প্রবাসে একটুকরো বাংলা: সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের দুর্গাপূজা

· Prothom Alo

প্রবাসের মাটিতে বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও শিকড়কে ধারণ করে সুইজারল্যান্ডে এবারও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। দেখতে দেখতে সুইজারল্যান্ডে বাংলাদেশি বাঙালিদের দুর্গাপূজা ১৯তম বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

সুইজারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি বাঙালিদের উদ্যোগে ২০০৮ সালে শুরু হয় এই দুর্গাপূজা। সেই থেকে নিয়মিতভাবে দুর্গোৎসব উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে। প্রবাসে থেকেও বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির হাজার বছরের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়াই এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

প্রতিবছরের মতো এবারও দেশের মতো তিথি ও রীতিনীতি মেনে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। শীতপ্রধান সুইজারল্যান্ডের মাটিতে ফুল, বেলপাতা, তুলসীপাতা, আম্রপল্লব, পদ্মফুল ও চন্দনের সৌরভে কয়েক দিনের জন্য যেন তৈরি হয় একটুকরো বাংলা।

দূর প্রবাসে থেকেও পূজামণ্ডপে এসে বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী বাঙালিরা মিলিত হন। অঞ্জলি, আরতি, প্রসাদ গ্রহণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পূজা হয়ে ওঠে প্রবাসী বাঙালিদের এক মিলনমেলা।

প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির বন্ধন—

দুর্গাপূজা এখন শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালির ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও মিলনের অন্যতম বড় উৎসব। সুইজারল্যান্ডে এ আয়োজনেও ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে অনেকেই অংশ নেন।

প্রবাসের দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, শ্রুতিনাটক, কৌতুক ও বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদেরও সম্পৃক্ত করা হয়। এতে তারা বাংলাদেশের ভাষা, গান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।

সুইজারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি বাঙালিদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা শুরু হয় ২০০৮ সালে। সেই সময় থেকে নিয়মিতভাবে পূজা হয়ে আসছে। সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে বসবাসরত বাঙালিরা পূজামণ্ডপে এসে প্রতিমা দর্শন, অঞ্জলি ও আরতিতে অংশ নেন।

২০২৬ সালের দুর্গাপূজার মহাষষ্ঠী ১৭ অক্টোবর, মহাসপ্তমী ১৮ অক্টোবর, মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর, মহানবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর। পঞ্জিকা অনুসারে অষ্টমী ও নবমী তিথির সময়ের কারণে এ বছর অষ্টমী ও নবমীর মধ্যে তিথিগত বিশেষ বিন্যাস রয়েছে।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

প্রতিমা—

প্রতিমাকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। গত বছরের মতো এবারও মন্দিরে সংরক্ষিত প্রতিমা ও পূজার সামগ্রীকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জায় বাঙালির ঐতিহ্য ও শৈল্পিকতার ছাপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

পূজার নির্ঘণ্ট—

* ১৭ অক্টোবর, শনিবার—মহাষষ্ঠী: দেবীর ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ, বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস।

* ১৮ অক্টোবর, রোববার—মহাসপ্তমী: নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমীর পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি।

* ১৯ অক্টোবর, সোমবার—মহাষ্টমী: মহাষ্টমীর পূজা, পুষ্পাঞ্জলি ও সন্ধিপূজা।

* ২০ অক্টোবর, মঙ্গলবার—মহানবমী: মহানবমীর পূজা, হোম ও অন্যান্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।

* ২১ অক্টোবর, বুধবার—বিজয়া দশমী: দশমীর পূজা, সিঁদুরখেলা, শুভেচ্ছা বিনিময় ও বিজয়ার আনুষ্ঠানিকতা।

২০২৬ সালের সাধারণ দুর্গাপূজা ক্যালেন্ডারেও ১৬-২১ অক্টোবরের মধ্যে ষষ্ঠী থেকে দশমীর পূজার দিনগুলো দেখানো হয়েছে।

পূজার বৈশিষ্ট্য

সার্বজনীন দুর্গাপূজা সুইজারল্যান্ডের মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয়। জুরিখের প্রাণকেন্দ্রের এই আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ হলো এর দেশীয় পরিবেশ। দুই বাংলার বাঙালির পাশাপাশি সুইজারল্যান্ডে বসবাসরত বিভিন্ন দেশের মানুষও পূজার আনন্দে অংশ নেন।

সন্ধ্যার আরতি এ আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণ। ঢাকের বাদ্য, ধূপের গন্ধ, প্রদীপের আলো ও ভক্তিমূলক পরিবেশে মুহূর্তের জন্য মনে হয় না যে আমরা প্রবাসে আছি। মনে হয় যেন বাংলাদেশের কোনো পাড়ার পূজামণ্ডপে দাঁড়িয়ে আরতি উপভোগ করছি।

পূজার ভোগ

সম্পূর্ণ আচার ও রীতি মেনে দেবীর ভোগ রান্না করা হয়। ভাত, পঞ্চব্যঞ্জন, বিভিন্ন ধরনের ভাজা, তরকারি, খিচুড়ি, পায়েস, লুচি, সন্দেশ, নাড়ু, মিষ্টি, দই ও বিভিন্ন ফল দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়।

পূজার কয়েক দিন ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য নিরামিষ প্রসাদের ব্যবস্থাও থাকে। বিজয়া দশমীর দিন বিশেষ আয়োজন করা হয়।

পূজার আকর্ষণ

দুর্গাপূজা ঘিরে শিশু-কিশোরদের জন্য চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজন থাকে। গান, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, ভক্তিমূলক সংগীত, শ্রুতিনাটক, কৌতুক ও অতিথি শিল্পীদের পরিবেশনা পূজার আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রবাসের ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও এই আয়োজন সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের স্মৃতিতে—গ্রামবাংলার মেঠো পথ, পূজামণ্ডপ, ঢাকের শব্দ, কাশফুল আর উৎসবমুখর সেই দিনগুলোর কাছে।

নতুন প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ এ আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষা, গান, নৃত্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

প্রবাসে সম্প্রীতির উৎসব

সুইজারল্যান্ডের দুর্গাপূজা শুধু পূজা নয়; এটি প্রবাসী বাঙালিদের মিলন, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির একটি বড় উপলক্ষ। সারা বছর বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলো এই কয়েক দিনে একত্র হন, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করেন, নতুন সম্পর্ক তৈরি করেন এবং নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে নতুন করে অনুভব করেন।

প্রবাসে এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—দেশ থেকে দূরে থাকলেও নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করা যায়।

পূজার স্থান ও উদ্যোক্তা

সুইজারল্যান্ড সার্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি

সার্বজনীন দুর্গাপূজা সুইজারল্যান্ড কমিটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এ আর দাস রবি, সুজিত দাস, তপন চক্রবর্তী, সুবাস সরকার, জয় রায়, অঞ্জন দেবনাথ, সনজিৎ চক্রবর্তী, বিপ্লব চৌধুরী, অঞ্জন দত্ত, নিরঞ্জন দাস, পিন্টু পাল, বিজয় পাল, রনো দেব, অনিমেষ চন্দ্র দে ও অনির্বাণ চ্যাটার্জি। সার্বজনীন দুর্গাপূজা সুইজারল্যান্ড কমিটি, কাঁশলাইস্ট্রাসে ১৬১, জুরিখ, সুইজারল্যান্ড।

Read full story at source