র‍্যাবের গাড়ি, সাবেক জবি ছাত্রী ও ‘জিনের ভর’, সেই ঘটনায় যা সামনে এল

· Prothom Alo

মমতাজ আরা বর্ষা নামের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রাক্তন যে ছাত্রীকে আটক করতে গিয়ে র‍্যাব বিতর্ক তৈরি করেছিল, তিনি এখন আত্মগোপনে।

Visit newssport.cv for more information.

বর্ষার রুমমেট, জবির শিক্ষক ও জকসুর নেতারা বলছেন, ঘটনার পর তিনি মেস ছেড়েছেন। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। মুঠোফোনও বন্ধ। বর্ষার বোনও বলেছেন, পরিবারের সঙ্গে বর্ষার যোগাযোগ নেই।

এদিকে পুলিশ বলছে, ‘জিনে ভর করার’ নাম করে র‍্যাবের এক কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে অর্থ ও সোনার গয়না হাতিয়ে নেওয়ার একটি মামলায় বর্ষা এজাহারভুক্ত আসামি। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করতে গিয়েছিল র‍্যাব।

অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, যেভাবে সাদাপোশাকে মাইক্রোবাসে করে র‍্যাব বর্ষাকে আটক করতে গেছে, সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বর্ষার রুমমেটরা র‍্যাবের বিরুদ্ধে গালাগালির অভিযোগও করেছেন।

বর্ষা জবির নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন বলে তাঁর দুজন সহপাঠী জানিয়েছেন।

রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় সাততলা ভবনের সপ্তম তলার একটি মেসে থাকতেন বর্ষা। ৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে আটক করতে যায় র‍্যাব।

বর্ষার রুমমেট ও মেস ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বলেছেন, সকাল পৌনে সাতটার দিকে এই মেসের সামনে যায় একটি মাইক্রোবাস। সেখানে তিনজন ব্যক্তি ছিলেন। তাঁদের পরনে র‍্যাবের পোশাক ছিল না। ওই তিন ব্যক্তি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীকে নিয়ে মেসে যান এবং দরজা খুলতে বলেন। তবে মেসের বাসিন্দারা শুরুতে দরজা খোলেননি।

রুমমেটরা আরও বলছেন, গালিগালাজ ও ধাক্কাধাক্কির মুখে তাঁরা দরজা খুলতে বাধ্য হন। এরপর ওই তিন ব্যক্তি মেসে ঢুকে তল্লাশি শুরু করেন। কিছু না পেয়ে তাঁরা বর্ষাকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

মেসের বাসিন্দারা বেশির ভাগ জবির শিক্ষার্থী। তাঁরা বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জবির ছাত্র সংসদের (জকসু) নেতাদের জানান। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যেই সেখানে র‍্যাবের আরেকটি গাড়ি এবং স্থানীয় থানার পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত হন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসক তারেক বিন আতিক সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন। তিনি জানান, প্রথমে ওই ব্যক্তিরা ভুল করে সেখানে গিয়েছেন বলে দাবি করেন। পরে বলেন, তাঁরা চুরির মামলার আসামি ধরতে এসেছেন। এর মধ্যেই বর্ষাকে গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাধা দেয়।

ঘটনার বিষয়ে জকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান ওইদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত বর্ষাকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব সদস্যরা ফিরে যাওয়ার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন করেন মমতাজ আরা বর্ষা। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সকালের ঘটনা নিয়ে ওই দিন বিকেলে জবির ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন বর্ষা। সেখানে তিনি দাবি করেন, তাঁর বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়া র‍্যাবের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে (আইটি) কাজ করেন। তিনি প্রতিশোধ নিতে র‍্যাবের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।

র‍্যাব বলছে, র‍্যাব-২–এ সুমন নামে কেউ কাজ করেন না। বাহিনীটির ১৫টি ব্যাটালিয়ন আছে। পুরো নাম ও পদবি না বললে কোনো ব্যক্তির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

মেসে নেই বর্ষা

র‍্যাবের বিরুদ্ধে অপহরণ, গুম, হত্যাসহ অতীতের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পড়া বাহিনীটিকে বিলুপ্ত করে সরকার এখন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের আইন আনছে। বিলটি সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে।

র‍্যাবের কর্মকর্তারা কেন একটি মেয়েকে আটক করতে গেলেন, তা জানতে খোঁজ নেওয়া শুরু করে প্রথম আলো। বর্ষার কাছ থেকে বিস্তারিত জানার জন্য গত রোববারের পর তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। ৭ ও ৮ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার কলতাবাজারে বর্ষার মেসে যান প্রথম আলোর প্রতিবেদক। সেখানে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

ওই মেসের একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষা দুটি টিউশনি করতেন। সেখান থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা পেতেন। তিনি মেসে দুটি আসন ভাড়া নিয়ে থাকতেন। ভাড়ার পেছনেই চলে যেত ছয় হাজার টাকা। তবে মাস তিনেক আগে বর্ষা টিউশনি ছেড়ে দেন।

মমতাজ আরা বর্ষাকে আটক করতে যাওয়া র‌্যাব সদস্যরা এই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকা, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভবনটির এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, বর্ষা তাঁকে বলেছিলেন, কেউ খুঁজতে এলে যেন বলা হয় যে তিনি (বর্ষা) সেখানে থাকেন না।

বর্ষার মেসে বাসিন্দাদের কাছ থেকে তাঁর বোন বৃষ্টির মুঠোফোন নম্বর পাওয়া যায়। তিনি দিনাজপুরে থাকেন। তিনি মঙ্গলবার রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, দুই দিন ধরে বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না তাঁরা।

বৃষ্টি আরও বলেন, বর্ষার জন্য তাঁর বাবা টাকা পাঠাতেন। পাশাপাশি বর্ষা টিউশনি করে চলতেন। তিনি অনলাইনে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন এবং একসময় নিজের একটি প্রতিষ্ঠানও ছিল। সে সময় বর্ষা হ্যাকিং বিষয়ে পারদর্শী হন বলেও উল্লেখ করেন বৃষ্টি।

‘জিনের ভর’ ও চুরি

এই ঘটনা অনুসন্ধানে নেমে একটি চুরির মামলার খোঁজ পাওয়া যায়। মামলাটি হয় গত ১২ আগস্ট রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায়। মামলার বাদী একজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার। তিনি বর্তমানে র‍্যাব-২–এ কর্মরত।

মামলায় ওই পুলিশ কর্মকর্তার গাড়িচালক মো. রাসেল ও তাঁর স্ত্রী মাছুরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, রাসেল ওই পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীকে বলেন যে তাঁর স্ত্রী মাছুরার ওপর জিন ভর করেছে। জিন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর পরিবারের অনেক কথা জানে। জিনের কথামতো চললে পেশাজীবনে উন্নতি হবে এবং পারিবারিক বিপদ দূর হবে।

পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী একজন সিনিয়র সহকারী সচিব। মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়, জিনের কথা বলে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা ও সোনার গয়না নিয়েছেন রাসেল ও তাঁর স্ত্রী। চেতনানাশক খাইয়েও টাকা ও সোনার গয়না চুরি করেছেন তাঁরা। খোয়া যাওয়া নগদ টাকার পরিমাণ ১৪ লাখ এবং সোনা ১০ ভরি। বাসার কাজের জন্য টাকাগুলো রেখেছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা।

মামলার এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, রাসেল ও তাঁর স্ত্রী মাছুরা সোনা বিক্রি করেছেন বর্ষার কাছে। মামলাটি তদন্ত করছে ক্যান্টনমেন্ট থানা-পুলিশ। ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিবুল হাসান মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, এ মামলার দুই আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন হিসেবে বর্ষার নাম আসে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল। বর্ষাকে আটক করতে সহযোগিতার জন্য র‍্যাবের কাছে রিকুইজিশন বা আবেদন করে থানা-পুলিশ।

র‍্যাব যা বলছে

র‍্যাব-২–এর পরিচালক এবং পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নয়মুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, র‍্যাবের অভিযানে আইনের কোনো ব্যত্যয় হয়নি। এজাহারনামীয় আসামি ধরতে র‍্যাব সেখানে গিয়েছিল। সেখানে আসামিকে না ধরতে র‍্যাবের ওপর চাপ তৈরি করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জবির সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষাকে আটক করতে প্রথম দিকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা পরিচয় জানাতে পারেননি। তাঁদের কাছে কোনো নথি বা মামলার এজাহার ছিল না। এ কারণেই সন্দেহের সৃষ্টি হয়।

৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বর্ষা বা তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের যোগাযোগ হয়নি উল্লেখ করে ইহসানুল কবির বলেন, ‘আমাদের প্রাক্তন ছাত্রী যদি অপরাধী হন, তাহলে ফৌজদারি আইন অনুসারে তাঁর বিচার হবে।’

Read full story at source