বানরুটির মূল্যবৃদ্ধি সরকারকে কি কোনো বার্তা দেয়

· Prothom Alo

খবর দুটি কাছাকাছি সময়ের। একটি খবর রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত। কোনো কোনো গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ। বলা হয়েছে, এই ‘বেতন বৃদ্ধির লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে আয় যৌক্তিক করা।’ নিশ্চয়ই সেটা দরকার আছে। আরেকটি খবর, দেশে বানরুটির দাম বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ঊর্ধ্বমুখী খরচের আঁচ প্রজাতন্ত্রের সবার ঘরে লাগে। বহু বছর ধরে দেশে ৮-৯ শতাংশের বেশি হারে মূল্যস্ফীতি ঘটছে। এ ‘আগুন’ ধনী-গরিব মানে না। তবে অল্প আয়ের শ্রমজীবীদের অবস্থা নিশ্চিতভাবে বেশি করুণ। বানরুটির দাম বাড়া নিচুতলার জন্য তুষের আগুনে ধোঁয়ার মতো।

Visit umafrika.club for more information.

রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা নিশ্চয়ই জানেন, শিল্পের ১৭টি খাতে পুরোনো মজুরিকাঠামো বদলের দিনক্ষণ পার হয়ে গেছে। আরও তিনটি খাতে নতুন মজুরিকাঠামো ঘোষণার সময় হবে জানুয়ারিতে। তার মানে এ মুহূর্তে ২০টি খাতের শ্রমজীবীদের জন্য বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নতুন মজুরিকাঠামো দরকার। এটা কোনো নতুন দাবি নয়। শ্রম আইনের নির্ধারিত সময়সীমার আলোকেই এ মুহূর্তে ওই ২০ খাতের শ্রমজীবীরা পুরোনো মজুরি হারে টাকা পাচ্ছেন। যেহেতু বছরে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট হয় এবং মূল্যস্ফীতি ৮-৯ শতাংশের বেশি—সে কারণে ইতিমধ্যে এই শ্রমিকদের ‘প্রকৃত মজুরি’ অনেক কমে গেছে। প্রতি মাসে মজুরি কমতে থাকা এই মানুষদের জীবনের গল্পগুলো আমরা কতটা জানি?

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দিলে আমাদের কী হবে

পুরোনো মজুরিকাঠামোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও সরকারি তরফ থেকে সেসব পর্যালোচনায় বিলম্বের কারণে অনেক খাতে অস্থিরতা চলছে। চা–বাগানগুলোতে শ্রমিকেরা আন্দোলন করছেন। অন্যান্য খাতেও চরম অসন্তোষ চলছে—যদিও সব জায়গায় শ্রমজীবীদের সংগঠিত হয়ে কথা বলার সুযোগ কম।

যেসব খাতে প্রচলিত শ্রম আইনের আলোকে নতুন মজুরিকাঠামোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো একেবারে নিচুতলার কর্মক্ষেত্র। এই তালিকায় আছে রাইস মিল, স মিল, বিড়িশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, নিরাপত্তা সার্ভিস কর্মী ইত্যাদি। ডিসেম্বর নাগাদ তৈরি পোশাক খাতের শ্রমজীবীদের মজুরিকাঠামোরও মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ওপরে উল্লেখিত ২০টি খাতে এমনও কর্মক্ষেত্র আছে, যেখানে মজুরি ৬-৭ বছর আগে নির্ধারিত। যেমন অ্যালুমিনিয়াম খাতে সর্বশেষ মজুরি ঠিক হয় ২০১৮ সালে। রাইস মিলগুলোতে মজুরি নির্ধারিত হয় ২০২০ সালে। মাঝের বছরগুলোর মূল্যস্ফীতি ও ইনক্রিমেন্টের ফারাক আমলে নিলে এসব খাতে ‘প্রকৃত মজুরি’ হয়তো অর্ধেকমতো আছে।

দেশ গঠনে শ্রমজীবী-পেশাজীবীরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নন। সবার মিলিত শ্রমে দেশ এগোবে। আর এ–ও নির্মম বাস্তবতা, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে, তাতে পেশাগত বঞ্চনা, মজুরিবৈষম্য, পদ-পেশার উঁচু-নিচু ব্যবধান ইত্যাদি থাকবে। কিন্তু অত্যধিক কাঠামোগত ব্যবধান সামাজিক শান্তির জন্য বিপজ্জনক।

আগে শ্রমিকদের মজুরি বাড়ত পাঁচ বছর পর। নতুন শ্রম আইনে বিধান (ধারা ১৩৯-চ) করা হয়েছে, তিন বছর পর মজুরিকাঠামো পরিবর্তন হবে। মালিকেরা বলছেন, নতুন আইন এখনই কার্যকর হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বর্তমান মজুরিকাঠামোগুলো ঘোষিত হয়েছে পুরোনো আইনের আমলে। শ্রমিক সংগঠকেরা এ রকম ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করছেন। তাঁদের মতে, কোনো আইন যখন সংশোধন হয়, তখন তাৎক্ষণিক সেটা কার্যকর হয়, যদি নতুন আইনে অন্য রকম কিছু বলা না থাকে।

শ্রম অর্থনীতিবিদদের বিবেচনায় কেবল আইনগত বিবেচনাতেই নয়, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের স্বার্থেও শ্রম খাতের পুরোনো মজুরিকাঠামোগুলো সংশোধন হওয়া দরকার। অনেক খাতের শ্রমিকদের গড় মজুরি সরকারি কর্মচারীদের সর্বনিম্ন গ্রেডের বর্তমান বেতনের চেয়ে বহুগুণ কম। অথচ এ রকম সবাইকে একই বাজারে বাঁচতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের নতুন পে স্কেলে সবচেয়ে নিচের গ্রেডে মূল প্রারম্ভিক বেতন ২০ হাজার টাকা। আর একজন চা–শ্রমিকের মাসিক বেতন ৬ হাজারের কম। এই বাগিচাশ্রমিকেরা এমনকি ভবিষ্যৎ মজুরির দাবিও করছেন রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের ২০তম গ্রেডের বেতনের চেয়ে বহু কম।

শ্রমজীবীরা কম দাবি করলেও বা সামাজিক বাস্তবতার কারণে কম দাবি করতে বাধ্য হলেও একটি দেশে এ রকম কাঠামোগত ব্যবধান বিপজ্জনক। এ রকম ব্যবধান গভীর বোবাক্ষোভ তৈরি করে, যার প্রকাশ কী সহিংস চেহারা নেয়, সেটা ২৬ মাস আগে দেখেছে বাংলাদেশ।

তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতনকাঠামোতে মাসিক নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। রাষ্ট্রীয় পে স্কেল প্রণয়নকারীরা যদি সরকারি দপ্তরগুলোর একদম নিচু গ্রেডের কর্মচারীর শোভন জীবনযাপনের জন্য ২০ হাজার টাকা প্রারম্ভিক মূল বেতনকে ন্যূনতম মানদণ্ড ভেবে থাকেন, তাহলে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি একটা কাঠামোগত বঞ্চনা নির্দেশ করে। এই দুই পাশের মানুষদের কারও অবদান কি দেশের জন্য কম?

কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রমিক খাত নয়, অনানুষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জীবন এ পর্যায়ে সরকারের জরুরি মনোযোগ দাবি করছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কর্মচারী মাত্র কয়েক লাখ। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া তথ্যমতে সেটা ১৪ লাখ ৬৫ হাজার।

জ্বালানিসংকটে অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখার পথ কী

অথচ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক কয়েক কোটি। জাতীয় জিডিপি, প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি—সবকিছুতে সম্মিলিত হিস্যা তাঁদের বেশি। তাঁদের সুরম্য অফিস কিংবা তোয়ালে দেওয়া চেয়ার নেই বলে সেই অবদান দেখি না আমরা। নাগরিক জীবনের ছন্দ টিকিয়ে রেখেছেন যে গৃহশ্রমিকেরা বা কৃষি অর্থনীতি টিকে আছে যে খেতমজুরদের শ্রমে, তাঁদের মজুরির মানদণ্ড বিষয়ে সরকার কিছু ভাবছে কি?

দেশ গঠনে শ্রমজীবী-পেশাজীবীরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী নন। সবার মিলিত শ্রমে দেশ এগোবে। আর এ–ও নির্মম বাস্তবতা, যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে, তাতে পেশাগত বঞ্চনা, মজুরিবৈষম্য, পদ-পেশার উঁচু-নিচু ব্যবধান ইত্যাদি থাকবে। কিন্তু অত্যধিক কাঠামোগত ব্যবধান সামাজিক শান্তির জন্য বিপজ্জনক।

প্রশ্ন উঠতে পারে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের মজুরির বিষয়ে সরকার কী করতে পারে? এ ক্ষেত্রে ন্যায়ানুগ পদক্ষেপ হলো যুক্তিসংগত হারে জাতীয় নিম্নতম মজুরি ঠিক করে দেওয়া।

প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের মাঝে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বিশ্বের বহু দেশে, এমনকি দক্ষিণ এশিয়াতেও এ রকম মানদণ্ড আছে। এ রকম মানদণ্ড না থাকায় কোনো গৃহমালিক চাইলেও একজন গৃহকর্মীকে ‘সঠিক মজুরি’ দিতে পারেন না। কিংবা একজন প্রাইভেট কারচালকের মজুরি কত হওয়া দরকার, সে বিষয়ে কোনো জাতীয় ধারণা নেই। এ রকম অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মী এবং তাঁদের নিয়োগকর্তাদের জন্য ভালো সমাধান জাতীয় ন্যূনতম মজুরি এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর সেটা হালনাগাদ করা।

বাংলাদেশ সংবিধান বলেছে, জনগণের সবার জন্য সুযোগের সমতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ এবং প্রজাতন্ত্রের সব স্তরে সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ‘রাষ্ট্রের কাজ’। সংবিধানের এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ। কিন্তু সেই লক্ষ্যে ন্যূনতম কিছু পদক্ষেপ তো প্রয়োজন।

সরকারের নীতিনির্ধারকেরা পে স্কেলের ব্যাপারে যেভাবে সক্রিয় হয়েছেন, একইভাবে শ্রমজীবীদের মজুরিকাঠামো সংশোধন এবং জাতীয় ন্যূনতম মজুরির প্রশ্নেও ইতিবাচক উদ্যোগ দরকার।

কিছু মানুষের পকেট ভারী করতে গিয়ে জ্বালানিসংকট

বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার প্রাইভেট সেক্টরের মজুরিকাঠামো নির্ধারণ করে দিতে না পারলেও একটা জাতীয় ন্যূনতম মান ঠিক করে দিতে পারে, যার নিচে কাউকে মজুরি দেওয়া যাবে না। এর বাইরে প্রাইভেট সেক্টরে বর্তমানে ওপরে-নিচে বেতনের অবিশ্বাস্য ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এ রকম মজুরি ব্যবধানকে অনেকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিচ্ছেন। কিন্তু এটা ক্ষুদ্র এক সুপার এলিট সমাজ তৈরির পাশাপাশি ঋণগ্রস্ত বিশাল এক নিচুতলার বিস্তার ঘটাচ্ছে। জাতীয় খানা জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৪০ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে ঋণের মাঝে আছে।

ঋণগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, ঋণের অঙ্কও বাড়ছে। বাস্তবতাবিবর্জিত কম মজুরি ঋণগ্রস্ততার বড় এক কারণ। ঋণের তথ্য জরিপে এলেও একদম নিচুতলার হাত পাতার তথ্য আমরা জানি না। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অনেককে পরিবার চালাতে দিশাহারা হয়ে হাত পাততে হয় নানা দিকে। বানরুটির মূল্যবৃদ্ধি মূলত ওই জগতের খবর। এটা ছোট খবর। কিন্তু এতে সবার জন্য বড় বার্তা আছে। সমস্যাটা বেকারির মালিকেরা নন। এর সমাধান বেকারিমালিকদের চাপ দিয়ে হবে না। মজুরিকাঠামো বদলাতে হবে। মজুরি–বঞ্চনা কমাতে হবে।

  • আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source