কিম জং–উন কতটা বিলাসী জীবনযাপন করেন, অবকাশকেন্দ্রের কাছে বড় বড় বিলাসবহুল নৌযান কি তাঁর

· Prothom Alo

উত্তর কোরিয়ার ওয়ানসান উপকূলে গত জুলাই থেকে চলতি মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) থেকে তোলা ছবিতে বারবার একটি বিলাসবহুল নৌযান দেখা গেছে। নৌযানটি দৈর্ঘ্যে ৮০ মিটার বা ২৬৩ ফুট।

Visit bettingx.bond for more information.

নৌযানটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এর ডেকে থাকা ৫০ মিটারের একটি সুইমিংপুল, যার এক প্রান্তে রয়েছে চমৎকার কিছু ওয়াটার স্লাইড।

মাসের পর মাস একটি মেরামতকেন্দ্রে পড়ে থাকার পর গত জুলাইয়ের শুরুতে নৌযানটি ওয়ানসানের কালমা উপদ্বীপের উপকূলীয় জলসীমায় আনা হয়।

ওয়ানসান মূলত সমুদ্রতীরবর্তী একটি মনোরম অবকাশ যাপনকেন্দ্র। সেখানে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ও তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্য রয়েছে বিশাল একটি ভিলা বা প্রাসাদোপম বাড়ি। শুধু ওই নৌযানই নয়, স্যাটেলাইট ছবিতে কিমের ওই ভিলার আশপাশে আরও কয়েকটি বড় নৌযান দেখা গেছে। বিবিসি এসব ছবি বিশ্লেষণ করেছে।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সংস্থা অনুমানের ভিত্তিতে উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। দেশটির বাজেটের সিংহভাগই চলে যায় সামরিক খাতে, যার একটি অংশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয়।

ধারণা করা হচ্ছে, নৌযানগুলো কিম ও তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সাবেক কর্মকর্তা, দেশ ত্যাগ করা নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির শাসকগোষ্ঠীর বাইরের কারও পক্ষে এত বড় নৌযানের মালিক হওয়া কঠিন।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন ওয়ার্কার্স পার্টির ‘৩৯ নম্বর দপ্তরে’ একসময় কাজ করতেন রি জং হো। তিনি বলেন, শীতকালে এই নৌযানগুলো জাহাজ নির্মাণকেন্দ্রে রাখা হয়। গ্রীষ্ম এলে সেখান থেকে বের করে কিম জং–উনের ভিলা বা কালমার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিম ও তাঁর পরিবারের সাঁতার কাটা ও বিনোদনের কাজে এগুলো ব্যবহার করা হয়।

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন

উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ৩৯ নম্বর দপ্তরটি জড়িত বলে ধারণা করা হয়।

উত্তর কোরিয়ার একনায়কতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর কার্যক্রম অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালিত হয়। ফলে শাসনব্যবস্থার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিদের সম্পদের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। দেশটির অর্থনীতির প্রকৃত চিত্রও অস্পষ্ট।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন সংস্থা অনুমানের ভিত্তিতে উত্তর কোরিয়াকে বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। দেশটির বাজেটের সিংহভাগই চলে যায় সামরিক খাতে, যার একটি অংশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয়।

জাতিসংঘের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সিংহভাগ মানুষই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার। নাগরিকদের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। অনেককেই বাধ্য করা হয় জোরপূর্বক শ্রমে। দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকটের কারণে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই অপুষ্টিতে ভুগছেন।

ওয়ানসান মূলত সমুদ্রতীরবর্তী একটি মনোরম অবকাশ যাপনকেন্দ্র। সেখানে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন ও তাঁর পরিবারের ব্যবহারের জন্য রয়েছে বিশাল একটি ভিলা বা প্রাসাদোপম বাড়ি।

অথচ সাধারণ মানুষের এই অনাহার-অর্ধাহারের বিপরীতে উত্তর কোরিয়ার শাসকেরা দশকের পর দশক ধরে কাটিয়ে আসছেন বিলাসী জীবন।

কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে যে নৌযানগুলো দেখা গেছে, সেগুলোর দাম জানা যায়নি। তবে একই ধরনের বিলাসবহুল প্রমোদতরির দাম কয়েক কোটি ডলার থেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। এর আগে কিমের তুলনামূলক ছোট, মাত্র ২৯ মিটার দৈর্ঘ্যের প্রিন্সেস প্রমোদতরিটির আনুমানিক দাম ধরা হয়েছিল ৭০ লাখ ডলার।

কিম জং উন

কেবল নৌযানের অবস্থান দেখে কিম বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঠিক কখন কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয়ে মিল পাওয়া গেছে—যখনই কিম জং–উন দীর্ঘদিন জনসমক্ষের আড়ালে থাকেন, তখনই এই বিলাসবহুল নৌযানগুলোর নড়াচড়া বেড়ে যায়। ফলে এটি স্পষ্ট, সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে তাঁদের এমন কিছু কর্মকাণ্ড চলে, যা রাষ্ট্র কখনোই প্রকাশ করে না।

জীবনীকার ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওয়ানসান শহরটির সঙ্গে কিম পরিবারের নাড়ির টান বহু পুরোনো। কিম জং–উন তাঁর মায়ের সঙ্গে শৈশবের একটা বড় সময় এখানেই কাটিয়েছেন।

নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত কিম জং–ইলের ভিলার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক দেশত্যাগী ব্যক্তি বলেন, ওয়ানসানের আশপাশের ভিলাগুলোতে শুধু অভিজাতদেরই যাতায়াত ছিল এবং গ্রীষ্মের দিনে তিনি সেখানে অনেক শিশু-কিশোরকে পানিতে স্কি করতে দেখেছেন।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে কিমের অবকাশযাপনের খবর সচরাচর প্রকাশ করা হয় না। বরং তাঁর এসব সফরকে সরকারি কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরা হয়। দেশ ত্যাগ করেছেন, এমন কয়েকজন বিবিসিকে বলেছেন, কিমের পরিবার যে ওয়ানসানে অবকাশযাপন করে, তা তাঁরা জানতেন। উত্তর কোরিয়ার অন্তত কিছু মানুষ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, ওয়ানসানে রয়েছে বহুতল হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, ক্রীড়াসুবিধা ও জলবিনোদনকেন্দ্র। সেখানে প্রায় ২০ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব।

অথচ সাধারণ মানুষের এই অনাহার-অর্ধাহারের বিপরীতে দেশটির শাসকেরা দশকের পর দশক ধরে কাটিয়ে আসছেন বিলাসী জীবন।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন

২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া ওয়ানসান কালমা অবকাশকেন্দ্রে রুশ পর্যটকদের ভ্রমণের ছবি প্রকাশ করেছে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রটি তৈরি করা হলেও স্থানীয় পর্যটকদের জন্যও এটি উন্মুক্ত।

দক্ষিণ কোরিয়ার একটি সংবাদমাধ্যম নাম প্রকাশ না করা এক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার কিছু স্থানীয় বাসিন্দার জন্য সেখানে চার রাতের একটি ভ্রমণ প্যাকেজের দাম ধরা হয়েছিল প্রায় ১০০ ডলার। তবে এটি দেশটির বেশির ভাগ মানুষের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ।

জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল প্রায় ৬৬৭ ডলার। একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ছিল ৩৬ হাজার ২২৭ ডলার।

উত্তর কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষের কাছে অবকাশযাপন এখনো নাগালের বাইরে। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি অবসর কাটানোর সময়ই পায় না।

দেশ ত্যাগ করা কয়েকজন বিবিসিকে বলেন, আইন অনুযায়ী শ্রমিক, দপ্তরের কর্মী ও সমবায় খামারের কৃষকদের বছরে ১৪ দিনের ছুটি পাওয়ার কথা। তবে বাস্তবে এই নিয়ম খুব মানা হয় না বললেই চলে।

কিম জংয়ের অজানা জীবনকিম জং-উন

দেশটিতে টানা কয়েক দিন ছুটি নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া একপ্রকার অসম্ভব ও অস্বাভাবিক ঘটনা। বড়জোর মানুষ সাপ্তাহিক ছুটি বা জাতীয় দিবসের দিনগুলোতে একটু আশপাশে যাওয়ার সুযোগ পান।

তবে ছুটি পেলেও ভ্রমণের স্বাধীনতা সীমিত। নিজের শহর বা জেলার বাইরে যেতে সরকারি অনুমতি নিতে হয়। তাই অবাধে চলাচল করতে পারাটাও অনেকের কাছে ছুটি কাটানোর মতোই বিলাসিতা।

বিবিসি ওয়ানসানের আশপাশে চারটি বড় নৌযান শনাক্ত করেছে। এগুলোর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৫০, ৫৫, ৬০ ও ৮০ মিটার। চলতি বছর চারটি নৌযানকেই বারবার কিমের ওয়ানসানের ভিলার আশপাশে দেখা গেছে।

উত্তর কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষের কাছে অবকাশ যাপন এখনো নাগালের বাইরে। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি অবসর কাটানোর সময়ই পায় না।

এর মধ্যে বড় নৌযানটির গতিবিধি ছিল সবচেয়ে স্পষ্ট, যা জুলাই থেকে কালমা উপদ্বীপের জলসীমায় নোঙর করে আছে।

৫০ ও ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যের অন্য দুটি নৌযানকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ওয়ানসানের কাছাকাছি তে ও সিন দ্বীপের আশপাশে বারবার দেখা গেছে। কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের নৌযানটির পাশে চারটি ছোট নৌকাও দেখা গেছে।

কৃত্রিম উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষক জং সঙ–হাক বলেন, ছোট নৌকাগুলো বড় নৌযানে মানুষ, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেয়। তাঁর মতে, তে ও সিনের মতো ছোট দ্বীপগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে ব্যক্তিগত অবকাশযাপনের সুযোগ করে দেয়, যেখানে গোপনীয়তা বজায় রাখা সম্ভব।

মাকে নিয়ে কিম জংয়ের নীরবতা, রহস্য কীউত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন

৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের নৌযানটিকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত কিমের ওয়ানসানের ভিলার কাছে বারবার দেখা গেছে।

উত্তর কোরিয়া কখনো এসব নৌযানের মালিকানা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে অতীতে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে বিবিসি দেখেছে, ২০০২ সালে ওয়ানসানে একই ধরনের একটি বড় নৌযান ছিল। সে সময় দেশটির ক্ষমতায় ছিলেন কিম জং–ইল।

সাবেক মার্কিন বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যান ২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানকে তিনি বলেছিলেন, সাত দিনের সফরের বেশির ভাগ সময় কিম জং–উনের সঙ্গে ওয়ানসানে কাটিয়েছেন। সেখানে তাঁরা জেট স্কি চালিয়েছেন এবং ঘোড়ায় চড়েছেন।

রডম্যান আরও বলেছিলেন, তাঁরা ৬০ মিটার দীর্ঘ একটি নৌযান ব্যবহার করেছিলেন, যা দেখতে অনেকটা ফেরি ও ডিজনিল্যান্ডের ক্রুজের সংমিশ্রণ। তবে এটি সম্প্রতি কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে নজরে আসা ৬০ মিটার দৈর্ঘ্যের নৌযানটিই কি না, তা নিশ্চিত নয়।

উত্তর কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষের কাছে কিম পরিবার ও তাঁদের সমর্থকদের জীবনযাপন শুধু বিলাসী নয়, কল্পনাতীতও মনে হতে পারে। কারণ, রাষ্ট্রীয় প্রচারে সর্বোচ্চ নেতাকে এমন একজন আত্মত্যাগী মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যিনি সব সময় নিজের আগে দেশের কথা ভাবেন।

রি জং হো বলেন, ‘কিম জং–উনকে জনগণের নেতা হিসেবে তুলে ধরা হয়। অথচ সাধারণ মানুষ যেখানে দিনে এক বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে তাঁর চারটি বিলাসবহুল নৌযান রয়েছে।’

Read full story at source