মায়ের কফিনের পেছনে পাশাপাশি হেঁটেছিলেন, আজ কেন এত দূরে উইলিয়াম-হ্যারি
· Prothom Alo

একই মায়ের দুই সন্তান। শৈশবে একসঙ্গে খেলেছেন। দেখেছেন মা-বাবার বিচ্ছেদ। তারপর হঠাৎ একদিন হারিয়েছেন মাকে। ১৯৯৭ সালের সেই দিনে উইলিয়ামের বয়স ১৫, হ্যারির ১২। পৃথিবীর সামনে তখন তাঁরা রাজপরিবারের দুই কিশোর; কিন্তু ভেতরে তাঁরা মাকে হারানো দুই ভাই। মায়ের কফিনের পেছনে পাশাপাশি হেঁটেছিলেন উইলিয়াম ও হ্যারি। তিন দশক পর সেই দুই ভাইয়ের মধ্যেই তৈরি হয়েছে গভীর দূরত্ব।
Visit chickenroadslot.lat for more information.
এখন দুই ভাইয়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ নেই। এমনটাই বলছে তাঁদের সম্পর্কের বিষয়ে অবগত সূত্র ও ব্রিটিশ রাজপরিবারের পর্যবেক্ষকেরা।
হ্যারি তাঁর বাবা রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে দেখা করেছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে চার বছর পর রাজা চার্লস ও রানি ক্যামিলার ব্যক্তিগত বাসভবন হাইগ্রোভে দেখা করেন হ্যারি, মেগান ও তাঁদের দুই সন্তান আর্চি ও লিলিবেট। বাবার সঙ্গে সেই সাক্ষাতে পারিবারিক যোগাযোগের একটি দরজা যেন আবার খুলেছে। কিন্তু উইলিয়ামের সঙ্গে দূরত্ব রয়ে গেছে।
ডায়ানার জীবনের শেষ রাতে কী ঘটেছিলএরই মধ্যে আরও বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে। ছয় বছর যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পর হ্যারি ও মেগান তাঁদের দুই সন্তানকে নিয়ে আবার যুক্তরাজ্যে ফিরে এসেছেন। ২৬ আগস্ট তাঁরা ব্রিটেনে পৌঁছান। সন্তানদের একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে মাত্র দুই দিন যাওয়ার পর নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে তাঁদের অন্য একটি স্কুলে নেওয়া হয়।
২৬ সেপ্টেম্বর কানাডার টেলিভিশন চ্যানেল সিটিভিকে হ্যারি বলেন, ‘ব্রিটিশ মাটিতে ফিরে ভালো লাগছে।’ সন্তানদের প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য, ‘বাচ্চারা স্কুলে খুশি।’ যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি শুধু বলেন, ‘অনেক কারণ।’ বিস্তারিত জানাননি তিনি।
হলিউডে হ্যারি–মেগানের স্বপ্ন কেন ফিকে হয়ে গেলএকই শোক, ভিন্ন পথ
১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট প্যারিসে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান প্রিন্সেস ডায়ানা। তাঁর দুই ছেলে তখন কিশোর। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁদের জীবনের কিছুই আর আগের মতো থাকেনি।
ডায়ানার মৃত্যুর পর বহু বছর তাঁদের সম্পর্কের যে ছবি জনসমক্ষে এসেছে, তাতে দেখা গেছে, তাঁরা পরস্পরের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতেন। রাজপরিবারের ভেতরে তাঁদের অভিজ্ঞতার একটি বড় অংশ ছিল অভিন্ন। বাইরের পৃথিবীর চেয়ে তাঁরা একে অন্যের কাছে নিজেদের জীবনকে সহজে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পরিচয়ের পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মা ডায়ানার সঙ্গে ছয় বছরের উইলিয়াম ও তিন বছরের হ্যারি। ১৯৮৭ সালে স্পেনেউইলিয়াম জন্মের পর থেকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকার-সারির দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। ২০২২ সালে তাঁর বাবা চার্লস রাজা হওয়ার পর তিনি হন সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী। তাঁর জীবনের একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ রাজার দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতিতে কেটেছে। আর হ্যারি ছিলেন তাঁর ছোট ভাই—যাঁর অবস্থানকে বলা হয় ‘স্পেয়ার’। পরে নিজের বহুবিতর্কিত স্মৃতিকথার বইয়ের নাম দেন ‘স্পেয়ার’।
রাজপরিবার ছাড়ার ৬ বছর পর যুক্তরাজ্যে ফিরছেন হ্যারি ও মেগানএকসময় তাঁরা ছিলেন ‘আমরা’
ডায়ানার মৃত্যুর সময় উইলিয়াম ও হ্যারি দুজনই পড়াশোনা চালিয়ে যান। উইলিয়াম ইটন কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ভূগোল নিয়ে সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় কেট মিডলটনের। অন্যদিকে হ্যারি ইটন শেষ করে কিছু সময়ের জন্য পড়াশোনার বাইরে থেকে বিভিন্ন কাজ ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নেন। পরে তাঁর জীবনের বড় অধ্যায় হয়ে ওঠে সেনাবাহিনী।
বাবা বর্তমান ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস ও মা প্রয়াত ডায়ানার সঙ্গে দুই ভাই উইলিয়াম ও হ্যারি। ১৯৯৫ সালের মে মাসেদুই ভাইয়ের জন্যই সামরিক জীবন ছিল রাজপরিবারের দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উইলিয়াম স্যান্ডহার্স্ট রয়্যাল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে তিনি বিমানবাহিনীর অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে তিনি সামরিক বাহিনীর সক্রিয় দায়িত্ব থেকে সরে আসেন।
হ্যারির সামরিক জীবন ছিল আরও দীর্ঘ এবং সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায় ভরা। তিনি প্রায় ১০ বছর ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনীতে ছিলেন এবং আফগানিস্তানে দুই দফা দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে তাঁর সক্রিয় সামরিক দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে। সেনাজীবন তাঁকে রাজপরিবারের পরিচয়ের বাইরে নিজের একটি আলাদা পরিচয়ও তৈরি করে দিয়েছিল।
হ্যারি-মেগানের সংসার টানাপোড়েনের মুখেব্যক্তিগত জীবনে বড় পরিবর্তন
এরপর দুই ভাইয়ের ব্যক্তিগত জীবনেও আসে বড় পরিবর্তন। উইলিয়াম ২০১১ সালে কেট মিডলটনকে বিয়ে করেন। কেট সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পের ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানেই ২০০১ সালে প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি কিছুদিন পরিবারের ব্যবসায় কাজ করেন এবং পরে পোশাক ও আনুষঙ্গিক পণ্যের খুচরা ব্যবসায় কাজ করেন। উইলিয়ামের সঙ্গে বিয়ের আগে তিনি মূলত একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত তরুণী ও পেশাজীবী হিসেবেই জীবন কাটিয়েছেন। তাদের তিন সন্তান হলেন প্রিন্স জর্জ, প্রিন্সেস শার্লট ও প্রিন্স লুই। বিয়ের পর উইলিয়ামের জীবনের সঙ্গে রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব আরও সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়।
অপরদিকে হ্যারি বিয়ে করেন মার্কিন অভিনেত্রী মেগান মার্কেলকে, ২০১৮ সালে। তাঁদের দুই সন্তান, আর্চি ও লিলিবেট। কিন্তু এই বিয়ের পরই হ্যারির জীবন ঘিরে রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং রাজকীয় দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। ২০২০ সালে হ্যারি ও মেগান ঘোষণা করেন, তাঁরা রাজপরিবারের কর্মরত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন।
মেগান ও হ্যারি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কেএরপর তাঁদের জীবন যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের কেন্দ্র থেকে আরও দূরে সরে যায়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার পর হ্যারি ও মেগান নিজেদের কাজ, সন্তান এবং জনজীবনের নতুন পরিসর তৈরি করেন।
অন্যদিকে উইলিয়াম রাজপরিবারের ভেতরেই থেকে ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ রাজার দায়িত্বের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন।
দুই ভাইয়ের দূরত্বের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি আসে হ্যারির স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’ প্রকাশের পর। বইটিতে রাজপরিবারের ভেতরের নানা ঘটনা, তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাঁদের পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় প্রকাশ্যে আসে। এর ফলে দুই ভাইয়ের সম্পর্ক নিয়ে যে আলোচনা আগে ছিল, তা আরও তীব্র হয়।
হ্যারি–মেগান যুক্তরাজ্যে ফিরলে কি সরকারি নিরাপত্তা পাবেনস্পেয়ার-এ হ্যারির যত অভিযোগ
হ্যারির স্মৃতিকথা স্পেয়ার-এর একটি বড় অংশজুড়ে আছে তাঁর বড় ভাই উইলিয়ামের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন। বইটিতে হ্যারি লিখেছেন, ছোটবেলা থেকেই তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তিনি নিজের অবস্থানকে ‘স্পেয়ার’ হিসেবে দেখেছেন, আর উইলিয়াম ছিলেন ভবিষ্যৎ রাজা। মায়ের মৃত্যুর পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পার্থক্য তাঁদের জীবনের পথও আলাদা করে দেয়। হ্যারির বর্ণনায়, রাজপরিবারের ভেতরে তাঁর নিজের অবস্থান ও পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন একধরনের অস্বস্তি কাজ করেছে।
ব্রিটিশ সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়াম ও তাঁর স্ত্রী কেট মিডলটন তাঁদের সন্তানদের নিয়ে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতেমেগানকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তের সময় দুই ভাইয়ের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে হ্যারি লিখেছেন। তাঁর দাবি, উইলিয়াম তাঁকে মেগানকে বিয়ে করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে ২০১৯ সালে মেগানকে নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্কের সময় পরিস্থিতি শারীরিক সংঘর্ষে গড়ায় বলে হ্যারি বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, উইলিয়াম তাঁকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন এবং এতে তাঁর পিঠে আঘাত লাগে। হ্যারি আরও লিখেছেন, পরে উইলিয়াম এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছিলেন।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে সন্তানদের স্কুল বদলালেন হ্যারি–মেগানমেগান ও কেটের সম্পর্ক নিয়েও বইটিতে বেশ কিছু তথ্য এসেছে। হ্যারির বর্ণনায়, তাঁদের বিয়ের প্রস্তুতির সময় পোশাক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে দুই নারীর মধ্যে মতবিরোধ হয়েছিল। মেগানকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার সময় রাজপরিবার ও প্রাসাদ তাঁর স্ত্রীকে যথেষ্ট সমর্থন করেনি বলেও হ্যারি অভিযোগ করেছেন।
চার্লসকে নিয়েও হ্যারির অভিমান কম নয়। তবে বাবার ক্ষেত্রে তাঁর অভিযোগ অনেকটাই আবেগ, হতাশা ও প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার সঙ্গে জড়িত। মেগানকে ঘিরে সংকটের সময় বাবা তাঁর ও মেগানের পাশে যথেষ্ট দৃঢ়ভাবে দাঁড়াননি বলে হ্যারি মনে করেন।
বাঁ থেকে কেট মিডলটন, প্রিন্স উইলিয়াম, প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মার্কেলচার্লসের সঙ্গে ক্যামিলার বিয়ের আগেও দুই ভাই বাবাকে তাঁকে বিয়ে না করার অনুরোধ করেছিলেন বলে হ্যারি লিখেছেন। তাঁর বর্ণনায়, ক্যামিলাকে নিয়ে তাঁদের আশঙ্কা ছিল। পরে ক্যামিলার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ তোলেন হ্যারি। তাঁর দাবি, নিজের ভাবমূর্তি ভালো করার জন্য ক্যামিলা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। রাজপরিবারের ব্যক্তিগত তথ্য সংবাদমাধ্যমে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল।
বইটিতে হ্যারি তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের ভাঙনকে শুধু একটি ঘটনার ফল হিসেবে দেখাননি। তাঁর বর্ণনায়, শৈশবের ‘স্পেয়ার’ পরিচয়, মায়ের মৃত্যু, ভাইয়ের সঙ্গে দূরত্ব, মেগানকে ঘিরে বিরোধ, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে রাজপরিবারের সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছু মিলেই একসময় তিনি রাজপরিবারের কর্মরত সদস্যের জীবন থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
হ্যারির অভিযোগের জবাবে উইলিয়াম প্রকাশ্যে কোনো বিস্তারিত বক্তব্য দেননি। স্পেয়ার প্রকাশের পর কেনসিংটন প্যালেসও তাঁর অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা উইলিয়ামকে বইটি নিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
যুক্তরাজ্যে কখনো ফিরতে চান না বলা প্রিন্স হ্যারি এখন কেন পরিবার নিয়ে ফিরছেনকেট ও মেগানের সম্পর্ক কেমন ছিল
কেট ও মেগানের সম্পর্ক শুরু থেকেই বিরোধপূর্ণ ছিল, এমনটা বলার সুযোগ সীমিত। হ্যারি ও মেগানের বিয়ের আগে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের বিয়ের প্রস্তুতির সময় কিছু ঘটনা দুই নারীর সম্পর্কের টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে আনে। হ্যারির স্পেয়ার বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, কেটের মেয়ে শার্লটের পোশাক নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে মেগানের সঙ্গে তাঁর বার্তা আদান-প্রদান হয়।
বাঁ থেকে মেগান মার্কেল, প্রিন্স হ্যারি, প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটন। ২০১৮ সালে বাকিংহাম প্যালেসের ব্যালকনিতেএই ঘটনাকে ঘিরেই পরে সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়ায়, মেগান নাকি কেটকে কাঁদিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালে অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেগান বলেন, ঘটনাটি উল্টো। তাঁর ভাষ্য, কেটের আচরণে তিনি নিজেই কেঁদেছিলেন। মেগান আরও বলেন, পরে কেট ক্ষমা চেয়ে তাঁকে ফুল ও একটি চিঠি দিয়েছিলেন। অর্থাৎ একই ঘটনার দুটি ভিন্ন বর্ণনা প্রকাশ্যে এসেছে। কেট নিজে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য দেননি।
স্পেয়ার-এ হ্যারি আরও কয়েকটি ঘটনার কথা লিখেছেন, যেগুলো দুই নারীর সম্পর্কের দূরত্ব বোঝাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মেগানের কথিত ‘বেবি ব্রেন’ মন্তব্য, যা কেট পছন্দ করেননি বলে হ্যারি লিখেছেন।
এর বাইরে বড় একটি বিষয় ছিল সংবাদমাধ্যমের তৈরি তুলনা। হ্যারি ও মেগানের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম কেট ও মেগানকে প্রায়ই পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরত। ২০২৩ সালে স্পেয়ার নিয়ে কথা বলার সময় হ্যারি বলেন, সংবাদমাধ্যম তাঁদের দুই ভাইয়ের মতোই দুই স্ত্রীকেও পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে।
তবে প্রকাশ্য তথ্য থেকে কেট ও মেগানের সম্পর্ককে সরাসরি ‘শত্রুতা’ বলা কঠিন। তাঁদের মধ্যে কিছু মতবিরোধের কথা হ্যারি ও মেগান নিজেরাই বলেছেন, আবার ২০২২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর উইলিয়াম, কেট, হ্যারি ও মেগানকে একসঙ্গে উইন্ডসরে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। ফলে তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল এ কথা বলা যায়; কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের পুরো চিত্র বাইরে থেকে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
প্রিন্স হ্যারির সঙ্গে কি বাবা রাজা চার্লসের দূরত্ব ঘুচবেমেগান কি সম্পর্কে বাধা ছিলেন
মেগানের পরিবার রাজপরিবারের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক বাধা ছিল না। কিন্তু তাঁর পরিচয় ছিল ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রচলিত পরিমণ্ডল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ছিলেন মার্কিন অভিনেত্রী, তালাকপ্রাপ্ত এবং মিশ্র বর্ণের নারী। মেগান মার্কল ২০১১ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র প্রযোজক ট্রেভর এঙ্গেলসনকে বিয়ে করেন। প্রায় দুই বছর পর, ২০১৩ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়।
মেগানের বাবা টমাস মার্কেল ছিলেন টেলিভিশনের আলোক-পরিচালক এবং এমি পুরস্কারজয়ী। মা ডোরিয়া র্যাগল্যান্ড ছিলেন সমাজকর্মী। মেগানের মা কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাবা শ্বেতাঙ্গ। মা–বাবার বিবাহবিচ্ছেদের পর মেগান মায়ের সঙ্গেও থেকেছেন, বাবার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অর্থাৎ তিনি ব্রিটিশ অভিজাত বা রাজপরিবারের কোনো পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে আসেননি।
মেগানের মা–বাবার বিবাহবিচ্ছেদ, বাবার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে দূরত্ব এবং পরিবারের কয়েকজন সদস্যের প্রকাশ্য বক্তব্যও বিয়ের আগে আলোচনায় আসে। তার চেয়েও বড় বিষয় ছিল তাঁর বর্ণগত পরিচয়। হ্যারি-মেগানের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসার পর কিছু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে যে বর্ণবাদী ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল, তা নিয়ে হ্যারি প্রকাশ্যেই প্রতিবাদ করেছিলেন।
মেগান কি হ্যারির ‘ব্রেনওয়াশ’ করেছেন, ক্যামিলার মন্তব্যে তোলপাড়ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন
দুই ভাইয়ের বন্ধন আবার জোড়া লাগবে কি না, এই প্রশ্নের উত্তর এখন কারও জানা নেই। তাঁদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা শুধু পারিবারিক অভিমান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজপরিবারের ভেতরের সম্পর্ক, গণমাধ্যম, হ্যারির প্রকাশ্য অভিযোগ এবং তাঁর রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত। তবু রক্তের সম্পর্কের গল্প কখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যায়। বাবা চার্লসের সঙ্গে হ্যারির যোগাযোগ আবার শুরু হয়েছে। ভাইয়ের ক্ষেত্রেও হয়তো সময়ই বলে দেবে, পুরোনো ক্ষত পেরিয়ে তাঁরা কোনো দিন আবার পাশাপাশি দাঁড়াতে পারেন কি না।
মতবিরোধ ভুলে রাজপরিবারের সঙ্গে আবারও এক হতে চান প্রিন্স হ্যারিরাজা চার্লসের কোনো ভূমিকা থাকবে
দুই ভাইয়ের সম্পর্ক জোড়া লাগানোর ক্ষেত্রে রাজা চার্লসের ভূমিকা কতটা হবে, সেটিও একটি প্রশ্ন। এখন পর্যন্ত অবশ্য তাঁকে সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় দেখা যায়নি। বরং তিনি হ্যারির সঙ্গে সম্পর্কটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার দিকেই এগিয়েছেন।
ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস (ডানে) এবং তাঁর বড় ছেলে ও উত্তরাধিকারী প্রিন্স উইলিয়ামকিন্তু উইলিয়াম ও হ্যারির সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, দুই ভাইয়ের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ এখনো তৈরি হয়নি। উইলিয়ামের অবস্থান হলো, তাঁর বাবা হ্যারির সঙ্গে যে সম্পর্ক রাখতে চান, সেটি তাঁর নিজের বিষয়। ফলে চার্লস হয়তো দুই ছেলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য কোনো একসময় ভূমিকা রাখতে পারেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তাঁর পক্ষ থেকে এমন কোনো প্রকাশ্য উদ্যোগের কথা জানা যায়নি।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। চার্লস এখন শুধু একজন বাবা নন, তিনি রাজা। ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে রাজপরিবারের দায়িত্ব ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়টিও তাঁর বিবেচনায় থাকে। হ্যারি ও মেগান যুক্তরাজ্যে ফিরে এলেও তাঁরা কর্মরত রাজপরিবারের সদস্য নন, সেপ্টেম্বরে বাকিংহাম প্যালেসও বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। তাই দুই ভাইয়ের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু বাবার মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করবে, এমনটা বলা কঠিন। শেষ পর্যন্ত উইলিয়াম ও হ্যারির নিজেদের ইচ্ছা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, এপি, পিপল, দ্য গার্ডিয়ান, আইটিভি নিউজ, স্কাই নিউজ, দ্য ইনডিপেনডেন্ট, হ্যারির স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’ এবং মেগানের ২০২১ সালের অপরাহ উইনফ্রেকে দেওয়া সাক্ষাৎকার।