বইমেলায় বিজ্ঞানের বই ৩
· Prothom Alo

ফেব্রুয়ারি মাস বইপ্রেমীদের জন্য বছরের অন্যতম বড় উৎসব। নতুন বইয়ের গন্ধে চারদিকে আনন্দের ঢল নামে। প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলার আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। এ মাসেই প্রকাশিত হয় বছরের প্রায় সব নতুন বিজ্ঞানের বই। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে মেলা শুরু হয়ে মোটামুটি ফেব্রুয়ারি মাসেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এবার নানা কারণে মেলা শুরু হয়েছে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে। মেলা শেষ হচ্ছে আজ ১৫ মার্চ। ২০২৬ সালের বইমেলায় প্রকাশিত দারুণ সব বিজ্ঞান ও সায়েন্স ফিকশন থেকে বাছাইকৃত কিছু বই নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
১. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আমাদের জীবন
লেখক: মুহাম্মদ ইব্রাহীম
প্রকাশক: অনন্যা প্রকাশ
পৃষ্ঠা: ৩০৪
দাম: ৬০০ টাকা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আমাদের জীবনের খুব কাছে চলে এসেছে। এটি অনেকের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলছে। আবার অনেকের কাজকর্মকে খুব মসৃণ করছে। এর সঙ্গে পরিচয়, এর একরকম সাক্ষরতা অর্জন ক্ষতি এড়িয়ে এর সর্বোত্তম সুযোগ নিতে সাহায্য করবে, আমাদের ঘরোয়া নিজস্ব জীবনেও। বইটি তেমন সাক্ষরতার একটি প্রাথমিক প্রয়াস যথাসম্ভব উপভোগ্য ও সহজবোধ্য উপস্থাপনে। এআই কী, এটি কী করছে, জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর কী প্রয়োগ হচ্ছে, এর ফলে সামনে আমাদের কী হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার চেষ্টা আছে এতে। সেই সঙ্গে এই মহা শক্তিশালী প্রযুক্তির একটু ভেতরে ঢুকে তার বুদ্ধির কৌশলগুলোও দেখার চেষ্টা করা হয়েছে সরল উদাহরণে। তাছাড়া এখন যেভাবে একে মানুষের মতো সাধারণ বুদ্ধি ও আত্মসচেতনতা দেবার চেষ্টা চলছে তারও কিছু কৌশল।
২. বিস্ময় তাই জাগে
লেখক: ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স
পৃষ্ঠা: ৩৭৪
দাম: ৬৫০
নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই চারটি দশকে ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী যত লেখালেখি করেছেন তার এক মননশীল নির্যাস এই নির্বাচিত প্রবন্ধাবলি। পুরোটাই বিজ্ঞানের সালতামামি। বলা যায়, এই পুরা লেখক জীবনেরই এক অনবদ্য সংকলন। বাংলাদেশের বিজ্ঞান-সাহিত্যেরও এক অনুপম খণ্ড।
৩. প্যারাডক্স ২: দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতির প্রহেলিকা
লেখক: আবদুল গাফফার রনি
প্রকাশনী: পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড
পৃষ্ঠা: ২১৬
দাম: ৬০০ টাকা
মন আর মস্তিষ্কের যুগলবন্দিই আমাদের বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন রাখে। কিন্তু কোনো কারণে এই দুইয়ের মধ্যে যদি বোঝাপড়ার ঘাটতি তৈরি হয় তাহলে তৈরি হয় দৃষ্টিভ্রম। সেই দৃষ্টিভ্রমের কিছু কিছু এতটাই শক্তিশালী যে চোখে ভুল দেখাটাও আপনার মনে হবে সঠিক। ভুলকে সঠিক বলার এই বিভ্রমই অপটিক্যাল প্যারাডক্সের জন্ম দেয়। আর প্যারাডক্স সবসময় কাণ্ডজ্ঞানকেই চ্যালেঞ্জ করে। তবে দৃষ্টিভ্রমের চেয়ে প্যারাডক্সের আসল ক্যারিশমা যৌক্তিক ও বৌদ্ধিক জ্ঞানে। একটা বাক্য কখনো নিজেকেই মিথ্যা প্রমাণ করে, আবার তা মিথ্যা হলে বাক্যটা সঠিক প্রমাণিত হয়। বুদ্ধিকে, যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার এই ব্যাপারকেই বলে প্যারাডক্স।
তবে একে ধাঁধা বা স্রেফ বিভ্রমের কাতারে ফেলা যায় না। প্রতিটা প্যারাডক্স তাই একেকটা মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ, যার শিকড় যুক্তি-বুদ্ধির গভীরে প্রোথিত। তাই প্যারাডক্সের বিচরণ যেমন যুক্তিবিদ্যায়, দর্শনে কিংবা মনোবিজ্ঞানে, তেমনি বিজ্ঞান, গণিত, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কখনো কখনো প্যারাডক্স এসে হাজির হয়। এই ‘হাজির হওয়াটা’কে উটকো ঝামেলা বলে গুরুত্ব না দেওয়ার কোনো উপায় নেই। বরং প্যারাডক্সের চ্যালেঞ্জ কিংবা অসম্ভাব্যতার কাছে নিজের অসহায়ত্বকে মেনে নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হয় দার্শনিক, বিজ্ঞানী, রাজনীতিক বা অর্থনীতিবিদদের। দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, রাজনীতি, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও ইমপসিবল অবজেক্ট-এই সাতটি বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্যারাডক্সে সাজানো হয়েছে প্যারাডক্স ২: দর্শন, বিজ্ঞান ও রাজনীতির প্রহেলিকা গ্রন্থটি।
৪. অ্যাস্টেরয়েডের মুখোমুখি
লেখক: এমরান আহমেদ
প্রকাশক: অনুপম প্রকাশনী
পৃষ্ঠা: ৮৮
দাম: ২০০ টাকা
মহাবিশ্ব সারাক্ষণই আমাদের চমকে দিচ্ছে। কিছুদিন আগেই সৌরজগতে হানা দিয়েছিল ওমুয়ামুয়ার মতো এক অদ্ভুত মহাজাগতিক অতিথি। এবার নাসা জানিয়েছে, 31/ATLAS নামে আরও একটি আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু বা ধূমকেতু তীব্র গতিতে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। মহাকাশের এমন সব রোমাঞ্চকর ঘটনা নিয়েই সাজানো হয়েছে এই বইটি। বইটিতে আরও উঠে এসেছে চাঁদের রহস্যময় দক্ষিণ মেরুর কথা। ভারতের চন্দ্রযান-৩ সেখান থেকে নতুন সব তথ্য ও ছবি পাঠিয়েছে। এই সাফল্য দেখে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোও এখন চাঁদে যাওয়ার নতুন প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যাকে বলা হচ্ছে স্পেস রেস ২.০।
এছাড়া বিজ্ঞানীরা মহাকাশে এমন কিছু লুকানো গ্যালাক্সির সন্ধান পেয়েছেন, যা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের পুরোনো ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে। গ্রহাণুর আঘাত পৃথিবীর জন্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ মেলে ডাইনোসর বিলুপ্তির ইতিহাস থেকে। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে এক বিশাল গ্রহাণুর আঘাতেই পৃথিবী থেকে ডাইনোসর হারিয়ে গিয়েছিল। এমনই সব বিস্ময়কর মহাজাগতিক ঘটনা এবং বিজ্ঞানের রোমাঞ্চকর সব অভিযান নিয়ে এই বই।
৫. আধুনিক বিজ্ঞানের যত বিস্ময়
লেখক: মো. আহসানুর রহমান
প্রকাশক: মাতৃভাষা প্রকাশ
পৃষ্ঠা: ১২০
দাম: ৩০০ টাকা
একটি মাছির মস্তিষ্কের মাত্র ১ লাখ ৪০ হাজার নিউরনের মানচিত্র তৈরি করতে ১২৮টি প্রতিষ্ঠানের ২৮৭ জন গবেষকের সময় লেগেছে দীর্ঘ ২০ বছর। অথচ মানুষের মস্তিষ্কে আছে প্রায় ৮০ বিলিয়ন নিউরন। বিজ্ঞানের এমন সব রোমাঞ্চকর আবিষ্কারের গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ড. মো. আহসানুর রহমান এর নতুন বই ‘আধুনিক বিজ্ঞানের যত বিস্ময়’। জিন থেরাপির মাধ্যমে হিমোফিলিয়ার চিকিৎসা, মরুভূমির বিষাক্ত টিকটিকির লালা থেকে স্থূলতার ওষুধ তৈরি কিংবা সুঁই ছাড়া শুধু লোশন মেখেই ভ্যাকসিনের সুবিধা এমন ২৪টি সমসাময়িক গবেষণার সহজ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এই বইয়ে।
সাধারণত বিশ্বের নামকরা সব বৈজ্ঞানিক জার্নাল নেচার বা সায়েন্স এর গবেষণাগুলো কঠিন ইংরেজি ও পে-ওয়ালের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে। লেখক সেই বাধা ভেঙে আধুনিক বিজ্ঞানের এই জটিল বিষয়গুলোকে গল্পের ভাষায় সাধারণ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন। বইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে মূল গবেষণাপত্রের বারকোড দেওয়া আছে। স্মার্টফোনে স্ক্যান করলেই সরাসরি সেই গবেষণাপত্রটি দেখা যাবে। একজন তরুণ পাঠক এই বই থেকে শুধু তথ্যই জানবে না, বরং বিজ্ঞানীরা কীভাবে প্রশ্ন করেন বা কীভাবে একটি ধারণাকে প্রমাণ করেন, সেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সম্পর্কেও ধারণা পাবে।
৬. বিদ্যুৎ
লেখক: আইজ্যাক আসিমভ
ভাষান্তর: আবুল বাসার
প্রকাশনী: অনুপম প্রকাশনী
পৃষ্ঠা: ১০২
দাম: ২০০ টাকা
গল্পবলিয়ে হিসেবে আইজ্যাক আসিমভের তুলনা নেই। তিনি বিজ্ঞান কল্পকাহিনির গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে বিজ্ঞানের উন্নয়নের ইতিহাস নিয়েও তাঁর প্রচুর কাজ রয়েছে। ছেলে-বুড়ো সব পাঠকের জন্যই বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ-সরলভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। বিষয়গুলো বিজ্ঞানের তথ্যে ভরপুর থাকলেও তা তার জনপ্রিয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতোই পড়ে ফেলা যায় অনায়াসে।
সুইচ টিপলেই বাতি জ্বলে ওঠে। কারণ তারের ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়। বর্তমানে বাড়ি আর অফিস আদালতের হাজারো কাজের জন্য আমরা বিদ্যুৎ ব্যবহার করি। কিন্তু শক্তির এই রূপটি খুঁজে পেতে আমাদের কয়েক শত বছর লেগেছে। এই ছোট্ট বইটিতে বিদ্যুতের ইতিহাস নিজস্ব ঢঙে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন আইজাক আসিমভ। বিদ্যুৎ সম্পর্কে জানতে এবং এটি মানুষের কাজে লাগাতে বিজ্ঞানীরা যে অক্লান্তভাবে কাজ করেছেন, সেসবই সহজ আর সাবলীল ভাষায় জানিয়েছেন তিনি। বিদ্যুৎ সম্পর্কে আমরা ভবিষ্যতে আরো অনেক কিছুই জানব, কিন্তু বিদ্যুৎ আবিষ্কারের শুরুর গল্পগুলো পুরানো হবে না কখনোই।
৭. ফ্লাওয়ার্স ফর এলজারনন
লেখক: ডেনিয়েল কিজ
অনুবাদক: শাওন মাহমুদ
প্রকাশনী: অন্বেষা প্রকাশন
পৃষ্ঠা: ৯৬
দাম: ২৭০ টাকা
চার্লস গর্ডন বুদ্ধিমতায় পিছিয়ে। আইকিউ আটষট্টি। শৈশবেই তার বুদ্ধির বিকাশ থেমে যায়। সে লিখতে পড়তে জানে না, উপহাসকেও বন্ধুত্ব ভেবে ভুল করে। বিজ্ঞানের অত্যন্ত বিতর্কিত এক উদ্ভাবন প্রথমবার মানবদেহে পরীক্ষা করার জন্য বেছে নেওয়া হয় তাকে। যাকে বলে ‘হিউম্যান ট্রায়াল’। সেই গবেষণায় রয়েছে বড়সড় এক গন্ডগোল, এক গুরুতর ঝুঁকি যা গবেষণার দুই শীর্ষ বিজ্ঞানীর নজরে না এলেও ধরা পড়ে চার্লসের চোখে। প্রথম চার্লস নয়, ভিন্ন একজন। তাদের মন আলাদা, চিন্তা চেতনা আলাদা। অথচ দেহ এক। যার আবির্ভাবেই ঘুরে যায় গল্পের মোড়। এই বইটি তারই হাতে লেখা ডায়েরি। তবে গল্পটির মূল লক্ষ্য এই গবেষণা নয়, বরং তার চেয়েও গভীর কিছু। ছোটগল্প হলেও এটি পাঠকের মনে অগণিত প্রশ্ন জাগাবে। কিছু অংশে ঘটনা বিচ্ছিন্নও মনে হতে পারে। তবে এর পাতায় পাতায় রয়েছে সেসবের সুপ্ত ইঙ্গিত। যা পাঠকের চোখ এড়িয়ে যেতে চাইবে। আর সেই লুকানো স্তরগুলো ধরতে পারলেই বোঝা যাবে লেখকের সাফল্য।