বাণী ও সুরে লালনের সাধনা
· Prothom Alo

বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানাবতার ফকির লালন সাঁই সংগীতের বাণী ও সুর-সুধার মাধ্যমে জীবদ্দশাতেই নিজের সাধনকথা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তথ্যের দুর্লভতা হেতু এবং অনেকটা অজ্ঞতার কারণেও লালন সাঁইকে অনেকে কেবল একজন সাধক কবির মধ্যে সীমায়িত করেন। তা ছাড়া গুরু-শিষ্য পরম্পরার উত্তরাধিকারী লালনপন্থী সাধক শিল্পীদের কল্যাণে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের গবেষকদের অবদানে লালন সাঁইয়ের গানের বাণীর প্রামাণ্য দলিল যেমন ফকির-সাধকদের গৃহাঙ্গনের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের আর্কাইভ ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে সংরক্ষিত রয়েছে, তেমনি লালন সাঁইয়ের গানের ঐতিহ্যগত সুরের প্রাচীন ধারা সংরক্ষিত হয়েছে। এ প্রবন্ধে সেই ইতিহাসের সূত্রগুলো উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
Visit sportbet.rodeo for more information.
তিনটি প্রশ্ন দিয়ে মূল আলোচনায় প্রবেশ করতে চাই। প্রথম প্রশ্ন: ফকির লালন সাঁই নিজে গান পরিবেশন করতেন কি না? দ্বিতীয় প্রশ্ন: লালন সাঁইয়ের গানের কোনো পাণ্ডুলিপি আছে কি না? তৃতীয় প্রশ্ন: লালন সাঁইয়ের সব গানের সুর অডিও বা ভিজ্যুয়ালি সংরক্ষিত আছে কি না?
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (৪ মে ১৮৪৯ - ৪ মার্চ ১৯২৫) অঙ্কিত ফকির লালন সাঁইয়ের কথিত মূল স্কেচ‘গানের শেষ কলি গাইতে গিয়ে আস্তে করে গান শেষ করলেন, তারপর চাদর মুড়ি নিয়ে নীরব হয়ে গেলেন। অতি নিকটে থেকেও তাঁর শিষ্যরা বুঝতে পারল না তাদের প্রাণপ্রতিম ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়ীর গানের পাখীটা তাঁর শেষ গানের শেষ কলি গাইতে গাইতেই ইহলীলা শেষ করে চলে গেলেন।’
প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিতে চাই ঐতিহাসিক সূত্র থেকে। লালন সাঁইয়ের দেহত্যাগের মাত্র ১৪ দিন পর তথা ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক (৩১ অক্টোবর ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ) কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে ‘মহাত্মা লালন ফকির’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সে প্রতিবেদনের শুরুতেই লেখা হয়েছে, ‘লালন ফকীরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকী নাই। শুধু এ অঞ্চলে কেন, পূর্বে চট্টগ্রাম, উত্তরে রঙ্গপুর, দক্ষিণে যশোহর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বঙ্গদেশের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক এই লালন ফকীরের শিষ্য; শুনিতে পাই ইঁহার শিষ্য দশ হাজারের উপরে।’ বিবরণে তৎকালে লালন সাঁইয়ের গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ রয়েছে। তিনি নিজের সাধনক্ষেত্র কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার বাইরে বহুদূর পর্যন্ত নিজের সাধনার ধারা সম্প্রসারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
একই প্রতিবেদনে লালনের দেহত্যাগের তথ্য দিতে গিয়ে লেখক লিখেছেন, ‘পীড়িতকালেও পরমেশ্বরের নামে পূর্ববৎ সাধন করিতেন; মধ্যে মধ্যে গানে উন্মত্ত হইতেন। ধর্মের আলাপ পাইলে নববলে বলীয়ান হইয়া রোগের যাতনা ভুলিয়া যাইতেন। এই সময়ের রচিত কয়েকটি গান আমাদের নিকট আছে। অনেক সম্প্রদায়ের লোক ইঁহার সহিত ধর্মালাপ করিয়া তৃপ্ত হইতেন। মরণের পূর্বের রাত্রিতেও প্রায় সমস্ত সময় গান করিয়া রাত্রি ৫টার সময় শিষ্যগণকে বলেন “আমি চলিলাম”।’
এই বিবরণে প্রমাণিত হয়, লালন সাঁইয়ের সাধনার প্রধান আশ্রয় ছিল সংগীত। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও সংগীতের ভাবে যেমন উন্মত্ত থাকতেন, তেমনি শিষ্য-ভক্তদের সঙ্গে সাধন বিষয়ে আলোচনায় নিজের ব্যাধির কথা বিস্মৃত হয়ে যেতেন। একদিকে ধর্মালোচনা তথা সাধনকথার আলোচনা, অন্যদিকে গান পরিবেশনের দক্ষতায় তিনি সমাচ্ছন্ন ছিলেন। তাই তো তিনি দেহত্যাগের আগের রাতে সমস্ত সময় গান গেয়ে পার করেছিলেন।
তাঁর দেহত্যাগ সম্পর্কে লালনপন্থী সাধক ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ প্রায় একই ধরনের বিবরণ প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, লালন সাঁই দেহত্যাগের আগের রাতে শিষ্যদের উদ্দেশে উপদেশ–বাণী দেওয়ার পাশাপাশি গানও গেয়েছিলেন। শুধু তা–ই নয়, তিনি লিখেছেন, ‘ভোরের দিকে লালন সাঁই শিষ্যদের বলেন, “শোনো, আমি তোমাদের একটা গান শোনাব। মনিরুদ্দিন, তুমি গানটি লিপিবদ্ধ করো।” শিষ্যরা চিন্তা করল, সাঁইজী বয়সের বার্ধক্যদ্বারে উপনীত হয়েছেন, হয়তো আর গান করবেন না। তাই আজ হয়তো শেষ গান শোনাবেন। শেষ গানে না জানি কত সুন্দর বাণী শোনাবেন ভেবে সবাই একদৃষ্টে সাঁইজীর মুখপানে সাগ্রহে তাকিয়ে রইল। সাঁইজী প্রাণঢালা সুরে গান ধরলেন:
পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে।
ক্ষম হে অপরাধ আমার এ ভব কারাগারে।
পাপী অধম জীব হে তোমার
তুমি যদি না কর পার
দয়া প্রকাশ করে;
পতিত পাবন পতিত নাশন
কে বলবে আর তোমারে।
‘গানের শেষ কলি গাইতে গিয়ে আস্তে করে গান শেষ করলেন, তারপর চাদর মুড়ি নিয়ে নীরব হয়ে গেলেন। অতি নিকটে থেকেও তাঁর শিষ্যরা বুঝতে পারল না তাদের প্রাণপ্রতিম ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়ীর গানের পাখীটা তাঁর শেষ গানের শেষ কলি গাইতে গাইতেই ইহলীলা শেষ করে চলে গেলেন।’
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়ায় সংরক্ষিত লালনের গানের প্রাচীন পাণ্ডুলিপির একটি পৃষ্ঠা। এই পাণ্ডুলিপির একটি অনুলিপি বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিততাঁর জীবদ্দশায় কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদ ফকীর কর্তৃক সম্পাদিত এবং ১২৯২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত কাঙাল হরিনাথ মজুমদার প্রণীত কাঙ্গালের ব্রহ্মা-বেদ: আত্ম ও সাধনতত্ত্ব-এর ‘উপাসনা’ উপশিরোনামের আলোচনা অংশে লালন সাঁইয়ের ‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা’ শীর্ষক গানটি মুদ্রিত হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, এটিই ছিল লালন সাঁইয়ের জীবদ্দশায় মুদ্রিত প্রথম গান।
‘গানের শেষ কলি গাইতে গিয়ে আস্তে করে গান শেষ করলেন, তারপর চাদর মুড়ি নিয়ে নীরব হয়ে গেলেন। অতি নিকটে থেকেও তাঁর শিষ্যরা বুঝতে পারল না তাদের প্রাণপ্রতিম ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়ীর গানের পাখীটা তাঁর শেষ গানের শেষ কলি গাইতে গাইতেই ইহলীলা শেষ করে চলে গেলেন।’
এই বিবরণে লালন সাঁইয়ের সংগীতের বাণী ও সুর রচনার যৌথ ও নিবিড় প্রকাশ দৃষ্ট হয়, একই সঙ্গে লালন সাঁইয়ের গানের বাণী লিপিবদ্ধ করার ইতিহাসও জানা যায়। হিতকরী পত্রিকার বর্ণনায় লালন সাঁইয়ের গানের বাণী সংগ্রহের সূত্রও লভ্য।
উপর্যুক্ত বিবরণের সূত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে লালন সাঁইয়ের জীবৎকালেই তাঁর সংগীত–সম্পর্কিত পাঁচটি কাজ একসঙ্গে চলছিল। যথা: ১. লালন সাঁই মুখে মুখে গান রচনা করেন; ২. নিজের গানের সুর নিজেই করেন; ৩. তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্যরা তাঁর গানের বাণী লিপিবদ্ধ করেন; ৪. তাঁর গান সংগ্রহের কাজ শুরু করেন তাঁর ভাবপরিমণ্ডলের মধ্যে অবস্থানকারী লেখক, সম্পাদক ও প্রতিবেদকদের কেউ কেউ এবং ৫. তাঁর গান প্রকাশনার ক্ষেত্রেও প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাঁর পরিচিতজনেরা।
শেষোক্ত দুটি কথার প্রমাণস্বরূপ দৃষ্টান্ত উপস্থাপন সমীচীন মনে করি। আসলে পূর্বে উল্লেখিত পাক্ষিক হিতকরীর বিবরণের একটি স্থানে প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ‘এই সময়ের রচিত (লালন সাঁইয়ের পীড়িতকালের) কয়েকটি গান আমাদের নিকট আছে।’ এর অর্থ তিনি লালন সাঁইয়ের গান সংগ্রহ করেছিলেন। এ ছাড়া প্রতিবেদনের অন্তে তিনি লালন সাঁইয়ের গানের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে অভিমতসহ একটি গান প্রকাশ করেন; সেটি হলো, ‘লালন ফকীরের গান সর্ব্বত্রে সর্ব্বদাই গীত হইয়া থাকে। তাহাতেই তাঁহার নাম, ধর্ম, মত ও বিশ্বাস সুপ্রচারিত হইবে।’ এরপর তিনি লালন সাঁইয়ের ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ শীর্ষক গানটির পূর্ণ পাঠ উদ্ধৃত করেন। এটি লালন সাঁইয়ের দেহত্যাগের পর মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত প্রথম গান। এর আগে তাঁর জীবদ্দশায় কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদ ফকীর কর্তৃক সম্পাদিত এবং ১২৯২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত কাঙাল হরিনাথ মজুমদার প্রণীত কাঙ্গালের ব্রহ্মা-বেদ: আত্ম ও সাধনতত্ত্ব-এর ‘উপাসনা’ উপশিরোনামের আলোচনা অংশে লালন সাঁইয়ের ‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা’ শীর্ষক গানটি মুদ্রিত হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, এটিই ছিল লালন সাঁইয়ের জীবদ্দশায় মুদ্রিত প্রথম গান।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়ায় রক্ষিত রঙিন প্রতিকৃতি। এটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর অঙ্কিত লালন সাঁইয়ের কথিত মূল স্কেচের রঙিন অনুলিপিসুধীন দাস ও আজাদ রহমানের রেকর্ডিং ছাড়া অন্যদের রেকর্ড করা গানগুলো সৌভাগ্যক্রমে আমার পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, ড. ক্যারোল সলোমনের রেকর্ডিংগুলো আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের (সিয়াটল) এথনোমিউজিকোলজি বিভাগের ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া মকছেদ আলী সাঁই, মহিন শাহ, করিম শাহ প্রমুখ সাধক শিল্পীর গীত লালন সাঁইয়ের শতাধিক গানের অডিও রেকর্ডিং লভ্য।
পরবর্তীকালে লালন সাঁইয়ের গানের বাণী সংগ্রহ ও মুদ্রণের ইতিহাস ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। প্রসঙ্গেক্রমে প্রথম দিকের মুদ্রণ–সংক্রান্ত কিছু তথ্য উল্লেখ করা যায়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, যথাক্রমে নবকান্ত চট্টোপাধ্যায় ১৩০০ বঙ্গাব্দের (১৮৯৩) ১ আষাঢ় ভারতীয় সঙ্গীত মুক্তাবলীর প্রথম ভাগ তৃতীয় সংস্করণে, সরলা দেবী ১৩০২ বঙ্গাব্দের (১৮৯৫) ভাদ্র মাসে ভারতী পত্রিকায়, সতীশচন্দ্র দাস ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫) শ্রাবণ মাসে প্রবাসী পত্রিকায়, করুণাময় গোস্বামী ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫) ভাদ্র মাসে প্রবাসী পত্রিকায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩২২ বঙ্গাব্দের (১৯১৫) আশ্বিন–মাঘ মাসে প্রবাসী পত্রিকায় লালন সাঁইয়ের গান মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করেন। এই ধারাবাহিকতায় জলধর সেন, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, বসন্তকুমার পালসহ অনেকে লালনের কিছু গান মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধের আলোচনা যেহেতু লালন সাঁইয়ের গানের প্রকাশনার বিস্তৃত ইতিহাস সম্পর্কে নয়, তাই সেদিকে আর দৃষ্টি দিচ্ছি না।
আমাদের আলোচনার মূল বিষয় লালনের গানের বাণী ও সুর। উল্লেখ্য, তাঁর গানের আদি সুর সংরক্ষণের ইতিহাসও কিন্তু আমাদের হাতে আছে। তাঁর গানের প্রথম স্বরলিপি করেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত বীণা-বাদিনী পত্রিকার ১৩০৫ বঙ্গাব্দের (১৮৯৮-৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) মাঘ–ফাল্গুন সংখ্যায় ‘পারমার্থিক গান’ শিরোনামে লালন সাঁইজির রচিত ‘ক্ষম অপরাধ ও দীননাথ’ এবং ‘কথা কয় কাছে দেখা যায় না’ গান দুটির স্বরলিপি প্রকাশ করেন। এর প্রায় শতবর্ষ পরে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে লালন সাঁইজির গানের ‘মূল সুরকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা ও উত্তরসূরিদের জন্য সংরক্ষণের’ মানসে সংগীতসাধক সুধীন দাস লালনসংগীতের স্বরলিপি প্রণয়নে উদ্যোগী হন। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে লালন পরিষদের কেন্দ্রীয় সংসদ থেকে প্রকাশিত লালন সংগীত স্বরলিপির প্রথম খণ্ডের ‘স্বরলিপি রচনা প্রসঙ্গে’ শীর্ষক ভূমিকাংশে সুধীন দাস লিখেছেন, ‘এই স্বরলিপির কাজে আর যাঁর কথা আমাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে, তিনি হলেন লালন সংগীত বিশারদ খোদাবক্শ সাঁই, যিনি অনায়াসে প্রায় শ’ পাঁচেক লালনগীতি পরিবেশন করবার ক্ষমতা রাখেন। ধারাবাহিকভাবে সুযোগ পেলে হয়তো লালনের পাঁচ শতাধিক গানের স্বরলিপি প্রকাশ করতে পারব।’ এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সুধীন দাস প্রাথমিকভাবে ১৯৮৩-৮৪ খ্রিষ্টাব্দে খোদাবক্শ সাঁইয়ের গীত লালনের শতাধিক গানের অডিও রেকর্ডিং করেন। শুধু তা–ই নয়, তিনি ১৯৮৬ ও ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে যথাক্রমে লালন সংগীত স্বরলিপি এবং লালনগীতি ও স্বরলিপি নামে দুটি গ্রন্থে লালনের ৭০টি গানের স্বরলিপি প্রকাশ করেন। অবশ্য তিনি তাঁর পরিকল্পনা অনুসারে লালনের পাঁচ শতাধিক গানের স্বরলিপি সম্পাদন করতে সক্ষম হননি। প্রায় একই সময় থেকে ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত খোদাবক্শ সাঁইয়ের কণ্ঠ থেকে আমেরিকার ড. ক্যারোল সলোমন, জাপানের মাসাইয়্যুকি ওনিশি, আজাদ রহমান, তপন মজুমদার প্রমুখ লালনের শত শত গান রেকর্ড করেন। সুধীন দাস ও আজাদ রহমানের রেকর্ডিং ছাড়া অন্যদের রেকর্ড করা গানগুলো সৌভাগ্যক্রমে আমার পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, ড. ক্যারোল সলোমনের রেকর্ডিংগুলো আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের (সিয়াটল) এথনোমিউজিকোলজি বিভাগের ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়া মকছেদ আলী সাঁই, মহিন শাহ, করিম শাহ প্রমুখ সাধক শিল্পীর গীত লালন সাঁইয়ের শতাধিক গানের অডিও রেকর্ডিং লভ্য।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন সাঁইয়ের সমাধিসৌধ ও লালনপন্থী সাধকের সন্ধ্যাকালীন ভক্তিনিবেদনলালনের গানের মূল পাণ্ডুলিপিগুলো যেমন গুপ্ত বস্তুর মতো ব্যক্তিবিশেষের নিকট রয়েছে, তেমনি সেগুলোর অনুলিপিকৃত পাণ্ডুলিপিও আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। কেউ কেউ পাণ্ডুলিপিভিত্তিক গানের সংকলন প্রকাশ করেছেন, তবে সেগুলো সহজপ্রাপ্য নয়।... অন্যের রচিত গানকে লালনের নামে প্রচারের প্রবণতা বেড়েছে। মিডিয়াকেন্দ্রিক গান পরিবেশনে বাণিজ্যিক শিল্পীদের অধিকাংশই লালনের গানের ভাব, বাণী, সুর, সাধনা ইত্যাদির বিষয়ে মনোযোগী নন।
লালনের গানের সুর সংগ্রহের আরেকটি তথ্য উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক। সেটি হলো ২০০১ থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লন্ডনপ্রবাসী রঙ্গন মোমেন বৃহত্তর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন বাউল-ফকির ও সাধকের নিকট থেকে তিন হাজার গানের সুর-বাণীর অডিও রেকর্ড করেন, যার মধ্যে লালনের প্রায় ৬৫০টি গানের সুর-বাণীর অডিও সংরক্ষিত রয়েছে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, লালনের প্রামাণ্য গানের সংখ্যা সাকল্যে প্রায় ৬৫০। এসব গানের হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি বা খাতা তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্যরাই লিপিবদ্ধ করে গেছেন। শুধু গানের বাণী নয়, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে তাঁর গানের তালিকাও প্রণয়ন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর গানের সুর যেমন তাঁর মুখ থেকে গুরু–শিষ্য পরম্পরায় শ্রুতি ও স্মৃতিতে প্রবাহিত, তেমনি অধিকাংশ গানের ঐতিহ্যগত সুর বিংশ শতাব্দীর আশির দশক থেকে অডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তাঁর গানের মূল পাণ্ডুলিপি গুরু–শিষ্য পরম্পরায় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামের লালনপন্থীদের কাছে সংরক্ষিত আছে; ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা জেলার লালনপন্থী সাধকদের অন্দরমহলেও লালনের গানের আদি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত রয়েছে।
কিন্তু লালনের গানের মূল পাণ্ডুলিপিগুলো যেমন গুপ্ত বস্তুর মতো ব্যক্তিবিশেষের নিকট রয়েছে, তেমনি সেগুলোর অনুলিপিকৃত পাণ্ডুলিপিও আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। কেউ কেউ পাণ্ডুলিপিভিত্তিক গানের সংকলন প্রকাশ করেছেন, তবে সেগুলো সহজপ্রাপ্য নয়। ইতিমধ্যে লালনের গানের বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন প্রকাশনায় অন্যের রচিত গানকে লালনের গান বলে প্রচার করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে; মিডিয়া ও মঞ্চকেন্দ্রিক অনেক জনপ্রিয় শিল্পীর লালনের গানের বাণিজ্যিক পরিবেশনায় লালনের ঐতিহ্যিক সুর ও পরিবেশনরীতি পরিবর্তনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়; অন্যের রচিত গানকে লালনের নামে প্রচারের প্রবণতা বেড়েছে। মিডিয়াকেন্দ্রিক গান পরিবেশনে বাণিজ্যিক শিল্পীদের অধিকাংশই লালনের গানের ভাব, বাণী, সুর, সাধনা ইত্যাদির বিষয়ে মনোযোগী নন।
বসন্তকুমার পাল ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) প্রবাসী পত্রিকায় ‘ফকির লালন সাহ্’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘তাঁহার মন “অধর মানুষ” ধরিবার প্রবল বাসনায় অনুক্ষণ আকুল রহিত। তাঁহার অন্তঃকরণের ভাবরাশি যখন দু’কূলপ্লাবিনী তটিনীর ন্যায় আকুল উচ্ছ্বাসে উথলিয়া উঠিত, তখন আর তিনি আত্ম-সংবরণ করিতে পারিতেন না। শিষ্যগণকে ডাকিয়া বলিতেন, “ওরে আমার পুনা মাছের ঝাঁক এসেছে।” শুনিবামাত্র শিষ্যেরা যে যেখানে থাকিত ছুটিয়া আসিত। তখন সাঁইজী আপন ভাবের আবেশে গান ধরিতেন; শিষ্যেরাও সঙ্গে-সঙ্গে গাহিয়া চলিত। ইহাতে সময়-অসময় কিছু ছিল না, সদা-সর্ব্বদাই এই পোনা মাছের ঝাঁক আসিত। তিনি গৃহস্থ হইয়া সদানন্দ-ধামে বাস করিতেন।’
পাঠক, একবার ভেবে দেখুন, লালন সাঁইজির গানের বাণী ও সুরের যুগলবন্ধনকে পৃথক করা কি সংগত? সাঁইজি নিজেই তাঁর বাণী ও সুরকে কোনো দিন আলাদা বিবেচনা করেননি। আসুন, সেই সত্য মেনে নিয়ে ফকির লালন সাঁইকে সম্মান করি, সমাদর করি, হৃদয়ে ধারণ করি, তাঁর শ্রীচরণে সর্বান্তঃকরণে ভক্তি নিবেদন করি। নিজের অহংকারকে চূর্ণ করি। সাঁই দয়াময়।
সাইমন জাকারিয়া: কবি ও গবেষক