অসুস্থতা আমাকে থামাতে পারেনি, মানসিকভাবে আরও শক্ত করেছে: আফরোজা সুলতানা

· Prothom Alo

তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা এবং এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন–৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন যারীন’স ক্রিয়েশনের স্বত্বাধিকারী আফরোজা সুলতানা শিউলি।

‘দীর্ঘদিনের চিকিৎসার অভিজ্ঞতাই আমাকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে শক্ত করে তোলে। আমি যখন চিকিৎসকের কাছে যেতাম দেখতাম, দুই-তিন বছরের শিশুরাও কেমো নিতে এসেছে। তখন মনে হতো, আমি তো জীবনের ১৭ বছর দেখেছি। এই বাচ্চাগুলো তো মাত্র দুই-তিন বছর বয়সে এমন লড়াই করছে। এসব দেখতে দেখতে আমি অনেক শক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।’

Visit likesport.biz for more information.

পডকাস্টে নিজের অসুস্থতার শুরুর দিককার স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কথাগুলো বলেন আফরোজা সুলতানা শিউলি। গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে পডকাস্টের পর্বটি প্রচারিত হয়।

পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, মাত্র ১৭ বছর বয়সে থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ার সময় তাঁর এবং পরিবারের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল?

উত্তরে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘১৯৯৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওয়ার সময় পরীক্ষার হলেই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। স্যাররা আমাকে হাসপাতাল নিয়ে যান। পরে দেখা যায়, আমার হিমোগ্লোবিন ছয়ের নিচে নেমে গেছে। তখন আমাকে তিন ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। কিন্তু কেন হিমোগ্লোবিন এত কমে গেছে, সেটা তখনো বোঝা যায়নি।’

এরপর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এবং ভারতে যাওয়ার কথা জানান আফরোজা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা হতো। অনেক সময় ব্যথা সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। তখন বাংলাদেশে সিটি স্ক্যান, এমআরআইয়ের মতো পরীক্ষা সহজলভ্য ছিল না। কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তাররা প্রথমে আমার মস্তিষ্কের সমস্যা আছে কি না, সেটাই দেখছিলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা ও ওষুধের পর মাথাব্যথা কিছুটা কমলেও শরীরের দুর্বলতা কমেনি। দুই মাস পরপর আবার রক্ত নিতে হতো।’

পরে ঢাকায় একজন হেমাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়ার পর তাঁর অসুস্থতার প্রকৃত কারণ জানা যায়। আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘পিজিতে ডা. রশিদকে দেখানোর পর তিনি হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষা দেন। সেই পরীক্ষাতেই থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। রিপোর্টে পরিষ্কার লেখা ছিল—বিটা থ্যালাসেমিয়া। আমি মাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই কথাটি বলেছিলাম। কিন্তু আমার ভাই আমার হাত থেকে রিপোর্টটা নিয়ে নেয়। সেদিন সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনি।’

আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘দীর্ঘদিনের চিকিৎসার অভিজ্ঞতাই আমাকে ধীরে ধীরে মানসিকভাবে শক্ত করে তোলে। আমি যখন চিকিৎসকের কাছে যেতাম দেখতাম, দুই-তিন বছরের শিশুরাও কেমো নিতে এসেছে। তখন মনে হতো, আমি তো জীবনের ১৭ বছর দেখেছি। এই বাচ্চাগুলো তো মাত্র দুই-তিন বছর বয়সে এমন লড়াই করছে। এসব দেখতে দেখতে আমি অনেক শক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, অসুস্থতার কারণে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কীভাবে পরবর্তী সময়ে তাঁকে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে নিয়ে যায়?

জবাবে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘হিমোগ্লোবিনের আয়ু যেখানে সাধারণভাবে প্রায় ১২০ দিন, আমার ক্ষেত্রে সেটা ছিল প্রায় ২১ দিন। ২১ দিন পরপর রক্ত লাগত। নিয়মিত রক্ত নেওয়ার ফলে চোখে ঝাপসা দেখাসহ নানা শারীরিক সমস্যার দেখা দিতে শুরু করে। তাই পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায় আমার। ঠিক সেই সময় নানা বিষয় শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। আমি বাবাকে বলেছিলাম, “আমি যখন কিছুই করতে পারছি না, তখন ব্লক-বাটিক শিখি। যুব উন্নয়ন থেকে এটা শিখতে চাই।” কিন্তু আব্বু আমাকে যেতে দিতে চাইতেন না। একদিন রাগ করে তাঁর সঙ্গে খুব খারাপ আচরণও করেছিলাম।’

আফরোজা সুলতানা আরও বলেন, ‘ব্লক-বাটিক শেখার সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে আমার উদ্যোক্তা হওয়ার পথ তৈরি করে। বিয়ের পর প্রথম ঈদে শ্বশুরবাড়ির জন্য কুশন কভার ও সোফা ম্যাট তৈরি করেছিলাম। জিনিসগুলো খুব সুন্দর হয়েছিল। তখন পর্যন্ত আমি কাউকে একই ব্লকের মধ্যে দুই রঙের এমনভাবে কাজ করতে দেখিনি।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, চিকিৎসার সেই সময়ের অভিজ্ঞতা কীভাবে আপনাকে নতুন করে কিছু শুরু করার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল?

উত্তরে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে যাওয়া, থেরাপি, ইনজেকশন, কেমো—অনেক কিছুই আমি একা করেছি। একদিন আলট্রাসনোগ্রাফির সময় একজন চিকিৎসক আরেকজনকে বলছিলেন, আমার ক্রনিক লিভার সিরোসিস হতে পারে। তখন আমি ঠিক করি, দেশে ফিরে আর বসে থাকব না। অনেক সময় তো শুয়ে-বসে কেটে গেছে। এবার কিছু একটা শুরু করব।’

এরপর নিজের মেয়ের নামে গড়ে তোলেন যারীন’স ক্রিয়েশন। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ছিল প্রাকৃতিক রং এবং দেশীয় কাপড়। এ পথ বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বুটিকের প্রতি আমার একটা আগ্রহ ছিল। আর প্রাকৃতিক রঙের প্রতিও আলাদা আকর্ষণ ছিল। তাই শুরু করার সময় মনে হয়েছিল, কেমিক্যালের পরিবর্তে প্রাকৃতিক রং নিয়েই কাজ করি।’

প্রাকৃতিক রং ও দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় এবং দেশের বাইরে তাঁর কাজ কীভাবে পৌঁছেছে? এ প্রসঙ্গে আফরোজা সুলতানা বলেন, সুপারি, ডালিমের খোসা, খয়ের—এসব দিয়ে রং তৈরি করা যায়। কিন্তু একই ধরনের কাপড় বা বাটিকের সঙ্গে প্রাকৃতিক রঙের পার্থক্য বোঝানো খুব কঠিন। এখন অনেকেই বাটিকের রং কিছুটা হালকা করে সেটিকে ন্যাচারাল ডাই হিসেবে বিক্রি করেন। ফলে আসল প্রাকৃতিক রং দিয়ে কাজ করা মানুষের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে যায়। মানুষ অনেক সময় দেশীয় পণ্যের দাম দেখেই প্রশ্ন করে, এত দাম কেন? কিন্তু সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, কী ধরনের রং ব্যবহার হয়েছে, সেই বিষয়গুলো বোঝানো কঠিন।

দেশের বাইরে নিজের পণ্য পাঠানোর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘আমেরিকা থেকে একজন আমাকে ফোন করে প্রাকৃতিক রং দিয়ে শাড়ি তৈরি করে দিতে বলেছেন। আবার কেউ ছবি পাঠিয়ে আমার কাছে নির্দিষ্ট ডিজাইনে কাজ করতে বলেছেন। তাঁরা অনেক সময় সরাসরি পণ্য না দেখেও আমার কাজের ওপর আস্থা রাখেন। আমার করা ডাই প্যারিস ফ্যাশন উইকেও গেছে। তবে সেটি আমার নামে যায়নি।’

বাংলাদেশের দেশীয় ফ্যাশনকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে নিজেদের পণ্যের প্রতি আস্থা তৈরি করার বিষয়ে জানতে চান সঞ্চালক।

উত্তরে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, আমরা নিজেরাই মনে করি আমাদের দেশীয় পণ্য ভালো নয়। অথচ দেশীয় কাপড়ের মান অনেক ভালো। আমি নিজে সুতির কাপড় পরি এবং আমাদের দেশের সুতি কাপড়ের ওপর আমার আস্থা আছে।’

এ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে বাংলাদেশের দেশীয় ঐতিহ্য ও নিজস্ব পরিচয়কে কীভাবে তুলে ধরতে চান এবং নিজের কাজের ক্ষেত্রে অন্যের নকশা অনুসরণ না করে কীভাবে ডিজাইন করেন?

আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘দেশীয় ফ্যাশনের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করি। একটি মেলায় স্টল নিতে অনেক টাকা খরচ হয়। কিন্তু অল্প কিছু পণ্য নিয়ে গেলে সেগুলো হয়তো সবার পছন্দের না–ও হতে পারে। ফলে শুধু মেলায় অংশ নিলেই হবে না, সেখানে কীভাবে নিজের ব্র্যান্ডটি তুলে ধরা যায়, সেটা জানাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি কখনো কে কী পরল, কে কী দেখল, সেটা দেখে কাজ করি না। আমার নিজের চোখে যেটা সুন্দর লাগে, যেটা তৈরি করতে ইচ্ছা করে, আমি সেটাই করি। ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে আমার পড়াশোনা নেই। তাই নিজেকে ডিজাইনার বলি না। আমি নিজের চিন্তা ও বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ডিজাইন করি।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে নিজের প্রতিষ্ঠানের বিশেষত্ব তুলে ধরে আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘যারীন’স ক্রিয়েশনের কোনো পণ্য নিয়ে আজ পর্যন্ত অনলাইনে বা অফলাইনে কোনো অভিযোগ পাইনি। কোনো পণ্য ফেরত আসেনি, এক্সচেঞ্জও হয়নি। আমাদের পণ্য সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রং দিয়ে তৈরি এবং দেশীয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, একটি ডিজাইন একবারই তৈরি করি। একই ডিজাইনের দ্বিতীয় কপি করি না।’

Read full story at source