মেজ ছেলে

· Prothom Alo

পেছন ফিরে দেখি, আম্মা মুখে কাপড় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে আমার যাওয়ার পথের দিকে। আব্বা সঙ্গেই যাচ্ছে, গাড়িতে তুলে দেবে বলে।
পাস করার পর শহরে দুটো চাকরি করলেও এবার যাচ্ছি স্বপ্নের শহর চট্টগ্রাম ছেড়ে রসমালাইয়ের শহর কুমিল্লায়। কখনো চট্টগ্রাম ছাড়তে হবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।

Visit casino-promo.biz for more information.

আমি তখন স্কুলে ক্লাস নিচ্ছি। বীজগণিতের একটা অঙ্কের ঠিক মাঝখানে ফোনটা এল।
‘আপনার কাল ইন্টারভিউ আছে। সব কাগজপত্র নিয়ে চলে আসুন। ঠিকানা হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
কোনোমতে অঙ্কটা শেষ করে শিক্ষার্থীদের বললাম, ‘তোমরা একই রকম আরেকটা অঙ্ক করো। আমি আসছি।’
প্রথমেই ফোন দিলাম আব্বাকে। তিনি এক বাক্যেই বললেন, ‘ইন্টারভিউটা আগে দিয়ে আয়। এরপর দেখা যাবে। তোর ভাইয়া কী বলে, সেটা একটু শুনে নে।’
আমি জানি, ভাইয়াকে ফোন দিলে অন্তত পাঁচ মিনিট বয়ান দেবে, কেন ইন্টারভিউ দেওয়া উচিত, কেন সুযোগটা হাতছাড়া করা যাবে না, ভবিষ্যৎ নিয়ে কী করতে হবে… ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিন্তু আমার তো এই স্বপ্নের শহর ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে না।
দূরে গেলে ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করবে কে? আর রিধি? সে তো একা হয়ে যাবে।

রিধি একটা নামকরা ব্যাংকের কর্মকর্তা। দিন শেষে আমরা প্রায়ই ২০ টাকার বাদাম কিনে, খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে সুখ-দুঃখের গল্প সেরে নিতাম। রিধির সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে হতো আনন্দে আকাশে ভেসে বেড়ানোর মতো, যেমন প্যারাসেইলিং করার সময় মাটি থেকে অনেক ওপরে উঠে গেলে হয়।
মাঝেমধ্যে বন্ধুরা রাতে ডাক দিলে স্কুটি নিয়ে মেরিন ড্রাইভ ধরে চলে যেতাম পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে। শুধু এক কাপ চা আর আড্ডায় গা ভাসানোর জন্য।
এসব ছেড়ে কি অদূরের একটা শহরে যাওয়া যায়?

যাওয়ার দিন ভাইয়াকে ফোন দিয়ে বললাম, ‘আব্বা যেন আমার সঙ্গে বাস টার্মিনালে না যায়। কিছু কাজ আছে। সেসব শেষ করে বাসে উঠব।’
আব্বা জোরাজুরি করলেন। আমি তাকে নিলাম না।
কী করব! আমারও তো আব্বাকে সঙ্গে নিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু রিধি অপেক্ষা করছে বাস টার্মিনালে, আমাকে বিদায় দেবে বলে। সে কথা তো আর বলতে পারি না। বলার মতো মুখও এখনো হয়নি।
বাস টার্মিনালের দিকে যেতে না যেতেই আব্বা প্রায় ২০টার ওপর কল দিয়ে বসে আছেন।
রাগে ভাইয়াকে নক দিয়ে বললাম, ‘আব্বাকে মানা করো, কল না দিতে। আমি গিয়ে সবাইকে ভিডিও কল দেব।’

নীল দহন

আজ আর কোনো পার্কে নয়, রিধি আমাকে একটা সুন্দর রেস্টুরেন্টে ট্রিট দিল। অর্ডার করার প্রায় ৪০ মিনিট পর খাবার এল। আমাদের সময় নিয়ে মাথাব্যথাও নেই।
গল্পের মাঝখানে কখন যে সময় চলে গেছে, খেয়ালই করিনি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় ৯টা।
বাসে ওঠার কথা ছিল সন্ধ্যা ৭টায়। সাইলেন্ট করা মুঠোফোনটা পকেট থেকে বের করে দেখি; চক্ষু চড়কগাছ! ১০০-এর ওপর মিসড কল!
কী করে উঠি?
বাসে ওঠার কথা বলতেই রিধির চোখ ভিজে উঠল। এত মানুষের ভিড়েও আমাদের মনের উথালপাতাল অশ্রুর খবর কেই–বা বুঝবে!
শেষ পর্যন্ত উঠতেই হলো।
গাড়িতে উঠেই ভাইয়াকে আবার বললাম, ‘সবাইকে টেনশন করতে মানা করো। আমি ফেনীর কাছাকাছি।’
অথচ মাত্র বাসে উঠেছি।
পরিবারের সঙ্গে এমন মিথ্যা বললেও দিন শেষে এই পরিবারই তো সব। আব্বাকে তো এমনিতেই ভয় পাই। যদি জানতে পারেন এত রাতে বাসে উঠেছি, তাহলে আমার খবর করে ছাড়বেন!

ঘণ্টাখানেক পর বিপত্তি বাধল। ভাইয়া ফোন দিয়ে বলল, ‘কই আসোস?’
‘চৌদ্দগ্রাম।’
সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘লাইভ লোকেশন দে।’
কী যে করি! না দিয়েও উপায় নেই। এতক্ষণ ভাইয়াকে বলে বলে তো স্বপ্নের শহরে পড়ে আছি। শেষ পর্যন্ত লোকেশন পাঠাতেই হলো।
লোকেশন পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে ভাইয়াকে আরেকটা কথাও বললাম, ‘আমার মন টানতেছে না রে।’
সে ফোন দিয়ে উল্টো ঝাড়ি দিল।
‘অনেকগুলো মানুষকে তুই বসিয়ে রাখছিস। রাত বাজে প্রায় ১২টা!’
কী করব? রিধির সঙ্গে দেখা না করে কীভাবে চলে যাই? শনিবারে তো তার অফিস থাকে না। বাসায় ম্যানেজ করে আসতে আসতেই দেরি হয়ে গেছে ওর।
কথা বলতে বলতে ভাইয়ার কাছ থেকেই জানতে পারলাম, আব্বা আমাকে রিকশায় তুলে দেওয়ার পর বাসায় যাননি। হেঁটে হেঁটে বাস টার্মিনালে গিয়েছেন। দূর থেকে আমাকে একবার দেখবেন বলে।
আর আম্মা ভাইয়াকে ভিডিও কল দিয়ে কেঁদেছেন অনেকক্ষণ। যাওয়ার সময় বলে এসেছি, ‘এবার তোমরা শান্তিতে থাকো।’
কেন যে বললাম কথাটা। হয়তো প্রিয় শহরে না থাকার যন্ত্রণা হতে পারে।

দুই ছেলে এখন দুই শহরে!
কথাটা শুনে হুট করেই চোখ ভিজে উঠল।
এতক্ষণ চট্টগ্রাম ছাড়ার কষ্টটা শুধু আমার নিজের মনে হচ্ছিল। হঠাৎ বুঝলাম, শহর ছেড়ে আসার কষ্টটা হয়তো আমার চেয়েও বেশি কারও মনে জমে আছে।
পেছনে তাকিয়ে শেষবারের মতো দেখি, আম্মা মুখে কাপড় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আব্বা হয়তো তখনো বাস টার্মিনালের কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন।
মেজ ছেলে বলে হয়তো আদরটা একটু কম পেয়েছি, এমনটা ভাবতাম মাঝেমধ্যে। সেদিন বুঝলাম, আদর কম ছিল না। শুধু প্রকাশটা একটু আলাদা ছিল।
দুই ছেলে দুই শহরে চলে গেলেও বাবা-মায়ের কাছে দুজনই একই ঘরের ছেলে হয়ে থাকে।

Read full story at source