মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার ৫ সেকেন্ডের মধ্যে তুলে খাওয়া কি উচিত
· Prothom Alo

হাত ফসকে মেঝেতে পড়ে যাওয়া প্রিয় খাবারটি মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে তুলে মুখে পুরে দেওয়ার আগে কেউ কি কখনো ভেবে দেখেছে, সেখানে ওঁত পেতে আছে কোন ভয়ংকর অদৃশ্য ঘাতক? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় বেরিয়ে আসা জুতোর তলায় লুকিয়ে থাকা সেই রোমহর্ষক ব্যাকটেরিয়াগুলোর গল্প কি তবে চিরতরে বদলে দেবে ছোটবেলার সেই নিরীহ বিশ্বাস...
ফাইভ-সেকেন্ড রুল। ছোটবেলায় এই নিয়মের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ব্যাপারটি হলো, খুব সুস্বাদু কোনো খাবার হাত ফসকে হঠাৎ মেঝেতে পড়ে গেলে, ৫ সেকেন্ড পার হওয়ার আগেই যদি সেটি তুলে ফেলা যায়, তবে তা খাওয়া নিরাপদ! এর পেছনের যুক্তিটি শুনলে বেশ মজাই লাগে।
Visit mchezo.co.za for more information.
অনেকেরই বিশ্বাস, মেঝেতে ঘাপটি মেরে থাকা জীবাণু, ধুলোবালি বা পোষা প্রাণীর লোম নাকি হঠাৎ করে খাবারের আগমন দেখে হকচকিয়ে যায়। জীবাণুদেরও তো পরিস্থিতি বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে! আর ঠিক সেই সুযোগে বিদ্যুৎগতিতে খাবার তুলে নিলে জীবাণুরা আর সেটিকে ‘নোংরা’ করার সময় পায় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নিয়মের যৌক্তিকতা নিয়ে আমার সন্দেহ হয়েছে। তবুও খুব প্রিয় কোনো খাবার মেঝেতে পড়ে গেলে মনের অজান্তেই হাত নিশপিশ করত সেটি তুলে মুখে পুরে দেওয়ার জন্য। এটি মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে গেছে।
কিন্তু বিজ্ঞান আসলে কী বলে? যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ল্যাবরেটরি টেস্টিং, পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান গিলসন সায়েন্সেসের ডিরেক্টর অফ অপারেশনস এরিন থেন জানিয়ে দিয়েছেন, ৫ সেকেন্ডের নিয়মের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তবে এই এককথায় ‘না’ বলার পেছনে লুকিয়ে আছে অনেকগুলো ছোট ছোট শর্ত ও পরিবেশের ভিন্নতা।
মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাবেন কিমেঝের ধরনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুনতে অবাক লাগলেও, একদম মসৃণ টাইলস বা কাঠের মেঝের চেয়ে কার্পেটের ওপর খাবার পড়লে তাতে জীবাণু সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম থাকে।
জ্যাম মাখানো পাউরুটি ও শুকনো বিস্কুট মাটিতে পড়া এক কথা নয়
এরিন থেনের মতে, খাবারটি মেঝেতে পড়লে কতটা দূষিত হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাবারটি কতটা ভেজা বা চটচটে এবং মেঝের ধরন কেমন। একটি শুকনো ক্র্যাকার বিস্কুট এবং এক টুকরো আঠালো জ্যাম মাখানো পাউরুটি যদি একই মেঝেতে পড়ে, তবে বিজ্ঞান বলছে, শুকনো বিস্কুটের চেয়ে ওই ভেজা পাউরুটিতে জীবাণু আক্রমণ করবে কয়েক গুণ বেশি! কারণ ভেজা বা আর্দ্র খাবার স্পঞ্জের মতো কাজ করে, যা মেঝের সব ময়লা ও জীবাণুকে মুহূর্তের মধ্যে শুষে নেয়। আবার মেঝের ধরনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুনতে অবাক লাগলেও, একদম মসৃণ টাইলস বা কাঠের মেঝের চেয়ে কার্পেটের ওপর খাবার পড়লে তাতে জীবাণু সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম থাকে। কারণ কার্পেটের তন্তুগুলোর ফাঁকে জীবাণুরা আটকে থাকে, তাই খাবারের সঙ্গে ওদের সরাসরি সংস্পর্শ কিছুটা কম হয়।
ভেজা বা আর্দ্র খাবার স্পঞ্জের মতো কাজ করে, যা মেঝের সব ময়লা ও জীবাণুকে মুহূর্তের মধ্যে শুষে নেয়এর পাশাপাশি আরও কিছু সূক্ষ্ম বিষয় এখানে কাজ করে। খাবারটি কোথায় পড়ল, সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য। সেটি কি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোনো রাজপ্রাসাদের মেঝে, নাকি রাস্তার পাশের কোনো পাবলিক টয়লেটের ফ্লোর? মেঝেতে পড়ার পর খাবারটি যে ব্যক্তি খাচ্ছেন, তার শারীরিক অবস্থা কেমন? একজন সুস্থ-সবল ও পূর্ণবয়স্ক মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যে জীবাণুকে সহজেই ধ্বংস করতে পারে, একজন দুর্বল বা আগে থেকেই অসুস্থ মানুষের জন্য সেই সামান্য জীবাণুই হয়তো মারাত্মক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তারিখ পার হয়ে যাওয়া খাবার খাব কিকোরিনেব্যাকটেরিয়াম থেকে ডিপথেরিয়ার মতো জটিল রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মানুষের অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরয়ডেসও জুতো বা ব্যাগের মাধ্যমে মেঝেতে চলে আসে।
জুতার তলায় লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য শত্রুর দল
সবচেয়ে ভয়ংকর ও চমকপ্রদ তথ্যটি হলো, ঘরের সাধের চকচকে মেঝে আর বাইরের পাবলিক স্পেসের মেঝের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার খুব একটা পার্থক্য নেই! সাধারণ মানুষের ধারণা থাকে, নিজের ঘরের মেঝে বাইরের রাস্তার চেয়ে অনেক বেশি পরিষ্কার। কিন্তু গবেষকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। মানুষ যখন বাইরে বের হয়, তখন জুতোর তলায় বা মোজায় করে হাজারো অদৃশ্য জীবাণু তুলে নিয়ে আসে। এরপর সেই একই জুতো বা মোজা পায়ে দিয়ে ঘরের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বাথরুম, ড্রয়িংরুমসহ সব জায়গায় হেঁটে বেড়ানো হয়। এভাবেই এক জায়গার জীবাণু খুব সহজেই আরেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাড়িকে দূষিত করে তোলে।
এখন প্রশ্ন হলো, সাধারণ ধুলোবালির বাইরে মেঝেতে ঠিক কী ধরনের ভয়ংকর জীবাণু ওঁত পেতে থাকে? বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের মেঝেতে প্রচুর পরিমাণে ত্বকে বসবাসকারী ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্ট্যাফিলোকক্কাস। এই ব্যাকটেরিয়া ত্বকের ভয়ংকর ইনফেকশন ঘটাতে পারে। এছাড়া থাকে কোরিনেব্যাকটেরিয়াম। এটি থেকে ডিপথেরিয়ার মতো জটিল রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মানুষের অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ব্যাকটেরয়ডেসও জুতো বা ব্যাগের মাধ্যমে মেঝেতে চলে আসে। এর সঙ্গে যোগ হয় ব্যাসিলাস, বিভিন্ন ধরনের ছত্রাক বা ইস্ট। এগুলো পেটে গেলে তীব্র বমি, ডায়রিয়া ও বমি বমি ভাব তৈরি হতে পারে।
খাবার নিয়ে কিছু মজার বিজ্ঞানবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের মেঝেতে প্রচুর পরিমাণে ত্বকে বসবাসকারী ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো স্ট্যাফিলোকক্কাস।
সব মিলিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, ওই ৫ সেকেন্ডের ভরসায় মেঝে থেকে তুলে খাওয়াটা আসলে নিজের শরীরের সঙ্গে এক ধরনের জুয়া খেলার মতোই। বিশেষ করে ভেজা বা আঠালো খাবার মেঝেতে পড়লে তা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।
এরিন থেন সতর্ক করে দিয়েছেন, ভেজা খাবার মেঝের সংস্পর্শে আসামাত্রই স্পঞ্জের মতো সব নোংরা টেনে নেয়। তাই সব শেষে একটি অলিখিত নিয়মই মেনে চলা উচিত—মেঝেতে পড়া কোনো খাবারই খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না। ৫ সেকেন্ড তো দূরের কথা, ১ সেকেন্ডে তুলে নিলেও জীবাণুর আক্রমণ থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।
সূত্র: পপুলার সায়েন্সবিশ্বের সবচেয়ে পুষ্টিকর কয়েকটি খাবার