বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংজিতে কেন মাছ ধরা নিষিদ্ধ

· Prothom Alo

এশিয়ার দীর্ঘতম ও বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংজি। এটি তিব্বত মালভূমির তাঙ্গুলা পর্বতমালা থেকে শুরু হয়ে সাংহাইয়ের কাছে পূর্ব চীন সাগরের সঙ্গে মেশার আগে মধ্য ও পূর্ব চীনের প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে।

কোটি কোটি মানুষকে পানি ও জীবিকা দেওয়ার পাশাপাশি এই নদী ছিল অনেক অদ্ভুত ও সুন্দর জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। এর মধ্যে রয়েছে বাইজি ডলফিন, বিশাল আকৃতির চায়নিজ প্যাডলফিশ, চায়নিজ জায়ান্ট স্যালামান্ডার, ইয়াংজি ফিনলেস পোর্পোইস এবং চায়নিজ সাকারের মতো অনন্য সব বন্য প্রাণী।

Visit moryak.biz for more information.

তবে কয়েক দশক ধরে নদীর পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণে এই প্রাণীগুলোর অনেকগুলোই আজ বিলুপ্ত, প্রায় বিলুপ্ত কিংবা বিলুপ্তির পথে।

অতিরিক্ত মাছ ধরা, একের পর এক বাঁধ নির্মাণ, দূষণ, নদী খনন এবং নদীর আশপাশে জমি দখলের ফলে ১৯৫০ সাল থেকে ইয়াংজি নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় কিছু অসাধু জেলে মাছ ধরার জন্য বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রোফিশিং, বিষের মতো ধ্বংসাত্মক উপায় বেছে নেয়।

২১ শতকের শুরুতে দেখা যায়, ২০ শতকের প্রথমার্ধের তুলনায় নদীতে মাছের উৎপাদন কমে মাত্র ২৫ ভাগে নেমে এসেছে। এমনকি ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী অন্তত ১৩৫টি মাছের প্রজাতি নদী থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।

ধানখেতের বাসিন্দা খলশে মাছ কোথায় গেলএশিয়ার দীর্ঘতম ও বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম নদী ইয়াংজি

বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে ২০২১ সালে চীনের সরকার একটি বড় পদক্ষেপ নেয়। তারা পুরো নদী এলাকাজুড়ে বাণিজ্যিক মাছ ধরার ওপর ১০ বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে ২০৩০ সালের দিকে। এটি বাস্তবায়নে প্রায় ২ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করা হয়। এই প্রকল্পের অধীন ১ লাখ ১১ হাজার নৌকা নদী থেকে তুলে নেওয়া হয় এবং মাছ ধরে সংসার চালানো ২ লাখ ৩১ হাজারের বেশি মানুষকে অন্য পেশায় পুনর্বাসিত করা হয়।

তবে এই বিশাল বিনিয়োগের সুফল এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘সায়েন্স’ (Science) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় নদীর ৫৭টি জায়গায় মাছের অবস্থা তুলনা করে দেখা হয়েছে। এতে নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগের (২০১৮-২০) ও পরের (২০২১-২৩) সময়ের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হয়।

দেখা গেছে, নদীতে মাছের মোট পরিমাণ আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বিশেষ করে বড় আকারের মাছের সংখ্যা তো ২৩২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

পৃথিবীর একমাত্র মিষ্টি পানির পরপয়েজ বা ডলফিন–জাতীয় প্রাণী

প্রাণীর সংখ্যায় বড় পরিবর্তন

নিষেধাজ্ঞার পর নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উপস্থিতি ১৩ শতাংশ বেড়েছে। এমনকি একদম বিলুপ্তির মুখে থাকা কিছু বিরল প্রজাতির ক্ষেত্রেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ইয়াংজি স্টারজন এবং চায়নিজ সাকারের আবার দেখা মিলছে। বিশালাকার সব বাঁধের কারণে এই মাছগুলো এদের ডিম ছাড়ার জায়গায় ঠিকমতো যেতে না পারলেও, এদের সংখ্যা যে একটু একটু করে বাড়ছে, তার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে ইয়াংজি ফিনলেস পরপয়েজের ক্ষেত্রে। এটি পৃথিবীর একমাত্র মিষ্টি পানির পরপয়েজ বা ডলফিন–জাতীয় প্রাণী। তবে এরা ডলফিন থেকে আলাদা। দেখতে হাসিখুশি মুখ আর তরমুজের মতো মাথার জন্য প্রাণীটি বেশ পরিচিত। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, নদীতে এদের সংখ্যা ২০১৭ সালের ৪৪৫টি থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৫৯৫টিতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরেই এই সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

চিংড়ি মাছ, কাঁকড়া নয় কেনঅতিরিক্ত মাছ ধরা, একের পর এক বাঁধ নির্মাণ, দূষণ, নদী খনন এবং নদীর আশপাশে জমি দখলের ফলে ১৯৫০ সাল থেকে ইয়াংজি নদীর জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে

সাফল্য মিলেছে, তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়

নদীর তীরে যুগ যুগ ধরে বসবাস করা জেলেদের জীবনের কী অবস্থা হলো, সে বিষয়টি এই গবেষণায় সরাসরি উঠে আসেনি।

তবে সরকারি হিসাব থেকে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ২ লাখ ৩১ হাজার মানুষের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ ২০২৩ সালের মধ্যে নতুন কাজ খুঁজে পেয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এখন ইয়াংজি নদী পাহারা দেওয়ার বা সুরক্ষার কাজ করছেন। এছাড়া প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরকারি সামাজিক ভাতা বা সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে।

তবে সরকার ছাড়া অন্য কোনো স্বাধীন সংস্থার নিরপেক্ষ তথ্য না থাকায় জেলের আয় আগের মতো আছে কি না কিংবা তারা নতুন কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না।

গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এই পর্যবেক্ষণ খুব অল্প সময়ের। এই নিষেধাজ্ঞা আসলেই কতটা কাজ করছে এবং পরিবেশের এই উন্নতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, তা বুঝতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে নজর রাখতে হবে।

তবে গবেষকেরা আশা হারাচ্ছেন না। তাঁদের মতে, এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে পরিবেশ রক্ষার নতুন অনুপ্রেরণা হতে পারে। গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, অল্প সময়ে জীববৈচিত্র্যের এই পরিবর্তন দেখে তাঁরা আশাবাদী। তবে আবার মাছ ধরা শুরু হলে কিংবা বাঁধের প্রভাব, নদীদূষণ ও পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো না মিটলে এই সাফল্য সহজেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

গবেষকেরা আরও জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেকং বা দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের মতো বড় নদীগুলোতেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে চাষের মাধ্যমে মাছের চাহিদা মেটাতে পারলে একদিকে মানুষের প্রোটিনের অভাব দূর হবে, অন্যদিকে নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশও বেঁচে যাবে।

সূত্র: ন্যাচারাল ওয়ার্ল্ড ফান্ড ও আইএফএল সায়েন্সতাজা মাছ থাকতে শুঁটকি কেন

Read full story at source