শিশুকে কোরআনের প্রথম পাঠ: কখন এবং কীভাবে

· Prothom Alo

অনেক অভিভাবকই মনে করেন, চার বা পাঁচ বছর বয়স একটি শিশুর জন্য কোরআন কিংবা কায়দা পড়া শেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কম। তাদের ধারণা, এই বয়সে শিশুদের মনোযোগ ও ধৈর্য কম থাকায় পড়াশোনা শেখানো কঠিন।

Visit xsportfeed.life for more information.

তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আধুনিক শিক্ষা-মনস্তত্ত্ব ভিন্ন কথা বলে। বর্তমান যুগে যে বয়সে একটি দুই-তিন বছরের শিশু সহজেই প্রযুক্তির ব্যবহার শিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ব্রাউজ করতে পারে, কিংবা বিভিন্ন বর্ণমালা চিনে নিতে পারে, সেই বয়সেই তাকে সুশৃঙ্খলভাবে কায়দা ও কোরআনের প্রাথমিক পাঠে অভ্যস্ত করা পুরোপুরি সম্ভব।

এর জন্য কঠিন কোনো নিয়মের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু অভিভাবকের অসীম ধৈর্য, ভালোবাসা এবং সঠিক ধারাবাহিকতা।

নিজের পাঠে দুর্বলতা থাকলে বর্তমান সময়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক বা মসজিদের মক্তবের সাহায্য নেওয়া কঠিন নয়। শিক্ষক পড়ালেও বাড়িতে অনুশীলনের সময় অভিভাবকের উপস্থিতি শিশুর ভেতরে বাড়তি উৎসাহ তৈরি করে।

৩ অজুহাত ও সমাধান

সন্তানকে শৈশবে কোরআন শিক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাতে গিয়ে অভিভাবকেরা প্রধানত তিনটি সামাজিক অজুহাত বা দ্বিধার সম্মুখীন হন।

১. ‘শিশু এখনো অনেক ছোট’: অভিভাবকেরা মনে করেন, ছোট শিশুরা দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে পড়াশোনা করতে পারে না। কিন্তু শিক্ষা দেওয়া মানেই ঘণ্টা পর ঘণ্টা আটকে রাখা নয়। অনেক ধর্মীয় বিদ্যালয়ে ছোট শিশুদের কায়দা পড়ে মূল শব্দ চেনার বদলে শুধু সুরা মুখস্থ করানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

কায়দা পড়ে বর্ণ চিনে নিজে দেখে পাঠ করতে পারার যে বনিয়াদি দক্ষতা, তা শৈশবে শেখা যতটা সহজ, বয়স বাড়লে তা ততটাই কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে একটু ধীর গতি হলেও শৈশবই হলো মূল বর্ণমালা ও পাঠের নিয়ম আয়ত্ত করার সেরা সময়।

২. ‘আমি নিজেই তো পড়তে পারি না’: এই দ্বিধা অনেক অভিভাবককে পিছিয়ে দেয়। তবে একজন অভিভাবকের জন্য সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয় হলো নিজের সন্তানকে সুরা ফাতিহা বা সঠিক উচ্চারণে কায়দার পাঠ অন্তত নিজে শেখানো।

নিজের পাঠে দুর্বলতা থাকলে বর্তমান সময়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক বা মসজিদের মক্তবের সাহায্য নেওয়া কঠিন নয়। শিক্ষক পড়ালেও বাড়িতে অনুশীলনের সময় অভিভাবকের উপস্থিতি শিশুর ভেতরে বাড়তি উৎসাহ তৈরি করে।

শিশুর কোরআন শিক্ষা শুরু করার উপযুক্ত বয়স কোনটি

৩. ‘সন্তানের একেবারেই সময় নেই’: আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা, বিদ্যালয়, গৃহশিক্ষক এবং নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের চাপে অনেক অভিভাবক দাবি করেন যে কোরআন শিক্ষার জন্য সময় বের করা যাচ্ছে না। এটি মূলত অগ্রাধিকারের বিষয়।

ইহজাগতিক জীবনে সন্তানকে চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হিসেবে গড়ে তুলতে অভিভাবকেরা যেমন সাধারণ বর্ণমালা শেখানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন, ঠিক তেমনি পরজাগতিক সফলতা ও সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ার জন্য কোরআন পড়া শেখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

ছোট শিশুদের শেখার গতি সবসময় একরকম থাকে না। কোনো কোনো শব্দ বা আয়াত উচ্চারণ শিখতে শিশুর দুই সপ্তাহও লেগে যেতে পারে।

শিশুর কোরআন শিক্ষার ৫ কৌশল

শৈশবে কায়দা ও কোরআন শেখার প্রক্রিয়াটিকে সহজ, আনন্দদায়ক ও সাবলীল করতে কয়েকটি মৌলিক কৌশল অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে:

১. সময় ভাগ করে নেওয়া: প্রতিদিন দীর্ঘ সময় পড়া না বানিয়ে সপ্তাহে অন্তত চার দিন ১০ থেকে ১৫ মিনিটের সংক্ষিপ্ত সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। শুরুতেই দীর্ঘ সময় দেওয়ার প্রয়োজন নেই; মাত্র পাঁচ মিনিট দিয়ে শুরু করে শিশুর স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময় বাড়ানো ভালো।

২. ছোট ছোট অর্জন উদযাপন করা: কায়দার একটি পৃষ্ঠা সুন্দরভাবে পড়া শেষ হলে বা নতুন কোনো কঠিন শব্দ আয়ত্ত করতে পারলে শিশুকে ছোট কোনো উপহার দেওয়া, পার্কে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া কিংবা পছন্দের কোনো খাবার কিনে দিয়ে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

এই চর্চা শিশুর মনে পড়াশোনার প্রতি একধরনের আনন্দময় অনুভূতি তৈরি করে।

৩. তাড়াহুড়ো না করা: ছোট শিশুদের শেখার গতি সবসময় একরকম থাকে না। কোনো কোনো শব্দ বা আয়াত উচ্চারণ শিখতে শিশুর দুই সপ্তাহও লেগে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অধৈর্য না হয়ে ভালোবাসার সঙ্গে বারবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

মুসলিম সভ্যতায় শিশুর ‘প্রাথমিক শিক্ষা’র রূপরেখা

৪. উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা: ইতিহাস থেকে দেখা যায়, মনীষীদের মায়েরা শৈশবে তাঁদের উপযুক্ত শিক্ষা পরিবেশে পাঠাতেন। ইমাম শাফেয়ির মাতা শৈশবেই তাঁকে সুন্দর পোশাক পরিয়ে প্রখ্যাত আলেমদের শিক্ষার মজলিসে নিয়ে যেতেন, যাতে তিনি সুন্দর পরিবেশের প্রতি আকর্ষিত হন। (আবু নুআইম আল-ইসফাহানি, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৯/৭২, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৫)

তাই সন্তানকে একা ঘরে বসিয়ে না রেখে স্থানীয় মাসজিদের মক্তব বা দলীয় শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করলে সে অন্যদের দেখে দ্রুত শেখে।

৫. পরিবারের সার্বিক অংশগ্রহণ: বাড়িতে যখন শিশু কায়দা বা কোরআন পড়তে বসবে, তখন পরিবারের অন্যান্য সদস্যকেও মোবাইল বা বিনোদন থেকে দূরে থেকে তেলাওয়াত বা অন্য কোনো ভালো কাজে যুক্ত থাকা উচিত। পারিবারিক এই পরিবেশ শিশুকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৩৭যিনি সাবলীলভাবে কোরআন পড়েন, তিনি সম্মানিত ও পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবেন। আর যিনি আটকে আটকে কষ্ট করে কোরআন পড়েন, তাঁর জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার।

মুসলিম সমাজের চিরায়ত ঐতিহ্য

কোরআন শিক্ষার এই ধারাবাহিক ঐতিহ্য নতুন কিছু নয়; বরং তা সাহাবিদের জামানা থেকেই চলে আসছে। সাহাবি আবু দারদা (রা.) দামেস্কের প্রধান মাসজিদে প্রথম শিশুদের ছোট ছোট দলে ভাগ করে শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে কোরআন শিক্ষার চমৎকার ও সুসংগঠিত ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন। (ইবন কাসির, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ, ৮/৫৪, দার আলাম আল-কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)

সেই চিরায়ত ঐতিহ্যই আজ মক্তব ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে টিকে রয়েছে।

যেকোনো ভালো কাজে তাড়াহুড়ো না করে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই ইসলামি মূলনীতি। মহান আল্লাহর কাছে সেই কাজই সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়—যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৪)

তাই প্রতিদিন মাত্র দশ মিনিটের নিয়মিত অনুশীলনও শিশুর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

শেখার প্রক্রিয়ায় শিশু ভুল করলে বা তোতলামি করলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। কারণ কষ্টে পড়ে শেখার মধ্যেও বিশেষ সওয়াব রয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, যিনি সাবলীলভাবে কোরআন পড়েন, তিনি সম্মানিত ও পুণ্যবান ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকবেন। আর যিনি আটকে আটকে কষ্ট করে কোরআন পড়েন, তাঁর জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৯৩৭)

কোরআনের প্রথম অবতীর্ণ বাণী ছিল ‘পড়ো’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১)। জীবনের প্রথম পাঠে যদি এই খোদায়ি আদেশ যুক্ত হয়, তবে শিশুর পুরো জীবনই আলোর পথ খুঁজে পবে। সন্তানের কাছে কোরআন শেখার অভিজ্ঞতাটি যেন কোনো ভীতি বা শাস্তির কারণ না হয়ে ওঠে; বরং তা যেন ভালোবাসাময় এক সুন্দর স্মৃতি হিসেবে সঞ্চিত থাকে।

শিশু যখন আল্লাহকে দেখতে চায়

Read full story at source