বরিশালে কী ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহৃত হয়েছে, নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ

· Prothom Alo

বরিশালের বাকেরগঞ্জে বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন দগ্ধ হয়েছেন। উপজেলার ভরপাশা ইউনিয়নের দুধলমৌ গ্রামে আজ সোমবার সকালে ওই ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে আজ রাত আটটা পর্যন্ত কী ধরনের বিস্ফোরক থেকে এ ঘটনা ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের পরীক্ষা ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ঘটনার পর র‍্যাব, পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিস্ফোরণস্থল ঘিরে রেখে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঢাকার বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে।

Visit biznow.biz for more information.

এ সম্পর্কে বরিশালের পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে। তারা এখনো ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি। তাই বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত মতামত দিতে পারবেন।’

বিকট বিস্ফোরণ শোনা গেছে এক কিলোমিটার দূর থেকেও
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, বিস্ফোরণ ছিল অত্যন্ত বিকট। প্রায় এক কিলোমিটার দূর থেকেও শব্দ শোনা গেছে। দুধলমৌ গ্রামের বাসিন্দা আল আমিন সিকদার বলেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দ শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাঁর বাড়ি ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। শব্দের উৎসের দিকে এগোতে গিয়ে তিনি দেখেন, মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি করছেন। পরে শাহ আলম হাওলাদারের বাড়িতে গিয়ে দেখেন, পরিবারের সদস্যরা কান্নাকাটি করছেন। শাহ আলমের স্ত্রী, মেয়ে ও নাতি দগ্ধ হয়েছেন। স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান।

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইতি আক্তার বলেন, সোমবার সকাল ছয়টার দিকে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠানে তাঁর ভাগনের পায়ে ব্যথা থাকায় তাঁকে ব্যায়াম করাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি একটি রশির সঙ্গে লাল রঙের তিনটি চিপসের প্যাকেট বাঁধা দেখতে পান।

ইতি বলেন, ‘বিষয়টি দেখে আমাদের কৌতূহল হয়। কাছে গিয়ে দেখি, যে রশির সঙ্গে চিপসের প্যাকেট বাঁধা, রশিটির আরেক পাশে একটি কাপড়ের শপিং ব্যাগও বাঁধা ছিল। বিষয়টি কী, তা দেখার চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় বৃষ্টির কারণে উঠান পিচ্ছিল থাকায় ইটে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। সঙ্গে সঙ্গে বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। আমার পায়ে আগুন লাগে। পাশে থাকা আমার মা ও ভাগনের শরীরেও আগুন ধরে যায়। পরে আতঙ্কে আমরা বাড়ির পাশের তুলাতলা নদীতে ঝাঁপ দিই।’

এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান, বরিশালের পুলিশ সুপার পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে। তারা এখনো ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি। তাই বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তাঁরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত মতামত দিতে পারবেন।

চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ
আহত ব্যক্তিরা কী ধরনের দাহজনিত আঘাত পেয়েছেন, জানতে চাইলে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি হিট বার্ন বলে মনে হচ্ছে। ছেলেটির শরীরের প্রায় ১৫ শতাংশ অংশ দগ্ধ হয়েছে। অন্য দুজনের আঘাত তুলনামূলক কম। এটি কেমিক্যাল বার্ন নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তাঁদের শরীরে কোনো স্প্লিন্টার পাওয়া যায়নি।’

এদিকে দগ্ধ তিনজনের উন্নত চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছে জেলা প্রশাসন। আজ সন্ধ্যায় বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে তাঁদের রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। ওই তিনজন হলেন হনুফা বেগম (৫৫), তাঁর মেয়ে ইতি আক্তার (১৮) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাতি ফাহিম (১৫)।

সোমবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহম্মদ, বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মোস্তাফিজুর রহমান, জেলা প্রশাসক মামুন খন্দকারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের খোঁজখবর নেন। এ সময় হাসপাতালের পরিচালক ও কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর সুপারিশ করেন।
পরে বিভাগীয় কমিশনার তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেন এবং সরকারি ব্যবস্থাপনায় আহত ব্যক্তিদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

বরিশালে ঘরের পাশের বালুভর্তি বস্তায় হঠাৎ বিস্ফোরণ, শিশুসহ দগ্ধ ৩
ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের একটি বোতল, লাল-কালো সুতা প্যাঁচানো টেপ এবং দুই থেকে চার ইঞ্চি মতো তার উদ্ধার করা হয়েছে। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ঘটনাস্থলে যা মিলেছে
ঘটনাস্থল থেকে কী ধরনের আলামত জব্দ করা হয়েছে, জানতে চাইলে বাকেরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আদিল হোসেন প্রথমে কিছু বলতে চাননি। পরে টেপ মোড়ানো কোনো তার পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে প্লাস্টিকের একটি বোতল, লাল-কালো সুতা প্যাঁচানো টেপ এবং দুই থেকে চার ইঞ্চি মতো তার উদ্ধার করা হয়েছে।

ওসি আদিল হোসেন বলেন, ‘বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই বিস্ফোরণের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’ এ বিষয়ে কোনো মামলা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘এখনো হয়নি। তবে হবে।’  

আলমগীর হোসেন, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার প্রাথমিকভাবে এটি হিট বার্ন বলে মনে হচ্ছে। ছেলেটির শরীরের প্রায় ১৫ শতাংশ অংশ দগ্ধ হয়েছে। অন্য দুজনের আঘাত তুলনামূলক কম। এটি কেমিক্যাল বার্ন নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তাঁদের শরীরে কোনো স্প্লিন্টার পাওয়া যায়নি।

যেভাবে ঘটল বিস্ফোরণ
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে শাহ আলম হাওলাদারের বাড়ির পাশে বালুভর্তি কয়েকটি বস্তার কাছে হঠাৎ বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। এতে শাহ আলমের স্ত্রী হনুফা বেগম, মেয়ে ইতি আক্তার এবং নাতি ফাহিম দগ্ধ হন।

শাহ আলমের ছেলে জামাল হোসেন বলেন, ‘বিস্ফোরণের পর মা, বোন ও ভাগনের শরীরে আগুন ধরে যায়। তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে পাশের তুলাতলা নদীতে ঝাঁপ দেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে বাকেরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

ঘটনার পর থেকেই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তুলাতলা নদীতীরের এই প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, তাঁদের এলাকায় এর আগে এমন বিস্ফোরণের ঘটনা কখনো ঘটেনি। কীভাবে এবং কেন এই বিস্ফোরণ ঘটল, বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁরা।
আরেক  প্রতিবেশী এনায়েত হোসেন বলেন, ‘কীভাবে আমাদের গ্রামে এ ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা কেউ বলতে পারছেন না। গ্রামের সবাই এখন অজানা আতঙ্কে আছে।’

তবে পুলিশ সুপার এ জেড এম মুস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

Read full story at source