অমাবস্যা কটালের জন্য আমরা কি প্রস্তুত
· Prothom Alo
সেপ্টেম্বর মানে ভাদ্র মাস নিয়ে খনার সতর্কতার অন্ত নেই। খনা বলেছেন, ‘ভাদ্র মাসে জলের মধ্যে নড়েন বসুমাতা। রাজ্য নাশ, গো-নাশ, হয় অগাধ বান। হাতে কাঠা গৃহী ফেরে, কিনতে না পায় ধান।’ ভাদ্রের অমাবস্যা–পূর্ণিমায় সাগরের জোয়ার থাকে অন্য সময়ের থেকে প্রবল। আসছে ১১ সেপ্টেম্বর (২৭ ভাদ্র) সকাল ৯টা ২৭ মিনিটে চাঁদের অমাবস্যা তিথিটি সম্পন্ন হবে। সুতরাং ২৭ ভাদ্র দিনটি হচ্ছে বছরের অন্যতম প্রধান অমাবস্যা বা নো মুন ডে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য অমাবস্যার এই সময়টা সত্যিই ভয়ের এবং উদ্বেগের।
জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভূগোলের নিয়ম অনুযায়ী, এই শঙ্কার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণগুলো হচ্ছে:
Visit extract-html.com for more information.
সূর্য ও চাঁদের একমুখী টান: অমাবস্যার দিন সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী মহাবিশ্বে একই সরলরেখায় অবস্থান করে। এর ফলে দুই মহাশক্তির মিলিত মহাকর্ষীয় টানে সমুদ্রে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উঁচু জোয়ারের সৃষ্টি হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘স্প্রিং টাইড’ বলে। অমাবস্যা কটাল নামেও পরিচিত।
বর্ষার প্রভাব: সেপ্টেম্বর মাস (ভাদ্র) এমনিতেই বর্ষাকাল। এই সময়ে নদী ও সাগরে পানির চাপ সাধারণত অনেক বেশি থাকে। দুই দশক ধরেই ভাদ্রের বাঁধভাঙা জোয়ারের তাণ্ডব লক্ষ করা যাচ্ছে। এই সময় উপকূলীয় বাঁধগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমনের স্বপ্ন মাঠে মারা যায়। লোনাপানিতে আটকে যায় জনজীবন। দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধানের অভাবে এলাকাবাসী প্রতিবছরই জোয়ারের পানি
ও নদীভাঙনের মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েন। ইতিমধ্যে খুলনার কয়রার নাজুক বাঁধের কথা আমরা জেনেছি। কয়রা বেশ কয়েকটি বড় নদী দ্বারা বেষ্টিত এবং বাঁধের কিছু অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। এলাকা ঘুরে আর স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বললেই জানতে পারবেন বাঁধগুলো নিয়ে মানুষ কী শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। সেখানে প্রায় দুই লাখ মানুষ ভাদ্রের বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
কয়রার অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পোল্ডার ১৩-১৪/১ এবং ১৩-১৪/২–এর অধীন কয়রার ১৫৪ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে প্রায় ২১ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৮ কিলোমিটার বাঁধ তীব্র ধসের মুখে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলো হলো:
দশহালিয়া ও মঠবাড়ী: কপোতাক্ষ নদের তীব্র স্রোতে এ অঞ্চলের বাঁধগুলো মারাত্মক ক্ষয়ে গেছে। সম্প্রতি সংস্কারকাজ চললেও চিংড়িঘেরের অবৈধ পাইপের কারণে বাঁধের মাটি আবার ধসে পড়েছে। কপোতাক্ষ স্টেশন এবং মঠবাড়ীর কাছে তীব্র নদীভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদ–নদীর তীরবর্তী আরও বেশ কয়েকটি অংশ তীব্র স্রোত এবং জোয়ারের চাপের মুখে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই বেড়িবাঁধগুলো কয়রার একটি বিশাল অংশকে রক্ষা করে। এলাকাটি প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশের শিকার হয়। বাসিন্দারা জানান, তাঁরা প্রায় প্রতিবছরই একই হুমকির মুখে পড়েন। কারণ, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর সেগুলো বারবার মেরামত করা হয়, কিন্তু তার বদলে শক্তিশালী ও স্থায়ী কোনো কাঠামো তৈরি করা হয় না।
৪ নম্বর কয়রা ও গিলাবাড়ী: এক যুগের বেশি সময় ধরে এই এলাকার নদী রক্ষা বাঁধ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাস্তাটি সংস্কার না করায় এটি অত্যন্ত নিচু ও দুর্বল হয়ে আছে। জোয়ারের পানি সহজেই এর ওপর দিয়ে উপচে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কাটকাটা, সরদারঘাট ও টেংরাখালী (তেঁতুলতলা): এই পয়েন্টগুলোতে নদীর ভাঙন তীরের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে।
দক্ষিণ বেদকাশী: সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশগত কারণ এবং অবহেলার জন্য দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নটি এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
গত জুলাই মাসে দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের গোলখালীর কপোতাক্ষ স্টেশনের কাছের বাঁধটি মারাত্মক চাপের মুখে পড়ে। জরুরি ভিত্তিতে কাজ করায় ওই সময় বড় ধরনের ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল। জুলাইয়ের জোয়ার আর সেপ্টেম্বরের জোয়ার এক নয়, বলা যায় আকাশ-পাতাল তফাত। টেকসই সমাধান না হওয়ায় আসন্ন অমাবস্যা কটালে এই অংশ আবারও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন। উত্তর বেদকাশী এবং দক্ষিণ বেদকাশীতে, বিশেষ করে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদ–নদী বরাবর আরও কিছু ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকা শেষ হওয়ার নয়। খুলনা, সাতক্ষীরা ছাড়া অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলেরও একই দশা।
এবার সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি বিবেচনায় বরগুনার উপকূলীয় বাঁধের ঝুঁকি বেশ গুরুতর। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, জেলার ২২টি পোল্ডারে মোট প্রায় ৮০৫ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে এবং প্রায় ৩ কিলোমিটার বাঁধ নদীতে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ৫টি পয়েন্টের মধ্যে আছে:
১. তেঁতুলবাড়িয়া, তালতলী—বাঁধে ফাটল এবং ১৫টি গ্রাম ঝুঁকিতে।
২. পদ্মা, পাথরঘাটা—বাঁধহীন/ভাঙনপ্রবণ অংশ এবং জিও ব্যাগ দিয়েও পানি ঠেকানো কঠিন হচ্ছে।
৩. পশুরবুনিয়া, আমতলী—জোয়ারের চাপে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত।
৪. আলিয়াবাদ-কালিকাবাড়ি-করুণা, বেতাগী—বিষখালী নদীর ভাঙন ও দুর্বল বাঁধের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ।
৫. পালের বালিয়াতলী, বরগুনা সদর—পায়রা ও বিষখালী নদীঘেঁষা প্রায় ১.২৫ কিলোমিটার অংশ নদীতে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে।
এ বছরের আগস্টে তালতলী, পাথরঘাটা, আমতলী, বেতাগী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বাঁধের ভাঙন, ধস, বিলীন হয়ে যাওয়া এবং বাঁধ নিচু/সরু হয়ে যাওয়ার খবর এসেছিল। বলা যায় সমস্যাটি চলমান।
এখন উপায় কী
ভাদ্রের জোয়ারের সামনে বেড়িবাঁধ রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। সরকারি বড় বরাদ্দের অপেক্ষা না করে নেতা-মন্ত্রীদের গাড়ির সামনে-পেছনে না দৌড়ে আসন্ন ১১ সেপ্টেম্বরের অমাবস্যার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার স্থানীয়রা মিলে যৌথ প্রচেষ্টায় বাঁধের ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের সুরক্ষায় যে কাজগুলো করতে পারেন:
১. স্বেচ্ছাশ্রমে তাৎক্ষণিক মেরামত:
• বাঁশের পাইলিং ও খাঁচা তৈরি: কয়রার মঠবাড়ী বা গড়িয়াবাড়ী লঞ্চ টার্মিনালের মতো যেসব জায়গায় ফাটল ধরেছে বা মাটি ধসে যাচ্ছে, সেখানে নদীর তীরের দিকে শক্ত করে বাঁশের পাইলিং বা বাঁশের খাঁচা তৈরি করে দিতে হবে। এটি মাটিকে পানির টানে ভেসে যাওয়া থেকে আটকায়।
• জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলা: বস্তায় বালু বা মাটি ভরে তা শক্ত করে বেঁধে ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখতে হবে। বিশেষ করে জোয়ারের পানি যে অংশগুলো দিয়ে উপচে পড়ার আশঙ্কা আছে, সেখানে বস্তা দিয়ে অস্থায়ী দেয়াল তোলা যায়।
২. ঘেরের অবৈধ পাইপ চিহ্নিত ও বন্ধ করা: চিংড়িঘেরের পাইপের কারণে বাঁধ ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়। এ মুহূর্তে গ্রামের সবাই মিলে বাঁধের ভেতর দিয়ে যাওয়া সব অবৈধ পাইপের মুখ মাটি ও ইট দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দিতে হবে, যাতে জোয়ারের উচ্চ চাপে পাইপের চারপাশ দিয়ে পানি চুইয়ে বাঁধ ধসে না পড়ে।
৩. প্রাক্-জোয়ার নজরদারি দল: অমাবস্যার দিনগুলোতে (বিশেষ করে দুপুরের ও রাতের মূল জোয়ারের সময়) স্থানীয় যুবকদের নিয়ে একটি ‘বাঁধ পাহারা দল’ গঠন করতে হবে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে জোয়ারের সময় কোনো স্থান দিয়ে পানি চুইয়ে পড়া বা ছোট ফাটল দেখা দেওয়ামাত্রই যেন গ্রামের মানুষকে ডেকে তাৎক্ষণিক মাটি বা বস্তা চাপা দেওয়া যায়, তার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
৪. প্রাকৃতিক সুরক্ষা: বাঁধের ঢালে ঘাস ও গোলপাতা লাগাতে হবে। বাঁধের যে অংশগুলো এখনো ভালো আছে, সেগুলোর নদীর দিকের ঢালে ‘ছন ঘাস’ বা স্থানীয় লবণসহনশীল ছোট গাছ ও গোলপাতা লাগিয়ে রাখা দরকার। গাছের শিকড় বাঁধের মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, যা তীব্র স্রোতেও মাটি ক্ষয় হতে দেয় না। দীর্ঘ মেয়াদে এমন পদক্ষেপ কাজের।
৫. প্রশাসনকে জরুরি চাপ দেওয়া: পাউবো ও ইউপি সদস্যকে জানাতে হবে, যেখানে এখনো ইউপি সদস্য আছেন, সেখানে তাঁদের সঙ্গে বা পাউবোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার ব্যবস্থা। কোনো বাঁধ অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে তাঁদের কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ বা সরকারি সাহায্য বরাদ্দ করার জন্য যৌথভাবে দাবি জানান।
আসলে বাঁধের ওপর স্থানীয় মানুষের মালিকানা প্রতিষ্ঠা জরুরি। বাঁধ ভাঙলে যাঁদের পথে বসতে হয়, সেই বাঁধ পরিকল্পনা, নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁদের কাছে দেওয়ার যে রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠা, সেটা আমরা কবে বুঝব?
গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক-গবেষক, স্বাধীনতার ৫০ বছর: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অর্জন গ্রন্থের প্রণেতা।