বিশ্বকাপের প্রথম ডোপপাপী ও তাঁর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার গল্প
· Prothom Alo

৫০ বছরের বেশি সময় আগে মিউনিখের এক হোটেল করিডরে একজন মানুষ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফোন করছিলেন। তাঁর নাম আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফ। হাইতির জাতীয় দলের এই ডিফেন্ডার সেই মুহূর্তে শুধুই একজন ভীত মানুষ, যিনি জানতেন বাড়ি ফিরলে কী অপেক্ষা করছে।
Visit grenadier.co.za for more information.
কেন ভীত, আর ফোনে কী বলেছিলেন, তা জানার আগে একটু পেছনে যেতে হবে।
১৯৭৪ সাল। হাইতি তখন ডুভালিয়ে পরিবারের শাসনের কবলে একটানা ১৭ বছর। ১৯৫৭ থেকে ফ্রাঁসোয়া ‘পাপা ডক’ এবং ১৯৭১ সাল থেকে তাঁর ছেলে জাঁ-ক্লদ ‘বেবি ডক’—দুই প্রজন্মের এই স্বৈরশাসন টিকে ছিল নির্যাতন, খুন আর আতঙ্কের ওপর ভর করে। এই শাসনের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘টঁটঁ মাকুত’। ডুভালিয়ের এই ভয়ংকর গোপন পুলিশ বাহিনী যাকে ইচ্ছা ধরে নিয়ে যেতে পারত।
হাইতির সব ফুটবলার এই বাস্তবতার মধ্যে বড় হয়েছিলেন, আর তাঁদের প্রত্যেকেরই মনে ছিল জো গ্যাতজেঁসের গল্প। গ্যাতজেঁস ছিলেন হাইতির নামী ফুটবলার। ১৯৬৪ সালে তাঁর ভাইদের রাজনৈতিক কার্যকলাপের কারণে টঁটঁ মাকুত গ্যাতজেঁসকে পোর্ট–অ–প্রিন্সের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর থেকে কেউ আর তাঁকে দেখেনি।
এটাই ছিল হাইতির ফুটবলারদের জানা বাস্তবতা। জানতেন আর্নস্ট ইয়ান–জোসেফও।
আর্নস্ট ইয়ান-জোসেফ খেলতেন হাইতির ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ভায়োলেত এ.সির হয়ে। লালচে চুলের এই ডিফেন্ডার ১৯৭২ সালে জাতীয় দলে খেলা শুরু করেন। ডাক পান ১৯৭৪ বিশ্বকাপ দলেও।
ডোপ পাপ
পশ্চিম জার্মানিতে হওয়া বিশ্বকাপটিতে হাইতি প্রথম ম্যাচে ইতালির কাছে ৩–১ গোলে হারে। ম্যাচের পর নিয়মিত ডোপ পরীক্ষায় ডাকা হয় ইয়ান–জোসেফকে। তাঁর নমুনায় পাওয়ায় যায় নিষিদ্ধ উদ্দীপক ফেনমেট্রাজিনের উপস্থিতি।
ফিফার অ্যান্টি-ডোপিং কমিটির প্রধান ডা. গটফ্রিড শোয়েনহলজার তাৎক্ষণিকভাবে ইয়ান–জোসেফকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করেন। ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে ডোপিংয়ের দায়ে নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
ইয়ান–জোসেফের খেলার এই ছবিটি পাওয়া গেছে ইনস্টাগ্রামেইয়ান-জোসেফ অবশ্য আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। দাবি করেন, হাইতিতে তাঁর চিকিৎসক হাঁপানির চিকিৎসার জন্য ওষুধ দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না এতে নিষিদ্ধ উপাদান আছে। কিন্তু দলের ফরাসি চিকিৎসক জানান, ইয়ান-জোসেফের কোনো হাঁপানিই নেই।
পরে ইয়ান-জোসেফ স্বীকার করেন তিনি পারফরম্যান্স বাড়ানোর চেষ্টায় ওই ড্রাগ নিয়েছিলেন। হাইতির ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান জাঁ ভোরবে সাংবাদিকদের জানান, ইয়ান–জোসেফ মিউনিখেই থাকবেন। বিশ্বকাপে দলের বাকি ম্যাচগুলোয় গ্যালারিতে থাকবেন।
এল সালভাদরের সেই তরুণী এবং এক শ ঘণ্টার সেই ‘ফুটবল যুদ্ধ’পরের দুই দিন ইয়ান-জোসেফ কাটালেন মিউনিখের পেন্টা হোটেলের লবিতে। তবে একা নয়, সার্বক্ষণিক পাহারায় ছিল টঁটঁ মাকুতের লোকেরা।
এখানে একটি বলে রাখা ভালো। হাইতির ফুটবল ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মেজর অ্যাসিডিয়াস সেন্ট লুই একই সঙ্গে ছিলেন বেবি ডকের সরাসরি অধীনস্থ ‘লেপার্ডস’ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার। অর্থাৎ হাইতির ফুটবল প্রশাসন এবং ডুভালিয়ের সামরিক বাহিনী ছিল প্রায় একই সত্তা। বিশ্বকাপের দলের সঙ্গে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা শুধু ফুটবল কর্মকর্তা ছিলেন না।
ইয়ান-জোসেফ এই ফাঁদের মধ্যে বসে অনুমান করতে পারছিলেন, তাঁর ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হতে পারে। গ্যাতজেঁসের কথা মনে ছিল তাঁর। যে মানুষ নিজে কোনো রাজনীতি করেননি, শুধু তাঁর ভাইদের কারণে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। আর ইয়ান-জোসেফ তো সরাসরি বিশ্ব মঞ্চে ‘বেবি ডক’কে বিব্রত করেছেন।
মিউনিখ পুলিশের সঙ্গে ইয়ান–জোসেফহোটেলে একজন ফরাসিভাষী জার্মান হোস্টেসের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল ইয়ান–জোসেফের। মাকুতরা আশপাশে ঘুরঘুর করতে শুরু করার পর তিনি বারবার সেই হোস্টেসকে ফোন করলেন সাহায্যের আশায়। হোস্টেস সেই কথা জানান ফিফার মনোনীত দলীয় সংযোগকর্মী কুর্ট রেনারকে।
রেনার বিষয়টি তাঁর ঊর্ধ্বতনদের জানালেন। কয়েকজন সাংবাদিককেও বললেন। খবর ছাপা হলো; কিন্তু ফল হলো উল্টো। বিশ্বকাপ আয়োজন কমিটি কুর্ট রেনারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। ইয়ান-জোসেফের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলো না।
যুদ্ধবন্দী, মিথ্যা পরিচয় আর বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের গল্পকয়েক ঘণ্টা পরই টঁটঁ মাকুতের কয়েকজন সদস্য ইয়ান-জোসেফকে গ্রুনভাল্ড স্পোর্টস স্কুল থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। বিমানবন্দরের কাছের শেরাটন হোটেলে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখা এক রাত। পরদিন ভোরে তাকে পোর্ট অ প্রিন্সের একটি বিমানে তুলে দেওয়া হয়।
দলের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার ফ্রিৎস প্লাঁতিন পরে বলেছিলেন, ‘আমরা (ফুটবলাররা) শাসনের সেই অন্ধকার দিকটা থেকে আগে সুরক্ষিত ছিলাম; কিন্তু এবার সেই আঁধার সরাসরি আমাদের ছুঁয়ে গেল। পোল্যান্ডের ম্যাচের আগের রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। শুধু আর্নস্টের কথা মাথায় ঘুরছিল, খেলার কথা নয়।’
পোল্যান্ডের বিপক্ষে হাইতি ৭-০ গোলে হারে। ‘বেবি ডক’ও সম্ভবত ইয়ান–জোসেফকে নিয়ে তাঁর সতীর্থদের উদ্বেগের বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি জোসেফকে দিয়ে দলের অধিনায়ক ফিলিপ ভোরবেকের কাছে ফোন করান। উদ্দেশ্য, তিনি বেঁচে আছেন, এটা যেন সবাই জানে।
হাইতিতে ফিরে ইয়ান-জোসেফের ঠিক কী হয়েছিল, তার বিশ্বাসযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। ইয়ান–জোসেফ নিজেও কিছু বলেননি। তবে একটা গুজব ছিল যে তাঁর হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। তবে ফিফার এক বছরের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে পরে ইয়ান–জোসেফ হাইতির জাতীয় দলেও ফিরেছিলেন। এমনকি ১৯৭৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে সাতটি ম্যাচ এবং ১৯৮২-এর বাছাইপর্বে একটি ম্যাচও খেললেন।
২০২০ সালের ১৪ আগস্ট ইয়ান–জোসেফ মারা যান।
৫২ বছর পরে ...
এই ইতিহাসের স্মরণ শুধুই ইতিহাসচর্চার জন্য নয়।
১৯৭৪ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপে ফিরছে হাইতি। ‘সি’ গ্রুপে খেলবে ব্রাজিল, মরক্কো ও স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। হাইতির এবারের বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইও কিন্তু কম বিস্ময়কর নয়। দেশের ভেতরে গ্যাং সহিংসতার কারণে হাইতি তাদের সব ‘হোম ম্যাচ’ খেলেছে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে।
হাইতির এখনকার খেলোয়াড়রা নিশ্চয়ই ইয়ান–জোসেফকে ভুলে যাননি।
তাঁরা দুজন: বিশ্বযুদ্ধের আগেও ছিলেন, বিশ্বযুদ্ধের পরেও