পাঠচক্র: বইয়ের আড্ডা থেকে বিপ্লবের সূতিকাগার

· Prothom Alo

যুগে যুগে পাঠচক্রের ধরন বদলেছে, সেই সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে পাঠকের মনস্তাত্ত্বিক চেতনাতেও। পাঠচক্রের সাধারণ রূপটি হলো, কোনো একটি নির্ধারিত বই সংঘবদ্ধভাবে পড়া এবং নির্দিষ্ট অংশ শেষে নিজেদের পাঠপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা। এর বাইরেও নানা ভিন্নধর্মী পাঠচক্র লক্ষ করা যায়। যেমন পুরো বই আগে থেকে পড়ে এসে তার ওপর যৌথ আলোচনা ও গঠনমূলক সমালোচনা করা; কিংবা কোনো অভিজ্ঞ আলোচকের মুখ থেকে বইটির সারসংক্ষেপ শুনে নিজের মতামত ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা। বিভিন্ন সংগঠন ও পাঠকদল যুগে যুগে তাদের নিজস্ব ভাবনায় পাঠচক্রের এই রূপরেখা তৈরি করে নিয়েছে।

Visit tr-sport.click for more information.

কাঠামোগত পরিবর্তন এলেও যুগ যুগ ধরে পাঠচক্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া নানামুখী মতবাদ। যা বদলে দিয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বব্যবস্থার গতিপথ। পাঠচক্র কেবল বই পড়ার আসর নয়, এটি একই সঙ্গে দক্ষ শ্রোতা এবং যুক্তিমনস্ক বক্তা তৈরি করার মাধ্যম। তাই সেকালের প্রথাগত পাঠচক্রের সঙ্গে একালের আধুনিক রূপের বাহ্যিক ভিন্নতা থাকলেও, উভয়ের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু আজও অভিন্ন। সেকালের পাঠচক্রের দৃশ্য পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায়, কোনো একটি লাইব্রেরি কিংবা চায়ের টেবিলেই হতো মুক্তবুদ্ধির চর্চা।

পাঠচক্রের আসরের মতবাদ যেভাবে তৈরি করেছিল বিপ্লব এবং স্বাধীনতা আন্দোলন
অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে ফ্রান্সে ‘সেলুন’ সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচলন ছিল; যা মূলত ঘরোয়া পাঠচক্র। এ পাঠচক্রে তরুণদের মধ্যে এনেছিল মুক্তির চিন্তা, যা পরবর্তী সময়ে ফরাসি বিপ্লবে রূপ নেয়। শুধু ফরাসি বিপ্লবে থেমে থাকেনি এই পাঠচক্র, যুগে যুগে এর পরিসীমা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

রুশ বিপ্লব এবং কঙ্গো বিপ্লবেও পাঠচক্র ছিল অনন্য মাধ্যম। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার শাসনের (Tsarist Regime) চরম দমন-পীড়নের কারণে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কাজ অসম্ভব ছিল। তৎকালীন এই রাজনৈতিক অস্থিরতায় ‘মার্ক্সবাদী তত্ত্ব’ শ্রমিক ও তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে প্রথম কাজ করে ‘ক্রুঝকি বা পাঠচক্র’। এ বিষয়ে ‘আ পিপলস ট্র্যাজেডি’ গ্রন্থে অরলান্ডো ফিজেস বর্ণনা করেছেন। পরবর্তী সময়ে ‘কঙ্গো আন্দোলন ও আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামে পাঠচক্রের ভূমিকা ছিল অনন্য। ‘লুডো ডে উইটে’–এর গ্রন্থ ‘দ্য অ্যাসাসিনেশন অব লুমুম্বা’–এ তৎকালীন কঙ্গোর মহান নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বা এবং তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন পাঠচক্র ও আলোচনা সভায় অংশ নেওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়।

গণতন্ত্রের অপূর্ণতার উত্তর ‘নেতা জনতা ও রাজনীতি’ বইয়ে আছে কী

বাঙালি সাংস্কৃতিক বিপ্লবেও পাঠচক্রের ভূমিকা ছিল। উনিশ শতকের প্রথমার্ধে হিন্দু কলেজের হেনরি লুই ডেভিয়ান ডিরোজিও কর্তৃক গড়ে ওঠা ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ ছিল সে যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী পাঠচক্র। যে পাঠচক্রের প্রভাবে তরুণেরা জানতে পেরেছিল ধর্ম, সামাজিক কুসংস্কার ও যুক্তিবাদ। সুমিত সরকারের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মডার্ন ইন্ডিয়া: ১৮৮৫–১৯৪৭’, এবং শিবনাথ শাস্ত্রীর গ্রন্থ ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’ গ্রন্থে এ বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে অবিভক্ত বাংলার লেখক কাজী মোতাহার হোসেন এবং আবুল ফজল আর কাজী আবদুল ওদুদদের হাত ধরে ১৯২৬ সালে তৈরি হয়েছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’, যা বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে এনেছিল অমূল্য প্রভাব। এ ছাড়া ১৯৫২ এবং ১৯৭১ সালে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা এবং স্বাধীনতার চেতনা তৈরি করেছিল অনেক পাঠচক্রের আসর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিন কিংবা শরীফ মিয়ার আমতলার আড্ডাগুলো কেবল আড্ডায় থেমে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল বাঙালির স্বাধীনতা চেতনার বীজ তৈরির অনন্য মাধ্যম। স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে, তৎকালীন ঢাকার বিউটি বোর্ডিং কিংবা কফি হাউস—সবক্ষেত্রে পাঠচক্রের ধারা সেকালের তরুণদের মধ্যে এনেছিল প্রগতিশীল মনোভাব আর বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ভাবনা। কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকদের মতো লেখকেরা তাঁদের নব্য লেখনী পাঠ করতেন সেসব পাঠচক্রে। সাম্প্রতিক সময়ের গণ-অভ্যুত্থানেও পাঠচক্র সক্রিয় মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের ধারার প্রথম ধাপ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্টাডি সার্কেল বা পাঠচক্রে। রাষ্ট্রনীতি ও রাজনৈতিক আলোচনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল রাজনৈতিক সচেতনতা, এবং যার পরিকল্পনা পরবর্তী সময়ে গণ–অভ্যুত্থানে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে পাঠচক্র এখন পাড়ার মোড়ের চায়ের টেবিল কিংবা জামগাছতলার আড্ডা থেকে মোবাইল স্ক্রিনের নীল আলোয় রূপান্তর হয়েছে। এখনকার পাঠচক্রগুলো হয়ে উঠেছে প্রযুক্তিনির্ভর। নানাবিধ ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতায় ভিডিও কনফারেন্স এখন পাঠচক্রের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কাগজের বইয়ের পাশাপাশি কিন্ডল, পিডিএফ ও অডিওবুকের মাধ্যমে পড়ার অভ্যাসে এসেছে নতুন গতি। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে পডকাস্টের মাধ্যমে বইয়ের সারসংক্ষেপ শোনার প্রবণতাও বাড়ছে। প্রযুক্তির এই প্রত্যক্ষ প্রভাবে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়া বা চর্চার আগ্রহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এ বিষয়ে একজন শিক্ষিকা বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎসাহের অভাব এবং ক্যারিয়ার নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ডিজিটাল যুগের নিয়ন্ত্রণহীন প্রভাবেই শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও বইয়ের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার মূল কারণ। তবে পাঠচক্রের সঠিক চর্চা, এই মানসিক স্থবিরতা কাটাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।’

বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন প্রযুক্তিনির্ভর পাঠচক্র করলেও তেমন সাড়া বা আগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে একজন পাঠাগার পরিচালক বলেন, ‘একটা সময় মানুষ অনেক বই পড়লেও বর্তমানে মানসম্মত বইয়ের ঘাটতি এবং প্রযুক্তির প্রভাবে বই পড়ার মানসিক চেতনা লোপ পেয়েছে। যার ফলে বই পড়ার প্রতিযোগিতাও অনেকটা লোপ পেয়েছে। বই নিয়ে পাঠচক্রের আনন্দ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। তবে সুষ্ঠু প্রচারণা ও আলোচনা তরুণ প্রজন্মকে বই পড়া এবং জ্ঞান চর্চায় আগ্রহী করে তুলবে বলে বিশ্বাস করি।’

কাগজের পাতার সুবাসের জায়গায় এসেছে স্ক্রিনের আলো। কিন্তু যুগের এই পরিবর্তনের মধ্যেও পাঠচক্রের মূল চেতনাটি আজও রয়ে গেছে অভিন্ন জ্ঞানের আলো ছড়ানো, চিন্তার বিকাশ ঘটানো এবং সমাজকে সুন্দর করার তাগিদ।

বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা

Read full story at source