হাড়ের হদিস
· Prothom Alo

আমাদের গ্রামের মানিক নাথ আর মহরম আলীর কথা আমরা সহজে ভুলতে পারি না। পরস্পর প্রতিবেশী দুই বাসিন্দা তারা প্রাইমারি স্কুলে ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর একদিন হঠাৎ স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাদের পিতারা বলে, লেহাপড়ার ক্ষমতা নাই, কাজ কইর্যা খাইলে তয় কিছু লাভ। তাদের কাজ মানে খেতের কাজ। দুজনের পিতার দুই টুকরো জমিও পাশাপাশি। ফলে তাদের স্কুলের সহপাঠিত্ব এসে দাঁড়ায় সহমাটিত্বে। অল্পদিনের মধ্যেই তারা ভুলে যায় বইপুস্তকের কথা এবং তার পরিবর্তে মাটি, ফসল, বীজ, রোদ, বৃষ্টি, হাওয়া, মেঘ, বন্যা—এসব বিষয়ে তাদের মধ্যে জেগে ওঠে পারদর্শিতা। ধরা যাক, আজ রোববার। আকাশে ভেসে চলা মেঘের রং আর ছোটাছুটির দিকে তাকিয়ে মানিক বলবে, বুধবারে বৃষ্টি হবে। সেই বৃষ্টিতে হবে বন্যা। কাজেই মঙ্গলবারের মধ্যেই পাকা ধান কেটে গোলায় তুলতে হবে। যারা তার কথা না শুনে আরও পক্বতার প্রত্যাশায় থাকে, তাদের ফসল মারা যায় মাঠে। তাদের এমন পারঙ্গমতা দেখে অবাক লোকেরা জানতে চায়—পারো কেমনে ভাই? তখন মানিক অথবা মহরম বলে, বছরের পর বছর এই মেঘ, সোঁদা বাতাস, ঝাঁ ঝাঁ রইদ দেখতে দেখতে এত পথ হাঁইটা আসলাম। এ এমন কী আর কঠিন কাজ!
Visit casino-promo.biz for more information.
এত সব দক্ষতার কারবারি দুই প্রতিবেশী দুই বন্ধুকে ঠিকই একদিন আর সব গ্রামবাসীর মতনই অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয় অদৃষ্ট অথবা দুর্জ্ঞেয় অথবা অদৃশ্যমানতার কাছে। সবার একটাই জিজ্ঞাসা: এখন কী হবে! গ্রামের পর গ্রাম বাড়ির পর বাড়ির পোড়া ছাই আকাশে জমতে শুরু করলে তারা জীবনে প্রথমবার জানল, এত কালো মেঘ তারা আগে কখনো দেখেনি। যুদ্ধ কেন হয়, যুদ্ধ কেন মৃত্যু ছাড়া আর কিছু জানে না, সেসব কূটতর্কে মাতে লোকেরা, কিন্তু প্রতিমুহূর্তের ভীতি–আতঙ্ক মনের মধ্যে নিয়েও তাদের ছুটতে হয় খেতের দিকে। সেদিনও তারা গিয়েছিল খেতে কাজ করার জন্যই। আগের দিন দুপুরের দিকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের বড় রাস্তায় পাকিস্তানি আর্মির একটা জিপ মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যাম্বুশে পড়ে এবং তাতে মারা পড়ে চারজন। শোনা যায়, তাদের মধ্যে চালকটা ছিল বাঙালি। পরদিন অপরাহ্ণটা প্রতিশোধের রক্তপাতে সয়লাব করে দেয় মীরগঞ্জকে। অ্যাম্বুশের জায়গা থেকে এক বর্গমাইল এলাকার সব ঘরবাড়ি হানাদার বাহিনীর অগ্নিকাণ্ডে ছাই। মারা পড়ল বহু লোক, নিখোঁজ হলো আরও অনেকে।
সেই সন্ধ্যা থেকে মানিক-মহরমকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। কয়েক দিনের মধ্যে তাদের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে নানামুখী ভাষ্য ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। এলোপাতাড়ি গুলিতে যারা রাস্তায় বিলের ধারে খালপাড়ে ঘরের কোণে মরে রইল, তাদের মৃত-নিস্তব্ধ শরীরগুলো সামনে রেখে গ্রামবাসী একই সঙ্গে শোক করে এবং একই সঙ্গে প্রকাশ করে সন্তুষ্টি। কেননা, এযাবৎ যারা নিখোঁজ হয়েছে, তাদের জীবন থেকে স্বস্তি–শান্তি উধাও। একধরনের নাছোড় যন্ত্রণায় তারা ক্ষতবিক্ষত সারাটা ক্ষণ। একবার ভাবে, মারা পড়ে কোথাও পড়ে আছে। আবার ভাবে, না মরে নাই, নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। দুশ্চিন্তামুক্ত হওয়ার জন্য দেহমনের আরামের জন্য তারা স্তোক দেয় নিজেদের, মরলেও তো তারা রয়েছে দেশের মাটিতেই কোথাও না কোথাও। কিন্তু তাতেও স্বস্তি হয় না তাদের। সেই তুলনায় যারা মরদেহ পায়, ভাবে, ভাগ্যে তাদের মরণই লেখা ছিল, থাকুক। তারা তো তাদের সমাহিত প্রতিবেশীই।
কেউ কেউ বলছিল, মানিক-মহরমকে আরেক গ্রামবাসী অহিদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। তবে সৈন্যদের প্রতাপান্বিত প্রবেশের সময় তারা ঠিক কোথায় ছিল, সেটা কেউ বলতে পারে না। যদি তারা প্রাথমিক বর্ষণেই গুলিবিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে তো লাশ খেতেই পড়ে থাকার কথা।
সে রকম ভাবনার সন্তুষ্টি মানিক-মহরমের পরিবারের ভাগ্যে ঘটে না; বরং নানামুখী বার্তার গমনাগমন তাদের জীবনটাকে আরও কাহিল করে তোলে। প্রথমত, তারা সকালবেলা খেতে গিয়েছিল দুজনেই। যখন জিপভর্তি সৈন্যরা বড় রাস্তা থেকে সশব্দে সরু রাস্তা ধরে গ্রামে ঢোকে এলোপাতাড়ি গুলি করতে করতে, তখন রাস্তা–সন্নিহিত খেতে তাদের কর্মরত থাকার কথা। হয়তো তারা ছিলই। কিন্তু কেউ কেউ বলছিল, মানিক-মহরমকে আরেক গ্রামবাসী অহিদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল। তবে সৈন্যদের প্রতাপান্বিত প্রবেশের সময় তারা ঠিক কোথায় ছিল, সেটা কেউ বলতে পারে না। যদি তারা প্রাথমিক বর্ষণেই গুলিবিদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে তো লাশ খেতেই পড়ে থাকার কথা। খেতে দুটো লাশ অবশ্য পাওয়া যায়, সেগুলোর একটা ছিল মানিকেরই গাভি এবং আরেকটা মহরমের বলদ। তাদের লাশ আর পাওয়াই গেল না। এমনকি তারা নিখোঁজ কি না, তারও কোনো সূত্র নেই। দুটো জলজ্যান্ত মানুষ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ল এবং তারা দিনের পর দিন আর ফিরে না এলেও তাদের পরিবার এবং গ্রামবাসী মনে মনে তাদের হলেও হতে পারে জীবিত ধরে নিয়ে গ্রামের এবং দেশের সম্মিলিত মৃতদের জন্য দিনরাত শোকার্তই থাকে।
যুদ্ধ শেষ হয়ে দেশটাও স্বাধীন হয়ে গেল, কিন্তু দুজনের কারও দেখা নেই তখনো। মানিকের ছেলে বিমল আর মহরমের ছেলে বাহরাম দুজনেই নয় থেকে পড়ে দশে। প্রাইমারি স্কুল থেকে বলা হলো, তাদের কোনো পরীক্ষা দিতে হবে না, তারা আজ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। হলে কী হবে, পুঁজিপাটাশূন্য বিমল-বাহরামের পরিণতি হয় তাদের পিতাদের মতন। স্কুলমুখী হওয়াটা আর তাদের জোটে না। খানিকটা আত্মতৃপ্তির জন্য শুধু তারা বলতে পারে, তারা একসময় হাইস্কুলে পড়ত। গ্রামবাসীর মধ্যে যুদ্ধে নিহত-মৃতদের অনেকেরই জোটে আর্থিক সাহায্য। মানিক-মহরমের স্থান মৃতদের কাতারে না হওয়ার ফলে তারা তখনই আর্থিক সহায়তা পায় না, কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি পায়, একদিন তাদের জন্য অর্থ আসবে। তারা অবশ্য অর্থের আশায় বসে না থেকে তাদের পিতাদের মতো খেতে কাজ করবার প্রস্তুতি নিতে থাকে। সেটা ছিল এক বৈশাখ মাস। হাতে নিড়ানি নিয়ে দীর্ঘকাল অনাবাদি থাকা জমির আগাছা পরিষ্কার করার জন্য দুই বন্ধু বিমল-বাহরাম খেতে নামতে গিয়ে দেখে, খেত এরই মধ্যে আগাছাশূন্য করে রেখেছে কেউ। জমিতে কামলারা কর্মব্যস্ত আর দুই জমির আলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খবরদারি করে অহিদ। বিমল-বাহরাম হতভম্ব, জমি তাদের পিতাদের, কিন্তু সেই জমি কোন মন্ত্রবলে অহিদের পদতলে! আগুয়ান বিমল-বাহরামকে দেখে একগাল হাসি ছড়িয়ে বলে অহিদ, তোমরা জানো না বুঝি? তোমাদের বাবারা মানিক আর মহরম তাদের জমি দুইটা আমার বাবার কাছে বিক্রি করছে। জমির দলিল আর কাগজপত্র সব আমার কাছে আছে। বুঝছ?
বিমল-বাহরামের আর বোঝার কিছু থাকে না। দুজনেই বাড়ি ফিরে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে থাকে তাদের জমির দলিল। নেই। কোথাও নেই। পূর্বপুরুষদের পরম্পরায় থাকা জমি কখন কী করে অহিদ-রশিদের জমি হয়ে গেল, তার কোনো কিনারা করা যায় না। অগত্যা চির-অভ্যস্ত মাটির কাজ ছেড়ে দুই নিখোঁজ পিতার দুই ছেলে বাজারে এসে শিকড় গাড়ার প্রাণান্ত চেষ্টা চালায়। বাহরাম একটা মুদিদোকানের কর্মচারী, বিমল ছোট্ট একটা বিড়ি-সিগ্রেট-পানের কুঠুরির মালিক।
একসকালে বেহাত হয়ে যাওয়া জমির পাশ দিয়ে বিমল-বাহরাম বাজারে তাদের দোকানের দিকে রওনা দিচ্ছিল। অকস্মাৎ ভিড় দেখে খেতে নামে তারা আরও অনেকের সঙ্গে। জমিতে মুগ কলাই আর আলুর চাষ দেওয়ার জন্য অহিদের কামলারা খেটেখুটে হয়রান। এদের মধ্যে সিরাজ নামের যে কামলা তার কোদালের কোপ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত শব্দ হয়। ধাতব না হলেও শক্ত কিছু একটা মাটির গর্ভে সমাহিত ভেবে, অথবা তার মনে গুপ্তধন না হলেও দামি কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে সে খনন অব্যাহত রাখে। এভাবে খানিকটা খনন চালানোর পর সিরাজের ভাগ্যে জোটে দুটি মাথার খুলি। মানুষের মাথার সে খুলি দুটির দিকে যে-ই তাকায় মনে হয় যেন খুলিও তার দিকেই তাকিয়ে। খবর পেয়ে ছুটে আসে অহিদের ছেলে রশিদ। ছেলেটাও হয়েছে ঠিক বাপের মতনই। যেকোনো কিছু থেকে কী করে নিজের লাভ বের করে আনা যায়, সে ব্যাপারে রশিদ দারুণ দক্ষ। যেহেতু খুলি দুটি মানুষের এবং গ্রামে তখন পর্যন্ত নিখোঁজ বলতে মানিক এবং মহরম, সেহেতু ৪০ বছর আগেকার হলেও সে আবিষ্কার সবার জমাট কৌতূহলের সামনে সমাধানের ইশারা হয়ে উঠল।
ধাতব না হলেও শক্ত কিছু একটা মাটির গর্ভে সমাহিত ভেবে, অথবা তার মনে গুপ্তধন না হলেও দামি কোনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা নিয়ে সে খনন অব্যাহত রাখে। এভাবে খানিকটা খনন চালানোর পর সিরাজের ভাগ্যে জোটে দুটি মাথার খুলি। সে খুলি দুটির দিকে যে-ই তাকায় মনে হয় যেন খুলিও তার দিকেই তাকিয়ে।
বস্তুত মানিক-মহরমের কথা লোকে মনে রেখেছিল কি না বলা কঠিন। হয়তো রেখেছিল। নইলে খুলি দুটির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিমল-বাহরামের কথা মনে পড়বে কেন। জমি নাহয় অহিদের এবং রশিদের হয়ে গেছে, কিন্তু সেই জমিতেই মানিক-মহরমের দেহাবশেষ পাওয়ার প্রত্যাশা ঠিকই জেগে ছিল তাদের মধ্যে। তারা বলতে থাকে, হ্যাঁ, আরও খুঁড়লে হয়তো আরও হাড়গোড় পাওয়া যাবে, কিন্তু দুটি জলজ্যান্ত খুলিই হতে পারে গ্রামটির ইতিহাসের দীর্ঘকালীন অমীমাংসিত বিষয়ের আশু সমাধান। তাদের মনে এই বোধ জাগে, প্রাপ্ত খুলি দুটির মধ্য দিয়ে মীরগঞ্জের যুদ্ধ–ইতিহাসের একটা পর্বের সমাপ্তি হয়তো ধারণা করা সম্ভব। অশ্রু বিসর্জনকারী বিমল-বাহরামকেও এই সত্য মেনে নিতে হয়, হ্যাঁ, তারা তো আসলে তাদের পিতাদের প্রত্যাবর্তনের আশাই করেছিল। হাজারো–লাখো বছর আগেকার প্রাচীন মানবদের হাড়গোড় খুলির মাধ্যমে প্রত্যাবর্তনের কাহিনি তারা শুনেছে। গ্রামবাসীর সান্ত্বনায় তাদের অশ্রুর পরিমাণ বাড়ে। রোদের তির খুলি দুটির ভেতর দিয়ে এমনভাবে যাওয়া-আসা করে যেন দৈববলে এক অলৌকিক জাদুকর বনে যাওয়া রশিদের হাতে সেগুলো কোনো মূল্যবান প্রাপ্তির চাবি।
খুলি যখন মিলেছে তখন নিশ্চিত, হাড়গোড়ও এই মাটিতেই নিহিত রয়েছে। একদৃষ্টে খুলির দিকে তাকিয়ে থাকা বিমল-বাহরামের তখন অনেককাল আগেকার সকাল–সন্ধ্যা রাত্রির কথা মনে পড়ে। ওদের পিতারা বলত, এখন চৌকির ওপর নয়, শুতে হবে চৌকির নিচে। তাহলে অন্তত মুক্তিযোদ্ধা আর পাঞ্জাবিদের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হলে তারা হয়তো রক্ষা পাবে বেমক্কা গুলির হাত থেকে। ধান সেদ্ধ করার বিরাট কড়াই রোজ ঘুমানোর সময় মায়ের মাথার দিকটায় ঢালের মতো করে বসিয়ে দিত বাহরামের বাবা মহরম আলী। একদিন মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে আড়চোখে তাকালে বাহরাম দেখে, মহরমের মা, তার দাদি সেই কড়াই টেনেহিঁচড়ে ছেলের মাথার কাছে এনে শক্ত রক্ষণব্যূহ তৈরি করছে। আর বিমলের মনে পড়ে, তার বাবা মহরম আলীর কাছ থেকে শিখে নেওয়া কলেমাগুলো তাদের সবাইকে শিখিয়ে দিচ্ছে রোজ রাতে ঘুমানোর সময়। কালেমা শাহাদাতটা অনেক কঠিন লাগত বিমলের। মানিক বলত, বাজান, যত কঠিনই লাগুক শিখন লাগব, নইলে বাঁচন নাই!
৪০ বছর আগেকার সময় এভাবে খুলির ফাঁকা শূন্যতার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। এসে সংযোগ রচনা করে বিমল-বাহরামের সঙ্গে। খুলি তখনো রশিদেরই নিয়ন্ত্রণে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয়, এগুলোই মানিক ও মহরমের অস্তিত্বের উপস্থিতির স্মারক, তবু জমির মালিকানার সূত্রে জমিতে উদ্গত সবকিছুরও সে-ই মালিক। তথাপি গ্রামবাসীর সরল মন অকস্মাৎ প্রশ্নশীল হয়ে উঠলে পরিস্থিতি অনিবার্যভাবে জটিল রূপ নেয়। দুটি খুলি দুই মানুষের বর্তমানতাকে প্রকাশ করলেও আপাতদৃষ্টিতে সেগুলো একটি আরেকটির অনুরূপ। যেন তারা যমজ মানবখুলি। একটুও বোঝার উপায় নেই, কোনটা মানিক আর কোনটা মহরম। শেষে প্রতিকার নিয়ে এলেন সর্বজনমান্য ইমাম সুলতান, তোমরা শোনো, এত ভাবনাচিন্তার কিছু নাই। সমস্যা আছে, সমাধানও আছে। রশিদ ভাইয়ের হাতে খুলি দুইখান থাকুক। চোখ বুজে বিসমিল্লাহ বলে আমি প্রথম যেটা হাতে লবো, সেডাই মহরম আলীর আর অন্যটা হলো গিয়ে মানিক নাথের।
এমন প্রস্তাব ও সমাধান জনতার নিকটে ধন্বন্তরি মনে হলে গ্রামবাসী সাক্ষী হলো এক দুর্লভ উপলক্ষের। দুটি খুলি কেবল দুটি মৃত্যুরই প্রামাণ্য দলিল নয়, বরং তারা বলতে পারে, যত লাখ লোকের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মানুষ অর্জন করেছে রক্তাক্ত বিজয়, সেই সংখ্যার সঙ্গে আজ আরও এক যোগ এক দুটি নিশ্চিত মৃত্যুকে জুড়ে দিতে হবে, যে মৃত্যু এতকাল নিখোঁজ শিরোনামে মীরগঞ্জের ইতিহাসে জাগিয়ে রেখেছিল একধরনের অনিশ্চয়তা। শত দুঃখকষ্টের মধ্যেও বিমল-বাহরামের এটুকু পরিতৃপ্তি হয় ভেবে, ষড়যন্ত্র করে অহিদ-রশিদ তাদের জমি ছিনিয়ে নিয়ে গেলেও মাথার খুলি দুটি তো তাদের দান করেছে। এখন তারা কিছু না পেলেও অন্তত গর্ব করে বলতে পারবে, এক নদী রক্তের বিনিময়ে যদি স্বাধীনতা আসে, তাহলে সেই পুঞ্জীভূত রক্তের মধ্যে কিছু রক্ত মানিক নাথ ও মহরম আলীর।
কিছুদিনের মধ্যেই একধরনের চাঞ্চল্য জেগে ওঠে মীরগঞ্জে। মাটির নিচে খুলি পাওয়ার সংবাদ একান–ওকান হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অনেকটা দূর। বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকেরা আসতে থাকেন গ্রামে এবং তাঁরা বিমল-বাহরামের সঙ্গে কথা বলেন অনেকটা সময় ধরে। শোনা যায়, এতে বিমল-বাহরামের কিছু অর্থ উপার্জনও হয়। বিশেষ করে দারিদ্র্যক্লিষ্টতার মধ্যেও এমন মাহাত্ম্যের নজির সহানুভূতিপ্রবণ কারও কারও মনে উপচিকীর্ষা জাগালে তারা স্বেচ্ছায় দাতা হয়ে পড়ে। একটু লেখাপড়া জানা লোকেরা তাদের দুজনকে পরামর্শ দেয়, তাদের উচিত খুলি দুটি নিজেদের জিম্মায় না রেখে সরকারের দপ্তরে জমা দেওয়া। হ্যাঁ, জমির মালিক মানিক-মহরম, পরবর্তীকালে অহিদ-রশিদ হলেও মূলত দেশের সমস্ত জমির মালিক সরকার। কাজেই সেই জমিতে প্রাপ্ত নিদর্শনের মালিকও সরকারই। কারও কারও ধারণা, এগুলোর ওপর কোনো কোনো লোভী মানুষের চোখ পড়তে পারে। অনেকের কাছেই কবরস্থান কিংবা শ্মশানের পুরোনো হাড়গোড় কঙ্কালের দারুণ চাহিদা। জাদুকরেরা নাকি সেগুলো ব্যবহার করে জাদুটোনা আর ব্ল্যাক ম্যাজিকের উদ্দেশ্যে। সাবধান ও সতর্ক না হলে হয়তো বিমল-বাহরামের পক্ষে শেষ পর্যন্ত দীর্ঘকাল পরে লাভ করা জিনিসগুলো হারিয়ে ফেলতে হবে।
রশিদ যেন অন্তর্যামী কিংবা সে কোনো এক শক্তিধর ভবিষ্যদ্বক্তা। অনেক বিষয়েই পরিণতি সম্পর্কে আগাম বলে দিতে পারাটা তার বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে গ্রামে বিবেচিত। কিন্তু সে যে বাহরামকেই এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছুড়ে দেবে, সেটা ছিল তার ধারণারও বাইরে।
ভাগ্যবিপর্যয়ের দুশ্চিন্তা দুজনকেই বিষণ্ন করে, কিন্তু তারা তখনই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কী তাদের করা উচিত। নিঃসন্তান বিমলের স্ত্রী তার ভাঙা ঘরে একটা শূন্য হাঁড়ির মধ্যে রেখে দেয় খুলিটা। বাহরামের ছেলে মনির থাকে সৌদি আরব। খবর পেয়ে সে জানিয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে দেশে ফিরে এলে বিষয়টা নিয়ে সে কিছু একটা করবে, যাতে তার পিতামহের আত্মত্যাগের কাহিনি স্বীকৃতি পায় মানুষের কাছে। এরই মধ্যে একদিন চতুর্দিকে দারুণ উত্তেজনার সংবাদ আসে। শহরজুড়ে চলতে থাকে মানুষের ক্ষোভ-প্রতিবাদের ঢেউ। কোনো কারণ ছাড়াই লোকেরা একে অন্যকে আক্রমণ করে, কখনো অতর্কিতে কখনো দল বেঁধে পরিকল্পনামাফিক। বিষণ্নতার ধোঁয়া ধোঁয়া ছায়া বিমলের চোখেমুখে। দেখে বাহরাম ভাবে, যে বন্ধু একদিন তাকে সবকিছু খুলে বলত, মনের সব উদ্বেগ আর সংশয়ের বিষয়ে আগবাড়িয়ে কথা বলত, সে বন্ধুটিও কেমন যেন মনমরা-নিস্তেজ হয়ে গেছে।
কোন কারণে শৈশবসখা বিমলের মনে অশান্তি আর অনিশ্চয়তার ঘনঘটা, সেটা তাকে জানতেই হবে। এমন ভাবনা নিয়ে বাহরাম কেবলই তার উঠোনের কোণে তেঁতুলগাছটার নিচে দাঁড়ায় আর তখন অহিদের ছেলে রশিদ একগাল হাসি নিয়ে হাজির তার সামনে, বারাম ভাই, কী খবর, পরিস্থিতি বুঝতাছেন তো? এইবার মনে অয় একটা কিছু অইব।
রশিদের কথা বুঝতে কষ্ট হয় না বাহরামের কিন্তু একটা কিছু কী হবে, সেটা বোঝা তার পক্ষে দুষ্কর হয়ে পড়ে। রশিদ আরও এমন সব কথা বলে যেগুলোর মর্মোদ্ধার তার সাধ্যে কুলোয় না। মানুষ নাকি এখন অন্যভাবে চিন্তা করতে শুরু করেছে। এই অন্য ভাবটা কী ও কেন, সেটাই বুঝতে পারে না বাহরাম। বন্ধু বিমলের গোবেচারা মুখটা চোখে ভেসে ওঠে তার। কিন্তু রশিদ যে আরও এক জটিল সমস্যার ধাঁধা নিয়ে আসবে, সেটা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি বাহরাম। রশিদ যেন অন্তর্যামী কিংবা সে কোনো এক শক্তিধর ভবিষ্যদ্বক্তা। অনেক বিষয়েই পরিণতি সম্পর্কে আগাম বলে দিতে পারাটা তার বিশেষ যোগ্যতা হিসেবে গ্রামে বিবেচিত। কিন্তু সে যে বাহরামকেই এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছুড়ে দেবে, সেটা ছিল তার ধারণারও বাইরে। একটা রহস্যময় হাসির আভাস রশিদের ঠোঁটের কোণে, যে হাসিটা সে তার পিতা অহিদের কাছ থেকে পেয়েছে, বারাম ভাই, শোনো। যে খুলিডা তুমি মনে করতাছ তোমার বাবার, সেডা আসলে বিমলের বাবা মানিকের আর বিমলের কাছে যেডা, সেডা হলো তোমার বাবার।
রশিদ দাঁড়ায় না। এক বিরাট অনিশ্চিত গহ্বরের মধ্যে বাহরামকে ঠেলে ফেলে দিল কেউ। কেবল তখনই তার মনে হলো, ব্যাপারটাকে সে এমনভাবে খেয়াল করে দেখেনি। কিন্তু রশিদ কী করে এতটা নিশ্চিতভাবে বলতে পারল যে বিমলের কাছে থাকা খুলিটাই তার বাবা মহরমের আর তারটা মানিকের। প্রাপ্ত খুলি দুটির মধ্যে এমনকি কোনো সূত্র বা চিহ্ন থাকা সম্ভব, যেটির জোরে রশিদ বলতে পারে, কোনটি কার। একই কথা কি তাহলে রশিদ বিমলকেও বলেছে! আগুয়ান দুশ্চিন্তার মেঘটাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বাহরাম রওনা হলো বন্ধু বিমলের ঘরের দিকে। একটা স্তব্ধ জমাটবদ্ধতায় ঢাকা বিমলের ছোট্ট একচালা ঘরটা। দরজা খোলা। ঘর জনমানবশূন্য। ত্রিসীমানায় পাওয়া গেল না বিমল কিংবা তার স্ত্রী বাণীকে। তাহলে কি সে বাজারে তার পানের বাক্সটার ওখানেই রয়েছে! ভেবে দ্রুত বাহরাম ছোটে বাজারের দিকে। বাজারটাতেও একটা থমথমে ভাব। একটা মাতাল ঝোড়ো হাওয়া বয়ে গেলে যেমন হয়, সে রকম। স্তম্ভিত বাহরাম আবিষ্কার করল, বিমলের পান-বিড়ি-সিগ্রেটের বাক্সটাতে কারা যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। বাক্সটা পোড়া কয়লার চৌকোনা আকৃতির মধ্যে তখনো বাক্সেরই জানান দেয়, কিন্তু সেটা কতক্ষণ থাকবে বলা মুশকিল। একটা ঝোড়ো হাওয়া এলে কিংবা পিটিয়ে একপশলা বৃষ্টি হলেই কয়লার পরিণতিও আর অবশিষ্ট থাকবে না।
হতাশ বাহরাম বাড়ি ফেরে। সবকিছু কেমন নিরানন্দকর আর অহেতুক মনে হতে থাকে। কানে বাজে অহিদের ছেলে রশিদের কথা। সে যে বলে গেল, ‘একটা কিছু অইব’, সেটা আসলে কী, তা কোনোভাবেই উপলব্ধিতে আনতে পারে না সে। টেবিলে রাখা মাথার খুলিটার মুখোমুখি হলো বাহরাম। গোধূলির যেটুকু আলো এসে পড়ে, তাতে সেই খুলির কোটরভর্তি শূন্য চোখে মানিক না মহরম কার দৃষ্টি, সেটা সত্যি উদ্ধার করা অসম্ভব। একবার মনে হয় মানিকের, একবার মনে হয় বাপ মহরমের। রশিদ তার মনের মধ্যে সন্দেহটুকু ঢুকিয়ে দিলেও বাহরামের পক্ষে নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া সম্ভব হলো না, খুলিটা আসলে মাণিকেরই। হাড়ের শক্ত অবয়বে ছড়ানো শূন্যতা আর কাঠিন্য জুড়ে দিলে যেটুকু অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব দাঁড়ায়, তাতে এমন কোনো সূত্র সত্যি পাওয়া যায় না, যার ওপর ভর করে বাহরাম বলতে পারে, খুলিটা মানিকের, এবং তখনই তার মনে উঁকি মারতে আরম্ভ করল দ্বিতীয় সম্ভাবনা, খুলিটা যে মহরমেরই, তা-ও তো বলা মুশকিল। কোন সূত্রের ভিত্তিতে সে বলতে পারবে, টেবিলে রাখা মাথার খুলিটা তারই জনক মহরম আলীর। এসব ভাবতে ভাবতে আর বন্ধু বিমলের পোড়া দোকানবাক্সের কথা চিন্তা করতে করতে বাহরাম দিশাহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু সেটা হলে তো চলে না। তাকে তো সুস্থ থাকতে হবে। হাত থেকে খুলিটা ফের টেবিলে রেখে দিয়ে বাহরাম আপনমনে ভাবে, মাথার খুলি নিয়ে এমন চিন্তাভাবনার কী দরকার। সব মানুষের ভেতরেই তো এ রকম একটা করে খুলি আছে!