ধারদেনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অর্থাভাবে পাঁচ মাস পর ফিরলেন বাড়িতে

· Prothom Alo

গ্রামের সরু পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ একটি টিনশেড ঘর। ঘরের ভেতর ভাঙা চেয়ার-টেবিলে বসে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছেন আলামিন হোসেন (২০)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের এই ছাত্রের এখন থাকার কথা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে। কিন্তু অর্থাভাবে এখন তাঁর ঠিকানা ভাঙা ঘর। ধারদেনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও টাকার অভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাঁর পড়াশোনা।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আলামিনের বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে। বাবা আলেফ আলী পেশায় ভ্যানচালক। আলামিন ছাড়াও দ্বিতীয় স্ত্রী রোকসানা বেগম, বৃদ্ধ মা চন্দনা খাতুন এবং স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়ে ও এক ছেলে আছে।

আলামিন ২০২৩ সালে ডাঁসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে শৈলকুপার কাতলাগাড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। এরপর একটি বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারে বিনা মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নেন। ভর্তি পরীক্ষায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ইউনিটে ২০তম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটে ৫২৬তম হন। স্থানীয়দের সহযোগিতা ও ধারদেনা করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় টাকার কাছে সব স্বপ্ন আটকে যায়।

সোমবার দুপুরে আলামিনদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরে ভালো একটি চেয়ার-টেবিলও নেই। নেই আসবাব ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। আলামিন বলেন, ‘ভর্তির দুই মাস পর হলে উঠেছি। থাকা-খাওয়া আর পড়ার খরচ মাসে পাঁচ–ছয় হাজার টাকা লাগে। বাবা ভ্যান চালিয়ে যা আয় করেন, তা দিয়ে সংসারই চলে না। আমি ঢাকায় টিকতে পারিনি। গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রামে ফিরে এসেছি। বন্ধুরা এখন সেমিস্টার ফাইনালের প্রস্তুতি নিচ্ছে আর আমি বাড়িতে বসে আছি। অথচ কত সংকট মোকাবিলা করে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছিলাম।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলামিন হোসেন

আলামিনের বাবা আলেফ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভ্যান চালাইয়া দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পাই। এই দিয়া সংসার চালাই। ছেলের পড়ার খরচ কীভাবে দেব? ছেলের এই খরচাটা এখন জুলুম হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে। টাকার অভাবে ছেলে ঢাকা থেকে চলে আসছে।’

ছেলে পড়াশোনায় ভালো, বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় এ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে বলে জানালেন আলামিনের সৎমা রোকসানা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই ও পড়ুক। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য নাই।’

আলামিনের জীবনের গল্প আরও করুণ। পারিবারিক অসচ্ছলতা আর ঋণের চাপে ২০২৩ সালে তাঁর মা কাজলী খাতুন আত্মহত্যা করেন। মাকে হারানোর পর পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। গ্রামের মানুষ ও স্বজনদের সহায়তায় তিনি ঘুরে দাঁড়ান। প্রতিবেশীরা বলছেন, আলামিন অত্যন্ত বিনয়ী ও মেধাবী ছেলে।

প্রতিবেশী সাগর আলী বলেন, ‘ঋণের চাপ সইতে না পেরে ওর (আলামিনের) মা আত্মহত্যা করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া চাট্টিখানি কথা না। আমরা চাই সবাই ওর পাশে দাঁড়াক।’ আরেক প্রতিবেশী খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘মা মারা যাওয়ার পরও ছেলেটা হাল ছাড়েনি। এখন টাকার জন্য যদি পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, এটা খুবই দুঃখজনক।’

আবেগাপ্লুত হয়ে আলামিন জানালেন, আগামী রোববার তাঁর পরীক্ষা। এ জন্য ঢাকায় যাবেন। কিছু টাকা সংগ্রহ করেছেন। তবে ভবিষ্যতের দিনগুলো নিয়ে তিনি দিশাহারা।

Read full story at source