শিশুকে কাঁদানোর ভিডিও যখন ‘ক্যাশ’ কামানোর কনটেন্ট

· Prothom Alo

শিশুকে কাঁদিয়ে বিরক্ত করে তার কষ্টের ছবি, ভিডিও পোস্ট করে টাকা কামাচ্ছেন অনেক অভিভাবক। এই অভিভাবকের তালিকায় মা–বাবা, বড় ভাইবোন, শিক্ষক, পাড়া–প্রতিবেশী—কে নেই? সম্প্রতি শিশু নির্যাতনের একটি ভিডিও রাষ্ট্র হয়েছে।

Visit sportbet.rodeo for more information.

সেখানে দেখা যাচ্ছে, এক ধর্মীয় শিক্ষক এক শিশুর মুখে বারবার বেত ঢুকিয়ে দিচ্ছে, আর শিশুটি ভয়ে কেঁদেই চলেছে। কাঁদতে কাঁদতে অসহায় শিশুটি নিজেই চেষ্টা করে তার ছোট ছোট হাত দিয়ে বেতটি সরিয়ে দিতে চায়; কিন্তু নিষ্ঠুর শিক্ষক থামে না। ভিডিওটি রাষ্ট্র করার সময় লিখে দেয়, ‘পিচ্চি পোলাপানরে কান্না করাইতে ভালোই লাগে।’ 

শিশুকে কষ্ট দিয়ে, লজ্জা দিয়ে, শিশুর অসহায়তা উপভোগ করা যে অনৈতিক; সেটা যে বোঝে না, সে শিক্ষক হয় কেমন করে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার চর আবাবিলের এই শিক্ষকের নাম ইমরান হোসেন। একা না, এ রকম অসংখ্য ইমরান আমাদের চারদিকে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নানা অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে প্রায় দুই মাস আগেই ইমরানকে প্রতিষ্ঠান থেকে খেদিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ, অকারণে কঠোর শাস্তি দেওয়া এবং অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া শিশুদের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের অভিযোগ ছিল। নিয়োগকর্তারা এখন বলেছেন, উল্লেখিত শিক্ষক আগে থেকেই ‘টিকটক’ ও ‘রিলস’–এ আসক্ত ছিল। তাই যদি হয়, তবে তাকে কেন এত দিন পালা হলো? আর নেওয়াই–বা হয়েছিল কিসের ভিত্তিতে? 

বাংলাদেশে শিশুদের ওপর নিপীড়নের বা তাদের কান্নার ভিডিও দিয়ে কনটেন্ট তৈরির ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে বর্তমানে কোনো স্বতন্ত্র আইন নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে এ ধরনের কনটেন্ট সম্পূর্ণ বৈধ

বিষয়টি নজরে আসার কথা জানিয়ে রায়পুর থানার কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ঘটনার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পাদটীকায় জানিয়েছেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’ যে দেশে থানার কেরানিকে বাধ্যতামূলক সম্মানী দিয়ে কেরানির বয়ানে বা বচনে অভিযোগ লেখাতে হয়, সেখানে অসহায় শিশু বা তার বিবর্ণ পরিবার কীভাবে কথিত ‘আইনি ব্যবস্থার’ প্রতি আস্থা রাখবেন। দারোগাবাবুরা আর কবে শিশু সুরক্ষায় একটু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ‘নড়াচড়া’ করবেন? 

শিক্ষার্থীদের নানা ছবি অনলাইনে পোস্ট করার একটা প্রতিযোগিতা চলছে দুনিয়াজুড়ে। যত ‘লাইক’, তত ক্যাশ বিষয়টিকে আর স্রেফ শখের খাতায় রাখেনি, নিয়ে গেছে এক বাণিজ্যিক তাণ্ডবের মহাসড়কে।

সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল গোপনীয়তা রক্ষায় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে তুরস্ক। দেশটির জাতীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। নির্দেশনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দেশের সব প্রাদেশিক শিক্ষা দপ্তরে এ-সংক্রান্ত পরিপত্র পাঠানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিনা অনুমতিতে শিক্ষার্থীর ছবি ব্যবহার এখন থেকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের সঙ্গে সংগতি রেখে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল জগতে শিশুদের অগোচরে ব্যক্তিগত তথ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার বন্ধ করতে চায় দেশটি।

এখন থেকে তুরস্কে এই চর্চায় কঠোর বিধিনিষেধ মানতে হবে। এমনকি অভিভাবকের সম্মতি থাকলেও ছবির ব্যবহার হতে হবে মার্জিত এবং শিক্ষার্থীর মর্যাদার সঙ্গে সংগতি রেখে। সে দেশের নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো পর্যবেক্ষণ করবে। যেসব প্রতিষ্ঠান এই গোপনীয়তা নীতি ভাঙবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে এই নিয়ম কার্যকর করার দায়িত্ব স্কুলপ্রধানদের ওপর থাকবে।

বাংলাদেশে শিশুদের ওপর নিপীড়নের বা তাদের কান্নার ভিডিও দিয়ে কনটেন্ট তৈরির ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে বর্তমানে কোনো স্বতন্ত্র আইন নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে এ ধরনের কনটেন্ট সম্পূর্ণ বৈধ। দেশে বিভিন্ন বিদ্যমান আইন, শিশুর অধিকার–সম্পর্কিত নীতি এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সমন্বয়ে এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ভিত্তি তৈরি আছে।

প্রধান ভিত্তিগুলো হলো

১. শিশু আইন, ২০১৩। এই আইনের মূল নীতি হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করা। এখানে শিশুর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে কোনো কাজ যদি শিশুর মানসিক বা সামাজিক ক্ষতির কারণ হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।

২. জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ। বাংলাদেশ এই সনদের সদস্য। সেখানে কমপক্ষে চারটি জায়গায় সুনির্দিষ্টভাবে শিশু সুরক্ষার কথা বলা আছে।

আর্টিকেল ৩: শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে।

আর্টিকেল ১৬: শিশুর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সম্মান রক্ষা করতে হবে।

আর্টিকেল ১৯: শিশুকে সব ধরনের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।

আর্টিকেল ৩৬: শিশুর কল্যাণের জন্য ক্ষতিকর যেকোনো শোষণ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।

৩. সাইবার নিরাপত্তা/সাইবার সুরক্ষা আইন: যদি কোনো ভিডিও শিশুকে অপমান, হয়রানি, মানহানি বা মানসিক ক্ষতির কারণ হয়, অথবা ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরাধের উপাদান প্রমাণ করতে হয়।

৪. সংবিধান: বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(৪) ও অনুচ্ছেদ ১৭ শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নীতিগত ভিত্তি প্রদান করে।

৫. জাতীয় শিশুনীতি, ২০১১: শিশুদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের নীতিগত অঙ্গীকার রয়েছে।

যদি সরকারের নিয়ত ঠিক থাকে এবং স্পষ্টভাবে এসব অপরাধের লাগাম টেনে ধরতে চায়, তাহলে সময় নষ্ট না করে একটি ‘শিশু ডিজিটাল সুরক্ষা নির্দেশিকা’ বা বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারে, যেখানে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হবে—১. শিশুর কান্না, আতঙ্ক বা অপমানের ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ। ২. ভিউ বা আয়ের উদ্দেশ্যে শিশুর মানসিক কষ্টকে ব্যবহার। ৩. শিশুর সম্মানহানিকর বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত প্রচার। 

এই নির্দেশিকায় থাকবে এসব অপরাধের জন্য প্রশাসনিক ও আইনগত শাস্তির বিধান। মনে রাখতে হবে, শিশুরা হাসলেই দেশ হাসে। 

গওহার নঈম ওয়ারা লেখক ও গবেষক

[email protected]

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source