বিশ্বের যে দেশে বাংলাদেশি পাবেন ভাবেননি ‘নাদির অন দ্য গো’, সেখানেই পেলেন হাজারো বাংলাদেশি
· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় পিএইচডি করছিলেন । একসময় পড়াশোনা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন পৃথিবী দেখতে। ভ্রমণের ভিডিও তৈরি করে ‘নাদির অন দ্য গো’ নামে পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। মার্কিন ইউটিউবার ও ভ্রমণবিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাতা ড্রু বিনস্কির সঙ্গে যৌথভাবে তাঁর বানানো একটি প্রামাণ্যচিত্র সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে জায়গা করে নিয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান ইমাম
এ মুহূর্তে আপনি কোথায়?
Visit xsportfeed.life for more information.
সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে। প্রায় চার সপ্তাহ হলো মঙ্গোলিয়া থেকে এসেছি। দু–এক সপ্তাহ পর এখান থেকে মিসরের দিকে যাব।
বছরটা কেমন কাটল?
ভালোই কাটল বলা যায়। গত বছর থেকে ভিডিও বানানো কমিয়ে দিয়েছি। আগের মতো এক জায়গায় গিয়ে ১০টি ভিডিও না বানিয়ে একটিই ভালো করে বানানোর চেষ্টা করছি। মাঝেমধ্যে এক ঘণ্টা বা আধা ঘণ্টার ডকুমেন্টারি বানাচ্ছি। যেমন কম্বোডিয়ায় গিয়ে ওদের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আর তুর্কমেনিস্তানে গত বছর শুট করা ভিডিও এবার ছেড়েছি। প্রতিটিতেই বিদেশি দর্শকদের কাছ থেকে ভালো সাড়া এসেছে। তাই এখন এদিকে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছি।
এ পর্যন্ত মোট কত দেশ ঘুরলেন?
ঠিক সংখ্যা বলতে পারব না, ৮০টির মতো হবে।
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে নাদির নিবরাস২০২০ সালে আপনার প্রথম যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছিল, সেটা ছাড়া আর কোনো ভিডিও থেকে অপ্রত্যাশিত সাড়া পেয়েছেন?
বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে করা ওই বাংলা ভিডিওর পর থেকে প্রায় সব ভিডিওতেই খুব ভালো সাড়া পেয়েছি। প্রথম ভাইরালের এক মাস পর হাওয়াইতে সার্ফিং করার একটা ভ্লগ আপলোড করেছিলাম, ওইটাও খুব দ্রুত সাড়া ফেলেছিল। তার পর থেকে বছরে তিন-চারটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেমন কুয়েতের ভিডিওটা, সবচেয়ে গরম শহরে, ওইটাও ছাড়ার পরপরই বুঝেছিলাম, ভাইরাল হতে যাচ্ছে। তা-ই হয়েছে। সব ভিডিওতেই আমি ভালো সাড়া পাই।
কোনো জায়গার বিস্তারিত যে তথ্য আপনি শেয়ার করেন, সেটা কি ওখানে যাওয়ার আগেই জেনে নেন, নাকি গিয়ে জানার চেষ্টা করেন?
কোথাও যাওয়ার আগে ওই জায়গা সম্পর্কে বইপত্র পড়ে একটা স্ক্রিপ্ট তৈরি করে নিই। তবে সেখানে গিয়েও এমন অনেক কিছু জানতে পারি, যা হয়তো বইতে পাইনি।
আগে তো ভিডিও ধারণ, সম্পাদনা—সব নিজেই করতেন। এখন কি আপনার কোনো টিম আছে?
এখন আমার একটা টিম আছে। পরিকল্পনা ও স্ক্রিপ্ট নিজেই করি, ফিল্মিংয়ের সময় সাধারণত কাউকে নিয়োগ দিই। সম্পাদনার কাজে আমাকে সাহায্য করে বাংলাদেশের কয়েকজন। তাঁদের মধ্যে তিনজন ফুলটাইম। অস্থায়ী অনেকে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউব মিলিয়ে নানা রকম ভিডিও এডিট করতে হয়। অনেক কাজ। টিমের লোকেরা এসব সামলান। শুধু সিনেমাটিক এডিটগুলো আমি করার চেষ্টা করি।
নেটফ্লিক্সে সম্প্রতি ড্রু বিনস্কির একটি ভিডিওতে আপনাকে দেখা গেল ঢাকার যানজটে।
ড্রুর সঙ্গে ভিডিওটা আমরা যৌথভাবে করেছিলাম। শুধু নেটফ্লিক্সের জন্য ওইটা বানানো হয়নি, আমরা সেটা ইউটিউবেও ছেড়েছিলাম। ভিডিওটার জন্য অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করে দুজনে মিলে স্ক্রিপ্ট করি। ফিল্মিং আর এডিটিং ড্রু করেছে; আর কোথায় যাচ্ছি, কী করছি—সেটা ও অনেকখানি আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল।
ভ্রমণই এখন নাদির নিবরাসের নেশা ও পেশাড্রুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কীভাবে?
যোগাযোগ হয়েছিল ইনস্টাগ্রামে। আমরা প্রায় তিন দিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ভিডিওর জন্য শুট করেছি। ভিড় সামলানোর ঝক্কি ছাড়া অভিজ্ঞতা ভালোই ছিল। এখন ঢাকায় আমাকে বাইরে বের হতে হলে মাস্ক পরতে হয়, ছদ্মবেশ নিতে হয়। অবশ্য আমাদের সঙ্গে আমাদের শুটিং টিমের আরও লোক ছিল বলে বেশি ঝক্কি পোহাতে হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনাকে বিভিন্ন দেশের ভিসা–জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন করতে দেখি। আপনি কি বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাওয়ার সময় বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন?
বছরের অর্ধেক সময়ই চলে যায় বিভিন্ন দেশের ভিসার ব্যবস্থা করতে। এই যে এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, এ মুহূর্তে তিনটা দূতাবাসের সঙ্গে ই–মেইলে যোগাযোগ করছি; জানতে চাচ্ছি কবে ভিসা পাব। এক জায়গায় আবেদন করে ১৫ দিন ধরে অপেক্ষা করছি। ওই ভিসা নিশ্চিত না হলে অন্য দেশে যেতে পারছি না। বাংলাদেশি পাসপোর্টে হয়তো সব মিলিয়ে গোটা পঞ্চাশেক দেশের ভিসা তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়া পাওয়া যায়। যেসব দেশে বাংলাদেশিরা খুব একটা যায় না, সেসব দেশে ভিসার জন্য আবেদন করলে তাদের দূতাবাস ঠিকমতো সাড়া দেয় না। অনেক দেশে ভিসা পাওয়ার পর ইমিগ্রেশনে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয়। লাইন থেকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে নানা রকম প্রশ্ন করে। অনেক দেশের ইমিগ্রেশন আমাকে ঢুকতে দিয়েছে আমার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার পর।
কোথাও গিয়ে বিপদে পড়লে কী করেন?
সাধারণত এমনভাবে চলার চেষ্টা করি, যাতে বিপদে না পড়ি। গত পাঁচ বছর এমন কোনো জায়গায় যাইনি, যেখানে গেলে বিপদ হতে পারে বলে মনে হয়েছে। অবশ্য এমন কয়েকটা জায়গায় গিয়েছিলাম, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে ভয় ছিল। যেমন আফ্রিকায় আর মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে। ওখানে দামি বড় ক্যামেরা নিয়ে বাইরে বের হইনি। কখনো কখনো স্থানীয় ট্যুর কোম্পানি থেকে সিকিউরিটি সঙ্গে নিয়ে গেছি। থাকার জন্য এমন হোটেল বেছে নিয়েছি, যেটার নিরাপত্তাব্যবস্থা ভালো।
বিশ্বের প্রায় ৮০ দেশ ঘুরেছেন নাদির নিবরাসপৃথিবীর এমন একটি জায়গার কথা বলবেন, যেখানে বাংলাদেশি কাউকে পাবেন বলে আশা করেননি কিন্তু পেয়েছেন?
আফ্রিকার চারটি দেশের এক ট্রিপে গিয়েছিলাম। সেশেলস নামে পূর্ব আফ্রিকার একটি দ্বীপরাষ্ট্রে গিয়ে প্রথম দিনেই আমার ড্রোনটা ক্র্যাশ করে। যেখানে মানুষই তখন মাত্র এক লাখ, সেখানে আরেকটা ড্রোন কীভাবে পাই! অনলাইনে অর্ডার করলে ড্রোন পৌঁছাতে সপ্তাহ দুয়েক লাগবে, কিন্তু আমাকে তিন দিন পরেই মাদাগাস্কারে যেতে হবে। তাই কোনো আশা না করেই ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলাম। তারপর অবাক কাণ্ড। এক বাংলাদেশিকে পেলাম, উনি রিক্রিয়েশনাল ড্রোন পাইলট। তাঁর কাছ থেকে ড্রোনটা কিনে নিলাম। জানতে পেলাম, ওই দেশের এক লাখ মানুষের মধ্যে পাঁচ হাজার বাংলাদেশি।
কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে জায়গাটা সম্পর্কে পড়াশোন করে নেন নাদির নিবরাসকোথাও বেড়াতে গিয়ে কি কোনো অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন?
এক জার্মান বন্ধুর সঙ্গে মঙ্গোলিয়ায় গিয়ে মঙ্গোলিয়ান এক পরিবারের সঙ্গে ছিলাম। বিশাল এক মাঠের মাঝখানে তাঁদের বাড়ি। তাদের ৪০টি ঘোড়া। ওখানকার শিশুরা কোনো দিন কোনো বিদেশি লোক দেখেনি। আমাদের দেখে ভীষণ অবাক হয়েছিল। আমাদের গায়ের রং, চেহারা-সুরত কোনো কিছুর সঙ্গেই নিজেদের মেলাতে পারছিল না।
পিএইচডি মাঝপথে রেখে পৃথিবী দেখতে বেরিয়ে পড়লেন, একাডেমিক পড়াশোনায় কি আর ফিরবেন?
আশা করি, আর ফিরতে হবে না। কারণ, এখন যা করছি, তা আমি খুবই পছন্দ করি। একাডেমিক পড়াশোনাও এনজয় করতাম, তবে তা আমার এখনকার কাজের মতো এত মজার ছিল না। এতটা পরিপূর্ণতা অন্য কিছুতে অনুভব করিনি। আমার মনে হয়, এখন যেটা করছি, সেটার একটা তাৎপর্য আছে। আগের কোনো কাজেই সেটা খুঁজে পাইনি।
আপনার ঘোরা জায়গাগুলোর মধ্যে সেরা ১০টি জায়গার রেটিং করুন।
ওইভাবে ঠিক প্রিয় ১০ জায়গা বলা কঠিন। তবে এ মুহূর্তে মনে আসা দেশগুলো থেকে প্রিয় দেশের তালিকায় থাকবে—ব্রাজিল, মেক্সিকো, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, গুয়াতেমালা, ইতালি, সার্বিয়া, চায়না ও শ্রীলঙ্কা।
নাদির নিবরাস২০৩০ সালে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
আগামী ১০ বছর এভাবেই ট্রাভেল করে যেতে চাই। আমার টিমটাকে আরেকটু বড় করতে চাই। আরেকটু বড় বাজেটের প্রোডাকশন করার ইচ্ছা আছে।
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে যাবেন? জেনে রাখুন ১০টি তথ্য