আর্জেন্টিনা কি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, না ‘পিকনিক’ করছে

· Prothom Alo

১ এপ্রিল, ২০২৬।  
বুয়েনস এইরেসের বিখ্যাত লা বোমবোনেরা স্টেডিয়াম।
ম্যাচ শেষে লিওনেল স্কালোনি যখন সংবাদ সম্মেলনে বসলেন, তখন তাঁর শরীরী ভাষায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। দিন তিনেক আগে মৌরিতানিয়াকে ২-১ গোলে হারানোর পর জাম্বিয়াকেও ৫-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। জয়ের আনন্দ থাকারই কথা। কিন্তু সেই নিস্তরঙ্গ প্রশান্তিতে হুট করেই যেন একপশলা অস্বস্তির বৃষ্টি নামালেন এক আগন্তুক।

সবাই যখন প্রশ্ন করার সুযোগ খুঁজছেন, তখন পেছন থেকে দাঁড়িয়ে গেলেন এক ব্যক্তি। গায়ে ১৯৮৬ সালের সেই বিখ্যাত অ্যাওয়ে জার্সি, যেটির পেছনে নামের জায়গায় লেখা ‘মানো দে দিওস’—ঈশ্বরের হাত। হাতে মাইক্রোফোন নেই, কিন্তু গলায় অদ্ভুত এক আর্তি। স্কালোনিকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘মৌরিতানিয়া কিংবা জাম্বিয়া কি আর্জেন্টিনার জন্য সঠিক মানের প্রতিপক্ষ? ওদিকে ফ্রান্সের ‘সি’ দলও কিন্তু কলম্বিয়াকে হারিয়ে দিচ্ছে!’

Visit h-doctor.club for more information.

বিশ্বকাপে মেসিদের খেলা দেখতে সাইকেলে ১৭ হাজার কিমি পাড়ি দিচ্ছেন তিন বন্ধু

আর্জেন্টিনার প্রেস অফিসার তাঁকে থামানোর চেষ্টা করলেন। নিরাপত্তাকর্মীরা সরিয়ে দিতে চাইলেন। এতে ওই লোক যেন আরও মরিয়া হয়ে উঠলেন। প্রায় আর্তনাদের সুরে বললেন, ‘আমি তো সাহায্য করতে চাই। মানুষ তো এসব জানতেই চায়!’ স্কালোনি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন। ওই আগন্তুককে সরিয়ে দেওয়া হলো শেষ পর্যন্ত। তবে লোকটা যে প্রশ্নটা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে গেলেন, সেটা আসলে উঠেছে আরও অনেকের মনেই। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা কি তবে স্রেফ আত্মতুষ্টির সাগরে ভাসছে?

মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে গোল করেন এনজো ফার্নান্দেজ

সামনেই বিশ্বকাপ। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে নামবে আলবিসেলেস্তেরা। অথচ তাদের প্রস্তুতি সার্কাসের চেয়ে কম কিছু নয়। ইরানের যুদ্ধের কারণে স্পেনের বিপক্ষে কাতারে অনুষ্ঠিতব্য ‘ফিনালিসিমা’ বাতিল হয়ে গেল। এরপর তড়িঘড়ি করে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন (এএফএ) প্রতিপক্ষ খুঁজে আনল মৌরিতানিয়া আর জাম্বিয়াকে!

এএফএর গায়েও এখন দুর্নীতির দাগ। ২০২৩ সাল থেকে টাকাপয়সা নয়ছয় করা নিয়ে তদন্ত চলছে। শিরোপা ধরে রাখার কৌশল ঠিক করার চেয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার কামানোই যেন তাদের প্রধান লক্ষ্য। গত পাঁচটি প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কারা ছিল জানেন? ভেনেজুয়েলা, পুয়ের্তো রিকো, অ্যাঙ্গোলা, মৌরিতানিয়া ও জাম্বিয়া। এদের কেউই এবারের বিশ্বকাপে নেই! এমনকি বিশ্বকাপের আগে শেষ দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ হবে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও আলাবামার দুটি কলেজ ফুটবল স্টেডিয়ামে, হন্ডুরাস ও আইসল্যান্ডের বিপক্ষে।

আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি

মৌরিতানিয়ার বিপক্ষে জয়ের পর স্কালোনি নিজেও স্বীকার করেছেন ম্যাচটা বড্ড ম্যাড়মেড়ে ছিল। এমি মার্তিনেজ তো আরও সোজাসাপটা, ‘আমাদের খেলা দেখে মনে হয়েছে কোনো তাড়না নেই, গতি নেই। জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দিলে আমাদের আরও ভালো খেলতে হবে।’
এখন পর্যন্ত আর্জেন্টিনার সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সেই একটাই নাম—লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় তিনি। অথচ এখন পর্যন্ত স্কালোনি বা মেসি—কেউই নিশ্চিত করেননি মেসি খেলবেন কি না।

আর্জেন্টিনা বাজে খেলার পর স্কালোনি বললেন, ‘এটাই বাস্তব’


স্কালোনিকে যখনই মেসির অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি সাবলীলভাবে তা এড়িয়ে যান। টানা দুবার কোপা আমেরিকা আর কাতার বিশ্বকাপ জেতানো কোচের গায়ে সমালোচনার আঁচ লাগে না ঠিকই, কিন্তু মেসি-মহিমার কাছে তিনিও যেন অসহায়। স্কালোনি বলছেন, ‘সবই নির্ভর করছে ওর মনের ওপর, ওর ফিটনেসের ওপর। ও নিজেই নিজের ভাগ্য ঠিক করার অধিকার অর্জন করেছে।’

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি

কিন্তু মেসি কিসের অপেক্ষা করছেন? বাছাইপর্বে ১২ ম্যাচে ৮ গোল করে তিনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা। ইন্টার মায়ামির হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লিগ মাতাচ্ছেন। তাহলে কি বড় কোনো দলের বিপক্ষে নিজের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ ‘এলএমটেন’ নিজেই সন্দিহান!

আসলে  প্রত্যাশার চাপ কতটা অসহ্য হতে পারে, মেসির চেয়ে ভালো কেউ জানে না। ২০২১-এর আগে এই নিজ দেশের মানুষই তাঁকে ট্রফি না জেতার দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। দোহার লুসাইলে সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের পর অমরত্ব পেয়ে গেছেন। চাইলে তখনই বিদায় নিতে পারতেন। কিন্তু এখন তিনি দোদুল্যমান। পেশির চোট বারবার হানা দিচ্ছে, হারিয়ে গেছে সেই অতিমানবীয় গতি। বিশ্বকাপের মতো ক্ষিপ্রতার মঞ্চে যদি মেসি তাঁর সেরাটা দিতে না পারেন, তবে সেই স্মৃতি হবে বড় বেদনার।
তাঁর এবং আর্জেন্টিনার!

আর্জেন্টিনা এখন সেই বাঘের মতো, যে শিকার ভুলে বনভোজনে মেতেছে। বনের অন্য শিকারিরা কিন্তু ঠিকই দাঁত শাণাচ্ছে।

বিশ্বকাপের আগে ইউরোপিয়ান দলের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা

Read full story at source