সন্তানের আচরণ ও বন্ধু নির্বাচন: অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব

· Prothom Alo

প্রথম আলো ট্রাস্টের একটি আয়োজন বিনা মূল্যে মাদকবিরোধী পরামর্শ সহায়তা সভা। এ আয়োজনের আওতায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রথম আলোর কার্যালয় কারওয়ান বাজারে ১৮২ তম অনলাইন পরামর্শ সহায়তা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় উপস্থিত থেকে পরামর্শ প্রদান করেন বিশিষ্ট শিশু-কিশোর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল আহমেদ। এইবারের বিষয়টি ছিল—‘সন্তানের আচরণ ও বন্ধু নির্বাচন: অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব।’ অনুষ্ঠানটি সাক্ষাৎকার আকারে তুলে ধরা হলো।

অধ্যাপক ডা. হেলাল আহমেদ, আপনাকে স্বাগত জানাই।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

ডা. হেলাল আহমেদ: ধন্যবাদ আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য।

সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে অভিভাবকদের মূল উদ্বেগগুলো কোথায়?

ডা. হেলাল আহমেদ: প্রতিটি পরিবারই সন্তানের সার্বিক মঙ্গল চায়। সন্তান যখন বড় হতে শুরু করে, বিশেষ করে কৈশোরে পদার্পণ করে, তখন অভিভাবক ও সন্তান উভয়ের জন্যই সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয়। মানুষের মন একটি প্রদীপের মতো, যা সন্তান ও বাবা-মা উভয়ের মাঝেই আলো ছড়ায়। সন্তানকে কীভাবে আগলে রাখা যায়, কীভাবে তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ নিশ্চিত করা যায় এটিই এখনকার বাবা-মায়েদের প্রধান চিন্তা। কারণ, সন্তানদের ভালো থাকার ওপরেই পুরো দেশের ভালো থাকা নির্ভর করে।

আমরা প্রায়ই বাচ্চাদের বলি ‘ভালো বন্ধুদের সাথে মিশবে, খারাপদের সাথে নয়। বন্ধুনির্বাচনের এই ধারণাকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ডা. হেলাল আহমেদ: আসলে ভালো বা খারাপ এই দুটি শব্দ দিয়ে কোনো শিশুকে এভাবে ট্যাগ করা বা আলাদা করা ঠিক নয়। প্রতিটি শিশুরই নিজস্ব কিছু ইতিবাচক দিক থাকে। আমরা খুব সহজেই কারো বন্ধুকে খারাপ ছেলে বা খারাপ মেয়ে বলে চিহ্নিত করে ফেলি। এটা করা উচিত নয়। বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে আমাদের এমন বন্ধুদের বেছে নেওয়া উচিত যাদের মধ্যে ভালো মানবিক গুণাবলী রয়েছে। তবে তার মানে এই নয় যে, কাউকে আমরা আমাদের বন্ধু তালিকা থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেব। বরং তাদের নেতিবাচক আচরণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো দূর করতে সাহায্য করা উচিত।

সন্তানদের কেমন বন্ধু নির্বাচন করা উচিত এবং সেখানে অভিভাবকদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

ডা. হেলাল আহমেদ: শিশুদের এমন বন্ধু দরকার যারা অ্যাসার্টিভ বা স্পষ্টভাষী। অর্থাৎ, যারা কোনো রকম আক্রমণাত্মক আচরণ না করে নিজের মনের কথা বা মতামত প্রকাশ করতে পারে। আবার খুব বেশি ভীরু বা লাজুকও হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, সন্তানদের ‘না’ বলার ক্ষমতা শিখতে হবে। অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, সন্তানের অনেক ধরনের বন্ধু থাকতে পারে। সব বন্ধু যদি একই মানসিকতা বা একই অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের হয়, তবে সন্তান বাইরের বৈচিত্র্যময় পৃথিবীকে চিনতে পারবে না। একেই বলে ইনক্লুসিভনেস বা অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব। তবে হ্যাঁ, কোনো বন্ধুর মধ্যে যদি ক্ষতিকর কোনো প্রভাব বা অভ্যাস থাকে, তখন অভিভাবক হিসেবে তাদের সচেতন হতে হবে।

আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন, সন্তান কোনো খারাপ অভ্যাস বা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার জন্য কেবল খারাপ বন্ধুরাই দায়ী। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?

ডা. হেলাল আহমেদ: অনেক বাবা-মা বলেন, আমার সন্তান তো ভালোই ছিল, কিছু খারাপ বন্ধুর পাল্লায় পড়ে নষ্ট হয়েছে। কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে, কোনো বন্ধুই একা কাউকে জোর করে মাদকের দিকে নিয়ে যেতে বা ছাড়াতে পারে না। সন্তানের ভেতরে যদি কোনো শূন্যতা বা অপূর্ণতা থাকে, তবেই সে বাইরে সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে। আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ডিমান্ড রিডাকশ। অর্থাৎ, সন্তানের সামনে হয়তো মাদক বা যেকোনো খারাপ প্রলোভন থাকবে, কিন্তু তার নিজের ভেতরের নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস এতটাই দৃঢ় হবে যে সে নিজে থেকেই তা প্রত্যাখ্যান করবে এবং অন্যদেরও বারণ করবে।

আপনি প্যারেন্টিংয়ের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা করেছেন। বর্তমান সময়ে কোন ধরনের প্যারেন্টিং দেখা যাচ্ছে?

ডা. হেলাল আহমেদ: প্যারেন্টিং মূলত চার ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি হলো জেলিফিশ প্যারেন্টিং, যেখানে বাবা-মায়েরা সন্তানদের ভয় পান, তাদের অতিরিক্ত শাসন বা কোনো বিষয়ে ‘না’ বলতে পারেন না। ফলে সন্তানরা অনেক সময় অনিয়ন্ত্রিত বা উগ্র হয়ে ওঠে। অন্যদিকে এলিফ্যান্ট প্যারেন্টিং -কে বেশ আদর্শ মনে করা হয়, যেখানে সন্তানকে পরম স্নেহে সুরক্ষাও দেওয়া হয়, আবার সঠিক গাইডলাইনও দেওয়া হয়। অভিভাবকদের মনে রাখতে হবে, সন্তানের সাথে সম্পর্কটা হতে হবে স্বচ্ছ ও গভীর। সন্তান যেন কোনো কিছু লুকাতে না পারে। তবে তার মানে এই নয় যে আপনি তার বন্ধু হয়ে যাবেন; আপনার স্থান অভিভাবক হিসেবেই থাকবে, যেখানে ভালোবাসা ও সম্মান থাকবে, কিন্তু কোনো অহেতুক ভয় থাকবে না।

অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আপনার শেষ পরামর্শ কী হবে?

ডা. হেলাল আহমেদ: সন্তানকে বড় করা একটি নদীর মতো। নদী যেমন ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে চলে, তেমনি সন্তানকেও সঠিক নিয়মে ড্রেজিং বা গাইড করতে হবে, যেন সে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট বই পড়ে প্যারেন্টিং শেখা যায় না, এটি প্রতিটি সন্তান ও পরিবারের জন্য আলাদা এবং কাস্টমাইজড। অভিভাবকদের দুটি কাজ করতে হবে প্রথমত, সন্তানকে পড়তে হবে এবং দ্বিতীয়ত, সন্তানকে দেখতে হবে। তাকে বুঝতে হবে। সন্তান যখন মানসিকভাবে শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হবে, তখন বাইরের কোনো নেতিবাচক শক্তি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।

আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ডা. হেলাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Read full story at source