মানব পাচারের নেটওয়ার্ক ভাঙতেই হবে
· Prothom Alo

ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশি তরুণদের করুণ মৃত্যু আবার প্রমাণ করল, মানব পাচার বন্ধ ও নিরাপদ অভিবাসনের মতো জরুরি বিষয়গুলো আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো কতটা উপেক্ষিত। মিসরের কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাস নিশ্চিত করেছে, লিবিয়া থেকে রাবারের নৌকায় গ্রিস যাওয়ার পথে ৯ বাংলাদেশিসহ ১০ জন মারা গেছেন। নৌকাটি থেকে আরও ২৯ জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করে মিসরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
৩ আগস্ট ২৫ জনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন রাবারের নৌকাটিতে ৪২ জন বাংলাদেশি ও সুদানি নাগরিক লিবিয়ার তবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। ৩৬ ঘণ্টা পর গ্রিসে পৌঁছানোর কথা থাকলেও জ্বালানি ফুরিয়ে আসায় নৌকাটি দিকভ্রষ্ট হয়। মিসরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ও ভাগ্যের জোরে বেঁচে ফেরা তরুণেরা এই যাত্রার যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা এককথায় দুর্বিষহ ও কল্পনাতীত। একসময় নৌকাটিতে থাকা খাবার ও পানি ফুরিয়ে যায়। প্রচণ্ড গরম, সূর্যের অসহনীয় তাপ, খাবার ও পানির অভাবে একে একে ৯ জন বাংলাদেশি, একজন সুদানিসহ মোট ১০ জন মারা যান। মরদেহে পচন শুরু হলে সেগুলো সমুদ্রে ফেলা দেওয়া হয়। মিসরের উপকূলে ভেড়ার পর নৌকাটি থেকে অসুস্থ ও অচেতন অবস্থায় বাকিদের উদ্ধার করা হয়।
Visit tr-sport.bond for more information.
লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে অভিবাসন চেষ্টাকালে এ বছর এটি দ্বিতীয় বড় দুর্ঘটনা। এর আগে মার্চ মাসে ইতালি যাওয়ার সময় ১৮ জন বাংলাদেশি তরুণ মারা গিয়েছিলেন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি বাংলাদেশি তরুণদের ভাগ্য বদলের মরিয়া প্রচেষ্টা এবং ট্র্যাজিক মৃত্যুর মিছিল নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হলেও সেটা বন্ধে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতা একেবারেই অনুপস্থিত। প্রতিটি বড় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পর দু-একজন স্থানীয় পর্যায়ের দালালদের ধরা হলেও মানব পাচারকারী চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান। আবার যাঁরা গ্রেপ্তার হন, দুর্বল এজাহার ও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে তাঁদের বিচার হয় না বললেই চলে। এ ছাড়া পাচারকারী চক্রের যে আন্তরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্ক, সেটা ভাঙার জন্য যে দক্ষ ও বিশেষায়িত জনবল প্রয়োজন, সেটাও বাংলাদেশে অনুপস্থিত। সব মিলিয়ে মানব পাচারকারী চক্রের এই দায়মুক্তি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন বন্ধ হচ্ছে না।
বাংলাদেশের বৈষম্যমূলক অর্থনীতি সিংহভাগ তরুণের জন্য ভদ্রস্থ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। এই রূঢ় বাস্তবতাও অনেক তরুণকে জীবন বাজি ধরে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে প্ররোচিত করছে। এরই সুযোগ নিচ্ছে পাচারকারী চক্র। প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যাচ্ছে, অবৈধপথে ইতালি যেতে ২০ থেকে ২২ লাখ এবং গ্রিস যেতে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে লিবিয়া থেকে ইতালিতে পৌঁছান প্রায় ১১ হাজার ২৩১ জন বাংলাদেশি। ইউরোপীয় সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য বলছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত আনুমানিক ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ঝুঁকিপূর্ণ এই পথে ইউরোপ পৌঁছান। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় অবৈধ অভিবাসনের অর্থনৈতিক স্বার্থটা কত বড়।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ভূমধ্যসাগর হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এ অভিবাসনে বাংলাদেশিরা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও সুদানের চেয়েও এগিয়ে। এটি আমাদের জাতিগত লজ্জার একটি দৃষ্টান্ত। আমাদের নীতিনির্ধারকদের কাছে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির গল্প প্রাধান্য পেলেও কেন তরুণেরা দেশ ছাড়তে এমন মরিয়া, তা মোটেই গুরুত্ব পায় না। আমরা মনে করি, যে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন, তাঁদের জন্য নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার একমাত্র দায়িত্ব সরকারেরই।
ভূমধ্যসাগরে অবৈধ অভিবাসন ও হতভাগা তরুণদের করুণ মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করতেই হবে। তরুণদের জীবনকে যাঁরা নিজেদের অবৈধ মুনাফার পণ্যে পরিণত করেছে, সেই মানব পাচারকারী চক্রের নেটওয়ার্ক অবশ্যই ভেঙে দিতে হবে।