উত্তর মেরুর যাত্রী
· Prothom Alo

২০১২ সালের এপ্রিল মাসে কিশোরদের জন্য নববর্ষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল প্রথম আলো। কিশোর আলোর পূর্বসূরী বলা চলে এই সংখ্যাটাকে। এটি ব্যাপক জনপ্রিয় হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, বের হবে কিশোর আলো। সেই সংখ্যায় লিখেছিলেন প্রখ্যাত সব লেখকেরা। ১ অক্টোবর কিশোর আলোর ১৩তম জন্মদিন। জন্মদিনের আনন্দ পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে নববর্ষ সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে লেখা প্রকাশিত হচ্ছে শুধু কিশোর আলো অনলাইনে। কিআ পাঠকের জন্য থাকল তারেক অণুর লেখা মেরু অভিযানের গল্প।
প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় আমাদের পারিবারিক পাঠাগারে পৃথিবীর দুর্গম স্থানের দুঃসাহসী অভিযান নিয়ে একটি বই ছিল। এত দিন পরে সেই চমৎকার বইটির নাম আর খেয়াল নেই। কিন্তু প্রথম অধ্যায়ের নাম মনে হলে এখনো শিহরিত হই। গ্রিনল্যান্ড আর তার উত্তরে হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত দুধ-সাদা প্রান্তর নিয়ে মনকাড়া বর্ণনা ছিল 'দুধের মতো দেশের খোঁজে' অধ্যায়ে। সেই দুধের মতো সাদা দেশের বিস্তীর্ণ প্রান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে চির রহস্যে মোড়া শত শত বছর ধরে অ্যাডভেঞ্চারপিপাসুদের আকর্ষণ-উত্তর মেরু। ভাবতাম, আহা যদি যেতে পারতাম!
এর অনেক বছর পরে ২০০৭ সালের ২ এপ্রিল নরওয়ের রাজধানী অসলোতে শুরু হলো আমার মেরু অভিযান। পাখিপ্রেমী ইনাম আল হক এক দিন আগেই ঢাকা থেকে চলে এসেছিলেন, আমি এলাম ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি থেকে। সেই দিনই রওনা দিলাম আমাদের গ্রহের সর্ব উত্তরের জনবসতি স্পিটসবের্গেদের উদ্দেশে। ৭৮ ডিগ্রি অক্ষাংশে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জ বিশ্বের বুকে এক প্রাকৃতিক বিস্ময়। প্রায় আয়ারল্যান্ডের সম-আয়তনের এই পর্বত আর হিমবাহুময় ভূখণ্ডে মানবসন্তানের সংখ্যা মাত্র হাজার খানেক হলেও বিরল স্থলচর শ্বাপদ শ্বেতভালুকের সংখ্যা প্রায় চার হাজার! এখান থেকে আমাদের গন্তব্য ক্যাম্প বার্নেও, যা ৮৯ ডিগ্রি উত্তরে অবস্থিত। যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল সোভিয়েত আমলের তৈরি আস্তনোভবিমান, যা ভাসমান বরফপিতে অবতরণ ও সেখানে থেকে উড়তে সক্ষম।
সুমেরুর যে জিনিসে সবচেয়ে সেখানকার গ্রীষ্মের চিরসূর্য। বেশি অভিভূত হয়েছি তা হলো, এইয়ে তো সেই শিশুকাল থেকেই পড়ে আসছি আর্কটিকে বছরে ছয় মাস দিন, ছয় মাস প্রত। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয় বছরে মাত্র একবার করে। প্রকৃতির সেই অসাধারণ খেয়াল এবার চাক্ষুষ করলাম, সে এক অবিশ্বরণীয় অভিজ্ঞতা। সূর্য দিগন্তের বেশ ওপরে, তবে মাথ আকাশ থেকে অনেক নিচে, চারদিকে ঝকঝকে আলো, একবারে বাংলাদেশের বৈশাখের সূর্য। আলোর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক, যদি দুর্ঘটনাক্রমে কোনো বেরসিক মেঘদল সূর্যদেবতাকে ঢাকার দুঃসাহসী প্রচেষ্টা না চালায় তবে এই আলোর বন্যা ঠেকায় কে! আর সূর্য, সে তো চতুর্দিকেই! হ্যাঁ! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ-সবদিকেই সূর্য পরিভ্রমণ করছে, সে এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আর এমনটা আমরা দেখেছিলাম পুরো ৭২ ঘণ্টা। তিনটি দিন আঁধার নামের কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না আমাদের জগতে বা মানসে। ক্যাম্প বার্নেও থেকে হেলিকপ্টারে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে এক অজানা রোমাঞ্চে মন দুলে উঠল। অবশেষে মনের কোণে আশৈশব লালিত স্বপ্ন সত্যি হতে যাচ্ছে। আর মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই আমরা পৌছে যাব আমাদের গ্রহের সর্ব উত্তবেও প্রান্তসীমায়। সমগ্র পৃথিবীর সব ভ্রমণপিপাসু আর রোমাঞ্চপ্রিয়দের কয়েক শ বছর ধরে সমান তকম রহস্যের হাতছানি দিয়ে যে ডাকে দে-ই উত্তর মেরু।
Visit h-doctor.club for more information.
মার্কিন ন্যায়াল কমান্ডার রবার্ট এডউইন পিয়েরি তাঁর ইন্যুইট (এস্কিমো) সহযাত্রীদের নিয়ে সুমেরুতে পা রেখেছিলেন ১৯০৮ সালের ৬ এপ্রিল, সে তো প্রায় শতবর্ষ হতে চলল, তার পরও মেরুর প্রতি মানুষের সুতীব্র আকর্ষণ এখনো চরমভাবে বিদ্যমান। ম্যারাথনের পরে রাশিয়ান হেলিকপ্টারে সওয়ার হয়ে আমাদের যাত্রা মেরু পানে। বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে আসা। সহযাত্রীরা গাদাগাদি করে বসতেই কন্টারের মোটর ঘোর। শুরু করল। এর মধ্যেই খোলা প্রান্তরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় আমাদের অবস্থা ত্রিশঙ্কু (বাইরে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও এই ফাঁকা তেপান্তরে তা অনুভূত হতো মাইনাস ৬০ ডিগ্রির মতো। তখন তাও ভরা গ্রীষ্ম, চিন্তা করো পূর্ণ শীতে কী অবস্থা হয়!)। কপ্টারের ইঞ্জিন গরম লাগে, তাতেই, হাত-পায়ের হতে যে কয়েক মিনিট সময় আঙুল জমে একেবারে বরফ হওয়ার ভোগাড়। সবাই সেই স্বল্প পরিসরেই হাত-পা ঝাঁকিয়ে নানা রকম ম্যাসাজের মাধ্যনে রক্ত চলাচল অব্যাহত রাখতেই অস্থির, সে এক অকথ্য দূরবস্থা। যাক সে কথা, ইঞ্জিন গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কন্টারের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে এল। আর সবার মধ্যে স্বস্তিও ফিরে এল। বরফাচ্ছাদিত প্রান্তরের অল্প ওপর দিয়েই উড়তে থাকল হেলিকপ্টার। বিশাল সফেদ এই ক্যানভাসের ওপর দিয়ে আধা ঘণ্টার ভ্রমণ শেষে যখন আমাদের আধুনিক রথ থামল, তখন পাইলট রুমের জিপিএস-এ বলছে, আমাদের অবস্থান অক্ষাংশ-৮৯ ডিগ্রি ৫৯,৯৭৬ মিনিট। অর্থাৎ মেরুবিন্দু থেকে আমরা কয়েক মিটার দূরে, কিন্তু এমনটা বেশিক্ষণ থাকবে না, এর বরফপ্রান্তর জলের ওপর ভাসমান, কাজেই বরফস্তরটি সর্বদাই অবস্থান পরিবর্তনশীল। এখন যেখানে আছে, হয়তো মিনিট পনেরো পরেই মেরুবিন্দু সরে যাবে মিটার কয়েক ডানে বা বামে। একে একে মোহাবিষ্টের মতো কণ্টার থেকে বের হয়ে চির বরফের রাজ্যে পদচিহ্ন এঁকে দিলাম সবাই। নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো গেলাম আরও কয়েক মিটার উত্তরে, এই গ্রহে কেবল দুটি মেরু—সুমেরু ও কুমেরু।
ফাতেমা: স্বপ্ন হোক আকাশসমানআর আমরা এখন সুমেরুতে!
অবশেষে ২০০৭ সালের ৮ এপ্রিল, রোববার, বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬.১৫টা, গ্রিনিচ সময় দুপুর ১২.১৫-তে আমরা দুই বঙ্গসন্তান আমাদের গন্তব্য ৯০ ডিগ্রি উত্তরে পৌছালাম। উড়ল সেখানে প্রথমবারের মতো লাল-সবুজ পতাকা।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশেই প্রায় জীবনের পুরোটা কাটিয়েছি আমি এবং ইনাম ভাই। নিরক্ষরেখার কাছেই অবস্থিত আমাদের দেশের ওপর দিয়েই চলে গেছে কর্কটক্রান্তি, চিরসূর্যের দেশের মানুষ আর আজ কোনো অজানা দুর্দম আকর্ষণে হাজির হয়েছি এই বরফের রাজ্যে! এই অনন্য অনুভূতি, অসাধারণ অনুভূতি প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। তাই সে কল্পনার ভার তোমাদের ওপরই ন্যস্ত থাকল। তখন তাপমাত্রা মাইনাস ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মেরু প্রদেশের এই এক বিশেষত্ব, এখানে আবহাওয়ার পরিবর্তন হয় খুব দ্রুত। তাও ভালো আমাদের কোনো ব্লিজার্ডের (মেরু ঝড়) মুখোমুখি হতে হয়নি। ছবি তোলার পালা সাঙ্গ করে শেষবারের মতো তাকালাম এই প্রাকৃতিক বিস্ময়ের দিকে। সহযাত্রীদের দেখি বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মেরুটাকে উপভোগের চেষ্টায় মশগুল। দূর থেকে দেখি ক্যামেরা হাতে দৃঢ় ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছেন ইনাম ভাই। কাছে যেতেই আবেগভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'ভাবতে পারেন এ জায়গাটি আমাদের এত দিন দেখা হয়নি, হয়তো এটা না দেখেই মারা যেতে পারতাম।'
পাইলটের তাড়া খেয়ে আবার কপ্টারে চাপলাম সবাই। রোটর ঘোরা শুরু করল ধীরে ধীরে। আমরা প্রত্যেকেই শেষবারের মতো জানালায় মুখ চেপে শেষ দৃষ্টি বোলালাম এই মোহময় দুধ সাদা প্রান্তরে। এবং জানি শেষ পর্যন্ত একটাই চিন্তা কাজ করছিল সবার মনে, আবার হয়তোবা কোনো একদিন ফিরে আসব এই বন্ধুর, ভয়ংকর সুন্দর অথচ আকর্ষণীয় ৯০ ডিগ্রি উত্তরে।
তোমরা যারা এই ভয়ংকর সুন্দরের মুখোমুখি হতে চাও মনের ভেতর বাড়তে দাও সেই সুতীব্র ইচ্ছাকে। কারণ ইচ্ছা থাকলে একদিন হবেই।
দুপুরের ভাত খাবার সময়