প্রজ্ঞার উৎপত্তি: ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার হিকমাহ তত্ত্ব
· Prothom Alo

মানুষের জ্ঞান যত বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রজ্ঞা তত বেড়েছে—ইতিহাস এমন সাক্ষ্য দেয় না। অনেক সময় জ্ঞান বেড়েছে, ধ্বংসও বেড়েছে। প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, আবার মানবিকতা সংকুচিত হয়েছে। তথ্যের বিস্তার ঘটেছে, আবার সিদ্ধান্ত হয়েছে আরও বেশি বিভ্রান্ত।
এই বাস্তবতা সওয়াল করে—ইলম ও হিকমাহ কি একই জিনিস? নাকি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মধ্যে এমন একটি দূরত্ব আছে, যা অতিক্রম না করলে মানুষ সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী হতে পারে না? ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা এই প্রশ্নের উত্তরেই হিকমাহর একটি জ্ঞানতত্ত্ব নির্মাণ করে।
Visit esporist.com for more information.
এই দর্শনে প্রজ্ঞা জ্ঞানের পরিমাণ নয়; জ্ঞানের পরিণতি। অনেক তথ্য জানা মানুষকে তথ্যবান করতে পারে, বহু শাস্ত্রে দক্ষতা তাকে বিদ্বান করতে পারে, কিন্তু শুধু সঠিক সম্পর্কের মধ্যে জ্ঞানকে স্থাপন করার ক্ষমতাই তাকে প্রাজ্ঞ করে।
কারণ, ইলম বস্তু, ঘটনা ও ধারণাকে জানতে শেখায়; হিকমাহ শেখায় তাদের যথার্থ স্থান নির্ধারণ করতে। জ্ঞান বলে, কী আছে? প্রজ্ঞা বলে কোনটি কোথায়, কখন এবং কী উদ্দেশ্যে প্রয়োগযোগ্য। ফলে প্রজ্ঞা কোনো অতিরিক্ত জ্ঞান নয়; বরং জ্ঞানের নেজাম।
বীজকে কখন বপন করতে হবে, কতটুকু নিতে হবে, কতটুকু ভবিষ্যতের জন্য হেফাজত করতে হবে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করে কীভাবে তার এস্তেমাল করতে হবে—এই বিচার হিকমাহ।
এই কারণেই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা তথ্য, ইলম এবং হিকমাহকে একই ধারার তিনটি পৃথক স্তর হিসেবে বিবেচনা করে। তথ্য বিচ্ছিন্ন; ইলম তথ্যকে অর্থপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে সংগঠিত করে; কিন্তু হিকমাহ সেই সংগঠিত জ্ঞানকে অস্তিত্বের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে।
একটি বীজ সম্পর্কে উদ্ভিদবিদ্যা আমাদের শেখায় ইলম। কিন্তু সেই বীজকে কখন বপন করতে হবে, কতটুকু নিতে হবে, কতটুকু ভবিষ্যতের জন্য হেফাজত করতে হবে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট না করে কীভাবে তার এস্তেমাল করতে হবে—এই বিচার হিকমাহ। অতএব প্রজ্ঞা হচ্ছে তথ্যের নৈতিক ও অস্তিত্বগত নতিজার বোধ।
হিকমাহর উৎপত্তি শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ বিচ্ছিন্ন বাস্তবতার মধ্যে দেখতে শেখে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক। শিশুর চোখে পৃথিবী বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি। কিন্তু পরিণত বুদ্ধি উপলব্ধি করে যে নদী শুধু নদী নয়, বরং বৃষ্টি, পাহাড়, বন, মাটি, কৃষি, সভ্যতা এবং মানবজীবনের একটি অবিচ্ছিন্ন সিলসিলার অংশ।
জ্ঞান ও ভাষা: ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার ভাষাতত্ত্বএকইভাবে মানুষও শুধু ব্যক্তি নয়; পরিবার, সমাজ, ইতিহাস, প্রকৃতি এবং রবের সঙ্গে তার সম্পর্কের মধ্যেই তার প্রকৃত পরিচয়। প্রজ্ঞা এই আন্তসম্পর্ক দেখার তাওফিক। যে সম্পর্ক দেখতে পারে না, সে অনেক কিছু জানলেও সমগ্রকে বুঝতে পারে না।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মনে করে, হিকমাহর প্রথম উৎস মিজান। কারণ, বিচারশক্তি তখনই সঠিকভাবে কাজ করে, যখন মানুষের অন্তরে ভারসাম্য কায়েম হয়। নফস যদি আকলকে অধীন করে, তবে জ্ঞান হয়ে ওঠে কৌশল।
ক্ষমতা যদি বিচারকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে জ্ঞান পরিণত হয় শাসনের হাতিয়ারে। লোভ যদি দৃষ্টিকে পরিচালিত করে, তখন জ্ঞান হতে থাকে বাজারের পণ্য।
কিন্তু যখন আকল, ক্বালব ও ফিতরাত তাদের যথার্থ সম্পর্কের মধ্যে অবস্থান করে, তখন জ্ঞানের মধ্যে হিকমাহ জন্ম নিতে শুরু করে। অতএব প্রজ্ঞা চিন্তার আগে চরিত্রের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
এইখানে তাজকিয়াহর গুরুত্ব। ইসলামি জ্ঞানপরম্পরায় বাতেনের পরিশুদ্ধি কখনো জ্ঞানচর্চার বাইরের বিষয় নয়। কারণ, হৃদয় যদি অহংকার, হিংসা, লোভ কিংবা আত্মপ্রবঞ্চনায় আচ্ছন্ন থাকে, তবে আকল বাস্তবতাকে বিকৃতভাবে দেখতে শুরু করে।
বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়ম উন্মোচন করবে, দর্শন অর্থ তলব করবে, শরিয়ত নৈতিক মিজান নির্ধারণ করবে, শিল্প সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগ্রত করবে, এমনতরো সমগ্রতাই একটি প্রাজ্ঞ সভ্যতা নির্মাণ করে।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার ভাষায়, হিকমাহ এমন একটি আলো, যা আকলে যেমন জাহির হয়, তেমনি উদ্ভাসিত হয় আখলাকে। তাই প্রজ্ঞা হাসিলের জন্য শুধু অধ্যয়ন যথেষ্ট নয়; আত্মশুদ্ধিও অপরিহার্য। যে নিজেকে সংশোধন করে না, সে সাধারণত নিজের জ্ঞানকেও সংশোধন করতে পারে না।
তবে হিকমাহ স্রেফ আখলাকের নতিজা নয়, এটি দীর্ঘ অভিজ্ঞতারও পরিণতি। মানুষ যখন একই সত্যকে জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ করে, তখন তার জ্ঞান গভীরতা লাভ করে।
যে চিকিৎসক বহু রোগী দেখেছেন, যে বিচারক বহু মানবিক সংকট প্রত্যক্ষ করেছেন, যে কৃষক বহু ঋতুচক্রের পরিবর্তন অনুভব করেছেন, তাঁদের জ্ঞানের মধ্যে এমন এক প্রজ্ঞা জন্ম নেয়, যা শুধু পুস্তক পাঠ থেকে হাসিল হয় না। কারণ, অভিজ্ঞতা স্রেফ তথ্য বাড়ায় না; বরং সে বিচারের সূক্ষ্মতা বাড়ায়।
ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যা মনে করে যে হিকমাহর একটি সভ্যতাগত মাত্রাও আছে। কোনো সভ্যতা তখনই প্রাজ্ঞ হয়, যখন সে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে বিচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতায় না দেখে পারস্পরিক পূর্ণতা বিধানের সম্পর্কে স্থাপন করতে পারে।
বিজ্ঞান প্রকৃতির নিয়ম উন্মোচন করবে, দর্শন অর্থ তলব করবে, শরিয়ত নৈতিক মিজান নির্ধারণ করবে, শিল্প সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগ্রত করবে, এমনতরো সমগ্রতাই একটি প্রাজ্ঞ সভ্যতা নির্মাণ করে। কিন্তু যখন কোনো একটি জ্ঞানশাখা অন্য সব জ্ঞানকে গ্রাস করতে চায়, তখন সভ্যতা দক্ষ হতে পারে, কিন্তু প্রাজ্ঞ হতে পারে না।
মতভেদ ও মতবৈচিত্র্যের জ্ঞানতত্ত্ব: ইখতিলাফের ফিতরাতি দর্শনহিকমাহর আরেকটি লক্ষণ হলো দূরদৃষ্টি। জ্ঞান বর্তমানকে ব্যাখ্যা করতে পারে; প্রজ্ঞা বর্তমানের ভেতরে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও দেখতে পারে। একটি ফয়সালা আজ হয়তো লাভজনক, কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
একটি প্রযুক্তি বর্তমানের সমস্যা হয়তো সমাধান করছে। কিন্তু ভবিষ্যতের পরিবেশ ধ্বংস করতে পারে। একটি রাজনৈতিক সাফল্য তাৎক্ষণিক স্থিতি হয়তো আনল, দীর্ঘ মেয়াদে সে সমাজকে বিভক্ত করতে পারে। প্রজ্ঞা এই সুদূর পরিণতি বিবেচনা করার ক্ষমতা। তাই হিকমাহ সর্বদা বিচার করে সময়ের দীর্ঘ স্রোতে; মুহূর্তের উত্তেজনায় নয়।
এই দর্শনে প্রজ্ঞার সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট্য হলো, সে মানুষকে কর্তৃত্বের দিকে নয়, চালিত করে আমানতের দিকে। জ্ঞান মানুষকে শক্তিশালী করতে পারে; কিন্তু প্রজ্ঞা তাকে দায়িত্বশীল করে।
ইলম যখন সত্যকে জানে, চরিত্র তাকে ধারণ করে, অভিজ্ঞতা তাকে পরিণত করে, ফিতরাত তাকে যাচাই করে এবং ওহি তাকে চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে, তখন হিকমাহ জন্ম নেয়।
জ্ঞান মানুষকে প্রকৃতির ওপর প্রভাব বিস্তারের উপায় শেখায়; হিকমাহ শেখায় সেই প্রভাবের নৈতিক সীমা। জ্ঞান মানুষকে সৃষ্টি ব্যবহারের কৌশল দেয়; হিকমাহ শেখায় সৃষ্টির মর্যাদা রক্ষা করার আদব। ফলে প্রজ্ঞা ছাড়া জ্ঞান আধিপত্য কামনা করে; প্রজ্ঞাসহ জ্ঞান খেলাফত কায়েম করে।
এ জন্য ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যায় হিকমাহকে ইলমের সর্বোচ্চ পরিণতি বলা হয়। ইলম যখন সত্যকে জানে, চরিত্র তাকে ধারণ করে, অভিজ্ঞতা তাকে পরিণত করে, ফিতরাত তাকে যাচাই করে এবং ওহি তাকে চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করে, তখন হিকমাহ জন্ম নেয়।
এই জন্ম দীর্ঘ আত্মগঠন, চিন্তা, তাজকিয়াহ এবং সত্যের প্রতি অবিচল আনুগত্যের ফল।
প্রজ্ঞা জন্ম নেয় মানুষের সমগ্র অস্তিত্বে। আকল তাকে দেয় বিন্যাস, কলবের তাজকিয়া তাকে বানায় স্বচ্ছ, ফিতরাত তাকে দেয় মিজান, অভিজ্ঞতা তাকে করে পরিপক্ব এবং ওহি তাকে চূড়ান্ত অভিমুখ দান করে।
এই সমগ্রতার মধ্যেই হিকমাহর উদ্ভব। আর হিকমাহই ফিতরাতি বাস্তুবিদ্যার সেই শিখর, যেখানে জ্ঞান মানুষ, সমাজ ও কায়েনাতের মধ্যে ন্যায়সংগত সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার জীবন্ত শক্তিতে পরিণত হয়।
জ্ঞান ও আমলের সম্পর্ক: ফিতরাতি বাস্তুতন্ত্রের কর্মতত্ত্ব