হাসান বসরি: দাসের সন্তান থেকে জাতির বিবেক

· Prothom Alo

ইসলামের প্রথম শতাব্দী ছিল ইতিহাসের এক বিস্ময়কর সময়। তখন পৃথিবীতে একসঙ্গে হাঁটছিলেন নবীজির সাহাবি, তাবেয়ি ও নতুন মুসলিম সমাজের নির্মাতারা। মদিনার অলিগলিতে তখনো প্রতিধ্বনিত হতো ওহির যুগের স্মৃতি, আর বসরার মসজিদগুলোতে জন্ম নিচ্ছিল জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত।

সেই সময়েই আবির্ভূত হন এমন এক মানুষ, যাঁর কণ্ঠে মানুষ শুনত কোরআনের আবেদন, চোখে দেখত তাকওয়ার দীপ্তি, আর জীবনে খুঁজে পেত দুনিয়াবিমুখ এক আল্লাহ ভীরু মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি তাবেয়ি যুগের শ্রেষ্ঠ মনীষী—হাসান বসরি (রহ.)।

Visit betsport24.es for more information.

তাঁর জীবন শুরু হয়েছিল এক অদ্ভুত ইতিহাস দিয়ে। পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা—দুজনই ছিলেন ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় আসা মানুষ। যুদ্ধবন্দীদের মতো তাঁদেরও বিভিন্ন সাহাবির মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়।

পিতা ইয়াসার ও মাতা খাইরা—দুজনই ছিলেন ইরাক বিজয়ের সময় বন্দী হয়ে মদিনায় আসা মানুষ। যুদ্ধবন্দীদের মতো তাঁদেরও বিভিন্ন সাহাবির মধ্যে দাস হিসেবে বণ্টন করা হয়।

ইয়াসার চলে যান বিশিষ্ট সাহাবি জায়েদ ইবনে সাবিতের ঘরে, আর খাইরা আশ্রয় পান নবীজির স্ত্রী উম্মে সালামার সান্নিধ্যে। (আল–হাসান আল–বাসরি হায়াতুহু ওয়া সিলাতুহু বিল হুক্কাম: পৃ. ১)

২১ হিজরিতে মদিনায় জন্ম নেন হাসান, হজরত ওমর (রা.) তখন খলিফা। তাঁর শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল মদিনার সেই পবিত্র পরিবেশ, যেখানে নবীজির স্মৃতি তখনো জীবন্ত।

তাঁর মা উম্মে সালামার খেদমত করতেন এবং মায়ের কাজের ব্যস্ততায় ছোট্ট হাসান কাঁদলে উম্মে সালামা (রা.) নিজেই বুকে জড়িয়ে নিতেন। একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, এ সময় তিনি শিশু হাসানকে স্তন্য দিয়ে ভোলাতেন। পরবর্তীকালে মুসলিম ঐতিহ্যে অনেকেই বিশ্বাস করেছেন, সেই সান্নিধ্যের বরকত হাসান বসরির জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিকতার জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। (আত–তারিখুল কাবির: ২/২৮৯)

মিসরে ইবনে খালদুন: এক বহুমাত্রিক জীবনের শেষ অধ্যায়

ছোটবেলায় তিনি বহু সাহাবির দোয়াও লাভ করেন। খলিফা ওমর তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং মানুষের কাছে তাকে প্রিয় করে দিন।’ (আল–বিদায়া ওয়ান–নিহায়া: ৯/২৭৮)

অল্প বয়সেই তিনি মসজিদে নববিতে জুমার নামাজ আদায় করেছেন এবং খলিফা ওসমানের খুতবা শুনেছেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি কোরআন হিফজ সম্পন্ন করেন, বহু হাদিস মুখস্থ করেন, এমনকি লেখালিখি ও হিসাববিদ্যাতেও দক্ষ হয়ে ওঠেন।

সিফফিনের যুদ্ধের পরে হাসান বসরির পরিবার বসরায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন। সেখানে তিনি সাহাবি ও তাবেয়ি আলিমদের কাছে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা লাভ করেন।

বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস, জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, ইমরান ইবনে হোসাইন, মুগিরা ইবনে শু’বা (রা.)-সহ অনেক সাহাবির কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য তাঁর হয়। কোরআন শিক্ষাও তিনি গ্রহণ করেন বিশিষ্ট কারিদের কাছ থেকে। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৪/৫৬৫)

একসময় তিনি নিজেও হয়ে ওঠেন অসাধারণ শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রমী। প্রতিদিন দুটি ‘দরস’ বসত। একটি ছিল মসজিদে, যেখানে সাধারণ মানুষ অবাধে প্রশ্ন করতে পারত।

একসময় তিনি নিজেও হয়ে ওঠেন অসাধারণ শিক্ষক। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল ব্যতিক্রমী। প্রতিদিন দুটি ‘দরস’ বসত। একটি ছিল মসজিদে, যেখানে সাধারণ মানুষ অবাধে প্রশ্ন করতে পারত।

আশ্চর্যের বিষয়, সব প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজে দিতেন না; অনেক সময় তাঁর ছাত্রদেরও উত্তর দিতে উৎসাহিত করতেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু জ্ঞান দিতেন না, নতুন আলেমও তৈরি করতেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৪/ ৫৬৬)

অন্যদিকে তাঁর ঘরের দরস ছিল একেবারে আলাদা। সেখানে উপস্থিত হতেন বিশেষ আল্লাহভীরু মানুষজন। সেই আসরে আলোচনা হতো আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ইখলাস এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার বিষয় নিয়ে।

কখনো কখনো সেই আলোচনা এত দীর্ঘ হতো যে পরিবারের সদস্যরা বিরক্ত হয়ে যেতেন। পরে অবশ্য তাঁরা বুঝে নিতেন—এ কাজ কোনো সাধারণ আলাপ নয়; এটি মানুষের হৃদয় গড়ার কাজ।

তবে হাসান বসরি (রহ.) শুধু মসজিদের মানুষ ছিলেন না। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও ছিলেন সাহসী। কাবুল অভিযানে অংশ নিয়েছেন, খোরাসানের প্রশাসনিক দায়িত্বে কাজ করেছেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের যুগে বসরার বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

বিচারকের মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে থেকেও তিনি কোনো বেতন গ্রহণ করতেন না। তাঁর কাছে পদ ছিল দায়িত্ব, উপার্জনের মাধ্যম নয়। (তবাকাতে ইবনে সা’দ: ৭/১২৯)

ইমাম জুওয়াইনি: মুসলিম চিন্তার রূপকার

হাসান বসরির জীবন ছিল ইবাদত ও আত্মসংযমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতি মাসের আইয়ামে বিজ, সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা তিনি নিয়মিত পালন করতেন। রাতের অধিকাংশ সময় কাটত তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর স্মরণে।

পৃথিবীর চাকচিক্য তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। বরং তিনি মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিতেন, দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখেরাতই চিরস্থায়ী। (হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩৪)

হাসান বসরির প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে সাহাবিরাও তাঁর জ্ঞানের স্বীকৃতি দিয়েছেন। একবার সাহাবি আনাস ইবনে মালিককে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘হাসানের কাছে জিজ্ঞেস করো।’

উপস্থিত লোকেরা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘আমরা তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি!’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমরাও শুনেছি, সে–ও শুনেছে। তবে তার মনে আছে, আর আমরা ভুলে গেছি।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া: ২/১৩৪)

সমসাময়িকেরাও তাঁকে অসাধারণ সম্মান করতেন। কাতাদা (রহ.) মন্তব্য করেছিলেন, ‘পূর্ণ মানবিকতার দিক থেকে হাসান বসরির মতো মানুষ আর কাউকে দেখিনি।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা: ৪/৫৭৭)

সাহাবি আনাস ইবনে মালিককে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘হাসানের কাছে জিজ্ঞেস করো।’ উপস্থিত লোকেরা বিস্মিত হয়ে বলল, ‘আমরা তো আপনাকেই জিজ্ঞেস করছি!’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমরাও শুনেছি, সে–ও শুনেছে। তবে তার মনে আছে, আর আমরা ভুলে গেছি।’

তাঁর ছাত্রদের তালিকাও ছিল ঈর্ষণীয়। মালেক ইবনে দিনার, সাবেত বুনানি, ইবনে আওনের মতো পরবর্তী যুগের বিখ্যাত মনীষীরা তাঁর কাছ থেকেই জ্ঞান ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা লাভ করেন। এভাবেই তিনি শুধু নিজের যুগকেই আলোকিত করেননি, পরবর্তী শতাব্দীগুলোকেও আলোকিত করে গেছেন। (তারিখুল ইসলাম লিজ–জাহাবি: ৩/৯৯)

হাসান বসরির রচিত তাফসির, আকিদা ও আধ্যাত্মিকতাবিষয়ক গ্রন্থসমূহ পরবর্তী যুগের আলেমদের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে ওঠে। যদিও তাঁর বহু বক্তব্য মৌখিকভাবেই মানুষের হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, তবু সেগুলোর প্রভাব আজও ইসলামি চিন্তার জগতে অনুভূত হয়।

১১০ হিজরির রজব মাসের এক শুক্রবার রাতে এই মহান তাবেয়ি ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। লোকসমাগম এত বেশি ছিল যে সেদিন বসরার কেন্দ্রীয় মসজিদে নিয়মিত আসরের জামাত অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। মানুষের ভিড়ে তা বাইরে আদায় করতে হয়েছিল। (তবাকাতে ইবনে সা’দ: ৭/১৩২)

একজন মানুষের জীবনের সফলতা কি এর চেয়ে বড় হতে পারে? জন্মেছিলেন এক যুদ্ধবন্দীর সন্তান হিসেবে, কিন্তু মৃত্যুর সময় হাসান বসরি (রহ.) ছিলেন একটি জাতির বিবেক, একটি যুগের শিক্ষক এবং ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাবেয়ি।

ইমাম ইবনে কাসির: শতাব্দী পেরিয়েও কেন প্রাসঙ্গিক

Read full story at source