মেসির নিত্যসঙ্গী থেকে হলান্ডের নতুন প্রেম: এ কোন জাদুকরী পানীয়ের নেশা

· Prothom Alo

বাবার হাত থেকে প্রথমবার পানীয়টা নিয়ে মুখে দিয়েছিলেন সেবাস্তিয়ান ভিয়েরা। তারপর? তেতো স্বাদে মুখ বিকৃত হওয়ার জোগাড়! ভালো লাগেনি একটুও। বহু বছর পর নিজের সন্তানদের হাতে সেই একই পানীয় তুলে দিয়েছিলেন ভিয়েরা। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলো। ছেলেমেয়েদের মুখেও সেই একই বিরক্তি। এত গরম! এত তেতো! মানুষ এসব খায় কীভাবে?

অথচ সেই পানীয়টাই একসময় হয়ে উঠল ভালোবাসার। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক অদ্ভুত পারিবারিক উত্তরাধিকার।

Visit sportbet.rodeo for more information.

পানীয়টার নাম মাতে।

মেসির সবচেয়ে পছন্দের খাবার কী, কেমন তাঁর ডায়েট চার্ট

উরুগুয়ের সাবেক গোলকিপার ভিয়েরা ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে ১৫টি ম্যাচ খেলেছেন। ফুটবলের কত স্মৃতিই না তাঁর! কিন্তু মাতে নিয়ে স্মৃতিটা অন্য রকম। ভিয়েরার কথায়, ‘বাবা প্রথম আমাকে মাতে খেতে দিয়েছিলেন। একেবারেই ভালো লাগেনি। আসলে প্রথমবার খেয়ে কারও ভালো লাগাটা বিরল। আমার সন্তানদেরও একই অভিজ্ঞতা। বলেছিল, খুব গরম, খুব তেতো। কিন্তু ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। তারপর একসময় প্রেমে পড়ে যাবেন।’

মেসির মতো এখন অনেক ফুটবলারের প্রিয় পানীয় মাতে।

প্রেম!

এক পেয়ালা তেতো পানীয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক! শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার মানুষের কাছে এটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে কিংবা ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে মাতে নিছক পানীয় নয়। জীবনযাপনের অংশ। সামাজিকতার অনুষঙ্গ। কখনো বন্ধুত্বের সেতু, কখনো স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র।

আর এই প্রেমের নতুন দূত হয়েছেন ফুটবলাররা।

লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, দারউইন নুনিয়েজ। তালিকাটা অনেক লম্বা। এবার সেখানে নতুন নাম আর্লিং হলান্ড।

ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাতে হাতে নিজের একটি ছবি দিয়েছেন। সঙ্গে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সিটির বর্তমান ও সাবেক তিন আর্জেন্টাইন ফুটবলার এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ ও জেরোনিমো রুলিকে। তাঁদের সৌজন্যেই নাকি এই ‘চমৎকার পানীয়ের’ সঙ্গে পরিচয় হলান্ডের।

সম্প্রতি হলান্ড প্রেমে পড়েছেন মাতের।

ভাবুন একবার!

নরওয়ের এক ফুটবলার দক্ষিণ আমেরিকার শতাব্দীপ্রাচীন এক পানীয়ের প্রেমে পড়েছেন। মাঝখানে সেতুবন্ধন করেছে ফুটবল। বিশ্বায়নের যুগে ফুটবলের এমন সাংস্কৃতিক গোলও কম সুন্দর নয়!

অবশ্য মাতে এখন আর দক্ষিণ আমেরিকার একান্ত নিজস্ব সম্পদ নয়। ফুটবলারদের হাত ধরে অনেক আগেই ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপে। দলের বাসে ওঠার সময় এক হাতে ছোট্ট পেয়ালা, অন্য হাতে গরম পানির ফ্লাস্ক। কখনো অনুশীলনে যাওয়ার পথে, কখনো ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমে। ফুটবলারদের এমন ছবি এখন বেশ পরিচিত।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, চল্লিশেও ‘নবযৌবন’ যাঁর

কিন্তু কী আছে এই পানীয়তে?

মাতে তৈরি হয় দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় একধরনের চিরসবুজ গাছের শুকনা পাতা থেকে। গাছটির নাম ইয়েরবা মাতে। উষ্ণ পানিতে সেই পাতা ভিজিয়ে তৈরি করা হয় পানীয়। তারপর বিশেষ ধরনের ধাতব নল দিয়ে চুমুক দেওয়া হয়। নলটির নাম ‘বোমবিয়া’।

ঐতিহ্যগতভাবে মাতে পান করার পাত্র তৈরি হয় শুকনা, ভেতরটা ফাঁপা করে নেওয়া লাউজাতীয় ফল থেকে। এর নাম কালাবাশ। এখন অবশ্য কাঠ, কাচ কিংবা ধাতুর পাত্রও পাওয়া যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপে মাতের সাজে উরুগুয়ের এক দর্শক।

দেখতে যতটা সহজ, এর ইতিহাস ততটাই গভীর।

ধারণা করা হয়, প্রথম মাতে পান করতেন দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী গুয়ারানি জনগোষ্ঠীর মানুষ। বর্তমান প্যারাগুয়ে এবং আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও দক্ষিণ ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে তাঁদের বসবাস ছিল। এখনো আছে।

অর্থাৎ মাতে পান করার ঐতিহ্য ঔপনিবেশিক যুগেরও আগের।

আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইয়েরবা মাতে ইনস্টিটিউটের রাউল রোমেরো বলেছেন, ‘এই পানীয়ের গভীর সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিকড় রয়েছে। উপনিবেশ স্থাপনের আগেই এ অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে এর প্রচলন ছিল। মানুষের কাছে মাতে পান করার গুরুত্ব অপরিসীম।’

সেই প্রাচীন পানীয়ই একুশ শতকে এসে বিশ্বকাপজয়ী মেসির নিত্যসঙ্গী!

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কথা মনে আছে?

আর্জেন্টিনা সেবার বিশ্বকাপ জিতেছিল। মেসির হাতে উঠেছিল বহু আরাধ্য সোনালি ট্রফি। কিন্তু সেই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের সঙ্গে আরেকটি জিনিসও কাতারে গিয়েছিল। সেটি মাতে।

কতটা?

২৪০ কেজি!

হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। আর্জেন্টিনা দল কাতারে নিয়ে গিয়েছিল ২৪০ কেজি মাতে পাতা। যেন বিশ্বকাপের দীর্ঘ অভিযানে প্রিয় পানীয়ের কোনো ঘাটতি না হয়।

মেসির মতো তাঁর স্ত্রীরও প্রিয় মাতে।

উরুগুয়ের ফুটবলারদের অবস্থাও একই। বিশ্বকাপ চলাকালে উরুগুয়ের প্রেস কর্মকর্তা ফেলিপে কোতেলো দ্য অ্যাথলেটিককে বলেছিলেন, ‘ফুটবলাররা সবাই এটা নিয়ে পাগল। সারাক্ষণ পান করছে। শেষ হবে না। আর শেষ হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। আরও আনিয়ে নেব।’

এ যেন ফুটবলের পাশাপাশি আরেকটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। মাঠে গোল করার লড়াই, মাঠের বাইরে মাতে পান করার!

মেসি না রোনালদো: বয়স ৩০ পেরোনোর পর কে বেশি ভালো

২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও দেখা গিয়েছিল একই ছবি। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলারদের সঙ্গে ঘুরেছে তাঁদের প্রিয় ছোট্ট পেয়ালা।

উরুগুয়ের দলে তখন মাতে প্রেমিকদের অঘোষিত নেতা লুইস সুয়ারেজ, রোনালদ আরাউহো, নিকোলাস দে লা ক্রুস, আগুস্তিন কানোবিও ও রদ্রিগো বেন্তানকুর।

আর্জেন্টিনার দলেও কম প্রতিযোগিতা ছিল না। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, নিকো গঞ্জালেস, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। আর অবশ্যই মেসি ও রদ্রিগো দি পল।

মেসি ও দি পলের মাতে পান করার আবার নির্দিষ্ট সময় ছিল। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টায় মেসির হোটেলকক্ষে বসত দুজনের আসর।

মেসি, রদ্রিগো দি পল ও আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাপিয়া। সবার পছন্দ মাতে।

একটু কল্পনা করুন দৃশ্যটা।

বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মেসি বসে আছেন। পাশে বন্ধু দি পল। সামনে মাতে। হয়তো ফুটবল নিয়ে কথা হচ্ছে, হয়তো একেবারেই ব্যক্তিগত কিছু। কিংবা কোনো কথাই হচ্ছে না। দুই বন্ধুর নীরবতার মধ্যেও যে একধরনের কথোপকথন থাকে!

আসলে মাতে পানের মূল আকর্ষণ এখানেই।

পানীয়ের স্বাদ নয়, পান করার উপলক্ষ।

উরুগুয়ের সাবেক গোলকিপার ভিয়েরা যেমন বলেছেন, ‘উরুগুয়ের হয়ে খেলার সময় আমাদের সঙ্গে সব সময় মাতে থাকত। সব সময়। সত্যি বলতে, আমার মনে পড়ে না এমন কোনো সতীর্থ পেয়েছি, যে মাতে পান করত না। মাতে মানুষকে এক করে। কেউ মাতে তৈরি করলে আপনি থামবেন, একটু গল্প করবেন, হয়তো সঙ্গে কিছু পেস্ট্রিও খাবেন। বিশেষ করে সকালের রুটিনে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

শুধু সকাল কেন?

ভিয়েরার স্মৃতিতে মাতে সর্বত্র, ‘হোটেলে, অনুশীলনে যাওয়ার পথে, বাসে, ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমে। নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। কেউ ম্যাচের আগে পছন্দ করে, কেউ রাতে। প্রত্যেকের নিজস্ব অভ্যাস আছে।’

মাতে পছন্দ সুয়ারেজেরও।

তবে এই অভ্যাসের পেছনে শুধু সামাজিকতা নয়, শরীরের চাহিদাও কাজ করে।

মাতেতে আছে ক্যাফেইন, অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। কফির তুলনায় ক্যাফেইন কম, তবে ব্ল্যাক টির চেয়ে বেশি। ফলে শক্তি ও সতেজতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কেউ কেউ মনে করেন, ক্ষুধাও কিছুটা কমায়।

সুইজারল্যান্ডের এফসি বাসেলের ক্রীড়া পুষ্টিবিদ্যা বিভাগের প্রধান হোসে ব্লেসা এর আগে কাজ করেছেন সৌদি আরবের আল নাসরে। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দক্ষিণ আমেরিকার বাইরের ফুটবলারদের মধ্যে রোনালদোও মাতের বিখ্যাত ভক্ত।

মেসির চোখে ফুটবলে ভবিষ্যতের ১০ তারকা

ব্লেসার ব্যাখ্যা, ‘যেসব ফুটবলার মাতে পান করেন, তাঁরা সাধারণত বেশি তরল গ্রহণ করেন বলে শরীরে পানির ভারসাম্য ভালো থাকে। এতে ক্যাফেইন আছে, যা সহনশক্তি, উদ্যম ও মানসিক মনোযোগ বাড়িয়ে ক্রীড়া পারফরম্যান্স উন্নত করতে সাহায্য করে। এতে অ্যান্টি–অক্সিডেন্টও আছে, যা ফ্রি র‍্যাডিকেলের বিরুদ্ধে কাজ করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।’

তবে সাবধানবাণীও আছে। রাতে মাতে পান না করার পরামর্শ দেন ব্লেসা। ক্যাফেইনের কারণে ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

কিন্তু ফুটবলারদের কাছে এসব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্ভবত গৌণ। আসল ব্যাপারটা অন্য জায়গায়।

যেমন আঁতোয়ান গ্রিজমান।

ফরাসি ফুটবলার আঁতোয়ান গ্রিজমানেরও নিত্যসঙ্গী মাতে।

ফ্রান্সের এই বিশ্বকাপজয়ী ফরোয়ার্ড দক্ষিণ আমেরিকান নন। কিন্তু মাতে তাঁরও প্রিয় পানীয়। আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের ফুটবলারদের সঙ্গে দীর্ঘদিন খেলার সুবাদে তাঁর মধ্যেও গড়ে উঠেছে এই অভ্যাস।

ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের মধ্যেও মাতে প্রেমের সংক্রমণ হয়েছে। সাবেক টটেনহাম ডিফেন্ডার এরিক ডায়ার ২০১৮ সালে বলেছিলেন, ‘আমাদের অনেক ফুটবলার মাতে পান করা শুরু করেছে। দলে অনেক আর্জেন্টাইন ছিল। তাদের সঙ্গে আমিও শুরু করি। এখন ইংলিশ ফুটবলাররা দক্ষিণ আমেরিকান হওয়ার ভান করছে। আমি কিছুটা আসক্ত হয়ে পড়েছি।’

কী মজার ব্যাপার!

ফুটবল মাঠে দক্ষিণ আমেরিকানদের ড্রিবলিং, স্কিল কিংবা পায়ের কারুকাজ নকল করতে চান ইউরোপীয়রা। মাঠের বাইরেও এখন তাঁদের অনুকরণ!

তবে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মানুষের কাছে মাতে নিয়ে আবেগের গভীরতা বোঝা ইউরোপীয়দের পক্ষে হয়তো সহজ নয়।

আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইয়েরবা মাতে ইনস্টিটিউটের হিসাবে, দেশটিতে বছরে মাথাপিছু মাতে পান করার পরিমাণ ছয় কেজির বেশি। ৯০ শতাংশের বেশি পরিবারে মাতে আছে।

সেখানে মাতে দিবস আছে। মাতে বিশেষজ্ঞ আছেন, যাঁদের বলা হয় ‘মাতে সোমেলিয়ে’। মাতে স্বাদের আইসক্রিম আছে। এমনকি মাতে স্বাদের চিপসও পাওয়া যায়। সেই চিপসের প্যাকেটে আবার মেসির ছবি!

প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসও ছিলেন মাতের ভক্ত

বুয়েনস এইরেসে জন্ম নেওয়া প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিসও ছিলেন মাতের ভক্ত।

উরুগুয়েতে তো মাতের জনপ্রিয়তা রীতিমতো জাতীয় আবেগের পর্যায়ে। ২০২৪ সালে রাজধানী মন্টেভিডিওর ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে শিল্পীরা তৈরি করেছিলেন বিশাল আকারের রংবেরঙের মাতে পাত্রের শিল্পকর্ম।

২০২২ বিশ্বকাপে উরুগুয়ে দলের মাসকটের নাম ছিল ‘বোতিহা’। সেটি আসলে মানুষের সমান আকারের একটি থার্মোস ফ্লাস্ক!

২০১৯ সালে মাতে ইমোজি চালু হওয়ার পরও উরুগুয়েতে রীতিমতো আনন্দের উপলক্ষ তৈরি হয়েছিল।

তবে ভালোবাসা যেখানে গভীর, সেখানে অভিমানও থাকে। কখনো কখনো সেই অভিমান রীতিমতো জাতীয় বিতর্কে রূপ নেয়।

২০২২ বিশ্বকাপের কথাই ধরুন।

আর্জেন্টিনা দলের কাতারে নিয়ে যাওয়া মাতে পাতা নিয়ে হঠাৎ দেশটিতে বিতর্ক শুরু হলো। কারণ, পাতাগুলো আর্জেন্টিনার নয়। উৎপাদন হয়েছিল উরুগুয়েতে, প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছিল ব্রাজিলে।

ব্যস, শুরু হয়ে গেল হইচই!

আর্জেন্টিনার সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য লুইস পাস্তোরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘এটা অস্বাভাবিক এবং ব্যাখ্যাতীত। আর্জেন্টিনায় কয়েক ডজন খুব ভালো মাতে ব্র্যান্ড আছে। তার পরেও অন্য দেশের মাতে নেওয়া, এটা প্রায় উসকানি দেওয়ার মতো ব্যাপার।’

ভাবা যায়!

মেসিরা বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন। অথচ দেশে বিতর্ক চলছে, তাঁরা কোন দেশের মাতে পান করছেন!

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন অবশ্য সমালোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তবে দুই বছর পর কোপা আমেরিকায় আর সেই ‘ভুল’ করেনি।

এমি মার্তিনেজের মাতের পেয়ালাটা দেখুন। ২০২২ বিশ্বকাপে সেই বিখ্যাত সেভের ছবি আছে সেখানে।

সেবার ফুটবলারদের হাতে ছিল আর্জেন্টিনার নিজস্ব ব্র্যান্ড কাচামাইয়ের মাতে। ব্র্যান্ডটি আর্জেন্টিনা দলের আনুষ্ঠানিক স্পনসরও হয়ে যায়। দেশের বাজারে তাদের পণ্যের প্যাকেটে জায়গা পান মেসি, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ।

ফুটবল আর মাতে মিলে তৈরি হয় নতুন বাণিজ্যও।

তবে মাতে শুধু আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে কিংবা ইউরোপের ফুটবলেই সীমাবদ্ধ নয়। সিরিয়া ও লেবাননেও পানীয়টি জনপ্রিয়। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলাররা যেখানে গেছেন, সেখানেই কমবেশি ছড়িয়েছেন মাতের সংস্কৃতি।

কোভিডের পর এখন আর একই পেয়ালায় কয়েকজন মিলে মাতে পান করার অভ্যাস নেই।

কোভিড মহামারি অবশ্য এই সংস্কৃতিতে সামান্য পরিবর্তন এনেছে। আগে একই পেয়ালা ও একই ধাতব নল দিয়ে কয়েকজন মিলে মাতে পান করতেন। সংক্রমণের আশঙ্কায় এখন অনেকে সেই অভ্যাস থেকে সরে এসেছেন।

কিন্তু মাতে ঘিরে আড্ডা, বন্ধুত্ব কিংবা একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দটা হারিয়ে যায়নি।

বরং বিশ্বজুড়ে ফুটবল যত ছড়াচ্ছে, ততই নতুন মানুষ পরিচিত হচ্ছেন এই পানীয়ের সঙ্গে।

হলান্ড তার সর্বশেষ উদাহরণ।

নরওয়ের বরফঢাকা প্রকৃতি আর আর্জেন্টিনার রোদেলা ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যে কত দূরত্ব! ভাষা আলাদা। খাবার আলাদা। জীবনযাপনের ছন্দও আলাদা। অথচ এক পেয়ালা মাতে সেই দূরত্বটা কি অনায়াসে ঘুচিয়ে দিতে পারে!

ফুটবলে একটা ভালো পাস যেমন দুই খেলোয়াড়ের মধ্যে অদৃশ্য বোঝাপড়ার জন্ম দেয়, মাতে তেমনি দুজন মানুষের মধ্যে তৈরি করে বন্ধনের সেতু। মেসি থেকে সুয়ারেজ, রোনালদো থেকে গ্রিজমান, এবার হলান্ড। ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি। অথচ সবাইকে এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার এক প্রাচীন পানীয়।

ফুটবলে গোল করতে লাগে একটা বল। বন্ধুত্ব করতে কখনো কখনো শুধু এক পেয়ালা মাতেই যথেষ্ট।

Read full story at source