গ্রামের বৈঠকখানা কোথায় হারিয়ে গেল
· Prothom Alo

হুমায়ূন আহমেদের ‘ছেলেবেলা’ পড়লে বোঝা যায়, মানুষের স্মৃতিতে শৈশব কতটা গভীরভাবে থেকে যায়। সময় চলে যায়, মানুষ বড় হয়, কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে যায় আগের মতোই। একটি উঠান, কয়েকটি মোড়া, সন্ধ্যার আলো আর গল্পে মগ্ন কয়েকজন মানুষ। গ্রামবাংলার সেই দৃশ্যেরই একটি নাম ছিল বৈঠকখানা।
যেখানে দরজায় কড়া নাড়তে হতো না, অনুমতি লাগত না; বিকেলের আলো গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই মানুষ আপনা–আপনি সেখানে জড়ো হতো।
Visit syntagm.co.za for more information.
এখন সেই বৈঠকখানাগুলো কোথায়?
কোনোটি তালাবদ্ধ। কোনোটি গোয়ালঘর। কোনোটি ভেঙে সেখানে উঠেছে পাকা দালান। আর কোনোটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মানুষ নেই। ঘর আছে, অথচ বৈঠক নেই।
একসময় গ্রামের বাড়িতে বৈঠকখানা ছিল একধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বাড়ির মূল বসতঘর থেকে খানিকটা আলাদা, সাধারণত উঠানের পাশে বা রাস্তার ধারে একটি ঘর। কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো মোড়া, বাঁশের মাচা কিংবা মাটির চৌকি। এই সামান্য আয়োজনেই জমে উঠত গ্রামের সবচেয়ে বড় সংসদ।
সেখানে রাজনীতি নিয়ে তর্ক হতো, কৃষি নিয়ে আলাপ হতো, কারও গরু হারালে খোঁজের পরিকল্পনা হতো, কারও মেয়ের বিয়ের কথা উঠত। আবার কোনো কোনো দিন কোনো বিষয়ই থাকত না। তবু মানুষ আসত।
বৈঠকখানার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল সময়। মানুষের হাতে তখন সময় ছিল। সন্ধ্যা নামার পর টেলিভিশনের রিমোট নিয়ে যুদ্ধ ছিল না, হাতে স্মার্টফোন ছিল না, নোটিফিকেশনের শব্দে কথোপকথন থেমে যেত না। একজন গল্প শুরু করলে অন্যজন মাঝপথে উঠে চলে যেত না। গল্পের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করার অভ্যাস ছিল মানুষের।
একজন বৃদ্ধ কৃষক হয়তো বলতেন, এ বছর ধানের ফলন ভালো হবে। পাশ থেকে কেউ বলতেন, ‘না, আকাশের মতি ভালো নয়।’ আরেকজন শুরু করতেন তাঁর যৌবনের গল্প। সেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হতো আরেক গল্প। এভাবেই একটি সন্ধ্যা কখন যে রাত হয়ে যেত, কেউ টের পেত না।
শুধু আড্ডা নয়, বৈঠকখানা ছিল গ্রামের অনানুষ্ঠানিক আদালতও। জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ, গাছের ডাল কার উঠানে পড়েছে, কার গরু কার জমিতে ঢুকেছে। ছোটখাটো সমস্যার সমাধান অনেক সময় সেখানেই হয়ে যেত।
গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ মানুষ ছিলেন যেন জীবন্ত নথিপত্র। কার জমি কোথায়, কার বাবা কখন মারা গেছেন, কোন পরিবার কোথা থেকে এসেছে—সব তাঁদের নখদর্পণে।
আজ সেই স্মৃতির জায়গা দখল করেছে অন্য রকম ব্যস্ততা।
গ্রামের তরুণেরা কাজের সন্ধানে শহরে যাচ্ছে। যারা গ্রামে আছে, তাদের বড় একটি অংশের অবসর কাটে মোবাইলের পর্দায়। একই ঘরে বসে চারজন মানুষ চারটি আলাদা জগতের সঙ্গে যুক্ত। পাশের মানুষটির মুখ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে কথা হচ্ছে না।
বৈঠকখানার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়তো কোনো নতুন ভবন নয়, একটি ছোট্ট স্মার্টফোন। তবে শুধু প্রযুক্তিকে দোষ দিলে গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। গ্রামের অর্থনীতি বদলেছে, পরিবার ছোট হয়েছে, বাড়ির স্থাপত্য বদলেছে, মানুষের কাজের ধরন বদলেছে। যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হয়েছে। যে বাড়িতে আগে ১০ জন মানুষের বসবাস ছিল, সেখানে এখন ৩ জন। অতিথির আনাগোনা কমেছে। ফলে বৈঠকখানার প্রয়োজনও কমেছে।
মাকে আর জামা কিনে দেওয়া হলো নাকিন্তু প্রয়োজন কমে গেলেই কি একটি সংস্কৃতির মৃত্যু মেনে নিতে হবে?
ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা কিংবা কিশোরগঞ্জের কোনো কোনো গ্রামে এখনো পুরোনো বৈঠকখানা দেখা যায়। কোথাও সেটি সন্ধ্যার পরও প্রাণ ফিরে পায়। কোথাও আবার ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের মতো। দেয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার, কোণে ধুলাজমা মোড়া, শুধু নেই সেই কণ্ঠগুলো।
একটি বৈঠকখানা হারিয়ে গেলে শুধু একটি ঘর হারায় না। হারিয়ে যায় মানুষের মুখোমুখি বসার একটি পদ্ধতি। হারিয়ে যায় প্রজন্মের গল্প এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার সহজ রাস্তা। হারিয়ে যায় স্থানীয় ইতিহাসের অনেক অনানুষ্ঠানিক দলিল।
তবু গল্পটি পুরোপুরি বিষাদের নয়।
বৈঠকখানা হয়তো তার পুরোনো কাঠামোয় ফিরবে না। কিন্তু তার প্রয়োজনীয়তা অন্যভাবে ফিরতে পারে। গ্রামের পাঠাগার, উঠান বৈঠক, কমিউনিটি স্পেস কিংবা স্থানীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হতে পারে নতুন দিনের বৈঠকখানা। সেখানে মোড়ার বদলে চেয়ার থাকবে, কুপির বদলে আলো থাকবে; কিন্তু মানুষ যদি আবার মানুষের মুখোমুখি বসে, গল্পটি বেঁচে থাকবে। কারণ, বৈঠকখানা আসলে কোনো ঘরের নাম নয়। এটি মানুষের একসঙ্গে বসার একটি অজুহাত।
গ্রামের সেই ঘরগুলো হয়তো একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। কিন্তু কোনো এক সন্ধ্যায়, পুরোনো বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে যদি হঠাৎ মনে হয়, ‘এখানে তো একসময় সবাই বসত’; তাহলে বুঝতে হবে, ঘরটি হারালেও তার স্মৃতি এখনো আমাদের ভেতরে বসে আছে। হয়তো সেটিই বৈঠকখানার শেষ আশ্রয়।
ময়মনসিংহ