নজরুলের পুরুষকার
· Prothom Alo

‘সেই আমি প্রথম দেখলাম নজরুলকে, অন্য অনেক অসংখ্যের মতোই দেখামাত্র প্রেমে প’ড়ে গেলাম। চওড়া কাঁধে বলিষ্ঠ তাঁর দেহ, মাঝখান দিয়ে সোজা-সিঁথি করা কোঁকড়া চুল গ্রীবা ছাপিয়ে প্লাবিত, মুখখানা বড়ো ও গোলছাঁদের, নেত্র আয়ত ও কোণরক্তিম। গায়ে গেরুয়া রঙের খদ্দর পাঞ্জাবি, কাঁধে সূর্যমুখী-হলদে চাদর। কণ্ঠে তাঁর হাসি, কণ্ঠে তাঁর গান, প্রাণে তাঁর অফুরান আনন্দ—সব মিলিয়ে মনোলুণ্ঠনকারী একটি মানুষ।’
Visit palladian.co.za for more information.
এই হলেন বুদ্ধদেব বসুর চোখে নজরুল। এই নজরুল সশরীর, মনোলুণ্ঠনকারী এক মানুষ। শরীরের বাইরে সাহিত্যেও নজরুলের পৌরুষ ও পুরুষকারের এক প্রণয়ন পাওয়া যায়। প্রাক্-উপনিবেশি প্রজা বা উপনিবেশি ভদ্রলোক বাবুর যে পৌরুষ, উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের জমানার নজরুলের অনুভববিদ্যায় তার তুলনায় ভিন্ন এক পৌরুষ পাওয়া যায়। সমাজে যখন পরিবর্তনের সম্ভাবনা আসে, সেই নতুনের অনুভবের প্রযত্ন করা কবির কাজ। মধুসূদনের ধ্রুপদি রোমান্টিক অতিরেক, বঙ্কিমের আমলা-প্রশাসক-ঋষিগিরি বা রবীন্দ্রনাথের উপনিষদীয় আধ্যাত্মিক ব্রাহ্মমুহূর্তের পরে নজরুল এসেছিলেন বিংশ শতাব্দীর ইলেকট্রিক সত্তায়ন ধারণ করে।
নজরুলের পৌরুষের প্রধান গুণ মনে হয় অভিমান। নজরুল নিজেই বলেছেন তিনি ‘অতিরিক্ত অভিমানী’। বাংলায় ‘অভিমান’ শব্দ দিয়ে অহমিকাও বোঝায়—চির উন্নত মম শির—আবার অভিমানের আরেকটা অর্থ হলো যার সঙ্গে মনের যোগ আছে তার মুখ ভেবে বিমুখ হয়ে থাকার লীলা। যে বিমুখতা উন্মুখ, তাকেই বলে অভিমান। অর্থাৎ মান-অভিমান ধারণার দুই ধাপ: (১) অন্যের প্রতি বিমুখ হয়ে সীমা টেনে দেওয়া এবং (২) অন্যকে সেই সীমাকে লঙ্ঘন করতে দেওয়ার লীলা। অবশ্য এই লীলা প্রিয়জনের সঙ্গে চলে, সবার সঙ্গে নয়। অভিমান হলো প্রিয়জন বা রসজ্ঞের কাছে সীমা ও সীমাচ্যুতির লীলাময় মিথস্ক্রিয়া।
সংস্কৃত কাব্যে মান-অভিমান অনেকটা লিঙ্গচিহ্নিত। অর্থাৎ সাধারণত নায়িকাই সেখানে মান-অভিমান করে। আর নায়ক ব্যাটাচ্ছেলে সেই মান ভাঙান। কিন্তু নারী–পুরুষের মান-অভিমানের বাইরেও আরেক রকম অভিমানের সেরেস্তা পাওয়া যায় সুফি বেরাদরিতে—মান ও মানভঙ্গের মতো সেখানে পাওয়া যায় নাজ-ও-নিয়াজ [ঢং ও কাতরতা]। নজরুলের প্রিয় কবি হাফিজের সুফি কাব্যে আশেক ও মাশুকের মধ্যে এই সব রস আছে। মোদ্দাকথা, ম্যাসকুলিনিটি বা পৌরুষের নানা রংরসের যে ভান্ডার, তা জটিল ও বহুমাত্রিক।
নজরুলের এই অভিমানী পৌরুষ শরীরী। বায়োকেমিস্ট্রির শরীর নয়। লিপ্ত, যাপিত, আর্ত, রক্তাক্ত, রসভারাতুর শরীর। তাঁর প্রতিটি লেখা ‘রক্ত-লেখা’। রক্ত-অশ্রু-বীর্য-আবেগ-সুর-কলমের কালি—এই রকম নানা রসের বশ এই পৌরুষ। তার নমুনা দেখা যায় ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে শরাহত নজরুলের, বন্ধু মোতাহেরের সঙ্গে থেরাপিউটিক পত্রালাপে। এই পুরুষ সার্বভৌম নয়। লখিন্দর, অভিমন্যু বা একিলিসের মতো বিপন্নতা আছে তার। সে গুরুগম্ভীর সুসংযত ঋষিবাবা নয়, উপনিষদীয় সুসংহতিও তার নেই। নিজ সত্তার রস সে ছড়ায়। ‘he bleeds’। তার ‘চোখে জল!’ তার অনুভব থিতু নয়। পারসিক কবিদের মতো তাঁর কাছে জীবনের সুধা ও বিষ ক্রমাগত পরস্পরে বদলে যায়। আনন্দ অতি দ্রুত বিষাদে, জীবন অতি দ্রুত মরণের আকাঙ্ক্ষায় পর্যবসিত হয়।
অভিমানের বিপরীত হলো শ্রদ্ধা—যেটা খানিকটা বিমূর্ত ও সর্বজনের সাপেক্ষে রাখার অনুভব। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের কাছে শ্রদ্ধা একটা সর্বজনীন ও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাপার, যা ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে। নজরুল কিন্তু শ্রদ্ধা চান না। ‘শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা—শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেল। ও নিয়ে কি আমি ধুয়ে খাব?’ বরং তাঁর ‘অল্পেই অভিমান হয়। বুকের রক্ত চোখের জল হয়ে দেখা দেওয়ার আগেই তাকে গলার কাছে প্রাণপণ বলে’ আটকান তিনি।
কাজী নজরুল ইসলামঅভিমানের মধ্যে একটা ছেলেমানুষি আছে, একটা অ-সার্বভৌমত্ব আছে। যে বুড়ো হতে চায় না, বারবার তাকে ব্যথা পেতে হয়। তার উথলে ওঠা রসের সংকুলান বিদ্যমান চিহ্নতন্ত্রে নেই। প্রেমিকা তাঁর কাব্য ও অশ্রুর তোয়াক্কা করেন না। চোখের জল ফেলছেন নজরুল সেটা লোকে শুনলে ‘হেসে কুটপাট’ হয়। এক ব্রাহ্মণ ভদ্রলোককে রক্তদান করতে গেলেন নজরুল, কিন্তু সেই উচ্চবংশ কুলীন, নজরুলের রক্তকে ‘নেড়ের রক্ত’ বলে নিজ শিরায় নিতে প্রত্যাখ্যান করেন। বস্তুত হেগেল বা ফ্রাঞ্জ ফানোঁ আত্ম ও অপরের মধ্যে যে দ্বান্দ্বিকতাকে যুদ্ধের দ্বারা মীমাংসেয় মনে করেছেন, শ্রদ্ধার এলাকা সেখানে। অভিমান সেই একই দ্বান্দ্বিকতাকে অবৈরী রূপে হাজির করে এমন দুই সত্তার ভেতর, যারা পরস্পরের প্রতি প্রীতি ও যত্নের সম্পর্কে আগেই আবদ্ধ। অর্থাৎ অভিমান ও শ্রদ্ধা—এই দুই সংবেদের এলাকা আলাদা। অভিমান হয় নিকট অপরের সঙ্গে, আর শ্রদ্ধা হয় পরের সঙ্গে। কিন্তু যার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তার অভিমান চলে না, তাকে লড়াই করতে হয়।
পৌরুষের অনুভবপ্রবণতা ও বিপন্নতার মানে ভীরুতা নয়। নজরুল-রচনার পৌরুষ বীরত্বব্যঞ্জক। জর্জ বাতাইয়ের পরিভাষা ধার করে বলা যায়, সে যত না ‘সৈনিক’, তার চেয়ে বেশি ‘যোদ্ধা’। পাগলি মায়ের দামাল ছেলে। সে নিছক হুকুম তামিলের সুশৃঙ্খল পদাতিক নয়; বরং প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য জান কবুল। পটলাচের (potlatch) মতো করে সে নিজের অস্তিত্বের উদ্বৃত্ত প্রাণশক্তি বিলিয়ে দেয়। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, ‘প্রাণশক্তির এমন অসংবৃত উচ্ছ্বাস, এমন উচ্ছৃঙ্খল অপচয় অন্য কোনো বয়স্ক মানুষের মধ্যে আমি দেখিনি।’ নজরুল নিজে লিখেছেন, ‘তোর জান যায় যাক, পৌরুষ তোর মান যেন নাহি যায়।’ ‘মেদা-মারা’ ছেলের চেয়ে… ‘ডানপিটে’ ছেলে বরং অনেক ভালো। কারণ, পূর্বোক্ত নিরীহ জীবরূপী ছেলেদের ‘জান’ থাকে না; আর যারা জান নাই, সে-‘মোর্দা’ দিয়া কোনো কাজই হয় নাই, আর হইবেও না।’
পৌরুষের এই বীরত্ব নেহাত ভায়োলেন্সকে ভায়োলিন বাজিয়ে উদ্যাপন করার ব্যাপার নয়। উপনিবেশের কাঠামোগত সহিংসতাকে মোকাবিলার শক্তি অর্জনের প্রশ্ন তা, যে উদ্দেশ্যে কিশোর নজরুল বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। উপনিবেশি শক্তির জন্য কালা আদমি বা মুহাজিরিনকে গুলি করা যে কত সহজ, সেটা নজরুল তাঁর নানা সম্পাদকীয় প্রবন্ধে লিখেছেন। প্রতিরোধী, উপনিবেশবিরোধী লড়াইয়ের প্রেরণা পাওয়ার জন্যই মেদা-মারা হওয়ার বদলে শক্তির সাধনার প্রশ্ন আসে। তাই ‘অগ্নিবীণা’র কবিতাগুলোতে নজরুল প্রাগাধুনিক হিন্দু কাব্যের যুদ্ধবর্ণনার রণরঙ্গী ও বীভৎস রসের অনুপ্রাস ও ধামাকা জুড়েছেন কবিতায়।
জুলুমের বিরুদ্ধে সংগঠিত নজরুলী পৌরুষের এই বীরত্ব আত্মদানের—ফলে তা লোভী, দখলদার বা সঞ্চয়বাদী পৌরুষ নয়। সে ‘ছন্নছাড়া, কেবলই ঘুরে বেড়ায়, শ্রী নাই, সামঞ্জস্য নাই, ব্যালান্স-জ্ঞান নাই;’ তবু সে ‘সুন্দরের বৈতালিক, বেদনার ঋত্বিক।’
আজকাল বাংলাদেশে পৌরুষকে ঈর্ষাকাতর রক্ষণশীলতা [গায়রাত] বলে চেনানোর চল হয়েছে, আর গায়রাতকে উগ্র-আগ্রাসী অণু-অহং আকারে দেখার প্রচলন হয়েছে। এন্ড্রু টেট, আলফা-সিগমা বা কোটিপতি পুরুষ ধারণার উদ্যাপন বাংলাদেশের নব্য মধ্যশ্রেণিতে প্রচলিত হয়েছে। এই নব্য-গায়রাতি ভাবাদর্শ অনুসারে নারীকে অন্যের সাপেক্ষে অদৃশ্য করে দেওয়াই পুরুষত্বের পরাকাষ্ঠা। কিন্তু নজরুলের বীরত্বব্যঞ্জক পৌরুষ আগ্রাসী, দখলদার ও অত্যাচারী নয়। প্রেমকে প্রেমাস্পদের ওপর জবর দখল কিংবা জবরদস্তি বলে ভাবেন না তিনি। ‘আমি এত বড়ো ধৈর্যহারা বোকা blunt নই যে, যাকে পেলাম না—তাকে আমার এই জন্মেই পেতেই হবে।’ প্রেমাস্পদকে জোর করে ‘মড়া-আগলা’ করে আগলানোর গায়রাতকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
মোদ্দাকথা, যে পৌরুষ অবুঝ, বাঁধনহারা, বীর ও বিপন্ন, তার মূলে আছে কোরবানি, আত্মদান ও শহীদ হওয়ার ধারণা। নজরুল বলছেন, ‘আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক, জমদগ্নি,/ আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি!’
উপনিবেশে মানুষের দশা হলো দাসের। দাসের শরা কী রকম হয়? নজরুলের প্রশ্ন হলো, ‘মানুষের দাস তুমি, তোমার আবার ধর্ম কী?’ আর তাঁর জবাব হলো, ‘আমার বাঁচাই আমার ধর্ম।’ কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে জীবনের প্রয়োজন নিজেই এক জরুরি অবস্থা। বাঁচার উত্তুঙ্গতার উপলব্ধি থেকেই নজরুল লিখেছেন—‘মৃত্যুকেই তো আমি চিরদিন খুঁজে বেড়াই।’ (‘স্বাধীনচিত্ততার জাগরণ’) বাঁচার প্রয়োজনেই এই মৃত্যু-সন্ধান। বৈপ্লবিক ও প্রেমিককে জরুরি অবস্থায় বাঁচতে হয়। ‘দেবতার জল-ঝড়কে আমি বাঁধব। প্রকৃতিকে আমি প্রতিঘাত দেব। আচারের বোঝা ঠেলে ফেলে দেব, সমাজকে ধ্বংস করব। সব ছারেখারে দিয়েও আমি বাঁচব।...ওরে আমার তরুণ, ওরে আমার লক্ষ্মীছাড়ার দল, তোরা আয়, তোরা ছুটে আয়—এই ভণ্ডামি থেকে চলে আয়।’
বীর মাত্রই বে-শরা নয়; কিন্তু তার বিধি বা আইন ভাঙার দার্ঢ্য থাকে। এটা বৈপ্লবিক সত্তার অস্তিতত্ত্ব। জীবন, সময়, প্রেম বা লড়াইয়ের প্রয়োজনে সামাজিক ও মাজহাবি রীতিনীতিকে মুলতবি করা যায়। যুদ্ধে যাওয়া নজরুল কলকাতায় ফিরে যে ধূমকেতু পত্রিকা করেছিলেন, তা তেমন বিপ্লবীদের স্বর হয়ে এসেছিল। ‘“ধূমকেতু” তাহাদের বাণী হইয়া আসিয়াছিল—যাহাদের গৃহী আশ্রয় দিতে ভয় পায়, গহন বনে ব্যাঘ্র যাহাদের পথ দেখায়, ফণি তাহার মাথার মণি জ্বালাইয়া যাহাদের পথের দিশারি হয়, পিতামাতার স্নেহ যাহাদের দেখিয়া তুহিন-শীতল হইয়া যায়।’ বিপ্লবীরা উপনিবেশি ক্ষমতাকাঠামোর কাছে নিধনযোগ্য ছিলেন বলেই তাঁরা প্রচলিত নিয়মতন্ত্রের মাকাসিদকে মুলতবি করতে পারতেন।
নিয়মতন্ত্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে, বাঁচাকে কেন্দ্রে রেখে নজরুল যে সত্তার গঠন করলেন, সেই সত্তা পরিচয়ের জেওর [অলংকার] ও তাৎপর্যকে পূর্ণ মূল্যে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু পরিচয়বাদের জাতপাতে বাঁধা পড়েননি। জাত উজানো এই নজরুল ইসলামকে তাঁর সমসাময়িক জাতবাদী সমাজ কখনোই ঠিক চিনে সারতে পারে নাই। সমকালীন কলকাতার বিদ্বৎসমাজ তাঁর প্রতি আদর ও অত্যাচার দুই–ই করেছে। উত্তরকালে পূর্ব বাংলা, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা তাঁর নানা সীমিত বরণ-উদ্যাপন করেছে—কিন্তু তাঁর পরিচয়ের পূর্ণ রফা করে উঠতে পারেনি। সমকালে কেউ তাঁকে কাফের বলেছে, কেউ বলেছে পাত-নেড়ে, কেউ বলেছে অহিংস, কেউ ঠাওরেছে নাস্তিক। রাশি রাশি অভিধা দিয়েও তবু শনাক্ত করে উঠতে, তকমায়িত ও বর্গীকৃত করে সারতে পারেনি। সবকিছুর পরেও তাঁর নানা উপরি-পরিচয় [সারপ্লাস আইডেন্টিফিকেশন] থেকে গেছে।
কাজী নজরুল ইসলামব্যক্তিকে সমাজ জব্দই করে অতিশনাক্তির দ্বারা, অর্থাৎ বান্দা যা তার চেয়েও সে যা নয় তাই দিয়ে সমাজ তাকে শনাক্ত করে। বর্ণাশ্রমবাদী সমাজে এই শনাক্তি ‘জাত’ বলে পরিচিত। সামাজিক পরিচয় মাত্রই আরোপিত অতিশনাক্তি। কিন্তু সমাজ সবাইকে সমানভাবে জব্দ করে না। নজরুল সমাজের আরোপিত শনাক্তি নিয়ে দৈত্য-শিশুর মতো খেলা করতেন। তিনি জানতেন, ‘সমাজ সর্বদাই আছে লাঠি উঁচিয়ে’ (ইব্রাহীম খাঁকে লেখা পত্র), কিন্তু তিনি পরোয়া করেননি।
এই যে খেলা নজরুলের, তার এক পূর্বসূরি ছিলেন লালন, যিনি জেতের ফাতা বিকিয়ে দিয়েছিলেন, আরেক দিকে ছিলেন মধুসূদন, যিনি সুরাসুরের লড়াইয়ে অসুরের অবলম্বন করেছেন। কলকাতাকেন্দ্রিক সমাজে যে রকম জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির ছুঁৎমার্গ দিয়ে মানুষকে বর্গীকৃত ও শনাক্ত করত, নজরুল এই শনাক্তিকাঠামোতে জট লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কলোনিয়াল জাতের রাজনীতির সেমিওটিক্সে একটা জট লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেটা নিছক রক্ষণাত্মক নয়; বরং অনেকটাই আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমায়।
নজরুল এক চিহ্ন-সমাবেশ থেকে আরেক চিহ্ন-সমাবেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন ইললিগাল এলিয়েনের মতো। নিজেকে ছোটলোক, চণ্ডাল, কালা আদমি, অসুর, পাপী পরিচয়ের সঙ্গে একাত্ম করেছেন। উপনিবেশি দমন–পীড়নের ভেতর ক্ষমতার প্রতি জনতার যে নেতিবোধের প্রযত্ন হয়, তাকে উপলক্ষ করে নজরুল চণ্ডাল, কুলি-মজুর, মাঝি, কৃষক, ধীবর, চোর-ডাকাত, বারাঙ্গনাসহ সমাজের নানা প্রান্তিক পরিচয়ের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে কবিতা লিখেছেন (‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’)। হিন্দু-মুসলমানের ভেদ উত্তরণ করে নতুন রাজনৈতিক বান্দা-কর্তা-গঠনের চেষ্টা করেছেন। নারী ও পুরুষের সাম্য, নারীর উচ্চশিক্ষার অধিকার, নারী সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন করা এবং অবরোধ প্রথার মোচন—এই সব প্রশ্নেই প্রগতিশীল অবস্থান নিয়েছেন নজরুল। বিশের দশকের শেষের দিকে বাল্যবিবাহ তথা নারীর শিশু বয়সে বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটি সারদা বিলের দ্বারা নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে যখন হিন্দু-মুসলমান রক্ষণশীলেরা আন্দোলন করছিল, তখন তরুণ-তরুণীরা সেই রক্ষণশীল অবস্থানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামলে নজরুল তাদের অভিনন্দিত করেছিলেন।
জাতপাতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মানে কিন্তু নিজের পরিচয়কে জলাঞ্জলি দেওয়া নয়। জাতপাতে বিভক্ত, সাম্প্রদায়িকতায় বিভক্ত, কলোনিয়াল সমাজে মানুষের যে নানামাত্রিক হীনম্মন্যতা, সেখানে আত্মপরিচয়ের জাহিরাও একধরনের রাজনৈতিক তাৎপর্য পরিগ্রহ করে। নিজের সত্তা ও কর্মের ওপর থিতু হওয়াকে নজরুল গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘দেখিয়াছি, অনেকে তথাকথিত নীচ বংশে জন্ম বলিয়া নিজের পিতৃপুরুষের পরিচয় গোপন করে, কিন্তু তবু সে শান্তি পায় কি? লোকে তাহার এই মিথ্যা মুখোশে বরং আরো টিটকারি দেয় না কি? সে নিজের অন্তরেই নিজে লজ্জাতুর ছোট হইয়া যায় না কি? তাহার চেয়ে তাহার গৌরব করিবার ছিল, যদি সে বুক ফুলাইয়া তাহার পিতৃ-পুরুষের পরিচয় দিয়া নিজের কৃতিত্বে আপন মনুষ্যত্বের উপর দাঁড়াইয়া বলিতে পারিত যে, জন্মটা কিছুই নয়—পুরুষকারই হইতেছে আসল জিনিস।’
নজরুলের এই প্রাচীর-ভাঙ্গা, লৌহ-কবাট লোপাট করা অনুভববিদ্যার উন্মেষ দুনিয়ার ইতিহাসের একটা সুনির্দিষ্ট মুহূর্তে। ‘মোদের পথের ইঙ্গিত ঝলে বাঁকা বিদ্যুতে কালো-মেঘে’। বিদ্যুতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ায় মানুষ ও মাধ্যমের সম্পর্কের খোলনলচে পাল্টে যায়। বৈদ্যুতিক ও বৈদ্যুতিন যুগ আগের জমানার চেয়ে কেবল অধিক গতিশীল তা নয়, বরং এই যুগে আমাদের সত্তা বাঁধা পড়ে গতি ও ফিরতি-চক্করের বর্তনীতে। আগে যা ছিল কর্মফলের চক্র, এখন তা হয়ে ওঠে কর্ম ও অকর্মের নিত্য-সংশ্লেষ। নজরুলের খোদ সৃষ্টিকর্মের বর্তনীটিও অনেকটা ‘লাইভ’। বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, ‘সৃষ্টিকর্মটি যে-নির্জনতা দাবি করে ব’লে আমরা চিরকাল শুনে এসেছি তার তোয়াক্কা রাখেন না নজরুল, ঘর-ভর্তি লোকের উপস্থিতি তাকে বিব্রত করে না মুহূর্তের জন্য—বরং অন্যদের চোখে-চোখে তাকিয়ে, হাসির উত্তরে হাসি ফুটিয়ে, তিনি যেন নতুন প্রেরণা সংগ্রহ করেন। সামনে হার্মোনিয়াম, পাশে পানের কৌটা, হার্মোনিয়ামের ঢাকনার উপরে খোলা থাকে তাঁর খাতা আর ফাউন্টেন পেন—তিনি বাজাতে-বাজাতে গেয়ে উঠলেন একটি লাইন, তার বড়ো-বড়ো সুগোল অক্ষরে লিখে রাখলেন খাতায়, আবার কিছুক্ষণ বাজনা শুধু—দ্বিতীয় লাইন —তৃতীয়-চতুর্থ-দর্শকদের নীরব অথবা সরব প্রশংসায় চচিত হ’য়ে ফিরে-ফিরে গাইলেন সেই সদ্যরচিত স্তবকটি।’ বেতারে দূরসঞ্চালনের যে নতুন বার্তা-কেওয়াজের বর্তনী তৈরি হয়, নজরুলের সৃষ্টিপ্রক্রিয়া যেন তার এক আগাম ফিডব্যাক লুপ।
কেওয়াজের ভেতরেই যে ওয়াজ থাকে, সত্য যে ভুলের ভিড় থেকেই ছেঁকে নিতে হয়, সেটাই এই বৈদ্যুতিন যুগের শিক্ষা। লেনিন যেমন বলেছিলেন যে ভুল না করাটাই বুদ্ধির পরিচয় নয়, বরং ভুল কম করা ও দ্রুত শোধরানোটাই বুদ্ধির পরিচয়। নজরুলের তরুণ এই নতুন জমানার নিঃসংকোচ ভ্রমিষ্ণু কর্মী। ‘সবাই যখন বুদ্ধি জোগায়/ আমরা করি ভুল!/ সাবধানীরা বাঁধ বাঁধে সব/ আমরা ভাঙ্গি কূল!’
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামঅমলেন্দু দাশ লিখেছেন নজরুলের যে কোন ফিলোসফি নেই, সেটা তাঁর কবিসত্তারই ধাত ও গুণ। নজরুলের ফিলোসফিহীনতা, সেন্টিমেন্টালিটি, বহুজবানিকতা তাঁর একপ্রকার দুর্বলতা তো বটেই, আবার এটা চিন্তা ও চিহ্নতন্ত্রের সঙ্গে বান্দার এক নতুন ধরনের সম্পর্কেরও এলান। সে যেকোনো চিন্তা বা ফিলোসফিকে নিজের দশার সাপেক্ষে খতিয়ে দেখে। নজরুলের ভাষায়, ‘আমি যতটুকু বুঝতে পারি, তার বেশি বুঝবার ভান করে যেন কারুর শ্রদ্ধা বা প্রশংসা পাবার লোভ না করি। তা সে মহাত্মা গান্ধীরই মত হোক আর মহাকবি রবীন্দ্রনাথেরই মত হোক, কিংবা ঋষি অরবিন্দেরই মত হোক, আমি সত্যিকার প্রাণ থেকে যেটুকু সাড়া পাই...ঠিক ততটুকু মানব।…বিদ্রোহ মানে কাউকে না-মানা নয়। বিদ্রোহ মানে যেটা বুঝি না, সেটাকে মাথা উঁচু করে “বুঝি না” বলা।’
সলিমুল্লাহ খান বাল্টার বেনিয়ামিনের দোহাই দিয়ে নজরুলের কাব্যে মহিমার [অরা] অবসান প্রতিপাদন করেছেন। বিদ্রোহের দ্বারা খোদ পরমের কাছেও জবাব দাবি করা, একেই বলে মামুলীকরণ [প্রফেনেশন]। নজরুলের লেখায় এর মোক্ষম নমুনা ভৃগু। ভৃগুর ডাক খোদ বিষ্ণুকেও শুনতে হবে—এই তার দুর্দম আবদার। নজরুল কেবল ধর্মতাত্ত্বিক রহস্যেরই মামুলীকরণ করেননি, রাজনৈতিক মহিমারও হদ্দ করেছেন। বলাই দেবশর্মাকে চিঠিতে লিখেছেন, ‘মহাত্মা হওয়ার লোভ কোরো না।’ শেষজীবনে কংগ্রেস নেতৃত্বকে বিদ্রূপ করে লিখেছেন, ‘জরাগ্রস্ত জইফ যারা তাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত কোন অশ্রদ্ধা নেই—আমার বর্তমান ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে পরিচিত যাঁরা, তাঁরা জানেন আমার চেয়ে তাঁদের কেউ বেশি শ্রদ্ধা করেন না।...কিন্তু তাঁরা যখন জাতীয় মহাযুদ্ধের সেনাপতি হয়ে অগ্রে চলতে চান—তখনই আমার পায় হাসি।’ একই লেখায় ‘লিডারে’র প্রতি তরুণদের নির্ভরতাকে ব্যঙ্গ করেন, যা সম্ভবত তখনকার মুসলিম লীগের নেতৃত্বের সমালোচনা। (‘আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ’)
রাজনীতিতে যেমন লিডারদের মহিমাকে মামুলি করেছেন নজরুল, তেমনি সাহিত্য সাধনায়ও ‘অমর কাব্যে’র মহিমা স্পর্শ করার তোয়াক্কা করেননি তিনি—‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার বরাতে নজরুলের এই মহিমা-মোচনী মনোভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন সলিমুল্লাহ খান। রবীন্দ্রনাথকে নজরুল দেখেছিলেন কেবল শিল্পী নয়; বরং উপনিষদের আর্য ঋষি রূপেও। (‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা’) কিন্তু নজরুল তেমন ঋষি হতে চাননি। ‘নজরুল প্রকৃতিতে রবীন্দ্রনাথ হইতে স্বতন্ত্র—একটা শেষের সন্ধান যে চাহে নাই,’ লিখেছেন অমলেন্দু দাশগুপ্ত—নজরুলের ‘বুলবুল’ গ্রন্থের ভূমিকায়। ‘ব্যথা তার এত প্রবল যে শেষকে পর্যন্ত কামনা করিবার অবকাশ থাকে না। সে এই ব্যথামাথা প্রেমিকের চোখে পৃথিবীকে দেখিয়াছে, আর দেখিয়াই চলিয়াছে।’ রবীন্দ্রনাথ নিজেও নজরুলের ভিন্নতা জানতেন, তাই নজরুলকে আদর করে ‘উন্মাদ’ বলেছিলেন। নজরুল নিজেও উন্মাদ ডাকটা নিজের পরিচয় আকারে গ্রহণ করেছেন অগ্নিবীণার আত্মকথনে। আবার হাফিজ অনুবাদ করতে গিয়ে নিজেকে ‘রিন্দ’ বলে শনাক্ত করেছেন নজরুল। ইরানি কবিরা নিজেদের রিন্দান বা ‘স্বাধীনচিন্তাকারী, ব্যভিচারী’ বলতেন। তাঁদের সঙ্গে নিজেকে নজরুল একাত্ম করেছেন। ইলেকট্রেট বা বৈদ্যুতিক জমানায় মেঘ-বাদলের বিজলির মতোই চঞ্চল নজরুলের রিন্দ বা খ্যাপা অনুভববিদ্যা।
নজরুলের এই অভিনব অনুভবের বাহার তরুণদের প্রবলভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ‘আমার অপরাধ আমি তরুণ। তরুণেরা নাকি আমায় ভালবাসে, তারা আমার লেখার ভক্ত।’ ইব্রাহীম খাঁকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফরিদপুরের তরুণেরা তাঁকে বিপুলভাবে গ্রহণ ও বরণ করেছিল। যে তরুণদের তিনি আশার প্রতীক বলে নাম নিয়েছিলেন তাঁরা হলেন ইব্রাহীম খাঁ, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আবুল মনসুর, ওয়াজেদ আলী, আবুল হুসেন। নজরুল লক্ষ করেছিলেন, এই তরুণেরা মুসলমান হলেও চরিত্রে জাতবাদী ছিলেন না; বরং ছিলেন সব জাতির। তরুণদের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক লিডারগিরির ছিল না; বরং ছিল অনুভূমিক বা আড়াআড়ি বন্ধুত্বের। ‘নেতা হবার লোভ’কে সচেতনেই বর্জন করেছিলেন নজরুল।
মানুষের ‘মহীয়ান’ সত্তার নিশান-বরদার ‘নবযুগে’র বাণী নিয়ে আসা নজরুল। কিন্তু তিনি বিমূর্ত মানবতাবাদীও নন আর নতুন জমানার অন্ধ অনুরাগীও ছিলেন না। বিংশ শতাব্দীর সভ্যতার সংকট বুঝতেন তিনি। প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থার ভেতরের বিপদ সম্পর্কে তিনি টনটনে ছিলেন। ‘লাঞ্ছিত’ প্রবন্ধে তাই লিখেছেন, ‘মানুষ চিরকাল মানুষের উপর যে অত্যাচার করিয়া আসিতেছে, তাহা পশুদের পক্ষে অসম্ভব। কারণ মানুষ একটি চিন্তাশীল পশু।’ মানুষ সৌরজগৎটাকে ‘তাহার আরামের যন্ত্রে পরিণত করিয়াছে’। কিন্তু ‘রেল, স্টিমার, বিদ্যুৎ গাড়ি, কলকারখানা একটির পর একটি করিয়া মানুষের আরামের নিমিত্ত সৃষ্টি হইতে লাগিল এবং এই নিমিত্ত বায়ু, বিদ্যুৎ হইতে আরম্ভ করিয়া কোটি কোটি মনুষ্য, পশুপক্ষী, অপেক্ষাকৃত মুষ্টিমেয় প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন মনুষ্য-পশুর দাসখত লিখিয়া দিতে বাধ্য হইতে লাগিল।…সহস্র সহস্র শিল্পী কলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতে না পারিয়া জাত ব্যবসায় ছাড়িয়া দিয়া স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরিয়া রাস্তায় দাঁড়াইল। তাই আজ শত সহস্র তাঁতি জোলা, কামার কুমার বৈরাগী হইয়াছে। সহস্র লোক স্ত্রীপুত্র লইয়া কুলির কাজ করিতেছে।’ কলের প্রযুক্তি প্রান্তিক মানুষকে বীরত্ব, কর্মশক্তি, বা সচ্ছলতা দেয়নি বরং তাদেরকে পশুর মতো অধীন ও অসহায় করেছে। আজকের মেশিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকসের ভয়াবহ মানবীয় অভিঘাতের পূর্বাভাস টের পাওয়া যায় বিশ শতকের শুরুর দিকে লেখা নজরুলের শংকাবাণীতে।
উপনিবেশি রাজনীতির চূড়ান্ত পর্যায়, জমানার এনট্রোপি, আর সামাজিক ক্রমঘনায়মান বিপর্যয় চোখ এড়ায়নি নজরুলের। সমাজ ও রাজনীতি ক্রমশ ভিন্ন খাতে অগ্রসর হলো। নজরুলের জাতবিরোধী, মুক্ত-জমায়েতের সমাজ ও বান্দাগঠনের সম্ভাবনা দ্রুত বিলীয়মান হতে লাগল। বিস্মিত নজরুল লক্ষ করেন যে সুনীতিকুমার হিন্দু মহাসভার দিকে যাচ্ছেন আর সাংবাদিক মুজিবুর রহমান যাচ্ছেন তাঞ্জীমের দিকে। দেখলেন, যে তরুণদের সঙ্গে তাঁর এতকালের ভ্রাতৃত্ব, তাদের সঙ্গেও আর খাপ খাওয়াতে পারছেন না। ‘বহু মেশার পরেও আমি দেখলাম তাদের সাথে যেন আমার মিশ খাচ্ছে না।’ (‘জন-সাহিত্য’) নজরুলের কথিত ছয় তরুণ তত দিনে দুই ভিন্ন পথের পথিক হয়েছেন। শেষজীবনে এ কে ফজলুল হকের কাছেও হতাশ হয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে তোয়াজ করে চিঠি লিখতে হয়েছে নজরুলকে। সেই অপার বিপন্নতাই হয়তো তাঁকে ক্রমশ অন্তর্মুখিতার দিকে ঠেলে দেয়। তিনি নিজেকে ‘বিষ-জর্জরিত নির্জীব’ বলে ঘোষণা করলেন। (‘বাঙলার মুসলিমকে বাঁচাও’) ১৯৪২ সালের ১৭ জুলাই সুফি জুলফিকার হায়দারকে লেখা চিঠিতে জানালেন, তাঁর নার্ভ শ্যাটারড হয়ে গেছে।
জীবনের শেষ অভিভাষণে নজরুল বললেন, ‘হিন্দু-মুসলমানে দিন রাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে একদিকে কঠোর দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব অন্যদিকে লোভী অসুর যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণস্তূপের মতো জমা হয়ে আছে -- এই অসাম্য, এই ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম।’ সেই অসাম্য দূর না হয়ে আরও পুঞ্জীভূত হয়ে উঠল, আর অভিমানী নজরুলের অনুভব ও অভিব্যক্তির বর্তনী হয়ে এল সংকুচিত—তাঁর উদাসীন একাকিত্ব তখন কেবল নিজ আত্মার ভেতরে খুঁজে পাওয়া পরম সুন্দরের প্রতি গন্ধবিধুর অভিমান হয়ে রইল। (‘যদি আর বাঁশি না বাজে’)