ক্লিনিকে চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, কক্সবাজারের সেই নীলা রাখাইন পিএইচডি করবেন যুক্তরাষ্ট্রে
· Prothom Alo

কক্সবাজারের নীলা ওয়ান রাখাইন যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছেন। পূর্ণ বৃত্তিতে ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিকে বেছে নিয়েছেন তিনি। বাবা ছিলেন পেশায় দরজি। পড়াশোনার খরচ চালাতে তিনি নিজেও চাকরি করেছেন ক্লিনিকে। ক্লিনিকে চাকরি করে ভর্তি হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশে ফিরে বিশেষ করে শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
Visit sportbet.rodeo for more information.
কক্সবাজারের মেয়ে নীলা ওয়ান রাখাইন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সেখানে তাঁর গবেষণার বিষয় হবে শিক্ষা, বিশেষ করে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং। আগামী ১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছেন তিনি। পিএইচডি শেষে অর্জিত জ্ঞান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে লাগাতে চান তিনি।
নীলা ওয়ান এসএসসি পাস করেন কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে। পরে কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন পেশায় দরজি এবং চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আর্থিক সংকটের কারণে ভর্তি কোচিং করার সুযোগ হয়নি তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে কাজ করতেন নীলা ওয়ান। মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করতেন। সেই আয়ের একটি অংশ সংসারে দিতেন, আর বাকিটা জমাতেন ভর্তি পরীক্ষার খরচের জন্য।
সংগ্রামের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নীলা ওয়ান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। এক আত্মীয় আমার মাকে বলেছিলেন, “মেয়েকে এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।” কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, মানুষ যা–ই বলুক, কাজ দিয়েই তার জবাব দিতে হবে। এই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।’
নীলা ওয়ান এসএসসি পাস করেন কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে। পরে কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। ছোটবেলা থেকেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। বাবা মংফ্রুথেন রাখাইন পেশায় দরজি এবং চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। আর্থিক সংকটের কারণে ভর্তি কোচিং করার সুযোগ হয়নি তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একটি প্যাথলজি ক্লিনিকে কাজ করতেন নীলা ওয়ান। মাসে প্রায় চার হাজার টাকা আয় করতেন।
ছোটবেলা থেকেই বৌদ্ধ ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল নীলা ওয়ানের। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগে ভর্তি হন। ৩ দশমিক ৪৫ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষ করার পর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে শিক্ষা বিষয়ে ৩ দশমিক ৫২ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পড়াতে বরাবরই ভালো লাগত তাঁর। তাই টিউশনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পড়িয়েছেন, শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করেছেন এবং মিয়ানমারের শিক্ষার্থীদেরও অনলাইনে পাঠদান করেছেন। এসব অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিক্ষা বিষয়ে গবেষণার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সমাবর্তনে নীলা রাখাইনপিএইচডির প্রস্তুতি হঠাৎ করে শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে গবেষণার উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন তিনি। বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, নতুন দক্ষতা অর্জন করেছেন এবং নানা ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলাদেশ রাখাইন স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, অঙ্গন ও রঁদেভু শিল্পী গোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসব সংগঠনে কাজের মাধ্যমে নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও দলগত কাজের দক্ষতা অর্জন করেন।
স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর বিয়ে হয়। স্বামীর নাম নি জ রাখাইন। নীলা বলেন, ‘আমার পুরো যাত্রায় আমার স্বামী আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। বিয়ের পর যৌথ পরিবারে থেকেও পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে স্বামী ও বাবার অনুপ্রেরণায় আমি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসিনি।’
নীলা ওয়ান রাখাইন, পিএইচডি শিক্ষার্থী‘ছোটবেলা থেকেই নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। এক আত্মীয় আমার মাকে বলেছিলেন, “মেয়েকে এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে? শেষ পর্যন্ত তো সংসারই করবে।” কথাগুলো আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। তবে আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি, মানুষ যা–ই বলুক, কাজ দিয়েই তার জবাব দিতে হবে। এই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেছে।’স্নাতকোত্তরের শেষ সেমিস্টারে থাকতেই ইউনিসেফের একটি প্রকল্পে শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন নীলা ওয়ান। পরে ইউনিসেফ ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও শিক্ষক প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম ১০ মিনিট স্কুলে ইংরেজি প্রশিক্ষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবেও কাজ করেছেন। এ ছাড়া নিজ সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘চালুং একাডেমি’, যেখানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
নীলা ওয়ান রাখাইন ও তার স্বামী নি জ রাখাইন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ম সমাবর্তনের সময় তোলাছোটবেলা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন ছিল নীলা ওয়ানের। ইংরেজি ভাষার প্রতি আগ্রহ থেকেই সেই স্বপ্নের শুরু। পুরো যাত্রায় সবচেয়ে বড় দিকনির্দেশক ছিলেন তাঁর স্বামী নি জ রাখাইন। আবেদন প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে তিনি নীলা ওয়ানকে উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন। আবেদনের এক পর্যায়ে সাড়াও পান। ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে টিচিং অ্যান্ড লার্নিং এবং ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটিতে কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন বিষয়ে পূর্ণ বৃত্তিসহ পিএইচডির সুযোগ পান তিনি। সেই সঙ্গে কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটিতে কারিকুলাম অ্যান্ড ইন্সট্রাকশন বিষয়েও পিএইচডি করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে পূর্ণ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সেখানে তাঁকে টিউশন ফি মওকুফের আবেদন করতে বলা হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায় শুরু হলেও নিজের শিকড়কে ভুলতে চান না নীলা ওয়ান। তাঁর বিশ্বাস, গবেষণার অর্জিত জ্ঞান একদিন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখবে। নীলা ওয়ান রাখাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দেশ ছেড়ে যাচ্ছি দেশের জন্যই কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে। পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে আদিবাসী শিক্ষার্থী ও মেয়েদের মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে কাজ করার ইচ্ছা আছে। আমি নিজেও একজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। তাই জানি, তাঁদের কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। পাশাপাশি আমি চাই, ভবিষ্যতে কোনো মেয়েকে যেন শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে না হয়।’