তিন সচিবসহ ১৫ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তুরস্কে যাচ্ছেন, লক্ষ্য অভিজ্ঞতা অর্জন
· Prothom Alo
সরকারের তিনজন সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ১৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একসঙ্গে তুরস্ক সফরে যাচ্ছেন। সফরের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, দুর্যোগ মোকাবিলাসহ নানা বিষয়ে তুরস্কের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন ও সহায়তা। আগামী মাসের শেষের দিকে ঠিক করা এই সফরের খরচ বহন করবে তুরস্ক সরকার।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
তুরস্ক সফরে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী। অন্য দুজন সচিব হচ্ছেন ধর্মসচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চশিক্ষা বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিনিধিদলে থাকছেন।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের বাঁকবদলইআরডির এক আদেশে এ সফরের কথা জানানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের যাবতীয় খরচ তুরস্ক সরকার বহন করবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একসঙ্গে এত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার তুরস্ক সফর আগে হয়েছে কি না, তা মনে করতে পারেননি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। অতীতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাপান, ভারতসহ কিছু দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের বড় দল এ ধরনের সফর করেছেন।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে এবারের সফরকে দুই দেশের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালে ড্রোন সংগ্রহ নিয়ে তুরস্কের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী।
সফরের তালিকায় নাম থাকা একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে আগ্রহী বর্তমান সরকার। তুরস্কও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। এই অবস্থায় প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, দুর্যোগ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে দেশটি সফরে যাচ্ছে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলটি। আগামী ২৩ থেকে ২৭ নভেম্বর তুরস্কে এ সফর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আগামী দুই মাসে প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফরের প্রস্তুতিদুই দেশের সফর বিনিময় বেড়েছে
বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্কে অতীতে টানাপোড়েনও ছিল। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়। ওই বিচার ও মৃত্যুদণ্ড নিয়ে তুরস্কের আপত্তি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছিল। অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশ-তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গতি পায়। বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে বলে সরকারি সূত্রগুলো বলছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একসঙ্গে এত ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার তুরস্ক সফর আগে হয়েছে কি না, তা মনে করতে পারেননি প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। অতীতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, জাপান, ভারতসহ কিছু দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের বড় দল এ ধরনের সফর করেছেন।
আগামী ১০ থেকে ১২ নভেম্বর তুরস্কের আনাতোলিয়ায় কপ৩১-এর শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হবে। এই বৈঠকে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তুরস্ক সফর করার কথা রয়েছে।
গত মাসের শুরুতে তুরস্ক সফর করেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি সেখানে বেশ কিছু কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং তুরস্কের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে গত জুলাইয়ে তুরস্কে পাঁচ দিনের সরকারি সফর করেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান।
গত ৫ ও ৬ জুন বাংলাদেশ সফর করেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। সফরে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর করার পাশাপাশি তা বিস্তৃত পরিসরে উন্নীত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারি সূত্র বলছে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যৌথ উৎপাদন ও রোহিঙ্গা সংকট গুরুত্ব পায়। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার উদ্যোগের কথা বলেছিলেন। তুরস্কের সহযোগিতায় বগুড়ায় ড্রোন তৈরির কারখানা করা হবে বলে গত জুলাইয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। এ ছাড়া বগুড়ায় নির্মিতব্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে এ কারখানা হবে বলে জানান তিনি।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে এবারের সফরকে দুই দেশের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২২ সালে ড্রোন সংগ্রহ নিয়ে তুরস্কের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছিল বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী।
আগামী বছর ২০ ও ২১ জানুয়ারিতে ঢাকায় বাংলাদেশ-তুরস্ক যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) সভা হওয়ার কথা রয়েছে। নভেম্বরে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সফরে সহযোগিতার নানা ক্ষেত্রে চিহ্নিত করা এবং আলোচনা হতে পারে। পরবর্তী সময় জেইসি সভায় দুই দেশের মধ্যে নানা চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রতিরক্ষা, রোহিঙ্গা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা
তিন সচিবের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের পাঁচ দিনের এই সফরে কী কী বিষয়ে আলোচনা হবে, তার একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৮ অক্টোবর। বৈঠকে আলোচনার একটি প্রাথমিক খসড়াও তৈরি করা হয়।
তুরস্কের সঙ্গে কী কী বিষয়ে আলোচনা হবে—এ বিষয়ে কথা হয় প্রতিনিধিদলের অন্তত পাঁচ সদস্যের সঙ্গে। তাঁরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, যেসব খাতে তুরস্ক ভালো করেছে, সেসব বিষয়ে সহযোগিতা চাওয়া হবে। প্রতিরক্ষা খাত নিয়ে এর আগে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এ সফরেও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি হস্তান্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার ও ল্যাব স্থাপনে সহযোগিতা চাওয়া হবে। বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়ে আলোচনা হবে। দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি (পিটিএ) সইয়ের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা দিয়ে আসছে তুরস্ক। টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে দেশটির কাছে আরও সহযোগিতা চাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে তুরস্কের সহযোগিতা চাওয়া হবে। দেশটি এ প্রযুক্তি ব্যবহারে তাদের দেশে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্প ও ভূমিধসের আগে সতর্কবার্তা পেতে তাদের কাছে প্রযুক্তির সহযোগিতা চাওয়া হবে।
দুর্যোগসচিব আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়েও দেশটির কাছে সহযোগিতা চাওয়া হবে। তুরস্কের অর্থায়নে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।