লিফটে ওপরে ওঠার সময় কি ওজন বাড়ে এবং নিচে নামার সময় কি কমে
· Prothom Alo

আপনি যখন কোনো বহুতল ভবনের লিফটে ওঠেন, তখন কি একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়? লিফট যখন হঠাৎ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে, মনে হয় যেন পায়ের নিচের মেঝেটা আপনাকে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শরীরটা বেশ ভারী লাগে, তাই না? আবার লিফট যখন থামার জন্য গতি কমায়, তখন মনে হয় শরীরটা যেন হঠাৎ হালকা হয়ে গেল! ওপর থেকে নিচে নামার সময়ও ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে।
কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, লিফটে ওঠার সময় বা নামার সময় আমাদের ওজন কি সত্যিই বদলে যায় কি না? লিফট কি মহাকর্ষ বলের সঙ্গে কোনো লুকোচুরি খেলে? চলুন, আজ আপনার এই মজার ধাঁধার বৈজ্ঞানিক সমাধান করা যাক।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
প্রথমে জানতে হবে ওজন আসলে কী? পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় ওজন কথাটির অর্থ আমাদের ভাবনার চেয়ে একটু আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিগুয়েল মোরালেস বলছেন, পদার্থবিজ্ঞানে ওজনের অন্তত তিনটি অর্থ হতে পারে।
প্রথমত, আপনার ভর। অর্থাৎ আপনার শরীর ঠিক কতটুকু পদার্থ দিয়ে তৈরি। দ্বিতীয়ত, মহাকর্ষ বল, যা আপনাকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টানছে। আর তৃতীয়ত, আপনি যে মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন, সেটি আপনাকে কতটা জোরে ওপরের দিকে ধাক্কা দিচ্ছে।
ভর ও ওজনের মধ্যে পার্থক্যলিফট যখন হঠাৎ ওপরের দিকে উঠতে শুরু করে, তখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য শরীরটা বেশ ভারী লাগে। আবার লিফট যখন থামার জন্য গতি কমায়, তখন মনে হয় শরীরটা যেন হঠাৎ হালকা হয়ে গেল!
আপনি যখন মেঝেতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন এই তিনটি জিনিসই সমান থাকে। আপনার ভরের কোনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু লিফট যখন চলতে শুরু করে বা থামতে যায়, তখনই শুরু হয় আসল খেলা! লিফটের ভেতরে আপনার ভর বা পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের কোনো বদল হয় না। বদল হয় শুধু ওই তৃতীয় জিনিসটার, মানে মেঝে আপনাকে কতটা জোরে ধাক্কা দিচ্ছে!
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীদের কথাই ভাবুন। তারা তো মহাশূন্যে দিব্যি ভেসে বেড়াচ্ছেন। আমরা ভাবি, সেখানে বোধ হয় কোনো গ্র্যাভিটি নেই। কিন্তু সত্যিটা হলো, পৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে ওই মহাকাশ স্টেশনেও পৃথিবীর মহাকর্ষ বল আমাদের ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ করে!
আমরা ভাবি, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বোধ হয় কোনো গ্র্যাভিটি নেইতাহলে তারা ভাসেন কেন? কারণ মহাকাশ স্টেশনটি ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটার বেগে পৃথিবীর চারপাশে ঘুরছে। এই প্রচণ্ড গতির কারণে তারা অনবরত পৃথিবীর দিকে পড়ছেন, কিন্তু পৃথিবীর বক্রতার কারণে কখনোই মাটিতে এসে আছড়ে পড়ছেন না। যেহেতু তারা এবং তাদের পায়ের নিচের মেঝে একসঙ্গে নিচে পড়ছে, তাই মেঝে তাদের ওপরের দিকে কোনো ধাক্কা দিতে পারে না। আর এই ওপরের দিকে ধাক্কা দেওয়ার বল না থাকার কারণেই তারা নিজেদের ওজনহীন মনে করেন! আমরা পৃথিবীতে ওজন অনুভব করি, কারণ মাটি আমাদের নিচে পড়ে যেতে দেয় না, বরং অনবরত ওপরের দিকে ধাক্কা দেয়।
মহাকাশ স্টেশনে কি মহাকর্ষ বল শূন্যপৃথিবী থেকে ৪০০ কিলোমিটার ওপরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনেও পৃথিবীর মহাকর্ষ বল আমাদের ভূপৃষ্ঠের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ করে!
এবার আসা যাক লিফটে ভেতরের আসল বিজ্ঞানে। লিফট যখন ওপরের দিকে ওঠা শুরু করে, তখন লিফটকে আপনার শরীরের ভরসহ ওপরের দিকে একটা নির্দিষ্ট বেগে ছুটতে হয়। এই ত্বরণ তৈরি করার জন্য লিফটের মেঝে আপনার পায়ের তলায় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি জোরে ধাক্কা দেয়। আর এই বাড়তি ধাক্কাটার কারণেই আপনার নিজেকে হঠাৎ ভারী মনে হয়।
ধরা যাক, একটি সাধারণ লিফটের ত্বরণ প্রতি সেকেন্ডে ১ মিটার। এটি পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের প্রায় এক-দশমাংশ। এখন আপনার আসল ওজন যদি ৬৮ কেজি হয়, তবে লিফট ওপরে ওঠার ঠিক ওই শুরুর মুহূর্তটিতে ওজন মাপার স্কেলে দাঁড়ালে দেখবেন আপনার ওজন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে! স্কেলের কাঁটা তখন ৬৮ কেজির বদলে প্রায় ৭৫ কেজি দেখাবে!
এরপর লিফট যখন একটা নির্দিষ্ট গতিতে ওপরে উঠতে থাকে, তখন ত্বরণ শূন্য হয়ে যায়। মহাকর্ষ বল ও মেঝের ধাক্কা আবার সমান হয়ে যায়। তখন আপনার ওজনও একদম স্বাভাবিক মনে হবে। কিন্তু লিফট যখন ওপরে তার গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য গতি কমাতে থাকে, তখন ত্বরণ কাজ করে নিচের দিকে। মানে আপনার গতি কমানোর জন্য মেঝেকে তখন আর আগের মতো অত জোরে ধাক্কা দিতে হয় না। এই ওপরের দিকের ধাক্কা কমে যাওয়ার কারণেই এই সময়টায় আপনার নিজেকে একটু হালকা মনে হয়।
মহাবিশ্বের ভর কতআপনার আসল ওজন যদি ৬৮ কেজি হয়, তবে লিফট ওপরে ওঠার ঠিক ওই শুরুর মুহূর্তটিতে ওজন মাপার স্কেলে দাঁড়ালে দেখবেন আপনার ওজন প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে গেছে!
নিচে নামার সময় ঘটনাটা ঘটে ঠিক এর উল্টো। লিফট যখন নিচে নামা শুরু করে, তখন সে আপনার পায়ের নিচ থেকে যেন একটু সরে যেতে চায়। মেঝের ধাক্কা কমে যায় বলে নিজেকে হালকা লাগে। কিন্তু নিচে এসে যখন লিফট থামতে যায়, তখন সে আবার আপনার গতির উল্টো দিকে, মানে ওপরের দিকে ধাক্কা দেয়। ফলে ওই থামার মুহূর্তটিতে আপনাকে আবার ভারী মনে হবে।
তাহলে সহজ কথায় উত্তরটা হলো, লিফট যখন ওপরে ওঠা শুরু করে এবং নিচে নামার একদম শেষ মুহূর্তে গতি কমায়, ঠিক এই দুটি সময় আপনি নিজেকে সবচেয়ে ভারী অনুভব করবেন। আপনার রোজকার জীবনের এই লিফটের অভিজ্ঞতাটি কিন্তু সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটির সঙ্গে এটি জড়িয়ে আছে। আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত জেনারেল রিলেটিভিটি তত্ত্ব তৈরির সময় ঠিক এই বিষয়টাই খেয়াল করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মহাকর্ষ ও ত্বরণ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ! একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ইকুইভ্যালেন্স প্রিন্সিপাল বা সমতূল্যতার নীতি।
সমতূল্যতার নীতিরোজ অফিসে বা বাসায় যাওয়ার সময় লিফটের ওই কয়েক সেকেন্ডের অনুভূতিতে লুকিয়ে আছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মতো এত বড় একটা রহস্য! অদ্ভুত না?
লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চসূত্র: লাইভ সায়েন্সআলোর চেয়ে দ্রুত ছুটছে মহাবিশ্ব, আইনস্টাইন কি তবে ভুল ছিলেন