ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬: ভারতীয় ঐতিহ্যের নতুন ভাষা, রাজকীয় গ্ল্যামারের অনন্য অধ্যায়

· Prothom Alo

মখমলের রাজকীয়তা, মুক্তোর কোমল ঝলক, ভ্রমণের রোমান্স আর শতবর্ষের কারুশিল্প ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬ যেন শুধু একটি ফ্যাশন শো নয়, বরং ভারতীয় ফ্যাশনের নতুন পরিচয়ের উপস্থাপনা। যেখানে ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরেই জন্ম নিচ্ছে আগামী দিনের বিলাসবহুল স্টাইল।

Visit cat-cross.com for more information.

দিল্লির গণ্ডি পেরিয়ে এবার নতুন ইতিহাস লিখেছে ‘হুন্দাই ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬’। বছরের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত এই ফ্যাশন আয়োজন শুধু ভেন্যু বদলেই আলোচনায় আসেনি, বরং প্রতিটি ডিজাইনারের সংগ্রহে উঠে এসেছে ভারতীয় ঐতিহ্য, আধুনিক নকশা, আন্তর্জাতিক অনুপ্রেরণা এবং নিখুঁত কারুশিল্পের এক অনন্য মেলবন্ধন। ‘হুন্দাই ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬’–এর প্রথম দুই দিনে অংশ নেয় ভারতীয় ডিজাইনার অনামিকা খান্না, ফল্গুনী শেন পিকক এবং রোহিত বাল। তাদের অংশগ্রহণে তিনটি ভিন্ন জগত মিলিয়ে তৈরি হয় এমন এক ফ্যাশন ক্যানভাস, যেখানে প্রতিটি পোশাক যেন একটি গল্প বলে।

অনামিকা খান্নার ‘মুনলিট প্যালেস’: স্মৃতি, শিকড় আর নতুন ভাবনার মিলন

ইন্ডিয়া কতুর উইকের উদ্বোধনী শোতে অনামিকা খান্না উপস্থাপন করেন তাঁর নতুন সংগ্রহ ‘মুনলিট প্যালেস’। এই সংগ্রহের মূল দর্শন ছিল, ঐতিহ্যকে অতীতের কোনো স্থির স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং সময়ের সঙ্গে বদলে চলা এক জীবন্ত শিল্প হিসেবে দেখা।

রাজস্থানের বারমেরের রঙিন কারুশিল্প এবং কলকাতার কালিঘাটের সরল রেখার শিল্পধারাকে একসঙ্গে মিশিয়ে তিনি তৈরি করেছেন এক ব্যতিক্রমী ভিজ্যুয়াল ভাষা।

আইভরি ও সোনালি রঙের ভারী সূচিকর্মের পাশাপাশি ছিল গাঢ় কালো ভাস্কর্যধর্মী সিলুয়েট, যা পুরো সংগ্রহে এনে দেয় ড্রামাটিক রিভার্স।

ড্রেপড শাড়ি-গাউন, কোমর ছুঁয়ে নামা ঝলমলে নেকপিস, ফুলেল সূচিকর্মে তৈরি জ্যাকেট, স্টেটমেন্ট কেপ, বডি-স্কাল্পটেড গাউন। সবকিছুতেই ছিল স্মৃতি, নারীর উত্তরাধিকার এবং আধুনিকতার সূক্ষ্ম প্রকাশ।

ডিজাইনার অনামিকা খান্না

সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল তাঁর ট্যাগলাইন। যেখানে তিনি বলেন, ভারতীয় কারুশিল্পকে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, কিন্তু নিজের শিকড় ভুলে নয়।

ফল্গুনী শেন পিককের ‘লে গ্রঁ ভোয়াজ’: ভ্রমণের রোমান্সে বিলাসী কতুর

যদি অনামিকা খান্না স্মৃতির গল্প বলেন, তবে ফল্গুনী শেন পিকক দর্শকদের নিয়ে যান পৃথিবীজুড়ে এক কল্পনার সফরে।

তাঁর নতুন সংগ্রহ ‘লা গ্রান্ড ভয়েজ’ যার অর্থ একটি শ্রেষ্ঠ ভ্রমণ। কালকশনটি অনুপ্রাণিত হয়েছে ইউরোপের ঐতিহাসিক রেলযাত্রা, বাইজান্টাইন শিল্প, প্যারিসের বেল এপোক যুগ, স্ট্রাসবুর্গের গথিক স্থাপত্য, বাভারিয়ার রাজপ্রাসাদ এবং ভারতের তাজমহল থেকে।

র্যাম্পের স্টেজও সাজানো হয়েছিল ইউরোপীয় এক ঐতিহাসিক রেলস্টেশনের আদলে, যা পুরো শোকে করে তুলেছিল অনেক বেশি সিনেমাটিক। কালেকশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়ের মধ্য ছিল হাতে করা সূক্ষ্ম সূচিকর্মের লেহেঙ্গা, স্ট্রাকচার্ড করসেট, ড্রামিটিক কেপ, অর্নামেন্টেড ট্যাপেস্ট্রি জ্যাকেট, লাক্সারি শেরওয়ানি, গাউন ও শাড়ি।

ডিজাইনার ফল্গুনী শেন পিকক

পোশাকগুলোতে দেখা যায় ক্রিস্টাল অর্নামেন্টেশন, ফেদার বা পালকের ব্যবহার, মেটালিক গ্লো এবং জেমস স্টোন কালার। যা সংগ্রহটিকে ইন্টারন্যাশনাল লাক্সারির দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিটি পোশাকেই ছিল ভারতীয় হস্তশিল্পের সূক্ষ্ম ছাপ।

রোহিত বালের প্রত্যাবর্তন: মখমল, মুক্তো আর ফুলের রাজকীয় জগৎ

দীর্ঘ বিরতির পর র্যাম্পে ফিরে রোহিত বাল আবারও প্রমাণ করলেন কেন তাঁকে ভারতীয় কতুরের অন্যতম কিংবদন্তি বলা হয়।

র্যাম্পজুড়ে তৈরি হয় ড্রিমি গার্ডেন ভাইব। পদ্মফুলের অনুপ্রেরণায় নির্মিত স্থাপনা, কুয়াশার আবহ এবং সবুজ ঘাস পুরো আয়োজনকে রূপকথার আবহ এনে দেয়।

এই সংগ্রহের প্রাণ ছিল ‘মখমল’। কালো, গাঢ় মেরুন, আইভরি ও সাদা রঙের ওপর নির্মিত হয়েছে রাজকীয় সিলুয়েট। স্টেটমেন্ট কেপ, স্ট্রাকচার্ড জ্যাকেট, শেরওয়ানি, লেহেঙ্গা এবং অনারকলি। সবকিছুতেই ছিল আভিজাত্য ও ঐশ্বর্যের ছোঁয়া।

রোহিত বালের স্বাক্ষরধর্মী ফ্লোরাল মোটিফ, জরদৌজি, গোটাপাত্তি, সূতার সূচিকর্ম এবং ড্রামাটিক অর্নামেন্টেশন প্রতিটি পোশাককে করে তুলেছে শিল্পকর্মের মতো। যেখানে বিশেষভাবে নজর কাড়ে  কালো মখমলের অনারকলি ও সূচিকর্মের কেপ, সোনালি পাতার নকশায় সাজানো শেরওয়ানি,  বিশাল ফুলের অলংকরণযুক্ত জ্যাকেট, মুক্তোর ঝালরে সাজানো হেডপিস, করসেটধর্মী আইভরি ব্রাইডাল গাউন, ক্রপড ভেলভেট জ্যাকেটের সঙ্গে লেহেঙ্গার নতুন স্টাইলিং।

যা নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের পোশাকেও দেখা গেছে আধুনিক কাট, স্বচ্ছ কাপড়ের ব্যবহার এবং সাহসী লেয়ারিং।

কারুশিল্পই ছিল সবচেয়ে বড় নায়ক

তিন ডিজাইনারের সংগ্রহ আলাদা হলেও একটি জায়গায় সবাই ছিল এক। আর তা হচ্ছে ভারতীয় কারুশিল্প। যা এখন বিলাসবহুল ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে।  

কোথাও ভাস্কর্যধর্মী নির্মাণ, কোথাও হাতে করা হাজারো ঘণ্টার সূচিকর্ম, কোথাও আবার আধুনিক টেইলারিং। সব মিলিয়ে ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬–এর প্রথম দুই দিনে দেখা যায় ঐতিহ্য মানেই অতীতে আটকে থাকা নয়। বরং নতুন চিন্তা, নতুন নির্মাণ এবং বৈশ্বিক নান্দনিকতার সঙ্গে মিলিয়েও শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখা যায়।

হাল ফ্যাশন বিশ্লেষণ

ইন্ডিয়া কতুর উইক ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় বার্তা হলো, লাক্সারি ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ কেবল ঝলমলে পোশাকে নয়, বরং গল্প বলার ক্ষমতায়। অনামিকা খান্নার শিকড়ের সন্ধান, ফল্গুনী শেন পিককের বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন এবং রোহিত বালের চিরন্তন রাজকীয়তা। তিনটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা আলাদা ভাবে শুধু কতুর উইককে একটি ফ্যাশন আয়োজন নয়, বরং ভারতীয় নকশা ও কারুশিল্পের নতুন যুগের সূচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

Read full story at source