নীতিতে অটল থাকা: নবীজি (সা.)-এর দুই সিদ্ধান্ত থেকে শিক্ষা

· Prothom Alo

নীতির প্রশ্নে মানুষ সবচেয়ে বেশি নমনীয় হয় দুই অবস্থায়—যখন ভুলটা নিজের পক্ষের কারও, আর যখন প্রতিপক্ষ চরম উসকানি দেয়। প্রথম অবস্থায় মানুষ নিজের লোককে আড়াল করে, দ্বিতীয় অবস্থায় প্রতিশোধের ন্যায্যতা খুঁজে নেয়।

নবীজির জীবনে এই দুই পরিস্থিতিরই সরাসরি দৃষ্টান্ত আছে, আর দুটিতেই তিনি নীতি থেকে একচুল সরেননি। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অনেক; এখানে দুটি ঘটনার কথা বলছি।

Visit newssport.cv for more information.

১. ভুলের দায় স্বীকার ও ক্ষতিপূরণ

মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম প্রচারের জন্য রাসুল (সা.) কয়েকটি ছোট কাফেলা আশপাশের অঞ্চলে পাঠান। এমনই একটি কাফেলার সঙ্গে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-কে পাঠানো হয় জুজাইমা গোত্রের কাছে, নির্দেশ ছিল শুধু দাওয়াত দেওয়ার, যুদ্ধের নয়।

জুজাইমার লোকেরা আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল, কিন্তু ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি’ কথাটা সঠিকভাবে বলতে না পেরে বলছিল ‘সবা’না, সবা’না’ (আমরা স্বধর্ম ত্যাগ করেছি)। খালিদ (রা.) ভুল বুঝে মনে করলেন, তাঁরা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করছে এবং আক্রমণ চালালেন।

কয়েকজন নিহত হলো, অন্যদের বন্দী করা হলো। পরদিন খালিদ নির্দেশ দিলেন বন্দীদের হত্যা করতে, যদিও কয়েকজন সাহাবি এই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেন।

আস-সুফফা: মদিনায় নবীজি (সা.)-এর আবাসিক মাদ্রাসা

সংবাদ নবীজির কাছে পৌঁছলে তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে দুইবার বললেন, ‘হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে, আমি তার দায় থেকে মুক্ত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৩৩৯)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবীজি (সা.) এখানেই থামেননি। শুধু মৌখিক দায়মুক্তি ঘোষণা করে ক্ষান্ত হলে সেটাও একরকম নীতি রক্ষা হতো। কিন্তু তিনি হজরত আলীকে পাঠিয়ে নিহত ব্যক্তিদের রক্তপণ ও সম্পদের ক্ষতিপূরণ পুরোপুরি পরিশোধ করলেন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি দিয়ে। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৪/৭৩)।

যে খালিদ (রা.) তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতিদের একজন, তাঁর ভুলের দায়ও তিনি ধামাচাপা দেননি, বরং প্রকাশ্যে স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন।

শিক্ষা: নীতি তখনই প্রকৃত নীতি, যখন তা নিজের পক্ষের ভুলের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। দায় স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়, তার প্রতিকারও নিশ্চিত করতে হয়।

২. চরম উসকানির মুখেও সংযম

তাঁর জীবদ্দশায় ইয়ামামার বনু হানিফা গোত্রের মোসাইলামা নিজেকে নবী দাবি করে। নবুয়তের দশম বছরের শেষ দিকে সে নবীজিকে চিঠি লেখে, ‘নবুয়তের দায়িত্বে আমি আপনার অংশীদার। রাজ্যের অর্ধেক আমাদের, অর্ধেক কোরাইশদের।’ (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআ’দ, ৩/৫৩৪-৩৫)

বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে মহানবী (সা.)-এর ঘোষিত ১০ নীতি

চিঠি নিয়ে দুই দূত নবীজির দরবারে এল। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ তারা জবাব দিল, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি মোসাইলামা আল্লাহর রাসুল।’

এর চেয়ে বড় উসকানি আর কী হতে পারে, নবুয়তের মিথ্যা দাবিদারকে সরাসরি সত্য নবীর মুখের ওপর স্বীকৃতি দেওয়া। রাসুল (সা.) চাইলে সেই মুহূর্তেই তাদের শাস্তি দিতে পারতেন; আবেগ ও যুক্তি—দুটোই তার পক্ষে ছিল।

কিন্তু তিনি বললেন, ‘দূত হত্যা নিষিদ্ধ। আল্লাহর শপথ, তা না হলে আমি অবশ্যই তোমাদের হত্যা করতাম।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৬১)

এরপর নবী (সা.) শুধু চিঠির জবাব দিলেন, ‘রাজ্য তো আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন। আর শুভ পরিণাম খোদাভীরুদের জন্য।’ (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৪/২৪৩)

শিক্ষা: নীতি মানে শুধু ন্যায্য অবস্থানে অটল থাকা নয়, বরং সেই নীতি রক্ষায় নির্ধারিত সীমা, যত বড় উসকানিই আসুক, অতিক্রম না করা। ক্ষোভ ন্যায্য হলেই তা কাজে রূপান্তরিত করার অধিকার তৈরি হয় না।

এই দুই ঘটনার মিল একটিই জায়গায়, উভয় ক্ষেত্রেই নবীজির কাছে একটা সহজ পথ খোলা ছিল: প্রথমটায় নীরব থাকা বা লুকিয়ে যাওয়া, দ্বিতীয়টায় প্রতিহিংসায় সাড়া দেওয়া। তিনি কোনোটাই বেছে নেননি।

নীতিতে অবিচল থাকা মানে শুধু কঠিন সময়ে সঠিক কথা বলা নয়, নিজের মানুষের ভুলে জবাবদিহি করা, আর শত্রুর উসকানিতেও সীমা না ভাঙা—এই দুই-ই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী

ইসলামে অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনন্য নীতি

Read full story at source