গত ষাট বছরের মধ্যে র‍্যামের দাম এখন সবচেয়ে বেশি কেন, দাম কমবে কবে

· Prothom Alo

গত দেড় বছরে কম্পিউটারের র‍্যামের (RAM) দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বছরের বাকি সময়ও দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। অথচ গত ষাট বছর ধরে এই যন্ত্রাংশের দাম সব সময় নিয়মিত কমে আসছিল।

Visit een-wit.pl for more information.

হঠাৎ করে এমন দাম বেড়ে যাওয়াটা সত্যিই মেনে নেওয়া কঠিন। তাই সবাই এই পরিস্থিতির নাম দিয়েছে ‘র‍্যাম অ্যাপোক্যালিপস’ বা র‍্যামসংকট। এককালের পানির দামে এই জিনিস এখন যেন এক বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত হয়েছে। আর এ কারণেই নতুন কোনো ফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেট কিনতে চাইলে এখন থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

র‍্যাম আসলে কী?

র‍্যাম বা র‍্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি হলো যেকোনো কম্পিউটারের খুব জরুরি একটি অংশ। এটি কম্পিউটারকে দ্রুত কাজ করতে এবং তথ্য পড়তে সাহায্য করে।

কম্পিউটারের ব্রেইন বা সিপিইউের কাজ করার জন্য সব সময় তথ্যের অবিরাম সরবরাহ দরকার হয়, যা সাধারণত হার্ড ড্রাইভে জমা থাকে। কিন্তু হার্ড ড্রাইভ যতই ভালো হোক না কেন, সিপিইউকে ঠিকমতো তথ্য জোগাড় করে দেওয়ার জন্য তা যথেষ্ট দ্রুতগতির নয়। ঠিক এই জায়গাতেই সেতু হয়ে কাজ করে র‍্যাম। হার্ড ড্রাইভ থেকে ফাইল টেনে এনে সিপিইউের কাজের জন্য প্রস্তুত রাখে র‍্যাম।

তোমার কম্পিউটারে র‍্যামের পরিমাণ যত বেশি থাকবে, তথ্যগুলো তত দ্রুত কাজের জন্য প্রস্তুত থাকবে। অনেক সময় কম্পিউটার স্লো হয়ে গেলে ভালো প্রসেসর কেনার চেয়ে র‍্যাম বাড়ানো বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। তবে এই দাম বাড়ার সংকট শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত নিয়মটি এমনই ছিল।

আমেরিকার সব শিশুকে স্পেসএক্সের শেয়ার দেবেন ইলন মাস্ক, কীভাবে

র‍্যাম আসলে তৈরি হয় কোথা থেকে?

বিশ্বের বেশির ভাগ র‍্যাম মূলত তিনটি মাত্র কোম্পানি তৈরি করে। স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স এবং মাইক্রন। এই কোম্পানিগুলোর বিশাল সব কারখানা রয়েছে, যেখানে অত্যন্ত নিখুঁত ও জটিল প্রযুক্তিতে র‍্যাম তৈরি করা হয়। সাধারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আমরা যে র‍্যাম ব্যবহার করি, তাকে বলা হয় ডির‍্যাম অর্থাৎ ডাইনামিক র‍্যাম। কম্পিউটারের জন্য এর নাম ডিডিআর এবং মোবাইলের জন্য এর নাম এলপিডিডিআর।

তবে এইচবিএম (হাই ব্যান্ডউইথ মেমোরি) নামে র‍্যামের আরেকটি দারুণ ধরন রয়েছে, যা সুপার কম্পিউটার বা বড় কাজের জন্য তৈরি। সাধারণ ডিডিআরের তুলনায় এইচবিএম অনেক বেশি দ্রুতগতির এবং এতে অনেক বেশি তথ্য ধরে রাখা যায়। গতি ও ক্ষমতার কারণে এটি ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রশিক্ষণের কাজে অপরিহার্য।

ডিআরএএম ও এইচবিএম একে ওপরের বদলি হিসেবে ব্যবহার করা না গেলেও, এগুলো একই উপাদান দিয়ে তৈরি। দুটিই সিলিকন ওয়েফারের ওপর তৈরি হয়, তবে কাজের ধরন অনুযায়ী বানানোর প্রক্রিয়া আলাদা। সমস্যা হলো, এইচবিএম তৈরি করতে অনেক বেশি উপকরণ লাগে। মাইক্রনের প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় মেহরোত্রা জানান, সাধারণ ডিডিআর৫ র‍্যামের তুলনায় একটি এইচবিএম ইউনিট বানাতে প্রায় তিন গুণ বেশি সিলিকন ওয়েফার লাগে। অর্থাৎ একটি এইচবিএম বানাতে যে পরিমাণ উপাদান খরচ হয়, তা দিয়ে চাইলে সাধারণ তিনটি ডিআরএএম তৈরি করা যেত।

র‍্যামের দাম কতটা বেড়েছে?

কম্পিউটার পণ্যের দামের হিসাব রাখে ‘পিসি পার্ট পিকার’। তাদের গ্রাফ দেখলে যে কারও চোখ কপালে উঠবে। ২০২৫ সালের শুরুতে ১৬ জিবি ডিডিআর৫ র‍্যামের এক জোড়া স্টিকের দাম ছিল ১০০ ডলারের (১২ হাজার টাকা) নিচে, যা এখন বেড়ে ৪০০ ডলার (৫০ হাজার টাকা) ছাড়িয়ে গেছে। আবার ৩২ জিবি উচ্চমানের ডিডিআর৫ র‍্যামের দাম আগে ছিল ২৫০ ডলারের (৩১ হাজার টাকা) নিচে, আর তা এখন বেড়ে ১ হাজার ২০০ ডলার পার হয়েছে, যা বাংলাদেশে প্রায় দেড় লাখ টাকা। এই টাকাতে একটি সম্পূর্ণ ম্যাকবুক এয়ার ল্যাপটপ কেনা যায়।

পেরুর মরুভূমিতে থাকা নাজকা লাইন কী, কারা এঁকেছিল

র‍্যামের দাম হঠাৎ এত বেশি কেন?

এক কথায় উত্তর হলো, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

বড় বড় এআই কোম্পানিগুলো বাজারে থাকা প্রায় সব র‍্যাম কিনে নিয়েছে। এতদিন র‍্যামের বাজার ছিল বেশ স্বাভাবিক। কতটি ফোন বা কম্পিউটার বিক্রি হবে, সেই অনুযায়ী কোম্পানিগুলো র‍্যাম তৈরি করত। ফলে হঠাৎ কোনো মেমোরি সংকট হতো না।

কিন্তু এআই কোম্পানিগুলো রাতারাতি শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে মেমরি তৈরির কারখানাগুলোর আগামী কয়েক বছরের পুরো উৎপাদন ক্ষমতা আগেই বুক করে ফেলেছে। প্রযুক্তিবিষয়ক পত্রিকা ‘ডিজিটাইমস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সাল পর্যন্ত র‍্যাম তৈরির কারখানাগুলোর সব উৎপাদন ক্ষমতা এখনই বুক হয়ে গেছে।

ইলান মাস্কের এআই কোম্পানি ‘এক্স এআই’-এর মেমফিস ডেটা সেন্টারে ৫ লাখ ৫৫ হাজারটি শক্তিশালী এনভিডিয়া গ্রাফিকস কার্ড বা জিপিইউ ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু এই একটি সেন্টারেই প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ জিবি র‍্যাম ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিমাণ র‍্যাম দিয়ে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ‘আইফোন ১৭’ বা ৯৩ লাখ ‘গ্যালাক্সি এস২৬’ ফোন চালানো সম্ভব। আর বিশ্বে এখন এমন শত শত ডেটা সেন্টার তৈরি হচ্ছে।

আবার ২০২৫ সালের অক্টোবরে ‘ওপেনএআই’ ও ‘এএমডি’ মিলে একটি বিশাল মেগা এআই প্রজেক্টের চুক্তি করেছে। এই প্রজেক্টে যে পরিমাণ র‍্যাম লাগবে, তা দিয়ে প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি আইফোন বানানো যেত।

এ জন্য আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ র‍্যাম এবং মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রন টেকনোলজি তাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় কনজিউমার ব্র্যান্ড ‘ক্রুশিয়াল’এর ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন তারা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সরাসরি র‍্যাম বানানো বন্ধ করে সম্পূর্ণভাবে শুধু এআই এবং ডেটা সেন্টারের জন্য মেমোরি চিপ তৈরি করবে।

র‍্যামের দাম আবার কবে কমবে?

দাম কবে কমবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। তবে এআইয়ের এই অতিরিক্ত জোয়ার যদি হুট করে থেমে যায়, তবে র‍্যামের দাম আবার কমতে পারে।

তবে র‍্যাম তৈরি করা প্রধান কোম্পানিগুলোর মতে, পরিস্থিতি সহজে স্বাভাবিক হবে না। এসকে হাইনিক্স কোম্পানির মতে, ২০২৭ সালে সংকট আরও বাড়তে পারে। যেটা ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই টানাপোড়েন চলতে পারে। মাইক্রন ও বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডেলয়েট এর মতেও, ২০৩০ সালের আগে এই মেমরি সংকট কাটার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই।

বাস্তবে নেই, তবু মানুষ বাতিঘর দেখতে পায় কেন

মাইক্রন, স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স কেন বেশি র‍্যাম তৈরি করছে না?

এআই কোম্পানিগুলো গর্ব করে বলে তারা কয়েক মাসের মধ্যে বিশাল ডেটা সেন্টার বানিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু র‍্যাম তৈরির নতুন কারখানা বানানোর কাজটা মোটেও এত সহজ নয়। এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং এর জন্য দরকারি নিখুঁত যন্ত্রপাতি ও বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়।

আমেরিকার আইডাহোতে মাইক্রনের একটি কারখানায় ‘ক্লাস ওয়ান ক্লিন রুম’ রয়েছে। সেখানে প্রতি ঘনফুট বাতাসে মাত্র একটির বেশি ধূলিকণা থাকার অনুমতি নেই। একটি নতুন র‍্যাম কারখানা গড়তে কয়েক বিলিয়ন ডলার এবং বছরের পর বছর সময় লাগে।

তাই চাইলেই কেউ হুট করে কোনো গুদামঘরে র‍্যামের কারখানা বানিয়ে ফেলতে পারবে না। এসকে হাইনিক্স দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করে দুটি নতুন কারখানা তৈরির কাজ শুরু করেছে, যেগুলোতে ২০২৯ সালের জুনের আগে উৎপাদন চালুই হবে না।

বেশি লাভের লোভ

এদিকে মাইক্রন, স্যামসাং বা এসকে হাইনিক্সের মতো কোম্পানিগুলোরও এই সংকট দ্রুত কাটানোর কোনো তাড়াহুড়া নেই। সাধারণ র‍্যামের তুলনায় এআইয়ের কাজে ব্যবহৃত ‘এইচবিএম’ র‍্যাম থেকে অনেক বেশি লাভ হয়। আর বড় বড় এআই কোম্পানিগুলোও এই সীমিত র‍্যাম কিনতে চড়া মূল্য দিতে রাজি আছে।

এই কৌশলে কোম্পানিগুলোর পকেট বেশ ভালোভাবেই ভারী হচ্ছে। মাইক্রন তাদের ত্রৈমাসিক আয়ে রেকর্ড গড়েছে। এসকে হাইনিক্সের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৫৫৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। স্যামসাংও তাদের মেমোরি বিভাগ থেকে সর্বকালের সর্বোচ্চ মুনাফা পেয়েছে। এমনকি খবর এসেছে, মাইক্রন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এমন ব্যবস্থা করতে বলেছে যেন তাদের গ্রাহকরা অন্য কোথাও থেকে র‍্যাম চিপ কিনতে না পারেন।

এখন কি র‍্যাম কিনে ফেলা উচিত

আতঙ্কিত হয়ে হঠাৎ করে কোনো জিনিস কিনে ফেলা ঠিক নয়। এতে সংকট আরও বেড়ে যায়। তবে পরিস্থিতি যা দাঁড়ায়, তাতে চার বছর বেশ দীর্ঘ সময়। যদি আগামী বছরগুলোতে দাম বাড়তেই থাকে, তবে আজ যা বেশি দামে কিনছ, কাল হয়তো তার দাম আরও দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে।

কারোর যদি এখন সত্যিই র‍্যাম বা নতুন কম্পিউটার কেনার প্রয়োজন থাকে এবং সে জানো যে আগামী কয়েক বছর এটি তার লাগবে, তবে দেরি না করে এখনই কিনে ফেলা ভালো। আর যদি খুব জরুরি না হয়, তবে অপেক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পুরোনো বা সেকেন্ড-হ্যান্ড র‍্যাম দিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু বেশি দামে পরে বিক্রি করার জন্য কেউ যেন র‍্যাম কিনে স্টক না করে, কারণ এটি অন্যায় একটি কাজ।

সূত্র: এনগ্যাজেট, এনজেডএক্সটি১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে ইলন মাস্ক যা যা করতে পারবেন

Read full story at source