ইসলামে ভিন্নমতের সঙ্গে আচরণের নীতিমালা
· Prothom Alo

ইসলাম মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও কর্মজীবনের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। তবে সব মানুষ একইভাবে চিন্তা করবে, সব বিষয়ে একই মত পোষণ করবে—এমন বাস্তবতাবিবর্জিত প্রত্যাশা ইসলাম কখনোই করেনি।
মানুষের জ্ঞান, উপলব্ধি, পরিবেশ ও বাস্তবতার পার্থক্য থেকে অনেক বিষয়ে মতভেদ তৈরি হতে পারে। ইসলামের ইতিহাসেও আলেম ও ফকিহদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে।
Visit turconews.click for more information.
তবে ইসলাম মতভেদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দিয়েছে। সত্য অনুসন্ধান, ন্যায়পরায়ণতা, সংযত ভাষা এবং পারস্পরিক সম্মান মতভেদের ক্ষেত্রে এগুলোই একজন মুসলিমের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
মতভেদ মানুষের স্বাভাবিক বাস্তবতা
কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি তোমার রব চাইতেন, তবে তিনি মানুষকে এক উম্মত বানিয়ে দিতেন; কিন্তু তারা মতভেদ করতেই থাকবে।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ১১৮)
মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধির পার্থক্য পৃথিবীর বাস্তবতার অংশ। তবে সব মতভেদ সমান নয়। কোনো মতভেদ হতে পারে সত্য-মিথ্যার প্রশ্নে, আবার কোনোটি হতে পারে কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা বা ইজতিহাদের ক্ষেত্রে।
সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হয়, তবে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। এটাই উত্তম ও পরিণতির দিক দিয়ে শ্রেয়।ইমাম শাতিবি ইজতিহাদি বিষয়ে আলেমদের মতভেদের পেছনে বিভিন্ন দলিলের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার পার্থক্যকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর মতে, ইসলামের অনেক শাখাগত বিষয়ে এমন দলিল রয়েছে, যেগুলোর প্রয়োগ ও ব্যাখ্যায় যোগ্য আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য হতে পারে। (আশ-শাতিবি, আল-মুওয়াফাকাত, ৪/১৮০–১৮১, দারু ইবনে আফফান, রিয়াদ, ১৯৯৭)
মতভেদ আর বৈরিতা এক নয়
মতভেদ মানেই শত্রুতা নয়। একজন মানুষ কোনো বিষয়ে অন্যের চেয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন, অথচ তাঁর প্রতি সম্মান ও সৌজন্য বজায় রাখতে পারেন। ইসলামি জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।
ফিকহের বিভিন্ন মাজহাবের উদ্ভবও মূলত কোরআন-সুন্নাহর দলিল বোঝা, প্রয়োগ ও বিভিন্ন ফিকহি নীতির ব্যবহারে ইজতিহাদি পার্থক্যের ফল।
ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ (রহ.)-এর মধ্যে বহু বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু তাঁদের পারস্পরিক সম্মান ও জ্ঞানগত মর্যাদা অস্বীকারের প্রবণতা ছিল না।
মতভেদ ও মতবৈচিত্র্যের জ্ঞানতত্ত্ব: ইখতিলাফের ফিতরাতি দর্শনসাহাবিদের মধ্যেও দ্বিমত ছিল
মতভেদের আদব বোঝার জন্য সাহাবিদের জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আহজাবের যুদ্ধের পর মহানবী (সা.) সাহাবিদের বনু কোরাইজার দিকে পাঠানোর সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাদের কেউ যেন বনু কোরাইজায় পৌঁছার আগে জোহরের নামাজ আদায় না করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪১১৯)
পথে নামাজের সময় হয়ে গেলে সাহাবিদের একদল নির্দেশটির বাহ্যিক অর্থ অনুসরণ করে বনু কুরাইজায় পৌঁছার পর নামাজ আদায় করেন। আরেক দল মনে করেন, নবীজির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত সেখানে পৌঁছানো। তাই তাঁরা পথেই নামাজ আদায় করেন।
পরে বিষয়টি নবীজির কাছে উত্থাপন করা হলেও তিনি কোনো পক্ষকে ভর্ৎসনা করেননি। সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে এসেছে, দুই দলের কারও প্রতি তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেননি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭৭০)
ইমাম নববি এই ঘটনা থেকে ইজতিহাদের বৈধতা এবং যোগ্য ব্যক্তির দলিলনির্ভর মতপার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। (ইমাম নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম, ১২/৯৩–৯৪, দারু ইহয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৩৯২ হি.)
এ ঘটনা দেখায়, একই নির্দেশনা থেকেও যোগ্য মানুষের উপলব্ধিতে পার্থক্য হতে পারে। তাই মতভেদ হলেই একজনকে বিদ্বেষ বা অবজ্ঞার চোখে দেখা ইসলামি জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সত্যের অনুসরণই মূল লক্ষ্য
মতভেদের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের প্রথম দায়িত্ব নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করা নয়, সত্যকে অনুসরণ করা।
কোরআন বলে, ‘অতঃপর যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ হয়, তবে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। এটাই উত্তম ও পরিণতির দিক দিয়ে শ্রেয়।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯)
এখানে মতভেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি পাওয়া যায়। ব্যক্তির পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা বা নিজের মতের প্রতি আবেগ নয়; দলিল ও সত্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মতভেদে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো মতকে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক করে ফেলা। কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করা আর বক্তব্য প্রদানকারীকে অপমান করা এক বিষয় নয়।
ইমাম ইবনুল কাইয়িম বলেন, সত্যের প্রতি আনুগত্যের অর্থ হলো মানুষ নিজের মতকে সত্যের মাপকাঠি না বানিয়ে সত্যকে নিজের মতের মাপকাঠি বানাবে। (ইবনুল কাইয়িম, ইলামুল মুওয়াক্কিইন, ২/১৮৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯১)
জ্ঞানচর্চায় এই মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মতভেদ যখন সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে আত্মপক্ষ সমর্থনের মাধ্যম হয়ে যায়, তখন জ্ঞানচর্চা ধীরে ধীরে বিতর্কপ্রবণতায় পরিণত হয়।
মতভেদে ভাষারও দায়িত্ব আছে
কোরআন মতভেদের ক্ষেত্রেও উত্তম ভাষার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম কথা বলো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৮৩)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে ডাকো হেকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে; আর তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো উত্তম পদ্ধতিতে।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১২৫)
অর্থাৎ মতের বিরোধ থাকলেও ভাষায় শালীনতা থাকা চাই। ব্যক্তিকে আক্রমণ করা, বিদ্রূপ করা, অপমানজনক উপাধি ব্যবহার করা কিংবা তার নিয়ত সম্পর্কে অনুমান করা ইসলামি আদবের সঙ্গে যায় না।
কোরআন আরও সতর্ক করে বলেছে, ‘হে ইমানদারগণ, যেন কোনো সম্প্রদায় অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১)
মতভেদে মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো মতকে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এক করে ফেলা। কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করা আর বক্তব্য প্রদানকারীকে অপমান করা এক বিষয় নয়।
দাম্পত্য–জীবনে মতভেদ হলে ইসলামের নির্দেশনাআলেমদের মতভেদের আদব
ইসলামি জ্ঞানচর্চায় মতভেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো অপর পক্ষের বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করা। নিজের মতের পক্ষে দলিল জানা যেমন জরুরি, তেমনি অন্যের দলিল ও যুক্তিও বোঝা প্রয়োজন।
ইমাম ইবনে রজব আল-হাম্বলি আলেমদের মতভেদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, পূর্ববর্তী আলেমরা ইজতিহাদি বিষয়ে মতপার্থক্য করলেও তাঁদের মধ্যে জ্ঞান, তাকওয়া ও পারস্পরিক সম্মান বজায় ছিল। (ইবনে রজব, ফাদলু ইলমিস সালাফ আলাল খালাফ, পৃ. ৩৫–৩৭, দারু ইবনিল জাওজি, দাম্মাম, ১৯৯৬)
এই ঐতিহ্য থেকে বোঝা যায়, মতের দৃঢ়তা ও আচরণের কোমলতা পরস্পরবিরোধী নয়। একজন ব্যক্তি নিজের মতকে সঠিক মনে করেও অন্য মুসলিমের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে পারেন।
মতভেদ যেন সম্পর্কচ্ছেদ না ঘটায়
ইসলাম মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইকে তিন দিনের বেশি বর্জন করা বৈধ নয়। তারা যখন পরস্পরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, তখন একজন এদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, অন্যজনও ওদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের মধ্যে উত্তম সে, যে সালাম দিয়ে শুরু করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬০)
এখানে ব্যক্তিগত বিরোধের প্রসঙ্গ থাকলেও এর একটি সাধারণ শিক্ষা রয়েছে যে মতভেদকে এমন পর্যায়ে নেওয়া উচিত নয়, যেখানে তা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ধ্বংস করে দেয়।
সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৯‘তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, পরস্পর হিংসা কোরো না এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ কোরো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকো।আরেক বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর বিদ্বেষ পোষণ কোরো না, পরস্পর হিংসা কোরো না এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ কোরো না। তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে থাকো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৯)
মুসলিম সমাজে মতের বৈচিত্র্য থাকতে পারে। কিন্তু সেই বৈচিত্র্যের সঙ্গে পারস্পরিক সৌজন্য, ন্যায় ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখাও জরুরি।
মতভেদের সীমারেখা কী
তবে মতভেদের আদবের অর্থ এই নয় যে সত্য ও অসত্যের পার্থক্য মুছে ফেলতে হবে। ইসলাম সত্যকে সত্য এবং ভুলকে ভুল বলার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও ন্যায়, প্রজ্ঞা ও উত্তম পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
আল্লাহ নবী মুসা ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে পাঠিয়ে বলেছিলেন, ‘অতঃপর তোমরা তার সঙ্গে কোমল কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৪৪)
যেখানে ফেরাউনের মতো ব্যক্তির সঙ্গেও কথা বলার ক্ষেত্রে কোমলতার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতভেদের সময় একজন মুসলিমের ভাষা ও আচরণ কতটা সংযত হওয়া উচিত, তা সহজেই অনুমেয়।
মোটকথা, ইসলামে মতভেদ নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ হলো অন্যায়, অহংকার, বিদ্বেষ ও সীমালঙ্ঘন। সত্য অনুসন্ধানের জন্য যে মতভেদ মানুষকে জ্ঞানী ও পরিণত করে, তা এক জিনিস; আর যে মতভেদ মানুষকে পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলে, তা আরেক জিনিস।
ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও প্রাবন্ধিক