ভয়ংকর ভিলেনের মুখোমুখি রিচার, শেষ রক্ষা হলো কি
· Prothom Alo

তাঁর নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা নেই। একটি ছোট ব্যাগ, কয়েকটি পোশাক আর সামান্য কিছু টাকা নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়ান। তবে তিনি ঠিক হিমু নন। আগে ছিলেন মিলিটারি পুলিশের মেজর। অবসর নিয়ে বেছে নিয়েছেন ভবঘুরে জীবন। নিজের গাড়ি-বাড়ি নেই, ফোনও সেভাবে ব্যবহার করেন না। এ শহর, ও শহর ঘুরে বেড়ান। মন না টিকলে চড়ে বসেন বাসে, গন্তব্য নতুন শহর। কখনো হিচহাইকিং করেন। তবে তাঁর জীবন নির্বিবাদ নয়, মাঝেমধ্যেই জড়িয়ে পড়েন বড়সড় ঝামেলায়।এসব ঝামেলার পেছনে কখনো থাকে তাঁর ‘অতীত জীবন’। তিনি রিচার, মেজর জ্যাক রিচার। তাঁকে নিয়ে নির্মিত সিরিজ ‘রিচার’-এর চতুর্থ মৌসুমের শেষ পর্ব মুক্তি পেয়েছে ১৬ সেপ্টেম্বর। মুক্তির পরই অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর সিরিজটি বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। অনেকে বলছেন, এটিই ‘রিচার’–এর সেরা মৌসুম। এবার রিচারকে যেভাবে রক্তাক্ত হতে হয়েছে, আগের কোনো কিস্তিতেই এতটা নাকানিচুবানি খেতে হয়নি। কথা মিথ্যা নয়, কিন্তু তাই বলে কি এটিই সেরা মৌসুম?
একনজরেসিরিজ: ‘রিচার ৪’ধরন: অ্যাকশন-ক্রাইমউৎস: ‘গন টুমোরো’, লি চাইল্ডশোরানার: নিক সান্তোরাপরিচালনা: স্যাম হিল ও গ্যারি ফ্লিডারঅভিনয়: অ্যালান রিচসন, সিডেল নোয়েল, ক্রিস্টোফার মার্কেট ও অ্যাগনেজ মোস্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওপর্ব সংখ্যা: ৮রানটাইম: ৩৯-৫৬ মিনিট
নতুন মৌসুমে রিচার (অ্যালান রিচসন) হাজির হন ফিলাডেলফিয়ায়। গভীর রাতে ট্রেনে এক অস্থির নারীকে দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। রিচার ভাবেন, নারীটি আত্মঘাতী হামলাকারী হতে পারেন। রিচার কথা বলে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই নারী ট্রেনেই আত্মহত্যা করেন। ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারত; কিন্তু রিচারের স্বভাবটাই এমন, কোনো অন্যায় বা রহস্য চোখের সামনে ঘটলে তিনি সেটিকে এড়িয়ে যেতে পারেন না।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
নারীটির মৃত্যুর পেছনে কী ছিল, কেন তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রিচার জড়িয়ে পড়েন আরও বড় এক জটিলতায়। একপর্যায়ে সেখানে যুক্ত হয় পুলিশ, সরকারি সংস্থা, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও রাজনৈতিক স্বার্থ। একটি আত্মহত্যার ঘটনা ধীরে ধীরে পরিণত হয় ক্ষমতা, দুর্নীতি, যুদ্ধ ও গোপন ষড়যন্ত্রের গল্পে।
তৃতীয় মৌসুমে রিচারকে অনেকটাই ভিন্ন মেজাজে দেখা গিয়েছিল। সেখানে তিনি একটি প্রাসাদসদৃশ বাড়িতে ছদ্মবেশে ছিলেন; গল্পে ছিল রহস্য, হত্যাকাণ্ড ও স্ল্যাশার-ধাঁচের রোমাঞ্চ। চতুর্থ মৌসুম অবশ্য আবার রিচারের চেনা জগতে ফিরেছে, স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে জোট বেঁধে বড় একটি রহস্যের পেছনে ছোটা। তবে এটিকে নিছক প্রথম মৌসুমের পুনরাবৃত্তি বলা যায় না। বরং আগের মৌসুমগুলোয় তৈরি হওয়া চরিত্রটিকে কিছুটা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা আছে। তৃতীয় মৌসুমের শেষে নিলি (মারিয়া স্টেন) রিচারকে যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন, তারই প্রভাব এবার দেখা যায়।
রিচার কেন সব সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান? কেন এমন মানুষদের পিছু নেন, যাদের তিনি চেনেনও না? উত্তরটা এই সিরিজের দর্শকদের জানা। না জানলেও সমস্যা নেই। কারণ, সেটা জনপ্রিয় ধারার সিনেমা বা সিরিজের খুবই চেনা ট্রোপ—ক্ষমতাবান, দম্ভী মানুষ যখন নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে, নায়ক তাদের ছাড়েন না। রিচারও নয়। চতুর্থ মৌসুমের শুরুতেই সেই নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হন রিচার। একজন নারীকে বাঁচাতে না পারার ব্যর্থতা তাঁকে তাড়া করতে থাকে। আর সেই ব্যর্থতা থেকেই শুরু হয় তাঁর অনুসন্ধান।
‘রিচার ৪’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিচতুর্থ মৌসুমটি লি চাইল্ডের ‘রিচার’ সিরিজের ১৩তম উপন্যাস ‘গন টুমরো’ অবলম্বনে তৈরি। মূল উপন্যাসে নিউইয়র্ক শহর গুরুত্বপূর্ণ হলেও সিরিজে গল্পের কেন্দ্র করা হয়েছে ফিলাডেলফিয়াকে। অভিযোজনের সময় চরিত্র, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক উপাদানেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনের কিছু ইতিবাচক ব্যাপার আছে। আবার কিছু জায়গায় প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
মূল বইয়ের গল্পের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটকে সিরিজ আরও সমকালীন করে তুলেছে। যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অতীতের সামরিক কর্মকাণ্ডের পরিণতি এবার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের উত্থানের সম্পর্কের ইঙ্গিত এনে সিরিজটি আগের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। এই রাজনৈতিক স্তরটিই চতুর্থ মৌসুমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি। রিচার সাধারণত খুব সরল নীতিতে চলেন—অন্যায় করলে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু এবার তাঁকে বুঝতে হচ্ছে, সত্য প্রকাশ করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। সত্যের রাজনৈতিক প্রভাব আছে, ক্ষমতার সমীকরণ আছে, জনমত আছে।
চতুর্থ মৌসুমের শুরুর কয়েকটি পর্ব বেশ শক্তিশালী। ট্রেনে সেই রহস্যময় নারী, তাঁর আত্মহত্যা, রিচারের অপরাধবোধ এবং ধীরে ধীরে আরও বড় ষড়যন্ত্রের আভাস—সব মিলিয়ে গল্প দর্শককে টেনে নেয়। কিন্তু মাঝামাঝি গিয়ে গতি কিছুটা এলোমেলো হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তির দিকে সিরিজের মোড় নেওয়ার ঝুঁকি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি, কিন্তু গল্পের বড় অংশ এত বেশি ব্যাখ্যামূলক যে বারবার রোমাঞ্চ তৈরি হতে হতেও হোঁচট খায়।
‘রিচার’-এর আগের মৌসুমগুলোর বড় শক্তি ছিল রিচারের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা। ছোট একটি সূত্র থেকে বড় রহস্যের দিকে এগিয়ে যেতেন তিনি। এবারও সেটা আছে, কিন্তু আগের মতো ধারালো নয়। অনেক ঘটনা এমনভাবে সামনে আসে, যেখানে রিচারের বুদ্ধির চেয়ে ঘটনাচক্রের ভূমিকা বেশি বলে মনে হয়।
‘রিচার’-এর বড় আকর্ষণ অ্যাকশন। চতুর্থ মৌসুমে সেই জায়গায় কোনো ঘাটতি নেই; বরং সহিংসতার মাত্রা এবার আরও বেড়েছে।
বন্দুকযুদ্ধের বদলে ছুরির লড়াই বেশি এসেছে। আর সেই লড়াইগুলো শুধু দ্রুত কাটে সাজানো নয়; শরীরের ওপর আঘাতের প্রভাবও দেখানো হয়েছে। রক্ত, ক্ষত—সব মিলিয়ে এটি এখন পর্যন্ত সিরিজটির সবচেয়ে সহিংস অ্যাকশন মৌসুমগুলোর একটি। অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর বৈচিত্র্যও প্রশংসার দাবি রাখে। কখনো রিচারকে মনে হয় হাঁটতে থাকা ট্যাংক, আঘাত সহ্য করেও এগিয়ে যাচ্ছেন। কখনো তাঁর বিশাল শরীরই হয়ে উঠছে অস্ত্র। আবার কখনো নিছক শক্তির বদলে বুদ্ধি ব্যবহার করছেন। সবচেয়ে দুর্দান্ত শেষ পর্বের অ্যাকশন, মাঝের দিকে একটু ঝিমানোর মতো ভাব এলেও তখন টান টান হয়ে বসতে হয়। রিচারের শারীরিক শক্তিকে অ্যাকশনের মধ্যে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, নির্মাতারা সেটিও নতুনভাবে দেখিয়েছেন। ফলে প্রচুর অ্যাকশন থাকলেও দৃশ্যগুলো পুরোপুরি একঘেয়ে হয়ে যায়নি।
‘রিচার ৪’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিরিচার চরিত্রের সঙ্গে অ্যালান রিচসনের নাম এতটাই জড়িয়ে গেছে যে এখন তাঁকে বাদ দিয়ে এই সিরিজ কল্পনা করা কঠিন। তাঁর বিশাল শারীরিক গড়ন চরিত্রটির জন্য অবশ্যই বড় সুবিধা। কিন্তু শুধু শরীর দিয়ে রিচারকে বিশ্বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়। দরকার ছিল এমন এক অভিনেতা, যিনি কম কথা বলা, প্রায় নির্লিপ্ত এই চরিত্রটির ভেতরের মানবিকতাও দেখাতে পারেন। রিচসন এবার সেই জায়গাটিই আরও ভালোভাবে ধরেছেন।
আবির্ভাবেই বিশ্বজুড়ে হইচই পড়ে যায়, কে এই রিচারচতুর্থ মৌসুমে নিলি নেই (‘রিচার’-এর চতুর্থ মৌসুমের শেষ পর্ব মুক্তির দিনেই তাঁকে নিয়ে নতুন স্পিন-অফ সিরিজ এসেছে), আছেন স্থানীয় পুলিশের কয়েকজন সদস্য। তামারা গ্রিন চরিত্রে সিডেল নোয়েল ও জ্যাকব মেরিক চরিত্রে ক্রিস্টোফার মার্কেট বেশ ভালো। বিশেষ করে জ্যাকবের চরিত্রটির মধ্যে রিচারের সঙ্গে একটি অদ্ভুত মিল আছে। তিনি নিজের কাছের মানুষকে হারানোর যন্ত্রণা, রাগ ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে লড়ছেন। ফলে এক অর্থে জ্যাকব হয়ে ওঠে রিচারেরই আরেকটি প্রতিচ্ছবি।
এবারের খলনায়ককে আগের মৌসুমগুলোর তুলনায় আলাদা করার চেষ্টা রয়েছে। বিশেষ করে নারী প্রতিপক্ষের উপস্থিতি রিচারের লড়াইয়ের ধরন বদলে দেয়। রিচার যেখানে শারীরিক শক্তিতে এগিয়ে, সেখানে প্রতিপক্ষের হাতে রয়েছে ছুরি এবং মার্শাল আর্টের বিশেষ কৌশল। স্পয়লার হতে পারে, তাই ভিলেন নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো।
চতুর্থ কিস্তি ‘রিচার’-এর সেরা মৌসুম নয়। দারুণ শুরুর পর মাঝপথে সিরিজটি খেই হরায়, শেষের দিকে এসে আবার সামলে নেয়। তবে ‘রিচার’–ভক্তরা এসব নিয়ে থোড়াই কেয়ার করেন। অ্যালান রিচসন চরিত্রটিকে বই পাতা থেকে পর্দায় এতটাই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন যে তাঁর উপস্থিতিই যথেষ্ট। ‘রিচার’–ভক্তদের সিরিজটি হয়তো ইতিমধ্যেই দেখা হয়ে গেছে; আর যাঁরা আগের কোনো কিস্তি দেখেননি, তাঁরাও একবার দেখতেই পারেন। আট পর্বের সিরিজটি এক বসায় দেখার মতোই।
‘রিচার ৪’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি