সরকারের ছয় মাস: উচ্চশিক্ষায় যেসব পরিবর্তন প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি করল

· Prothom Alo

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার প্রাণকেন্দ্রে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার মানোন্নয়ন, কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষক–সংকট নিরসন, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নানামুখী সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সুশিক্ষা নিশ্চিত করা, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগসহ দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী ও সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।

Visit moryak.biz for more information.

সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি ও উদ্যোগের একটি বড় অংশ এখনো পরিকল্পনা কিংবা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে ইতিমধ্যে উচ্চশিক্ষা খাতে বেশ কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে। সে বিষয়ে দৃশ্যমান কিছু পরিবর্তন ও পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

১.

দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যদের অব্যাহতি দিয়ে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সবাইকে যে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, তা নয়; কারও কারও ক্ষেত্রে পদোন্নতিও ঘটেছে। যাঁরা পদোন্নতি পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ একাডেমিক যোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, নাকি তাঁদের বিশেষ দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় আনা হয়েছে—সে প্রশ্নও উঠেছে।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যদের মধ্যে এমন একাধিক শিক্ষক রয়েছেন, যাঁরা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সাময়িকভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত এবং যাঁদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে তদন্ত চলছে। আবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে ভাষা-সাহিত্য কিংবা বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকদের উপাচার্যের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী, কোনো কারণে উপাচার্যের পদ শূন্য হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি সাময়িকভাবে কাউকে দায়িত্ব দিতে পারেন। পূর্ণ মেয়াদে নিয়োগ দিতে হলে সিনেট নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত তিন সদস্যের শিক্ষক প্যানেলের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি উপাচার্যদের চার বছরের জন্য পূর্ণ মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত নিয়ম মেনে হয়নি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কেমন ভিসি নিয়োগ

২.

ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর উচ্চশিক্ষা খাতে আরেকটি দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি)। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে কমিশনে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় সবাইকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

চেয়ারম্যানসহ নতুন কমিশনের ছয় সদস্যের মধ্যে চারজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং একজন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মেডিকেল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে ইউজিসির সদস্য হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি সম্ভবত এবারই প্রথম।

নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কয়েকজন সদস্যের অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত দুজন সদস্য অধ্যাপক হিসেবে অপেক্ষাকৃত তরুণ। বিশেষ করে একজন সদস্য মাত্র দুই মাস আগে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং তাঁর কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেই।

ইউজিসি দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে সদ্য পদোন্নতিপ্রাপ্ত কোনো অধ্যাপককে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নজির বিরল।

ইউজিসি অধ্যাদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী, কমিশনের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড বিষয়ে বলা হয়েছে, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক কিংবা শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ খ্যাতি ও কৃতিত্ব অর্জনকারী ব্যক্তিদের মধ্য থেকে সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে।

প্রচলিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ ও বয়োজ্যেষ্ঠ অধ্যাপক কিংবা সাবেক উপাচার্যরা এ ধরনের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। সেই বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত তরুণ অধ্যাপকদের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কতটা নীতিসম্মত ও বিধিসংগত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই সঙ্গে চারজনকে নিয়োগ না দিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হলে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত করা যেত—যা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

দেশের ছাত্র-জনতার হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ পেয়েছি। শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ছাড়া সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। এই সুযোগ হেলায় হারানোর অবকাশ নেই—নইলে জাতি পিছিয়ে যাবে।

৩.

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। নবীনবরণ বা শিক্ষা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি ক্রমেই লক্ষণীয় হয়ে উঠছে।

কোনো কোনো অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষাসচিব, ইউজিসি চেয়ারম্যান ও সদস্য, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান এবং একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য উপস্থিত থাকছেন।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়াতে পারে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত একাডেমিক আয়োজন—বিশেষ করে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে—এ ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উপস্থিতি কতটা প্রয়োজনীয়, সেটিও ভেবে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রয়োজন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক অগ্রাধিকারকে কেন্দ্র করেই প্রতিটি আয়োজনের পরিকল্পনা হওয়া উচিত। সেটিই হবে উচ্চশিক্ষার স্বার্থে সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।

বিশ্ববিদ্যালয় যেন ধীরে ধীরে রাজনীতির উন্মুক্ত মঞ্চে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমপি কিংবা শিক্ষকনেতাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য করা হচ্ছে অথবা তাঁদের দিয়ে উদ্বোধনী ক্লাস নেওয়ার ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বাড়ার পথ আরও সুগম হতে পারে।

বাংলাদেশে যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বিকশিত হতে পারে নাবেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: বিজ্ঞাপনী চাকচিক্য বনাম শৃঙ্খলার অভাব

পরিশেষে, সরকারের ছয় মাসে উচ্চশিক্ষা খাতে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হয়েছে—বিশেষ করে উপাচার্য ও ইউজিসির সদস্য নিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক উপস্থিতি—এসব বিষয়ে যে প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়েছে, তা উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

দেশের ছাত্র-জনতার হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা একটি সুন্দর ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ পেয়েছি। শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ছাড়া সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। এই সুযোগ হেলায় হারানোর অবকাশ নেই—নইলে জাতি পিছিয়ে যাবে।

শিক্ষা খাতে মেধা ও যোগ্যতার সঙ্গে আপস করে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন কিংবা শিক্ষাকে বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল ও উৎপাদনমুখী করার কোনো উদ্যোগই সফলতা বয়ে আনবে না। রাজনৈতিক আনুগত্য যদি একাডেমিক যোগ্যতার ওপরে স্থান পায়, তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী ও সময়োপযোগী করার স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

  • ফরিদ খান অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
    ই-মেইল: [email protected]
    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source