শুধু টাকা দিলেই হবে না, খেলোয়াড়দের প্রতিভা, ভালো কোচ ও সংগঠক থাকতে হবে

· Prothom Alo

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় এবারের পর্বে অতিথি ক্রীড়াব্যক্তিত্ব বশীর আহমেদ। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের জন্ম, শৈশব, বেড়ে ওঠা ও খেলাধুলায় আজীবন জড়িয়ে যাওয়াসহ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমরা এসেছি বাংলাদেশের অগ্রগণ্য ক্রীড়াব্যক্তিত্ব বশীর আহমেদের কাছে। বশীর আহমেদ একই সঙ্গে হকি, ক্রিকেট, ফুটবল—এই তিন খেলায় পারদর্শী ছিলেন, জাতীয় পর্যায়ে খেলেছেন এবং ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বশীর ভাই, আপনাকে স্বাগত জানাই।

Visit afsport.lat for more information.

বশীর আহমেদ: ধন্যবাদ আপনাকে।

এই অনুষ্ঠানে আমরা জীবনের গল্প শুনি। তো বলা হচ্ছে, আপনার জন্ম ১ জানুয়ারি, কিন্তু আপনি বলছেন যে ’৪২-’৪৩ নয়, সম্ভবত আপনার জন্ম ১৯৪১ সালে এবং সেটা ১ জানুয়ারিতে নয়, কোনো একটা জামাই ষষ্ঠীর দিনে। এ নিয়ে একটু খুলে বলবেন?

 বশীর আহমেদ: মায়ের কাছে শুনেছি যে জামাই ষষ্ঠীর দিন। আমাদের চতুর্দিকে জমিদারবাড়ি ছিল, হিন্দু জমিদারি। তাদের গিন্নিরা এসে শুনছে যে আমি জন্মেছি, আমার মায়ের কাছে এসে বলল, দেখি তোমার বাচ্চাটা। তো যাই হোক, দেখার পর বলল, আজ জামাই ষষ্ঠী। ছেলে তো খুব ভাগ্যবান হবে। মানে ওরা আশীর্বাদ করলেন, বললেন, ওর খুবই দুর্দান্ত জীবনকাহিনি হবে।

নিশ্চয় আপনার এই জীবনকাহিনি দুর্দান্ত। তাহলে যেটা বলছেন, জন্ম হলো কি জিঞ্জিরায়?

 বশীর আহমেদ: না।

মাহুতটুলীতে?

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, মাহুতটুলীতেই।

ছোটবেলার মাহুতটুলীর কথা মনে আছে আপনার?

বশীর আহমেদ: অবশ্যই মনে থাকবে। কারণ, জন্মস্থান আমার। আর জন্মই তো আমাকে এত দূর নিয়ে আসছে। মানুষের বেড়ে ওঠা কিংবা খেলাধুলায় জন্মস্থানের পরিবেশ–পারিপার্শ্বিকতার ওপর নির্ভর করে। আমারও তা–ই। প্রকটভাবে এটা লক্ষ করেছি যে মাহুতটুলীতে আমার জন্ম হওয়ায় এবং আমার স্কুল কাছে হওয়ায় খেলাধুলায় আমি অগ্রগামী ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি কাকডাকা ভোরেই উঠে যেতাম, চলে যেতাম মাঠে। আর এতে আমাকে সহযোগিতা করেছেন আমার খালু। ওনাদের ছেলেপিলে ছিল না। উনি আমাকে পিতৃস্নেহে বড় করেছেন। খুব আদর–যত্ন করতেন এবং খেলাধুলার সব সরঞ্জাম উনি এনে দিতেন।

 আচ্ছা। আপনার আব্বার নাম কী? উনি কী করতেন?

বশীর আহমেদ: উনি ব্যবসা করতেন।

ওনার নাম কী?

বশীর আহমেদ: নাসিরুদ্দিন।

 আর আপনার আম্মার নাম?

 বশীর আহমেদ: খাতুননেসা।

 আপনি মাহুতটুলীতে কি ছোটবেলায় হাতি, মাহুত—এগুলো দেখেননি?

বশীর আহমেদ: না, শুনেছি যে ওখানে মাহুত থাকত।

  ওটা মোগল আমল ছিল নিশ্চয়ই?

 বশীর আহমেদ: এটা মোগল আমলের অনেক আগের শুনেছি, আমরা তো দেখিনি। আর ওইখানে মাহুতরা থাকত। আমার তা দেখা হয়নি।

  আরমানিটোলা স্কুল আপনাকে খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করেছে। এ স্কুলে আপনি ভর্তি হলেন ক্লাস থ্রিতে, তাই তো?

বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, ক্লাস থ্রিতে। কারণ, ওটা ক্লাস থ্রি থেকেই আরম্ভ। আর এর জন্য আমার পাশের বাসার শিক্ষাবিদ আ ন ম ফজলুর রশীদ সাহেব ও তার ওয়াইফ হাসমত রশীদ—ওনাদের অবদান ভোলার নয়। তিনিই আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। আর তখন থেকেই স্কুল ও আমার বাড়ি এক হয়ে গেছে। আমি ওইখানেই প্রায় সারা দিন পড়ে থাকতাম। ওই যে পিচঢালা—গেট থেকে স্কুলের বিল্ডিং পর্যন্ত, ওইখানেই খেলে অনেকে হকি প্লেয়ার হয়েছে, ফুটবল প্লেয়ার হয়েছে। আমাদের স্কুল আমাকে অনেক দিয়েছে। মোট কথা ওইটা ভোলার নয়। ছোটবেলা থেকেই কাকডাকা ভোরে আমি চলে যেতাম স্কুলের মাঠে—এক চক্কর, দুই চক্কর, ছোট মাঠ ওটা, হয়তো দেখে থাকবেন, ছোট মাঠ, কিন্তু এক চক্কর, দুই চক্কর, তিন চক্কর—এ রকম ১৫-২০ চক্কর আমি প্রতিদিন দিতাম। এ জন্যই দেখবেন, আমি কোনো দিন ফিল করিনি—মানুষ বলে যে দমের অভাব, আমি কোনো দিন কোনো খেলাতেই দমের অভাব ফিল করিনি। আপনি পেপারে দেখবেন, সব পেপারে লিখছে যে আমার কোনো দমের অভাব হয়নি, আমি দুর্দান্ত খেলেছি।

  হ্যাঁ। ওই সময় মর্নিং নিউজসহ বিভিন্ন পত্রিকায় খেলার অনেক রিপোর্টে আপনার অনেক সুনাম আছে। আচ্ছা, আরমানিটোলার সাথে আরমানির কোনো সম্পর্ক আছে?

বশীর আহমেদ: এটা শুনেছি। আরমানিটোলা স্কুলটা এখানে হইছে, পাশেই একটা বিরাট চার্চ আছে।

 চার্চ আছে, আরমানিয়ান।

 বশীর আহমেদ: ওটা হলো আরমানিটোলায়। স্কুলে চারটা হাউস ছিল, ওখানকার চার্চের লোকেরাই ছিলেন হাউস টিউটর।

আপনার জীবনকাহিনি নিয়ে একটা বই লিখেছেন। ওটায় আমি পড়েছিলাম যে ওই চারটা হাউসের মধ্যে অনেক স্পোর্টস হতো, খেলাধুলা হতো। সেইখান থেকে আপনারা অনেক খেলোয়াড় তৈরি হয়েছেন।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, আমি ওয়েস্ট হাউসে ছিলাম। আমাদের যেমন ন্যাশনাল খেলা হয় হকিটকি, সে রকম আমাদের চারটা হাউসেই হতো।

  চারটা হাউসের মধ্যে নানা ধরনের খেলার প্রতিযোগিতা হতো।

বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, চারটা হাউসেই অনেক নামকরা যেমন মাহমুদর রহমান মমিন, তারপর সালাম ভাই ক্রিকেটার—ওনারা ছিলেন। কিন্তু সব সময় ডমিনেট করছি যাতে আমার হাউসটা চ্যাম্পিয়ন হয়। আর ওখান থেকেই আমরা উঠে আসছি। কম্পিটিশন করার যে একটা মোহ কিংবা কম্পিটিশন করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যে একটা জেদ, ওটা ওইখান থেকেই তৈরি হইছে।

  আপনি আপনার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, একটা স্কুল থেকে অনেক জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় তৈরি হয়েছেন, ক্রিকেট–হকি প্লেয়ার তৈরি হয়েছেন এবং তাঁরা হকিতে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, ১০ জন এ রকম জাতীয় মানের পুরস্কারপ্রাপ্ত খেলোয়াড়  আছেন। সবচেয়ে আগে হলো মাহমুদর রহমান মমিন। তারপর সালাম ভাই, আমি। তারপর আবদুস সাদেক, ইব্রাহিম সাবের, মহসিন। ইব্রাহিম সাবের অবশ্য আমাদের স্কুলের না, পরে ওইখানে থাকত।

 উনি সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের?

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, সেন্ট গ্রেগরি। আর মহসিন, প্রতাপ শংকর হাজরা—আরও এ রকম ১০ জন আছে। …আমরা অনেক দূর পর্যন্ত গেছি এবং আমরা ইস্ট পাকিস্তান টিমেও খেলেছি একসঙ্গেই।

 আপনারা তো একই সঙ্গে ভালো ক্রিকেট খেলেছেন, ভালো ফুটবল খেলেছেন এবং ন্যাশনাল টিমে হকি খেলেছেন। এটা কীভাবে তখন সম্ভব হতো?

 বশীর আহমেদ: আসলে আগেকার খেলা ছিল সিজনাল গেম—এটা একটা। দ্বিতীয় কথা হলো আমি খেলাধুলা ভালোবাসি। যেকোনো খেলাই হোক। এমনকি আমার বন্ধু মানে ক্লাসফ্রেন্ড ছিল সুলতান মাহমুদ। ও মার্বেল খেলত। আমি তাকে বললাম, ‘তোর চাইতে ভালো মার্বেল খেলব আমি দেখ।’

 এই সুলতান মাহমুদ কি পরে বিমানবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন?

বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, বিমানপ্রধান। ও খুব ভালো মার্বেল খেলত স্কুলে।

হ্যাঁ, এটা হয়। যে খেলে, সে ফুটবল, হকি, ক্রিকেট—এই সব শুধু ভালো খেলে তা নয়, মানে সাইক্লিং, সাঁতার, গাছে ওঠা, এমনকি দাবা, লুডু, ক্যারম, এমনকি ব্যাডমিন্টনও ভালো খেলে।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, সেটা হতে পারে। কিন্তু আমি বসে বসে খেলাটা পছন্দ করতাম না।

 বাস্কেটবল খেলেছেন আপনি?

বশীর আহমেদ: বাস্কেটবল আমার স্কুলে ছিল। আমি খেলিনি। কিন্তু ওইটা খেলার সময়ও পাইনি। কারণ, ওই সময়েই আমার অ্যাথলেটিকস হতো। আমি অ্যাথলেটিকসে স্কুল চ্যাম্পিয়ন তিন বছর হয়েছি।

  ও, আপনি তো অ্যাথলেটিকসেও ভালো! অ্যাথলেটিকসে কোন কোন আইটেম করতেন?

 বশীর আহমেদ: সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যে আমি স্কুলের সবগুলো জাম্প, ডিসকাস থ্রো, শটপুট—এগুলো করতাম। তো একবার মনে আছে, এই ইন্টার স্কুলে সবাই মনে করছে আমি চ্যাম্পিয়ন হবো। কিন্তু আমার স্কুলের হেডমাস্টার থেকে আরম্ভ করে গেম টিচার—সবাই আমার সাথে গেছে যে ইন্টার স্কুলে আমি চ্যাম্পিয়ন হব, স্কুলের নাম হবে, স্কুল চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু দেখা গেল যে আমি প্রথমটায় আমি সেকেন্ড, সেকেন্ড আইটেমে সেকেন্ড… থার্ড এটা…এর মধ্যে টিচার যাঁরা গিয়েছিলেন, তাঁরা মন খারাপ করে চলে গেছেন। ফোর্থেরটাতেও আমি সেকেন্ড হলাম। কিন্তু দেখা গেল, (আমার) নম্বর ছিল এত বেশি, সব মিলিয়ে আমি চ্যাম্পিয়ন! তখন আমার বন্ধুবান্ধব আমাকে ঘাড়ে করে নিয়ে খুব হইচই করতে করতে স্যারের বাসায় গেলেন, হেডমাস্টারের বাসায়, ‘স্যার, আমরা স্কুল চ্যাম্পিয়ন হয়েছি’।

 আপনি ম্যাট্রিক পাস করলেন কত সালে?

 বশীর আহমেদ: ’৫৯-এ।

তারপর কোন কলেজ?

বশীর আহমেদ: জগন্নাথ কলেজ।

 তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়?

বশীর আহমেদ: তখন তো সব কলেজই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারে।

  আন্ডারে ছিল, হ্যাঁ।

 বশীর আহমেদ: আমি জগন্নাথ কলেজে পড়লেও খেলছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়েই। কিন্তু পড়িনি ওখানে।

  আর প্রথম আপনি বড় টুর্নামেন্ট কোনটা খেললেন?

বশীর আহমেদ: বড় টুর্নামেন্ট খেললাম যেটা, সেটা হলো আগা খান গোল্ড কাপ।

 ফুটবল?

বশীর আহমেদ: ফুটবল।

  এটা কত সালে?

 বশীর আহমেদ: ১৯৫৯ সালে, আমি তখন ভিক্টোরিয়ায় খেলি। তবে (ওই টুর্নামেন্টে) আমি মোহামেডানের হয়ে খেলি—চ্যাম্পিয়ন হই। এটাই আমার জীবনের প্রথম বড় টুর্নামেন্ট।

 আগা খান গোল্ড কাপে আপনারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন ফুটবল খেলে?

 বশীর আহমেদ: ফুটবলে।

  আর হকি প্রথম বড় টুর্নামেন্ট খেললেন?

 বশীর আহমেদ: মজার ব্যাপার হলো যে আমি তো ক্রিকেট খেলতাম। তখন রমনা গ্রিনে ক্রিকেট হতো। ওখানে খেলে আমরা চলে আসছি ওয়ারী টেন্টে। আগে তো টেন্টগুলা—জানেন কি না জানি না—একটু উঁচু উঁচু হতো। টিনের ওপরে ছাদ আর চারদিকে টিনেরই বেড়া থাকত। তো ওটাকে টেন্ট বলে আরকি। তো আমি ক্রিকেট খেলে আসছি, ওয়ারী টেন্টে বসে আছি। এর মধ্যে বিধু বলে এক হকি প্লেয়ার ছিল, সে ডেন্টিস্ট ছিল। আরামবাগের দিকে বাড়ি। সে এসে সালাম ভাইকে বলতেছে, ‘সালাম ভাই, আমাকে দুই-তিনটা প্লেয়ার দেন না। আমার হকি টিম নামতেছে না।’ তো আমি, আমার ক্লাসফ্রেন্ড গুলবান এবং সাব্বির আছে যে ফুটবলার, তার চাচা… তো এ রকম আমরা তিনজন খেলে আসছি। এর মধ্যে আমরা তিনজনই নেমে গেলাম। তো এই এক দিনেই আমার অভিষেক ধরতে পারেন।

  এটা কোন ক্লাবে?

বশীর আহমেদ: এটা হলো আপনার ব্রাদার্স ইউনিয়ন। ব্রাদার্স ইউনিয়নের কিন্তু হকির টিম ছিল আগে। আমি ওখানে খেলেছি প্রথম।

এটা কত সালের দিকে হবে?

বশীর আহমেদ: এটা ৫৬-৫৭ সালের দিকে হবে।

আপনার ১৫-১৬ বছর বয়স।

বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, তখন একেবারে স্কুলের ছাত্র।

  স্কুলের ছাত্র?

 বশীর আহমেদ: ক্লাস এইট-নাইনে পড়ি আরকি!

এরপর প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে খেললেন কবে? কোনটা? কী খেলা?

 বশীর আহমেদ: পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে  প্রথম খেললাম হকি। সেটা হলো ’৬৭-৬৮–এর দিকে। তো আরও আগে, আমার মনে হয়।

আচ্ছা, আমি বলি। আপনি হকি ভিক্টোরিয়া এসসি খেলেছেন, ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব। আতিকুল্লাহ কাপ ১৯৫৮ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

বশীর আহমেদ: হ্যাঁ।

 পাকিস্তান হকি লিগ খেলেছেন ১৯৬৩-৬৪, ১৯৬৬-৬৭ সোনালী ব্যাংকের হয়ে।

 বশীর আহমেদ: জি।…আচ্ছা, হকিতে একটা জিনিস বলি। হকি আমি ভালোবাসতাম। যে খেলাই খেলছি, আমার কাছে মনে হতো এটাই বোধ হয় আমার খেলা। তো আপনারা দেখবেন, হয়তো যে আমি হকিতে প্রচুর গোল করেছি। আমার ট্রিপল হ্যাট্রিক আছে একটা গেমে। আমি ১৩ গোল করছি একটা টিমের এগেনস্টে। এটা হলো ন্যাশনাল ব্যাংকের হয়ে। আরেকটা হলো আজাদ স্পোর্টিংয়ের এগেনস্টে ডাবল হ্যাট্রিক করছি। তো হকিতে এমন একটা অবস্থা ছিল, আমি ডি-তে ঢুকলে মনে হতো যে আমার মুখস্থ এই জায়গাটা। আমি যেকোনো জায়গা থেকে মারলে অ্যাটলিস্ট পোস্টে যাবে। পোস্টে আমার এমন অবস্থা হয়েছিল যে মারলে পোস্টে যাবেই। এটা গোল হোক কিংবা না হোক। তো এভাবেই আমার ক্যারিয়ারটা এগিয়েছে।

  আপনার স্মৃতিকথার মধ্যে ওই খেলার খুব সুন্দর বর্ণনা আছে। আপনি হকিতে গোল করলেন, পরে আবার একটা স্কোর করলেন। আপনার বইয়ের মধ্যে আছে, যেটা বের হবে ভবিষ্যতে।

 বশীর আহমেদ: আমি ছোট ঘটনাগুলো এক জায়গায় করে একটা বই বের করার চেষ্টা করছি। …

  …১৯৫৯ সালে আপনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে যোগ দিলেন, প্রিন্সিপাল অফিসে।

বশীর আহমেদ: জি।

ক্রীড়াব্যক্তিত্ব বশীর আহমেদ। একই সঙ্গে হকি, ক্রিকেট, ফুটবল—এই তিন খেলায় পারদর্শী ছিলেন তিনি

আর সেটা পরে সোনালী ব্যাংক হয়। আপনি সোনালী ব্যাংক থেকে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে অবসর নেন।

 বশীর আহমেদ: রিটায়ার।

আচ্ছা।

 বশীর আহমেদ: আসলে আমার একটা কথা কি যে আমার জেনারেল ম্যানেজার হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আমার নম্বরটা, আমাদের তো ব্যাংকে হয় কি, যখন ওপরের দিকে যায়, তখন একটা জায়গা খালি হলে আরেকজনের প্রমোশন। আমারও ওই রকম জিএম হিসেবে একটা ইয়ে ছিল। কিন্তু আমি ওই পর্যন্ত যেতে যেতে রিটায়ারমেন্টে চলে আসি।

 আপনি কি পাকিস্তান ন্যাশনাল টিমের হয়ে কোনো খেলা খেলেছেন?

 বশীর আহমেদ: (হকি) খেলেছি ১৯৬২ সালে কেনিয়ার এগেনস্টে। পিআইয়ের হয়ে প্রথম খেলেছি। ওখানে খুবই ভালো খেলেছি। তার পরের দিনই খেলা হয়েছে কেনিয়ার এগেনস্টে পাকিস্তান টিমে।

ওই সময় পাকিস্তান তো হকিতে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন ছিল।

 বশীর আহমেদ: ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন ছিল, জি। এটাই আমার জন্য একটা বড় পাওয় যে আমি হকিতে অ্যাটলিস্ট ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন টিমে খেলেছি। ধরতে গেলে আমার পরে হয়তো সাদেক— ওরা খেলছে, কিন্তু আমি এদের প্রথম পথ দেখিয়েছি।

আর?

 বশীর আহমেদ: আর জুনিয়র টিমে ইব্রাহিম সাবের ওরা খেলেছে।

ওরা খেলছে, আচ্ছা। আর ফুটবল?

 বশীর আহমেদ: ফুটবল আমি ১৯৬৪ সালে অনেক ভালো খেলতেছিলাম। কিন্তু ওই ওখানে হয় কি, আপনারা জানেন যে ওই যে দলগত একটা ইয়ে আছে। প্রভিন্সিয়াল একটা ব্যাপার আছে। আমি তো আমার ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি আমার হাইট, আর আমার এগেনস্টে যারা খেলছে...

  সব ৬ ফুট।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, ৬ ফুটের একেকজন। বুঝছেন? তখন মানে এত বড় বড় পা … ওখানে হয় কি যে আমি যদি চান্স পাই, তাহলে ওদের প্রভিন্সের একজন প্লেয়ার হয়তো বাদ পড়ে যায়। এর জন্য রাফলি খেলে। আমি কয়েকবার চেষ্টা করছি চান্স পাওয়ার, কিন্তু পারা যায়নি।

গাড়ি কিনে মাকে দেখাতে গিয়ে দেখি তিনি সাদা চাদরে ঢাকা

  আপনি ফুটবলে কোন পজিশনে খেলতেন?

 বশীর আহমেদ: আমি রাইট উইং ও লেফট উইংয়ে…

লেফট উইং, রাইট উইং। তার মানে দুই পায়ই ভালো চলে?

বশীর আহমেদ: মোটামুটি আরকি। তো আমি আমার আইকন প্লেয়ার হলো মারিদা অ্যাকচুয়ালি। উনিও খুব ভালো প্লেয়ার ছিলেন। আপনারা হয়তো নাম শুনছেন। উনি পাকিস্তান টিমেও খেলছেন। আরেকজনকে যে আমার খুব ভালো লাগত, উনি গজনবী ভাই।

  গজনবী ভাই, হ্যাঁ।

 বশীর আহমেদ: আর কবির ভাই রাইট উইংয়ে খেলতেন। কিন্তু আমি যখন রাইট উইংয়ে চান্স পেলাম, তখন কবির ভাই রাইট আউটে চলে গেলেন।

আচ্ছা।  বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আপনি ব্রিটিশ ভারত দেখেছেন। ৪৭-এর ইংরেজরা চলে যাচ্ছে—ওগুলো মনে আছে?

 বশীর আহমেদ: সাতচল্লিশ?

  ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হলো। ইংরেজরা চলে গেল, ওই সব ঘটনা মনে আছে?

বশীর আহমেদ: ওইটা খুব একটা মনে নেই। …

আমরা এখন ক্রিকেটে আসি। আপনি কি ব্যাটসম্যান? নাকি বোলার?

 বশীর আহমেদ: স্কুলে থাকতে বোলিং করেছি, এরপর ব্যাটিংও করছি। আমার মনে আছে কামরুজ্জামান হয়তো বলতে পারবে যে আমার ব্যাটিংটা মোটামুটি একটা ভালোই থাকত। আমার জীবনে আমি ৯৬ রান পর্যন্ত করছি। সালাম ভাই, কামরুজ্জামান—এঁদের সঙ্গেই আমি। দৌলতুজ্জামান… এরা আমাদের এগেনস্টে খেলত।

আর অ্যাথলেট হিসেবে আপনি কি ন্যাশনাল পুরস্কার পেয়েছেন?

 বশীর আহমেদ: অ্যাথলেটিকসের ব্যাপারটা হলো ওই যে বললাম, ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি প্লেয়ার তো। অনেক ভালো ভালো অ্যাথলেট ছিল ওই সময় পাকিস্তান টিমে। আমি যেটা করেছি, সেটা একটা ঘটনা। একটা সুন্দর একটা—ওই বললাম খণ্ড খণ্ড ঘটনা। আমি যখন ফুটবল প্র্যাকটিস করছিলাম ইউনিভার্সিটি মাঠে। তো কবির ভাই, আমাদের মোহামেডান ক্লাবের কবির ভাই না, আরেকটা কবির সাহেব, আমাদের ম্যানেজার। উনি এসে বললেন, ‘আপনারে ডাকে।’ কে ডাকে? বলল, ‘গজনবী আপনারে ডাকে।’ গজনবী ভাইরে আমি খুবই শ্রদ্ধা করি, এখন পর্যন্ত করি। মানে মনেপ্রাণে। আমি বললাম, ‘কেন?’ বলল, ‘ওখানে স্টেডিয়ামে আপনারে ডাকে। আমি বলতে পারি না।’ আমি বলি, বলেন, কী জন্য। বলে, ‘না, আমি কইতাম না।’ তো আমি ফুটবল প্র্যাকটিস করছিলাম। ওগুলো ছেড়ে দিয়ে আমি ওই কেডস পরেই চলে গেলাম। এরপর গজনবী বলেন, ‘আমাদের তিনটা প্লেয়ার হয়েছে রিলে রেসে মোহামেডানের। চার নম্বর তুই।’ আমি বললাম, ‘কি? আমি অ্যাথলেটিকস অনেক আগেই ছাইড়া দিছি। বলল, ‘দিয়া দেন একটা দৌড়।’ তখন আমি বললাম, ‘রানিং শু নেই, কিছু নেই, আমি দৌড়াব কেমন করে?’ বলেন, ‘আইচ্ছা দাঁড়া।’ কার থেকে যেন একটা রানিং শু আইনা দিল। এই ধরেন আমি চারজনে আমি, আর্জন খান, সিরাজ ওই অ্যাথলেটিকসের আর আমাদের স্পিকার হলেন যিনি।

মেজর হাফিজ? (স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ)

বশীর আহমেদ: মেজর হাফিজ। এই চারজন আমরা মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হলাম রেকর্ড ব্রেক করে। তো এ রকমই আরকি!

 রিলে রেস করলেন চারজনে মিলে?

 বশীর আহমেদ: চারজনে মিলে।

  ওই সময় আপনারা খেলে টাকাপয়সা পেতেন? পারিশ্রমিক পেতেন?

 বশীর আহমেদ: সবচেয়ে বড় কথা কি আপনাকে বলি, টাকাপয়সা আমার খুব জরুরি ছিল একসময়। কিন্তু খেলাধুলা আমি এত ভালোবাসতাম যে খেলাটাই আমার আসল। আমি একটা ছোট্ট উপমা দিই। আমি যদি ভিক্টোরিয়া ছেড়ে দিতাম, আগে মোহামেডানে চলে আসতাম, তাহলে হয়তো আমি আরও পাঁচ-ছয় হাজার টাকা মোহামেডান থেকে পেতাম। যেহেতু ভিক্টোরিয়ায় আমি খেলাধুলা আরম্ভ করছি, ওই ক্লাব আমি ছাড়তে পারিনি। আমি বলি না, এখানেই থাকো। এ রকম আরকি!

তারপর বাংলাদেশ হয়ে যাওয়ার পরে আপনি কি কোচ হয়ে গেলেন নাকি তারপরেও খেলেছেন?

 বশীর আহমেদ: আমি হকি খেলছি অল্প। সেটা আমার পা ভাঙার পরে। আমার ৫৯ এ ৫৯ না, ৬৭–এ আমার পা ভাঙে খেলতে গিয়ে…

ফুটবল নাকি হকি?

 বশীর আহমেদ: ফুটবল। ফেনীতে ফুটবল খেলতে গিয়ে সেখানে পা ভাঙল। আর খেলতে পারিনি। প্রফেশনাল খেলা ওইখানেই শেষ। কিন্তু হকিটা আমি ব্যাংকের হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেলতাম। লিগ খেলতাম আরকি! ’৭৬ পর্যন্ত খেলছি। তো অনেকের চেয়ে ভালো খেলছি হাফ, সেন্ট্রাল হাফে।

মানে ভাঙা ঠ্যাং নিয়েও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনি অনেকের চেয়ে ভালো খেললেন।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।

১৯৭৮ সালে ব্যাংকক এশিয়ান গেমসে কিছু হয়েছিল?

 বশীর আহমেদ: এশিয়ান গেমসে এটা ’৭৮–এ তো ওই সময় আমরা আমাদের টিম অনেক ভালো টিম ছিল, বাংলাদেশ টিম। তখন তো আবাহনী ও মোহামেডান এই দুটি টিম সব সময়…

যাত্রাপালা দেখে মনে হয়েছিল, অভিনেতারাই পৃথিবীর সর্বশক্তিমান মানুষ

  প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। যেটা আপনারা দেখছেন হয়তো … এরা ইগোটা বেশি পছন্দ করে। এই যে ’৭৮–এ হলো কি যে আপনার … আবাহনীর প্লেয়ার ছিল। মোহামেডান ইগোর জন্য ওদের প্লেয়ার নেয়নি। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল ওরা যখন গেল, তখন টিমটা খেলতেই পারেনি ৭৮–এ। কারণ, রেজিস্ট্রেশন করতে হয় আগে। এক-দুই মাস আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হয়। তখন আর খেলতে পারেনি, ফেরত চলে আসছে সবাই। … এটা ঠিক করেনি আরকি। ওরা খেলার জন্য খেলে না। এরা ওই ইগোটাকেই আগে ধরে, বুঝছেন?

জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার পেয়েছেন আপনি?

বশীর আহমেদ: আমি ১৯৮০–তে পেয়েছি।

 ১৯৮০ সালে?

 বশীর আহমেদ: জি।

  ২০০৮ সালে গ্রামীণফোন-প্রথম আলোর আজীবন সম্মাননা পেলেন? আরও বেশ কিছু পুরস্কার আপনি পেয়েছেন। ১৯৮৫ সালের এশিয়া কাপ হকির কোনো ঘটনা মনে আছে?

বশীর আহমেদ: এশিয়া কাপে হকি, হ্যাঁ।

 ১৯৮৫ সালে।

বশীর আহমেদ: এইটা ’৮৫ সালে এশিয়া কাপে, এটা তো আমাদের এইখানে হয়েছিল এশিয়া কাপ। ওই সময়টা তখন কোচ কেউ ছিল না, বাইরের কেউ ছিল না। তখন বাধ্য হয়ে আমরা আমাদের ওই যে দ্বন্দ্ব ছিল দুই টিমের তো আমাদের বাদ দেওয়া হলো। তখন বাধ্য হয়ে ফেডারেশন বলে যে না, ওনাদের আনতে হবে। তখন ’৮৫–এ আমি এবং মমিন ভাইকে নেওয়া হলো। আমরা এই তখন এই টিমটাকে অর্গানাইজ করার পরে এই টিমটা খেলল। মোটামুটি একটা সেফে খেলছে।

 হ্যাঁ, আপনি তো অলিম্পিকের মহাসচিব ছিলেন, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের?

 বশীর আহমেদ: জি। এইটা একটা ভাগ্যের ব্যাপার, এখানে এই পজিশন পাওয়া। তো এটার জন্য আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল।

 জি।

বশীর আহমেদ: যে কষ্ট মানে এই সবগুলা খেলাকে আমি অলিম্পিকে হলো যে সবগুলোই … আমরা আন্ডারে বলি না, এটা।

  হ্যাঁ, আপনাদের আমব্রেলার নিচে থাকে।

 বশীর আহমেদ: হ্যাঁ। তো এইটা ওই সময়টা খুব সমস্যা ছিল। এই টিম, ওই টিম, এদের প্ল্যান নিতে হবে, ওদের প্ল্যান নিতে হবে। এ রকম আরকি! তো যাহোক, সাদেক হোসেন খোকা এবং এরা আমাকে সাপোর্ট করল। আর আমি অলিম্পিকের সেক্রেটারি জেনারেল হলাম আরকি!

 এত দিন বাংলাদেশের মানে তিন যুগের খেলাধুলা দেখলেন। এখন তো বাংলাদেশ ক্রিকেটটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলে, ফুটবলটা সাফ পর্যায়ে খেলে, মেয়েদের ফুটবলও সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়। কিন্তু সব মিলিয়ে ওই সময় তো পাকিস্তান হকিতে চ্যাম্পিয়ন হতো। বা আমাদের এই যে অ্যাথলেট এসব নিয়ে আগে স্কুল-কলেজে, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সবাই সিরিয়াসলি অংশগ্রহণ করত। এখন কি দেখেন বাংলাদেশটা?

 বশীর আহমেদ: বাংলাদেশে বিশেষ করে এখন আমি দুটি খেলা খুব বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখি। একটা হলো হকি, একটা ফুটবল। হকিটা হলো কি যে এখনো অনেক আগাতে হবে।…তবে খেলাধুলা যদি করতে হয়, ইনডিভিজ্যুয়াল ব্রিলিয়ান্সির দরকার। প্রত্যেকটা মানুষের ক্রীড়ানৈপুণ্যের দরকার, প্রত্যেকটা প্লেয়ারের। যত দিন পর্যন্ত এইটা না হবে, আমরা… ব্রিলিয়ান্সি হলো আপনার একটা প্লেয়ার একটা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আপনি দেখেন, আপনি পেলেকে দেখেন, তারপর ম্যারাডোনা দেখেন, এখন মেসি দেখেন। আমাদের এখানেও এ রকম যে দু–একজন নাই, তা না। আমাদের এখানে সাকিব আল হাসান ছিল আগে, তারপর মোস্তাফিজুর রহমান কাটার (বল করে) যে, এদেরকে আমরা সেভাবে গ্রোআপ করতে পারিনি। কিন্তু খেলাধুলা চালাতে গেলে প্রথমে দরকার অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা যদি না থাকে, আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তারপর ট্রেনিং। তারপর ফেডারেশন— এগুলো দরকার। কিন্তু আমাদের যে সীমিত সম্পদ, এটা দিয়ে হয়তো কিছু দূর যাওয়া যেতে পারে। এটার মধ্যেই আমাদেরকে প্ল্যানিং করতে হবে। আমরা যে কোটি কোটি টাকা দিয়ে দিলাম, মনে করলাম চ্যাম্পিয়ন হবো। কিন্তু এতে কিন্তু লাভ হচ্ছে না।  কারণ, ব্রিলিয়ান্সি নেই…আপনি দেখেন, একটা ছেলে নেই। হকিতে দেখেন আগে যে রকম জুম্মন লুসাই,… এরা ছিল।…তো এই রকম ইনডিভিজ্যুয়াল ব্রিলিয়ান্সি দরকার।

 বাংলাদেশের এই ক্রীড়াজগৎ ধরেন ’৫০ সাল থেকে ৭৬ বছরে আপনার সবচাইতে প্রিয় ব্যক্তিত্ব কে?

 বশীর আহমেদ: মানে ক্রীড়াঙ্গনে না খেলোয়াড়?

সেসব সুন্দর দিন আমাদের আসবে, সেটা দেখেই মরতে চাই

 ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব কে?

 বশীর আহমেদ: আমার অনেকেই আছে। এখন বললাম আপনাকে যে মারিদাকে আমি আইকন প্লেয়ার হিসেবেই মনে করি। ব্যক্তিত্ব যদি বলেন, তাহলে অনেকে আছে যেমন ভিক্টোরিয়ায় ছিল অনেকেই, রেজা ভাই।

রেজা ভাইয়ের পুরো নাম মনে আছে?

 বশীর আহমেদ: রেজা ভাই ভুলে গেছি আমি।

  আচ্ছা।

বশীর আহমেদ: রেজা ভাই, শামসুদ্দিন সাহেব, কচি ভাই এঁরা ছিলেন। এঁরা আসলে এখন যে রকম আমরা ক্লাবে খেলি পয়সার জন্য, তখন কিন্তু এঁরা পয়সা দিয়ে ক্লাব করতেন। কিন্তু এখন অন্য রকম হয়ে গেছে।

আর আপনার খেলোয়াড় বলেন তাহলে, প্রিয় খেলোয়াড় কে?

 বশীর আহমেদ: ওই যে একই মারিদা বললাম। মারিদা, গজনবী ভাই এঁরা। আর মোহামেডানের দেখেন, মইনুল ইসলাম সাহেবের মতো মানুষ হয় না। সেই কুমিল্লার লোক হয়ে সমস্ত প্লেয়ারকে চাকরি দেওয়া, এটা করা, কত কিছু করেছেন। তাই না? তো এ জন্য বললাম যে ওই রকম ব্যক্তিত্ব নেই। এখন সবাই নিজের নাম করার জন্যই আসে কিংবা এখান থেকে কীভাবে কী করা যায় ওইটাই।

আর আগে যে আরমানিটোলা স্কুল এতগুলো খেলোয়াড় তৈরি করল, এখন কি স্কুলগুলো খেলোয়াড় তৈরি করে?

 বশীর আহমেদ: খুব কম। ওখানে সেই বললাম যে টাকাপয়সার প্রয়োজন হয় একটা। ওখানে আমরা যারা আছি, ওখানে খেলাধুলা হয়, কোচ নেই ওখানে। এখন ছিল কিছুদিন আগে মারা গেল ছেলেটা, ফজলু। ও চেষ্টা করত। আর এখন খুব কম ছেলেপেলে আসে। এখন সব পয়সার দিকে ঝুঁকে গেছে, ক্লাবে চলে যায়। ওইখানে খুব কম আসে।

  তাহলে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে সার্বিকভাবে বা কোনো একটা নির্দিষ্ট খেলায় ভালো করার জন্য কী করা উচিত? এটি আমাদের শেষ প্রশ্ন।

বশীর আহমেদ: ভালো দেশ করার জন্য আপনাকে প্রথমেই বললাম যে একটা খেলায় উন্নতি করতে গেলে সেটাকে লালন-পালন করতে হয়। শুধু টাকা দিলেই হবে না। সেটার ভালো কোচ থাকতে হবে, ভালো অর্গানাইজার থাকতে হবে। যারা মনেপ্রাণে ভালোবাসে, যেটা বললাম আগে, আগেকার অর্গানাইজাররা। সেই রকম থাকতে হবে। এখন তো আমি ওই রকম দেখি না। এখন খুব কম দেখি। আগের মতো মন উজাড় করে খেলাধুলার জন্য করে। নূর হোসেন স্যার দেখেন, আমরা আমরা স্যার বলি। কিন্তু ওনাকে দেখেন, তাঁর জীবনটাই খেলাধুলার জন্য গেছে। সোনালী অতীত ক্লাব করছেন উনি। তারপর ভিক্টোরিয়ায় উনি ছিলেন। এসব লোকের অভাব এখন অনেক। এসব লোকের আসতে হবে।

বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কখনো ভুল করে না

 আপনি কি গান শোনেন?

বশীর আহমেদ: শুনি। একসময় তো সারারাত সিনেমা দেখতাম। এই একটাই শখ আমার গান শোনা, খেলাধুলা। আমার ওই যে বললাম আমার খালু যে আমাকে পিতৃস্নেহ করছেন, খেলাধুলার সরঞ্জাম এনে দিতেন। তিনি যদিও মানে বাঙালি না, উনি দিল্লির। তো ওনার খুব শখ ছিল মানে আমাকে মানুষ করার জন্য গানবাজনা, খেলাধুলা সবকিছুর জন্য। ওনার থরে থরে ছিল কবিতার বই, গানের বই ছিল। তো ওগুলা দেখে দেখেই আমি মানুষ। আমার জীবনটা অ্যাকচুয়ালি দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। একটা হলো পাড়ার বখাটে ছেলেদের সঙ্গেও মিশতে হতো। আবার এদিকে আরমানিটোলা স্কুলে ভদ্র ছেলেদের সঙ্গে মিশতে হতো। এতে আমার দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। তো ওদের সঙ্গেও কিছুটা (সম্পর্ক) রাখতাম, এদের সঙ্গেও… মনে করতাম যে এটাই তো আমার আসল… এই আরমানিটোলা স্কুল। এই স্কুল আমাকে অনেক দিয়েছে আসলে।

 তো আপনি ব্রিটিশ ভারত পরাধীন ওই দেশ দেখেছেন, পাকিস্তান আমল দেখলেন, বাংলাদেশেরও তো ৫৫ বছর হয়ে গেল। দেশটা কি এগোচ্ছে নাকি পেছাচ্ছে?

বশীর আহমেদ: খেলাধুলা তো কমপ্লিট চেঞ্জ হয়ে গেছে। যেমন হকি আগে দেখতাম আমরা যে পাকিস্তান যখন পাকিস্তান-ইন্ডিয়া খেলা দেখলে মনটা ভরে যেত। মনে হতো যে একটা পাখি যাচ্ছে উড়ে। মানে রাইট ইন রাইট আউট, এ রকম লেফট ইন লেফট আউট এ রকম পাশ দিয়ে যাচ্ছে। ও যখন অ্যাটাক আটকিয়ে দিত, আবার এদিক দিয়া আসতো। দেখতে খুব সুন্দর লাগত। এখন তো ধরে আর আন্ডারস্টিং। ওইখান দিয়ে আগে তো এটা ছিল না। আগে এটাও ছিল না যে একজনের পরিবর্তে আরেকজন খেলবে। বুঝছেন? আগে তো যে প্লেয়ার খেলতে আরম্ভ করবে, সেই শেষ করবে। তো এ জন্য বললাম এখন চেঞ্জ হয়ে গেছে। এখন অনেক ফাস্ট হয়ে গেছে ক্রিকেট খেলা, হকি খেলা। ফুটবল খেলাও একই রকম।

জহির রায়হান সিঁড়ির অর্ধেক পর্যন্ত নেমে আবার উঠে এলেন, এরপর সেই যে বেরিয়ে গেলেন, আর ফিরলেন না

আবার এটা তো খেলাধুলার ক্ষেত্রে বললেন। ধরেন ঢাকা শহরটা। মাহুতটুলী ছিল আপনার, আরমানিটোলা, পুরান ঢাকা। তারপর স্টেডিয়াম হলো। আস্তে আস্তে ঢাকাটা এদিকে এগোচ্ছে, পল্টন হলো। ধানমন্ডি তো তখন ছিল না, ধানখেত ছিল। এই যে এখন আমরা যেসব জায়গায় আছি শ্যামলী, এসব জায়গাও ছিল না। আমরা আমরা বলতাম যে ঢাকা শহরের চৌহদ্দি হলো আপনার চকবাজার থেকে সদরঘাট, সদরঘাট থেকে রেলওয়ে স্টেশন ফুলবাড়িয়া, গুলিস্তান। গুলিস্তান তখনো তো হয়নি। আমাদের সামনেই গুলিস্তান হয়েছে। আর এইটুকুই আমাদের জায়গা ছিল। এই ঢাকা শহর। আর ঘোড়ার গাড়ি ছিল আমাদের। মোটামুটি ঘোড়ার গাড়ি আর রিকশা। যাওয়া–আসা। সেই ঢাকাটা এখন এত বড় বড় বিল্ডিং, এত গলি।

বশীর আহমেদ: আগে সাত কোটি লোক ছিল, এখন ১৮ কোটি লোক।

 হ্যাঁ। ’৭১ সালে সাড়ে সাত কোটি লোক, এখন হয়ে গেছে ১৮-১৯ কোটি, হ্যাঁ। তো সব মিলিয়ে আশা দেখেন নাকি হতাশা দেখেন?

বশীর আহমেদ: আশাই তো মানুষের জীবন। আশা আছে বলেই তো আমরা আছি। অতীত আছে বলেই তো ভবিষ্যৎ। তাই না?

  খুব সুন্দর বললেন। সুধী দর্শকমণ্ডলী, আমরা এই কথা দিয়ে শেষ করি যে আশা আছে তাই জীবন আছে, অতীতও আমাদের সম্পদ তা আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা এতক্ষণ একই সঙ্গে ফুটবলার, ক্রিকেটার, হকি খেলোয়াড় এবং অ্যাথলেট, সংগঠক ও কোচ বশীর আহমেদের কথা শুনলাম। আমরা অনেক উপকৃত হব নিশ্চয়ই। এই অভিজ্ঞতা আমাদেরকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ আপনাকে।

বশীর আহমেদ: ধন্যবাদ আপনাকে।

Read full story at source