ইরানের প্রস্তাব না মেনে ট্রাম্প কি আরও বিপদ বাড়াচ্ছেন

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের দেওয়া যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হয়তো এ মুহূর্তে ট্রাম্প মনে করছেন, তেহরানের শর্ত মেনে নেওয়ার চেয়ে অপেক্ষা করলেই যুক্তরাষ্ট্র বেশি সুবিধা পাবে।

Visit newssport.cv for more information.

গত শনিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি। ইরান চুক্তি করতে চাইছে; কারণ, তারা ভীষণভাবে হেরে যাচ্ছে।’

তবে ইরানের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করলেও তিনি নিজেও একটি চুক্তি করতে চান বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়, আর আমি মনে করি, সেটা ভালো। আমিও একটি চুক্তি করতে চাই। কিন্তু এই চুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না।’

পরদিন রোববার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, তেহরানের দেওয়া প্রস্তাবের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তাঁরা দেখেছেন। যদিও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো ওই প্রস্তাবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব তারা পায়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কঠোর করার পাশাপাশি ইরানের তেল থেকে আয় কমানোর লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপরও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

ইরানের সাত দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তাবের মধ্যে আরও যে সব বিষয় ছিল, সেগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে, ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে, আটকে রাখা প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের ইরানি সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে এবং লেবানন ও ইয়েমেনসহ পুরো অঞ্চলে একটি বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে হবে।

ইরান এরপর হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করবে। তেহরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের সঙ্গে গত জুনে দুই দেশের স্বাক্ষর করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অনেকটাই মিল রয়েছে। চুক্তির শর্ত নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে গত মাসে ওই সমঝোতা ভেস্তে যায়। এর ফলে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বেড়ে যায়, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের এলাকায়। প্রণালিটি কার্যত এখনো ইরানের অবরোধের আওতায় রয়েছে।

ট্রাম্প অপেক্ষা করতে চান কেন

ট্রাম্পের হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি মনে করছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। ইরানের ওপর নৌ অবরোধ কঠোর করার পাশাপাশি ইরানের তেল থেকে আয় কমানোর লক্ষ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দেওয়া হয়েছে।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর উড়োজাহাজ চলাচল–সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে ইরানের ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান

এর কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির একটি অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। তখন তিনি বলেছিলেন, এ অভিযানে বিশ্বজুড়ে তেহরানের আর্থিক স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

ঝুঁকিটা হলো, সময় গড়ালে শুধু ইরানের ওপরই চাপ বাড়বে না। সময় উভয় দিকেই কাজ করে। তাই আরও সময় গড়ানোর অর্থ হবে—জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়া, সামরিক বাহিনীর ওপর ঝুঁকি অব্যাহত থাকা এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চাপ বাড়তে থাকা।

ন্যাটো ডিফেন্স কলেজের জ্যেষ্ঠ অনাবাসিক সহযোগী ফেলো রিচার্ড ওয়েইটজ আল-জাজিরাকে বলেন, হোয়াইট হাউস হয়তো মনে করছে, আরও কিছুটা অপেক্ষা করলে আরও ভালো শর্ত পাওয়া যাবে। ইরানের প্রস্তাবের ধাপগুলো নিয়েও ওয়াশিংটনে উদ্বেগ রয়েছে।

ওয়েইটজ বলেন, ওয়াশিংটন হয়তো হিসাব করছে যে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ ইরান সরকারকে আরও বেশি ছাড় দিতে বাধ্য করবে।

ট্রাম্পকে কি ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে

তবে চুক্তির জন্য অপেক্ষা করা মার্কিন প্রেসিডেন্টের বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি হতে পারে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। কারণ, আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি হেরে যেতে পারে।

আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ মার্কিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, আর ৩১ শতাংশ এতে সমর্থন জানিয়েছেন। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগও আরও বাড়তে পারে।

আগস্টের শেষ দিকে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ মার্কিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, আর ৩১ শতাংশ এতে সমর্থন জানিয়েছেন। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নির্বাচন সামনে রেখে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগও আরও বাড়তে পারে।

ক্রিগ বলেন, ঝুঁকিটা হলো, সময় গড়ালে শুধু ইরানের ওপরই চাপ বাড়বে না। সময় উভয় দিকেই কাজ করে। তাই আরও সময় গড়ানোর অর্থ হবে—জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়া, সামরিক বাহিনীর ওপর ঝুঁকি অব্যাহত থাকা এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর চাপ বাড়তে থাকা।

হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। এসব দেশের অর্থনীতি তাদের জ্বালানি রপ্তানির ওপর অনেকাংশ নির্ভরশীল।

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহামাদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে বলেন, ইরানের এই প্রস্তাবকে ‘ট্রাম্পের দিকে একধরনের প্রলোভন ছুড়ে দেওয়া’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নির্বাচনের আগে তেল ও গ্যাসের দাম কমানোর সম্ভাব্য একটি পথ তৈরি হতে পারে।

তবে ইরান চাইলে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা এবং দেশের ওপর বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপের জন্য ট্রাম্পকে মূল্য দিতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।

মোহামাদ এলমাসরি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘তারা (তেহরান) হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যেহেতু সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, তাই এখনই উত্তেজনা আরও বাড়ানোর সময়।’

ট্রাম্পের আরও অপেক্ষায় কৌশল ‘বুমেরাং’ হতে পারে

ক্রিগ বলেন, ‘বিপদটা হলো, ট্রাম্প ইরানের ওপর তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপকে ইরানের আত্মসমর্পণের ইচ্ছার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন। এই দুটো এক বিষয় নয়।’

মোহামাদ এলমাসরি, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপকতারা (তেহরান) হয়তো সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যেহেতু সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন, তাই এখনই উত্তেজনা আরও বাড়ানোর সময়।

ইরান যে চাপে রয়েছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ক্রিগ বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ ‘ইরানের ওপর প্রভাব ফেলছে’, আর এ কারণেই তেহরানের একটি চুক্তি প্রয়োজন। তবে চাপ আরও বাড়ালেই যে ইরান আরও বেশি ছাড় দেবে, এমনটা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘ধ্বংসাত্মক’ যুদ্ধ করতে ইরান প্রস্তুত আছে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি

জ্বালানির দাম কি আরও বাড়তে পারে

ইরান হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক অবকাঠামো ও বাব আল-মানদেব প্রণালি ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে আরও ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যার ফলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ আরও বাড়াতে পারে।

ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ফলে নৌ পথে বৈশ্বিক বাজারে পণ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এরইমধ্যে সৌদি আরবের জাহাজে নৌ অবরোধের ঘোষণাও দিয়েছে হুতিরা। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর উপসাগরীয় দেশ, বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল বাব আল-মানদেব প্রণালি।

ক্রিগ সতর্ক করে বলেন, ‘তাই (ট্রাম্পের) এই কৌশল হিতে বিপরীত হতে পারে। ট্রাম্প মনে করছেন, ইরানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সময়ের চেয়ে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তেহরান এর ঠিক উল্টোটা মনে করছে। তাদের ধারণা, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের সহ্যসীমার ওপর চাপ তৈরি করবে এবং সেটা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক শাস্তির চেয়ে বেশি চাপের হবে।’

সময় নিয়ে তেহরানের ‘বড় বাজি’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষক হ্যারিসন বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানে তেহরান সম্ভবত ‘একেবারেই অবাক হয়নি’। বরং প্রস্তাবটির একটি উদ্দেশ্য হয়তো-ইরানিদের ও মার্কিন জনগণকে এটা দেখানো যে তারা (তেহরান) এখনো আলোচনায় আগ্রহী।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, তেহরান বুঝতে পারছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার এমন একটি উপায় খুঁজছেন, যেটিকে তিনি বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।

ক্রিগ বলেন, ‘ইরান সময়ের ওপর বড় বাজি ধরেছে। তাদের কৌশল হলো, এমনভাবে চাপ অব্যাহত রাখা, যাতে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প আবার আলোচনার টেবিলে ফিরতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে সময় যত গড়াবে, সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার খরচও যেন বাড়তে থাকে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ৭ দিনের রূপরেখা

ইরানের হিসেব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের হিসাবটা মূলত এমন—ট্রাম্পের কাছে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর এই চুক্তির প্রয়োজন আরও বেশি হয়ে উঠতে পারে। তাই এখনই কম মূল্যে তাঁকে চুক্তিটি দেওয়া উচিত নয়।’

অন্যদিকে হ্যারিসন বলেন, ইরানের এই প্রস্তাব ছিল একটি ‘সদিচ্ছার প্রকাশ’। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে তারা দেশের জনগণ ও মার্কিন জনগণ—উভয় পক্ষকেই দেখিয়েছে যে ইরান আলোচনায় বসতে আগ্রহী।

এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়াই ‘সবচেয়ে সম্ভাব্য ফল’ বলে মনে করেন ক্রিগ।

হ্যারিসন বলেন, ‘দুই পক্ষেরই একটি চুক্তি প্রয়োজন। তবে বর্তমানে উভয় পক্ষই মনে করছে, অপেক্ষা করলে শেষ পর্যন্ত যে চুক্তি হবে, তার শর্ত আরও ভালো হবে।’

ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছি...দারুণভাবে জিতছি: ট্রাম্প

Read full story at source