রংপুরে চার খুন: পুলিশের দেওয়া তথ্য নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা কতটা অমূলক
· Prothom Alo

‘ভাই, এটা কি ইয়াবা-সংক্রান্ত ঘটনা? ভাই, ছোট বাচ্চাটাকে কেন মারছিলেন? এই শার্টটা কি আপনার ছিল? ভাই, বিদ্যুতের লাইন কেন বন্ধ করছিলেন? ভাই, কে কে জড়িত ছিল?’
Visit biznow.biz for more information.
গত রোববার রাতে রংপুর মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত চাঞ্চল্যকর চার খুনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের জবানবন্দি শেষে আদালত থেকে কারাগারে পাঠান। সে সময় আদালত ভবন থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার মধ্যবর্তী পথে কয়েকজনকে উল্লিখিত প্রশ্নগুলো করতে শোনা যায়। অভিযুক্ত দুজনের কেউ কোনো কথা বলেননি।
বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, তাঁদের স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া প্রিয়ম চক্রবর্তী নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাসায় খুন হন। শনিবার দিবাগত রাতে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে খুনের কারণ সাংবাদিকদের জানান। কমিশনার বলেন, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ তাঁদের বন্ধু সীমান্তর বাসায় রাতে ইয়াবা সেবন করে গণপতির বাসার ছাদে আবার ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিল। গণপতি ইয়াবা সেবনে বাধা দিলে তাঁর কাঁধে থাকা গামছা গলায় পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করে দুজনে। এরপর তাঁর স্ত্রী এলে তাঁকেও হত্যা করে। এভাবে তাঁদের সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও প্রিয়ম চক্রবর্তীকে শ্বাস রোধে হত্যা করে।
পুলিশ কমিশনার আরও উল্লেখ করেন, দুই খুনি পার্শ্ববর্তী দেবুর বাড়ির তিনতলা থেকে গণপতির বাড়ির ছাদে লাফিয়ে গিয়েছিল। দিনটি শুক্রবার হওয়ার কারণে জুমার নামাজ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে, যাতে মুসল্লিরা দেখতে না পান। খুনিরা খুন করার পর খেজুর, শসা খেয়েছে, সোনা পরীক্ষা করেছে আগুন জ্বালিয়ে। এ রকম আরও অনেক তথ্যই দেন পুলিশ কমিশনার। সব তথ্য গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বরাতে বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া এ বক্তব্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।
রংপুর ডিবি উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁদের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী জানান যে সিদ্ধার্থর শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন আছে। মুগ্ধর প্রতি সন্দেহের কথাও তিনি বলেছেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময়ে ডিবি পুলিশের উপকমিশনারের শার্ট ও সিদ্ধার্থর শার্ট ছিল একই রঙের, একই প্রিন্টের। সিদ্ধার্থর বাবা বলেছেন, যখন পুলিশের হাতে ছেলেকে তুলে দেন, তখন গায়ে ছিল গেঞ্জি। পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, আড়ং তো মাত্র একটি শার্ট তৈরি করেনি।
পুলিশের দেওয়া যেসব তথ্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো ভেবে দেখা জরুরি। কারণ, এ প্রশ্ন শুধু দু-চারজনের নয়, অনেকের। যদি পুলিশ যা বলছে তা ঠিক হয়, তাহলে নিশ্চয়ই স্বল্পতম সময়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারার বিষয়টি বড় রকমের ইতিবাচক ঘটনা। সে ক্ষেত্রে পুলিশকে ধন্যবাদ দিতে হবে।
জনমনে ওঠা প্রশ্ন: ১. বাসার বিদ্যুতের লাইন কেন খোলা ছিল? ২. সীমান্তর বাসায় যদি ইয়াবা সেবন করে, তাহলে আবার কেন ইয়াবা সেবন করার জন্য ঝুঁকি নিয়ে এক বাসা থেকে আরেক বাসার ছাদে লাফিয়ে যাবে ইয়াবা সেবন করতে? ৩. যে বাসা থেকে লাফিয়ে গেছে, ওই বাসার ছাদে কিংবা নির্মাণাধীন নির্জন তিনতলার মেঝেতে বসে কেন ইয়াবা সেবন করল না? ৪. হিন্দু-অধ্যুষিত মাছুয়া পাড়ায় শুক্রবারের মুসল্লিদের কথা আসছে কেন? ৫. অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, পুলিশ অফিসারের শার্ট এক হওয়া কি রহস্যজনক নয়? ৬. স্বর্ণকারের দোকানের কর্মচারী সিদ্ধার্থ কি আড়ং থেকে শার্ট কিনেছে? ৭. ঘর কেন তছনছ করা ছিল? ৮. অভিযুক্ত ব্যক্তিদের যিনি ধরিয়ে দিয়েছেন, তিনি মুগ্ধকে কেন সন্দেহ করেছিলেন? ৯. দুজন মিলে কি চারজনকে হত্যা করেছে? ১০. চারজন মানুষকে খুন করার পর সেই বাসায় গোসল করা, শসা-খেজুর খাওয়া, সোনা পরীক্ষা করা কীভাবে সম্ভব?
গণপতির পরিবার যে বাসায় খুন হয়েছে, সেই বাসা সরেজমিন দেখতে গিয়েছিলাম রোববার বিকেলে। উত্তরমুখী নির্মাণাধীন দোতলা বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর। নিচতলার কাজ শেষ হয়নি। তাঁর বাড়ির পূর্ব দিক লাগোয়া বাড়িটি গ্রেপ্তার হওয়া সিদ্ধার্থদের। পশ্চিমে দেবুদের নির্মাণাধীন বাসা। বাসার উত্তরে মন্দির। মুগ্ধর বাড়িও কাছেই। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ মামাতো-ফুফাতো ভাই। সিদ্ধার্থর বাবার সঙ্গে আমার সামান্য কথা হয়। এরপরই তিনি বাসার ভেতরে চলে যান।
বাসার বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অনেকে মনে করছেন। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ার সঙ্গে বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোনো সম্পর্ক নেই বলে অনেকে বলছেন। ইয়াবা খাওয়ার পর আবারও ইয়াবা খাওয়ার বিষয়টিকে অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইছেন না। দেবুদের বাসাও নির্মাণাধীন। কেবল দ্বিতীয় তলায় একটি পরিবার থাকে। ওই বাসায় তৃতীয় তলার কেবল ছাদ হয়েছে। ইয়াবা সেই বাসার তৃতীয় তলায় কিংবা তৃতীয় তলার ছাদে বসেও খেতে পারত। গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ নগরীর একটি মাছের দোকানে কাজ করে আর সিদ্ধার্থ সোনার দোকানের কর্মচারী। এমন কর্মচারী আড়ং থেকে শার্ট কিনেছেন, তা-ও অনেকের বিশ্বাস না হওয়ারই কথা। যে শুভাকাঙ্ক্ষী সিদ্ধার্থকে সন্দেহের কারণ জানিয়েছেন, তিনি মুগ্ধকে কেন সন্দেহ করেছেন, তা জানা যায় না।
দশটি অবিশ্বাস একসঙ্গে করলে বড় রকম অনাস্থা তৈরি হয়। পুলিশ যা বলছে, তা যথার্থ হলে সেটার বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি মানুষ চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। যদি নেশার কারণে এ ভয়াবহ ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেই নেশার বিস্তার রোধ করতে না পারা মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের ব্যর্থতা। আমাদের এ কথাও মনে রাখতে হবে, পুলিশ গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছে, তা শতভাগ অসম্ভব নয়। দেশবাসী চায়, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হোক।
রংপুর শহর সুখের শহর বলে পরিচিত। সেই শহরে নিশ্চিন্ত বাস করাও আর নিরাপদ নয়। এক বাসায় চার খুনের কারণ যা-ই হোক, শহর যে অনিরাপদ, তা কি অসত্য? এই শহর কি আর ফিরবে সুখের শহরে?
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী রক্ষাবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
মতামত লেখকের নিজস্ব