মেসি কেন এখন আর্জেন্টিনাকে বিদায় বললেন

· Prothom Alo

জাতীয় দল তো একদিন ছাড়তেই হতো। বয়সও হয়ে গিয়েছিল ৩৯ বছর। আর্জেন্টিনার জার্সিতে সম্ভাব্য সবকিছুই জেতা হয়েছে। তবু কারও কারও কাছে গতকাল রাতে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা দল থেকে অবসরের ঘোষণা এসেছে চমক হয়ে। কারণ, এ সিদ্ধান্ত মেসি প্রকাশের আগপর্যন্ত ব্যাপারটা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে আজই (গতকাল) সেই দিন!

তাই জল্পনা–কল্পনা এখনো থামেনি। মেসি কেন এখন অবসর ঘোষণা করলেন, উঠছে সে প্রশ্নও। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন জানিয়েছে, গত ১৯ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনালের ৪৩ দিন আগে জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মেসি। এ তথ্যের সঙ্গে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নেওয়া যায়।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

মেসি তাঁর অবসরবার্তার শেষ অংশে লিখেছেন, ‘এই (অবসরবার্তা) কথাগুলো আমি ২১ জুলাই লিখেছিলাম, ফাইনালের দুই দিন পর। আমার বাবার ঘটনার পর আজ (গতকাল) আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’

বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩৯ দিন। অর্থাৎ বিশ্বকাপের আগেই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন মেসি। ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ১–০ গোলে হারের পর সেই সিদ্ধান্ত আরেকটু পাকা হয়। এরপর গত ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন।

মেসির সঙ্গে তাঁর বাবা হোর্হে মেসি

মেসি বিশ্বকাপ শুরুর আগেই জাতীয় দলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলেছিলেন। বাবাকে হারানোর পর স্বীকার করেছিলেন, তাঁর শরীর আর আগের মতো সায় দিচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সতীর্থদেরও ইঙ্গিত ছিল যে মেসির অবসরের দিন ঘনিয়ে আসছে। গত ২৫ আগস্ট যেমন তাঁর জাতীয় দল সতীর্থ লিয়ান্দ্রো পারেদেস বুঝিয়ে দেন, জাতীয় দলে শেষ ম্যাচটা খেলে ফেলেছেন মেসি। আর সেই ম্যাচটি হলো বিশ্বকাপের ফাইনাল। পারেদেসের ভাষায়, ‘আমার মনে হয়, সে ঠিক করেই রেখেছিল যে এটিই জাতীয় দলের হয়ে তার শেষ ম্যাচ।’

পারেদসের সেই কথা এবং মেসির অবসরবার্তার কয়েকটি কথা মেলালে ব্যাপারটা কিছুটা পরিষ্কার হয়। অবসরবার্তায় মেসি বলেছেন, ‘আমার দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই। তা ছাড়া পেছনে অনেক দুর্দান্ত তরুণ খেলোয়াড় আসছে, যাদের (জাতীয় দলে) থাকাটা প্রাপ্য।’

বিশ্বকাপ ফাইনালটা স্মরণ করা যায়। স্পেনের বিপক্ষে রীতিমতো পর্যুদস্ত হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেটাও মেসি মাঠে থাকতে—যেটা তাঁর ক্যারিয়ারেই বিরল ঘটনা।

ক্যারিয়ারের শেষ লগ্নে দাঁড়িয়ে সেই বিরল তেতো স্বাদ পাওয়ার মুহূর্তে কি মেসির মনে হয়েছে, তাঁর আর কিছু দেওয়ার নেই? পাশাপাশি নিকো পাজ–থিয়াগো আলমাদার মতো তরুণেরাও উঠে এসেছেন। সে জন্যই কি মেসির মনে হয়েছে, সময়টা এখনই? প্রশ্নটি তোলা যায়, কারণ সেই ফাইনালকে জাতীয় দলে নিজের শেষ ম্যাচ বানিয়ে অবসরবার্তায় মেসি বলেছেন, ‘আমি বুঝতে পারছি যে এটাই সঠিক সময়।’

বিশ্বকাপের পর ফিফার প্রথম আন্তর্জাতিক বিরতি ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত। তার আগে অবসরের ঘোষণা দিলেন মেসি। অর্থাৎ চার বছরের নতুন একটি বিশ্বকাপ চক্র শুরুর আগের এ সময়কে আকাশি–সাদা জার্সি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার সঠিক সময় বলে মনে হয়েছে কিংবদন্তির। এই বিরতিতে প্রতিটি জাতীয় দল এক থেকে চারটি ম্যাচ খেলতে পারবে। লা নাসিওন জানিয়েছে, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) বুয়েনস এইরেসে বিশ্বকাপ রানার্সআপ আর্জেন্টিনা দল এবং মেসিকে সম্মান জানাতে জমকালো বিদায়ী সংবর্ধনার আয়োজন করার পরিকল্পনা করছে। সুতরাং জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁকে অন্তত আরও একবার মাঠে দেখার সম্ভাবনা আছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে হয়ে রইল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শেষ ম্যাচ

লা নাসিওন আরও জানিয়েছে, ২৩ দিন আগে বাবার মৃত্যু মেসির এ সিদ্ধান্তে প্রভাব রেখেছে। সে সময় মেসি বলেছিলেন, ‘আমি আর কত দিন ফুটবল চালিয়ে যাব, এখন তা নিয়ে আমার সংশয় আছে।’ আরও একটি কারণ অনুমান করা যায়। জাতীয় দলে যে প্রজন্মের সঙ্গে তিনি বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, সেই দলটি ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ সামনে রেখে আর্জেন্টিনা এখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দলটির বেশ কয়েকজন সতীর্থের ক্যারিয়ারের চক্র শেষের পথে, দল পুনর্গঠন করতে হবে। এমনকি আগামী ডিসেম্বরের পর কোচ লিওনেল স্কালোনির থাকা নিয়েও সংশয় আছে।

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির যত রেকর্ড ও অর্জন

পাশাপাশি সহ-আয়োজক হিসেবে আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে ২০৩০ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে। অর্থাৎ দীর্ঘ বাছাইপর্ব খেলতে হবে না। সে হিসাবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের পরবর্তী বড় টুর্নামেন্ট ২০২৮ কোপা আমেরিকা। ৩৯ বছর বয়সী মেসি সম্ভবত মাঝের এই দুই বছরে নিজের বয়স আরও ভারী করে সে পর্যন্ত আর অপেক্ষা করতে চাননি।

আর্জেন্টিনার সঙ্গে ২১ বছর পথ চলেছেন মেসি

এএফএর অনেকেই আশা করেছিলেন, মেসি জাতীয় দলে আরও কিছুদিন খেলবেন। জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর শেষ স্মৃতিটি কোনো হেরে যাওয়া ফাইনাল যেন না হয়, সেটা ছিল এই আশার পেছনের কারণ। অন্তত কোপা আমেরিকা পর্যন্ত খেলবেন, এই আশাও করেছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু মেসিকে জানা থাকলে একটি বিষয় ভেবে নেওয়াই যায়। জাতীয় দলে সব সময় নিজের সেরাটা দিতে পারেন—এই বিশ্বাস সব সময়ই ছিল মেসির। দুই বছর পর কোপায় সেটা দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে কি সন্দেহে ভুগেছেন? মেসির অবসরবার্তাতেই সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবসরবার্তাতেই বলে দিয়েছেন, ‘নিজেকে সম্পূর্ণ উজাড় করে দিয়েছি।’

অর্থাৎ আর দেওয়ার কিছু নেই? সেটা মেসি বুঝেছেন বলেই কি সরে দাঁড়ালেন!

মেসির অবসরের আবেগে ভেসেছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও

Read full story at source