চাকরি ছেড়ে টিকটক: সামাজিক মাধ্যম কি সত্যিই ক্যারিয়ারে নতুন পথ?

· Prothom Alo

অফিসের নির্দিষ্ট টেবিল। বাঁধাধরা ডিউটি। সময় মেনে পাঞ্চ ইন–পাঞ্চ আউট। আর মাস শেষে অ্যাকাউন্টে বেতনের টাকা জমা হওয়া। নিরাপদ ছাপোষা ক্যারিয়ার বলতে আমরা সাধারণত এমন এক ছকবাঁধা জীবনকেই বুঝি। কিন্তু সেই গোছানো জীবন ছেড়ে কেউ যদি ঘরের কোণে ট্রাইপডে মোবাইল ক্যামেরা বসিয়ে দাঁড়িয়ে যান, তবে পরিচিতদের মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। আত্মীয়স্বজন আর পড়শিরা ভেবে বসতে পারেন ছেলে বা মেয়ের মাথাটাই বোধ হয় গেল!

তবে ইদানীং অনেকেই এই ছকভাঙা পথ বেছে নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এরিন ম্যাকগফের গল্পটি ঠিক তেমনই। বিজনেস ইনসাইডারের প্রকাশিত প্রতিবেদনের সম্প্রতি তিনি তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

Visit chickenroad-game.rodeo for more information.

সিভির পরামর্শ দিয়েই নিজের নতুন ক্যারিয়ার—

এরিন একসময় ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’-এর চাকরি করতেন। ২০২০ সালে করোনাকালে শখের বশে টিকটকে চাকরির ভাইভা ও রেজুমি তৈরির নানা কৌশল নিয়ে ছোট ছোট ভিডিও বানানো শুরু করেন। ২০২১ সালের মধ্যেই তাঁর অনুসারী শূন্য থেকে একলাফে ২০ লাখে গিয়ে ঠেকে।

বর্তমানে জেন-জি ও মিলেনিওয়ালদের ক্যারিয়ার পরামর্শ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরিন ম্যাকগফের অনুসারী ৬৫ লাখের বেশি। গুগল, মেটা, লিংকডইন, ইনডিড, হিলটন ও ক্যাপিটাল ওয়ানের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন তাঁর সঙ্গে কাজ করছে।

চমকপ্রদ বিষয় হলো ২০ লাখ অনুসারী হওয়ার পর এরিন অ্যাপটি মুছে ফেলেছিলেন! কারণ, তিনি অনলাইন গ্ল্যামারের পেছনে দৌড়ানো সাধারণ ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ হতে চাননি। কিন্তু অনুসারীদের হাজার হাজার বার্তা তাঁর ভাবনা বদলে দেয়। মানুষ জানাচ্ছিল, তাঁর পরমর্শ মেনে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত চাকরি পেয়েছেন কিংবা বেতন বাড়িয়ে নিয়েছেন।

এরপর এরিন আবার সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসেন।

বেতন কম হলেও এই চাকরিগুলো কেন বেছে নিচ্ছেন তরুণেরা

মানুষের সিভির ভুল শুধরে দেওয়ার পরামর্শ দিতে দিতেই তিনি নিজের এক রাজকীয় ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালে তিনি গড়ে তোলেন প্রযোজনা সংস্থা ‘গ্রে ফিল্মস’। ২০২৪ সালে ইউটিউব সিরিজ ‘নো ওয়ান নোজ হোয়াট দে আর ডুইং’ চালুর পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউস’-এর সঙ্গে বইয়ের চুক্তি করেন। ২০২৫ সালে তিনি স্থান পান ফোর্বসের ‘৩০ অ্যান্ডার ৩০’ তালিকায়।

বর্তমানে জেন-জি ও মিলেনিওয়ালদের ক্যারিয়ার পরামর্শ দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারী ৬৫ লাখের বেশি। গুগল, মেটা, লিংকডইন, ইনডিড, হিলটন ও ক্যাপিটাল ওয়ানের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখন তাঁর সঙ্গে কাজ করছে। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন তিনটি ‘সিলভার টেলি অ্যাওয়ার্ডস’, ‘ওয়েবি অনার’ এবং ‘ক্লিও প্রাইজ’। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনবিসি ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও তিনি নিয়মিত লিখছেন।

সরকারিভাবে ব্রুনাইয়ে চাকরির সুযোগ, পদ ১৭২

আগে দোকান নাকি আগে ক্রেতা?

তবে সোশ্যাল মিডিয়ার এই ক্যারিয়ারে পা দিয়েই টাকার পাহাড় তৈরি হয় না। এরিন নিজেই এক কোর্সে জানান, টিকটক ক্রিয়েটর ফান্ডে যোগ দেওয়ার প্রথম চার সপ্তাহে তিনি পেয়েছিলেন মাত্র ২ হাজার ৫০০ ডলার। কোনো বড় ব্রান্ডের চুক্তি তখন তাঁর ছিল না।

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবসার হিসাবটাই এমন। এখানে আগে ফ্রিতে ভিডিও বানিয়ে দর্শক বা ক্রেতা জমাতে হয়, তারপর আয়ের মুখ দেখা যায়।

তবে ২০২৬ সালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এ খাতে এখন ছোট নির্মাতাদের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। যাদের অনুসারী ১৫ হাজার থেকে ৫০ হাজারের মধ্যে, ব্র্যান্ডগুলো এখন তাদের পেছনেই বেশি টাকা ঢালছে। কারণ, ১০ লাখ ভুয়া বা অপ্রাসঙ্গিক দর্শকের চেয়ে ৩০ হাজার কাজের দর্শক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।

মানুষের সিভির ভুল শুধরে দেওয়ার পরামর্শ দিতে দিতেই এরিন ম্যাকগফ নিজের এক রাজকীয় ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন

অ্যালগরিদম নামক রহস্যময় বস

এরিনের মতো দু-একজনের সাফল্য দেখে হুট করে চাকরি ছেড়ে দেওয়া অবশ্যই ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৫ সালের এক বৈশ্বিক গবেষণায় সামাজিক মাধ্যমের নির্মাতাদের আয়ের বড় বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। অল্পসংখ্যক নির্মাতা বিপুল আয় করলেও অধিকাংশের আয় তুলনামূলকভাবে কম। অর্থাৎ ক্যামেরা অন করলেই টাকা অন হয় না।

তবু সামাজিক মাধ্যম এখন আর শুধু বিনোদনের জায়গা নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি ব্যবসায়িক ক্ষেত্রও হয়ে উঠছে। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান ২০২৬ সালের এপ্রিলে জানিয়েছে, টিকটক ও ভিসা যুক্তরাজ্যের কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য বিশেষ ডেবিট কার্ড চালু করেছে। ভিসার গবেষণায় দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ নির্মাতা কখনো না কখনো দেরিতে বা অনিয়মিত অর্থ পাওয়ার সমস্যায় পড়েছেন। আবার ৪১ শতাংশ অর্থের অনিশ্চয়তার কারণে কাজ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

অর্থাৎ টিকটকে আয় আছে। তবে আয় অনেকটা এমন—আজ বৃষ্টি, কাল রোদ। ছাতা সঙ্গে রাখাই ভালো।

তার ওপর এই জগতে বসের জায়গায় বসে থাকে অ্যালগরিদম। অফিসের কড়া মেজাজের বসকে অন্তত কাজের ফিরিস্তি দিয়ে শান্ত রাখা যায়। অ্যালগরিদমের মেজাজ বোঝা কঠিন। আজ ভিডিওতে লাখো দর্শক। কাল হয়তো ৩০০ জনও দেখল না।

বিদেশে পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজ, যেসব বিষয় জানা জরুরি

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে কী করবেন?

বাংলাদেশেও টিকটক এখন আর কেবল নাচ-গানের জায়গা নেই। রান্না, প্রযুক্তি, পড়াশোনা, বইয়ের রিভিউ কিংবা ছোট ব্যবসার প্রচার নিয়ে প্রচুর শিক্ষণীয় কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে।

তাই বলে কি চলতি চাকরিটা কালই ছেড়ে দেবেন? একদমই না।

নিজের মূল চাকরি বা পড়াশোনা ঠিক রেখেই সোশ্যাল মিডিয়াকে একটি অতিরিক্ত সুযোগ হিসেবে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রথমে কনটেন্ট বানিয়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করুন, নিজস্ব দর্শক তৈরি করুন এবং আয়ের পথ টেকসই করুন।

অতঃপর চাকরি ছাড়ার কথা ভাবতে পারেন।

Read full story at source