ক্যান্সারের টিকা: যুগান্তকারী এমআরএনএ প্রযুক্তিতে যেভাবে লেখা হচ্ছে নতুন ইতিহাস

· Prothom Alo

যুগ যুগ ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের নাম ক্যান্সার। এই মরণব্যাধির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কেমোথেরাপির যন্ত্রণাদায়ক সব দৃশ্য, চুল পড়ে যাওয়া এবং মৃত্যুর প্রহর গোনার ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন দেখেছেন, এমন কি কোনো টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব, যা শরীরকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখাবে? কোটি কোটি ডলার খরচ এবং শত শত ব্যর্থ গবেষণার পর অবশেষে সেই স্বপ্নের দরজা খুলতে শুরু করেছে।

Visit newsbetting.bond for more information.

সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর খবরটি এসেছে অগ্ন্যাশয় ক্যান্সার এবং মেলানোমা নামে ত্বকের এক ধরনের ভয়ংকর ক্যান্সার চিকিৎসার জগৎ থেকে। একটি মেডিকেল কনফারেন্সে অগ্ন্যাশয় ক্যান্সারের নতুন চিকিৎসার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, যা এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ রেগুলেটরের ফাস্ট-ট্র্যাক অনুমোদন পেয়েছে। পাশাপাশি মেলানোমা ক্যান্সারের টিকার ট্রায়াল থেকেও এসেছে চোখধাঁধানো সাফল্য। এই টিকাগুলো তৈরি হচ্ছে সেই একই এমআরএনএ (mRNA) প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা দিয়ে বিশ্বজুড়ে করোনার টিকা তৈরি হয়েছিল।

ক্যান্সারের টিকার মূল ধারণাটি বেশ সহজ। টিউমারের কোষে কিছু বিকৃত প্রোটিন থাকে, যাদের বলা হয় নিওঅ্যান্টিজেন। টিকার কাজ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এই নিওঅ্যান্টিজেনগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একবার এগুলোকে ‘বাইরের শত্রু’ হিসেবে চিনে ফেললে সে নিজেই টিউমার কোষগুলোকে ধ্বংস করে ফেলে।

ক্যান্সার কেন বহু বছর পরেও ফিরে আসে
টিউমারের কোষে কিছু বিকৃত প্রোটিন থাকে, যাদের বলা হয় নিওঅ্যান্টিজেন। টিকার কাজ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এই নিওঅ্যান্টিজেনগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

কিন্তু বাস্তবে এই তত্ত্ব কাজে লাগানো মোটেও সহজ ছিল না। ক্যান্সার কোষগুলো অত্যন্ত ধূর্ত। এরা শুধু একটি প্রোটিন তৈরি করেই বসে থাকে না, বরং বারবার রূপ বদলায়। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, টিউমারগুলো শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি দমিয়ে রাখে। ফলে শরীরের পাহারাদার কোষগুলো টিউমারকে ধ্বংস করার বদলে বোকার মতো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

বিজ্ঞানীরা এর একটি সমাধান খুঁজে পেয়েছেন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর নামে এক ধরনের ওষুধে। এই ওষুধ টিউমারের তৈরি প্রতিরোধ সরিয়ে দেয়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আবার সক্রিয় হয়ে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। গবেষকরা দেখেছেন, এর সঙ্গে ক্যানসারের টিকা দিলে ফল আরও ভালো হয়। দুটি মিলে বেশ শক্তিশালীভাবে কাজ করে!

ক্যান্সারের টিকা তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল সময়। একেকজন রোগীর ক্যান্সারের ধরন ও মিউটেশন একেক রকম। তাই সবার জন্য একটি কমন টিকা কাজ করে না। প্রতিটি রোগীর টিউমারের নিওঅ্যান্টিজেন বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত টিকা তৈরি করাটা ছিল দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। টিকা তৈরি হতে হতে অনেক সময় রোগীর অবস্থাই আশঙ্কাজনক হয়ে যেত।

ক্যান্সার সারিয়ে তুলবে রাশিয়ার নতুন ভ্যাকসিন
ক্যান্সার কোষগুলো শুধু একটি প্রোটিন তৈরি করেই বসে থাকে না, বরং বারবার রূপ বদলায়। তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো, টিউমারগুলো শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি দমিয়ে রাখে।

কিন্তু এমআরএনএ প্রযুক্তি এই দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এখন ল্যাবরেটরিতে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই একজন রোগীর নিজস্ব টিউমারের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত টিকা তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি মডার্না এবং মার্ক যৌথভাবে ইনটিসিমেরান নামে এমনই একটি টিকা তৈরি করেছে। গত কয়েক বছর ধরে মেলানোমা রোগীদের ওপর চেকপয়েন্ট ইনহিবিটরের সঙ্গে এই টিকার ট্রায়াল চলছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত এর প্রাথমিক ফলাফল প্রমাণ করেছে, এমআরএনএ প্রযুক্তির এই ব্যক্তিগত টিকার ধারণাটি শুধু কাগজে-কলমেই নয়, বাস্তবেও দারুণ কার্যকর।

মেলানোমা ক্যান্সারের ট্রায়াল থেকে যে আংশিক ফলাফল পাওয়া গেছে, তা রীতিমতো আশা জাগানিয়া। যেসব রোগীর শরীর থেকে অস্ত্রোপচার করে টিউমার ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তাদের এই টিকা দেওয়ার পর দেখা গেছে রোগ ফিরে আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো, সফল অস্ত্রোপচারের পরও অনেক সময় শরীরে আণুবীক্ষণিক স্তরে কিছু ক্যান্সার কোষ ঘাপটি মেরে বসে থাকে। কিছুদিন পর সেগুলোই আবার নতুন টিউমার হিসেবে ভয়ংকর রূপে ফিরে আসে। কিন্তু টিকার মাধ্যমে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে একবার শক্তিশালী করে তুলতে পারলে, সেই অ্যান্টিবডিগুলো পুরো শরীর চষে বেড়িয়ে ওই লুকিয়ে থাকা মাইক্রোস্কোপিক ক্যান্সার কোষগুলোকে খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করতে পারবে। ফলে রোগীদের কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের মতো ক্ষতিকর ও যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।

ব্যায়াম করলেই কাবু হবে ক্যানসার!
ক্যান্সার চিকিৎসার সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো, সফল অস্ত্রোপচারের পরও অনেক সময় শরীরে আণুবীক্ষণিক স্তরে কিছু ক্যান্সার কোষ ঘাপটি মেরে বসে থাকে।

বোস্টনের ডানা-ফারবার ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের মেডিকেল অনকোলজিস্ট এলাদ শ্যারনের মতে, ‘এটি পুরো ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যই একটি অভাবনীয় প্রতিশ্রুতি। তবে এখনই আনন্দে আত্মহারা হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ মেলানোমা মানুষের শরীরের সবচেয়ে বেশি ইমিউন সিস্টেমকে সাড়া জাগানো ক্যান্সার। মেলানোমায় এই টিকা যতটা ভালো কাজ করছে, অন্যান্য ক্যান্সারেও ঠিক ততটা সফল হবে কি না, তা জানতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’

তবে গবেষকেরা থেমে নেই। ফুসফুস, মূত্রাশয় ও কিডনি ক্যানসারের রোগীদের ওপরও এই টিকার পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে মডার্না ও মার্ক। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই হয়তো জানা যাবে, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই টিকা আমাদের কতটা এগিয়ে নিতে পারে।

সূত্র: দ্য ইকোনোমিস্টহাতির কেন ক্যান্সার হয় না

Read full story at source