ভিটেমাটি বেদখল, গানও বেহাত—তবু অমলিন ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ গানের রাধারমণ

· Prothom Alo

এক ঝিমকালো অন্ধকার শীতের রাতে সাধককবি রাধারমণের বাড়িতে পৌঁছাই। সময়টা ছিল গত বছরের ডিসেম্বর। তাঁর গান ও জীবন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এর আগেও অনেকবার এখানে আসা হয়েছে। তবে সে রাতের স্মৃতি বেশ উজ্জ্বল। রাধারমণের সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে সিলেটের শিল্পী ইকবাল সাঁই গাইলেন রাধারমণেরই লেখা গান। স্রষ্টার সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে গাইতে গিয়ে ইকবাল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর চোখের কোণে জমে পানি। হয়তো সে কারণেই বারবার গানের পদে ভুল করছিলেন, কোথাও এক-আধটি পঙ্‌ক্তি ছেড়েও যাচ্ছিলেন!
অমৃত এক স্মৃতিসুধা নিয়ে সেদিন রাতে নলুয়ার হাওরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কেশবপুর গ্রাম থেকে ফিরি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার এই কেশবপুরেই রাধারমণের বাড়ি। যদিও তাঁর ভিটেমাটির প্রায় পুরোটাই এখন বেদখল। তবে সেখানে রয়েছে রাধারমণের সমাধি। পাশে সবুজ-শ্যামল, ছায়াঘেরা পুকুর। এসব দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ভিড় জমান মানুষ। প্রায় তিন দশক ধরে রাধারমণ স্মরণে তাঁর গ্রামে বেসরকারি উদ্যোগে নিয়মিত উৎসব হতো। সেখানে ঘটত প্রাণের সম্মিলন। কয়েক বছর আগে সেই উৎসব সরকারি উদ্যোগে উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে স্থানান্তর করা হয়। এসব আয়োজনে যোগ দিতেন দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত শিল্পী থেকে শুরু করে সংগীতপ্রেমীরা।

Visit moryak.biz for more information.

রাধারমণের পুরো নাম রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ। বৈষ্ণব-সহজিয়া ধারার এই গীতিকবি মারা যান ১৯১৬ সালে। যদিও কোনো কোনো গবেষকের মতে, তাঁর মৃত্যুসাল ১৯১৫। জন্মসাল নিয়েও রয়েছে কিছুটা মতভেদ। কেউ বলেন ১৮৩৪, কারও মতে ১৮৩৩। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়ের গানের ঐতিহ্যবাহী ধারা ধামাইলের স্রষ্টা হিসেবে তাঁকে মনে করা হয়। হাওরাঞ্চলের এমন কোনো বিয়ের উৎসব নেই, যেখানে রাধারমণের গান পরিবেশিত হয় না! এর বাইরেও তিনি লিখেছেন নানা ধারার হাজারো গান। এসব গানের মধ্যে রয়েছে বিচ্ছেদ, মনশিক্ষা, গোষ্ঠ থেকে শুরু করে ধর্মীয় পর্যায়ের গান।

রাধারমণের সমাধির পাশে শিল্পী ইকবাল সাঁই

রাধারমণের গানের কোনো পাণ্ডুলিপি ছিল না। মুখে মুখেই তিনি পদ রচনা করতেন। সেসব পদ শিষ্য, ভক্ত ও গুণগ্রাহীদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে লোকমুখে। প্রথমে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে, পরে এক থানা থেকে আরেক থানায়, এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। এখন বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় রাধারমণের গান। যেখানে বাঙালির বসবাস, যেখানে উৎসব-উচ্ছ্বাস, সেখানেই শিল্পীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় তাঁর গান। বাংলাদেশ ও কলকাতার নাটক-চলচ্চিত্রেও নানা আঙ্গিকে ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর গান। এমনকি ইংরেজি ও ইতালীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে তাঁর গান গেয়েছেন ভিনদেশি শিল্পীরাও।

রাধারমণের গানের পাণ্ডুলিপি না থাকলেও লোকমুখে ছড়িয়ে থাকা গান সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছিলেন কয়েকজন গবেষক। তাঁদের প্রচেষ্টায় সংরক্ষিত হয়েছে তাঁর হাজারো গান। রাধারমণের গানের উল্লেখযোগ্য সংগ্রাহকদের মধ্যে রয়েছেন গুরুসদয় দত্ত, মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, আবদুল গফফার চৌধুরী, চৌধুরী গোলাম আকবর, বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী ও নন্দলাল শর্মা। তবে এসব মনীষীর উদ্যোগ সত্ত্বেও ভিটেমাটির মতো রাধারমণের গানও বেহাত হয়েছে। অন্য গীতিকারের ভণিতা যুক্ত করে রাধারমণের গান গাওয়ার নজিরও কম নয়। আবার অজ্ঞতাবশত অনেক শিল্পী অন্যের গানও রাধারমণের নামে প্রচার করছেন।
শিল্পী-শ্রোতাদের কাছে রাধারমণের অনেক গানই জনপ্রিয়। এর মধ্যে উল্লেখ করা যায়, ‘ভ্রমর কইও গিয়া, শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে রাধার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া’, ‘আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিবার মনে লয়’, ‘জলের ঘাটে দেইখা আইলাম কী সুন্দর শ্যামরায়’, ‘জলে যাইও না গো রাই’, ‘আমি কারে বা দেখাব মনের দুঃখ গো হৃদয় চিরিয়া’, ‘আমার কৃষ্ণ কোথায় পাই গো, বল গো সখী কোন দেশেতে যাই’, ‘শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধু রে’, ‘আমার বন্ধু বিনোদিয়া’ এবং ‘আমারে আসিবার কথা কইয়া, মান করে রাই রইয়াছো ঘুমাইয়া’।

রাধারমণের গান দেশের সীমানা পেরিয়ে ধীরে ধীরে ভিনদেশেও সমাদৃত হচ্ছে। তবে কয়েক দিন ধরে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্রের পাতায় আলোচনায় এসেছে তাঁর নাম। আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বর রাধারমণের প্রয়াণদিবসের অনুষ্ঠান এলাকার কবরস্থানের পাশে না করার অনুরোধ জানিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করেছে ‘কেশবপুর ইসলামিক অর্গানাইজেশন’ নামের স্থানীয় একটি সংগঠন। আবেদনে গানবাজনাকে অনৈসলামিক উল্লেখ করে অনুষ্ঠান বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
রাধারমণের প্রয়াণদিবসের আয়োজন নির্ধারিত সময়ে হবে কি না, কিংবা হলেও কেশবপুর গ্রামে, নাকি উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে হবে—এ নিয়ে এখনো স্থানীয় লোকজনের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে এসব বিতর্ক ছাপিয়ে সংগীতপিপাসু মানুষের কাছে রাধারমণ আজও তাঁর গানেই উজ্জ্বল। তাঁর ভিটেমাটি বেদখল হয়েছে, গান নিয়েও রয়েছে নানা বিভ্রান্তি; তবু মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে বেঁচে আছে তাঁর সৃষ্টি।
জন্মের দ্বিশতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, মৃত্যুর শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও রাধারমণ প্রাসঙ্গিক, তাঁর গানও অমলিন।

Read full story at source