পাথরের মাটি নাকি উর্বর বাগান: আপনার আমল কেমন
· Prothom Alo

কোরআনে সরাসরি বুদ্ধি খাটানো ও তাদাব্বুর (আপাতচোখে যা দেখা যায় তার গভীরে গিয়ে চিন্তা) করার নির্দেশ তো আছেই, সেই সঙ্গে প্রাণপ্রকৃতিকে উপমা বানিয়ে গভীরভাবে চিন্তাফিকিরের ইশারা দেওয়া হয়েছে।
Visit playerbros.org for more information.
আমরা এমনই কিছু উপমার মধ্য দিয়ে আল্লাহ–তাআলার আয়াতের পর্যালোচনা করব।
১. লোকদেখানো দানের উপমা
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দানকে নষ্ট করে দিয়ো না; ওই লোকের মতো যে নিজের ধন লোকদেখানোর জন্য ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও আখিরাতে ইমান রাখে না। ফলে তার উপমা হলো এমন একটি মসৃণ পাথর, যার ওপর কিছু (আলগা) মাটি থাকে, তারপর প্রবল বৃষ্টি সেটাকে (ধুয়েমুছে) সাফ করে ফেলে। যা তারা উপার্জন করেছে তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগানোর ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৬৪)
একটি অদৃশ্য মানবিক অবস্থাকে আল্লাহ–তাআলা কী চমৎকারভাবে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। যারা দান করে আবার সেই দানের কথা বলে বেড়ায়, দানগ্রহীতাকে নানাভাবে কষ্ট দেয়, সময়ে–সময়ে খোঁচা মেরে বলে—আরে, অমুককে কত কিছু দান করলাম।
আল্লাহর দরবারে তাদের এই দানের কোনো মূল্য নেই। এই দান মসৃণ পাথরের ওপর জমে থাকা আলগা মাটির মতোই। প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এখানে কোনো গাছ বা তরুলতা জন্ম নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এক দফা প্রবল বৃষ্টিতেই সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে। আবার সেই মসৃণ ও গাছ জন্মানোর অযোগ্য পাথর ভেসে উঠবে।
একইভাবে এই শ্রেণির দানকারীরাও দুনিয়া ও আখিরাতে কোনো ফল পাবে না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তারা দান-খয়রাত করেই জান্নাতে চলে যাবে। বাস্তবতা এ থেকে একদমই আলাদা।
প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এখানে কোনো গাছ বা তরুলতা জন্ম নেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এক দফা প্রবল বৃষ্টিতেই সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাবে।নবীজি (সা.) যেভাবে উপমা ব্যবহার করতেন
২. নিষ্ঠাপূর্ণ দানের উপমা
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ও নিজেদের মনে (ইমানের) দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা কোনো উচ্চভূমিতে অবস্থিত একটি বাগানের মতো, যেখানে মুষলধারে বৃষ্টি হয়, ফলে সেথায় ফলমূল দ্বিগুণ জন্মে। আর যদি মুষলধারে বৃষ্টি না–ও হয়, তবে অল্প বৃষ্টিই যথেষ্ট। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৬৫)
এখানে আগের আয়াতের একদম বিপরীত দিক উপস্থাপন করা হয়েছে। উর্বর উঁচু ভূমিতে মুষলধারে বৃষ্টি পড়লে যেমন দ্বিগুণ ফসল হয়, অল্প পড়লেও মাটির উর্বরতার কারণে ফসল উৎপাদনে খুব একটা হেরফের হয় না।
এই উপমা দিয়ে আল্লাহ–তাআলা বোঝান—যে ব্যক্তি আল্লাহকে রাজি-খুশি করার জন্য দান করে, তার দান কখনোই বৃথা যায় না। নিষ্ঠার সঙ্গে বেশি দান যেমন তার প্রতিদানকে বহুগুণে উন্নীত করে, তেমনই অল্প দানও ভালো ফলাফল বয়ে আনে।
কোরআনের এই চিত্রকল্প আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দেয়—দান বাহ্যিক কোনো কাজের নাম নয়; বরং তার প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে অন্তরের অবস্থার ওপর। প্রসঙ্গত বলতে হয়, এটা শুধু দানের ক্ষেত্রেই নয়, কোরআন ও হাদিসে সব ধরনের আমলের সঙ্গেই নিয়ত বা উদ্দেশ্যকে শুদ্ধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
৩. মানুষে মানুষে বৈচিত্র্যের উপমা
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূখণ্ড, আঙুরের বাগান, শস্যক্ষেত্র, একই মূল থেকে উদ্গত বা ভিন্ন ভিন্ন মূল থেকে উদ্গত খেজুরগাছ—যেগুলো একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়, আর স্বাদ-রূপের ক্ষেত্রে সেগুলোর কিছুসংখ্যককে আমরা কিছুসংখ্যকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এমন জাতির জন্য এতে নিদর্শন রয়েছে—যারা মস্তিষ্ক খাটায়।’ (সুরা রাদ, আয়াত ৪)
বস্তু থেকে আয়াত: প্রকৃতি-পাঠের এক তাওহিদি রূপান্তরএকই মাটি থেকে রস আস্বাদন করে, একই সূর্য থেকে শক্তি গ্রহণ করে, এবং ক্ষেত্রবিশেষ একই মূল থেকে উদ্গত হয়েও যেমন প্রতিটি গাছ আলাদা, তাদের একেক ফলের একেক স্বাদ; মানুষে মানুষে পার্থক্যটাও একই রকম।একই মাটি থেকে রস আস্বাদন করে, একই সূর্য থেকে শক্তি গ্রহণ করে, এবং ক্ষেত্রবিশেষ একই মূল থেকে উদ্গত হয়েও যেমন প্রতিটি গাছ আলাদা, তাদের একেক ফলের একেক স্বাদ; মানুষে মানুষে পার্থক্যটাও একই রকম। একই পরিবার, একই সমাজ, এমনকি কখনো একই পরিবেশে বেড়ে উঠেও মানুষের চরিত্র, চিন্তা ও কর্মে কত ভিন্নতা দেখা যায়।
কেউ সত্য ও সততার পথে নিজেকে আলাদা করে, আবার কেউ অসততা ও অন্যায়ের মধ্য দিয়ে ঠিক তা-ই করে। একই পরিস্থিতিতে পড়ে কেউ নিজেকে ধৈর্যশীল ও শোকরগুজার বানিয়ে আল্লাহর দিকে এগিয়ে নেয়, আবার কেউ নিজেকে কুফরির দিকে নিয়ে যায়।
তাই মানুষের পার্থক্য শুধু তার বাহ্যিক গঠন, বংশ বা পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে নয়; বরং তার ভেতরের গুণাবলি ও কর্মের মধ্যেও। একই পানি যেমন ভিন্ন ভিন্ন গাছে ভিন্ন স্বাদের ফল উৎপন্ন করে, তেমনি একই পৃথিবী, একই জীবন ও একই সুযোগের মধ্যেও মানুষ তার নিজের চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। কোরআন এই পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে তাকিয়েই আমাদের মানুষের এই বৈচিত্র্য নিয়ে চিন্তা করতে বলেছে।
৪. কাফেরের আমলের উপমা
আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘যারা তাদের রবের সঙ্গে কুফর করে তাদের উপমা হলো: তাদের আমলসমূহ ছাইয়ের মতো, যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচণ্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে, তার কিছুই তারা তাদের কাজে লাগাতে পারে না। এটা তো ঘোর বিভ্রান্তি।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ১৮)
একজন তিলে তিলে ছাই জমা করে বিশাল স্তূপ বানাল। আচমকা ঝড় উঠে সব ছাই উড়িয়ে নিয়ে গেল। এখন তার জন্য কি সম্ভব আবার সব ছাই একত্র করা? করলেও-বা সেই ছাই দিয়ে সে কী করতে পারবে?
এই চমৎকার উপমা দিয়ে আল্লাহ–তাআলা বোঝান—আমলের প্রথম শর্ত হলো ইমান। কেউ যদি ইমানই না আনে, তার কোনো আমল কাজে লাগবে না।
মওলবি আশরাফ: আলেম, লেখক ও অনুবাদক [email protected]