হাবিলদার পোশাকে নজরুলের প্রতিকৃতি: বিদ্রোহের পূর্বমুহূর্তের নান্দনিক দলিল

· Prothom Alo

হাবিলদার পোশাকে কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিকৃতি বাংলা আলোকচিত্র-ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় স্টুডিও পোর্ট্রেট। এর শিল্পমূল্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রতীকী ভাষা—তিনটি স্তরেই এটি একটি ক্ল্যাসিক আলোকচিত্র।

প্রথমেই চোখে পড়ে দণ্ডায়মান ভঙ্গি। নজরুল দাঁড়িয়ে আছেন—আত্মবিশ্বাসী, সোজা ও স্থির। তাঁর শরীরের ওজন এক পায়ে সামান্য স্থানান্তরিত; বাঁ হাতটি রাখা আছে সৈনিকের হেলমেটের ওপর, ডান হাত কোমরে। এই ভঙ্গি কৃত্রিম স্টুডিও-অঙ্গভঙ্গি হলেও এর মধ্যে আত্মমর্যাদা ও কর্তৃত্বের অনুভূতি প্রবল।

Visit sport-tr.bet for more information.

সামরিক পোশাকের নির্মাণও লক্ষণীয়। পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম, বুকের ওপর তির্যক বেল্ট, হাঁটু পর্যন্ত পট্টি জড়ানো পা এবং ভারী বুট—সব মিলিয়ে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন তরুণ হাবিলদার। কিন্তু মুখাবয়বে কোনো সামরিক কঠোরতা নেই। বরং সেখানে আছে চিন্তার গভীরতা এবং এক অদ্ভুত কোমলতা—এই দ্বৈততা ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

স্টুডিওর আঁকা ব্যাকড্রপ, পাশে কাপড়ে ঢাকা টেবিল, তার ওপর রাখা হেলমেট এবং অলংকৃত চেয়ার—সবই বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের ভারতীয় স্টুডিও আলোকচিত্রের পরিচিত উপাদান। এগুলো নিছক সাজসজ্জা নয়; বরং সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব নির্মাণের দৃশ্যভাষা।

সামরিক পোশাকের নির্মাণও লক্ষণীয়। পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম, বুকের ওপর তির্যক বেল্ট, হাঁটু পর্যন্ত পট্টি জড়ানো পা এবং ভারী বুট—সব মিলিয়ে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন তরুণ হাবিলদার। কিন্তু মুখাবয়বে কোনো সামরিক কঠোরতা নেই। বরং সেখানে আছে চিন্তার গভীরতা এবং এক অদ্ভুত কোমলতা। এই দ্বৈততা ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

আলোকসজ্জা সরাসরি নয়, নরম। ফলে মুখে তীব্র ছায়া পড়েনি। চোখের দৃষ্টি সামান্য ক্যামেরার বাইরে নিবদ্ধ। দর্শকের দিকে সরাসরি তাকিয়ে না থেকেও তিনি যেন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই দৃষ্টিই ছবিটিকে সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করায়।

ছবিটির বর্তমান রঙিন সংস্করণটি পরবর্তীকালের রঙায়ন। ফলে এটি মূল আলোকচিত্র নয়, বরং একটি পুনর্নির্মিত দৃশ্য। তবু রঙের ব্যবহার, বিশেষত নীল পটভূমি, খয়েরি বুট, ক্রিম রঙের ইউনিফর্ম ও লাল বেল্ট প্রতিকৃতির নাটকীয়তা বাড়িয়েছে। তবে গবেষণার জন্য অবশ্যই মূল সাদা-কালো প্রিন্টকেই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

হাবিলদারের পোশাকে কাজী নজরুল ইসলাম, ১৯২০, কলকাতা, (আলোকচিত্রীর নাম অজানা)

এই প্রতিকৃতির সবচেয়ে গভীর তাত্পর্য নিহিত রয়েছে এর কালগত অবস্থানে। এখানে আমরা যে মানুষটিকে দেখি, তিনি তখনো ‘বিদ্রোহী’ কবি নন; অগ্নিবীণা প্রকাশিত হয়নি; ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখা হয়নি। কিন্তু তাঁর মুখাবয়বের অন্তর্লীন তেজ, দৃষ্টির আত্মবিশ্বাস ও দেহভঙ্গির দৃঢ়তা যেন ভবিষ্যতের কবিকে আগাম ঘোষণা করছে।

এই একটি ছবিতে তিনটি পরিচয় একত্র হয়েছে—সৈনিক, কবি ও বিদ্রোহী। তাই এটি কেবল একটি প্রতিকৃতি নয়; এটি একজন মানুষের আত্মপরিচয়ের সন্ধিক্ষণের দৃশ্যমান দলিল।

বাংলা আলোকচিত্রের ইতিহাসে এই ছবির যথার্থ মূল্যায়ন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আলোকগ্রাহকের পরিচয়, স্টুডিওর অবস্থান, নেগেটিভের উত্স, প্রথম প্রকাশ, বিভিন্ন সংস্করণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী রঙায়নের ইতিহাস নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা জরুরি। সেই গবেষণা সম্পন্ন হলে এই আলোকচিত্র কেবল নজরুল-গবেষণার নয়, ঔপনিবেশিক ভারতীয় স্টুডিও আলোকচিত্রের ইতিহাসেও একটি কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করবে।

বাংলা আলোকচিত্রের ইতিহাসে এই ছবির যথার্থ মূল্যায়ন এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আলোকগ্রাহকের পরিচয়, স্টুডিওর অবস্থান, নেগেটিভের উত্স, প্রথম প্রকাশ, বিভিন্ন সংস্করণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী রঙায়নের ইতিহাস নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা জরুরি। সেই গবেষণা সম্পন্ন হলে এই আলোকচিত্র কেবল নজরুল-গবেষণার নয়, ঔপনিবেশিক ভারতীয় স্টুডিও আলোকচিত্রের ইতিহাসেও একটি কেন্দ্রীয় স্থান অধিকার করবে।

হাবিলদারের পোশাকে কাজী নজরুল ইসলামের আলোকচিত্র অবলম্বনে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ থেকে প্রকাশিত ডাকটিকিট, ২০২৬

আজও যখন আমরা এই প্রতিকৃতির সামনে দাঁড়াই, মনে হয়—ক্যামেরার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণ সৈনিক শুধু একটি ছবি তোলেননি; তিনি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। তাঁর শরীর স্থির, কিন্তু তাঁর উপস্থিতি আজও গতিশীল। তাই সত্যিই বলা যায়—প্রয়াত হয়েও তিনি সরব।

Read full story at source