পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়া রোহিঙ্গাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে: ইউএনএইচসিআর
· Prothom Alo

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখনো ব্যাপকভাবে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁটের প্রেক্ষাপটে সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে নারী ও কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ ব্যক্তি এবং ২০২৪ সালের শুরু থেকে রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা প্রায় দেড় লাখ নতুন মানুষের জন্য।
Visit newssport.cv for more information.
কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এই পরিস্থিতি তুলে ধরে তাঁদের জন্য সহায়তা কাটছাঁটের বিষয়ে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবর বালোচ সোমবার জেনেভার পালে দে নাসিওঁ-এ অনুষ্ঠিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন। ঢাকায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মুখপাত্র বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার আবেদনে সাড়া দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রয়োজনীয় অর্থের ৬০ শতাংশ দিয়েছে। তবে শুধু ন্যূনতম সহায়তা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। পর্যাপ্ত সহায়তা না পেলে শরণার্থীদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে সংকট মোকাবিলায় আরও বেশি ব্যয় ও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বাবর বালোচ বলেন, এ বছর মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গণহারে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ৯ বছর পূর্ণ হবে। ইউএনএইচসিআর তার অংশীদারদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যাতে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ভুলে না যায়। এদের বেশির ভাগই কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছেন।
কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গারা তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে আসছেন এবং বাংলাদেশ সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে পর্যায়ক্রমে আসা এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। সবচেয়ে বড় ঢলটি আসে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে, যখন প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদার সহায়তা তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এমন এক সময়ে ইউএনএইচসিআর এই আহ্বান জানাচ্ছে, যখন বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীলতা এবং মানবিক সংকটের চাপ বাড়ছে। এর ফলে সীমিত সম্পদের মধ্যে কঠিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য অপরিহার্য সেবাগুলো হুমকির মুখে পড়ছে।
বাবর বালোচ জানান, গত মাসে বাংলাদেশে জাতিসংঘ এবং এর অংশীদারেরা বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নতুনভাবে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন করেছে তারা। প্রয়োজন বাড়তে থাকলেও এই অতি গুরুত্বপূর্ণ চাহিদাভিত্তিক আবেদনটি গত বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
বাবর বালোচ বলেন, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থী কার্যক্রমে মানবিক অর্থায়ন বাংলাদেশকে জীবন রক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখতে এবং শরণার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষায় বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জনে সহায়তা করেছে। তবে উল্লেখযোগ্য মানবিক চাহিদা রয়ে গেছে এবং অব্যাহত আন্তর্জাতিক সংহতি ছাড়া রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর দুর্দশা আরও বাড়বে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা, নিপীড়ন ও সংঘাত অব্যাহত থাকায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসছে। ফলে অনেক শরণার্থী মরিয়া সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, অনেক শরণার্থী ভালো জীবনের আশায় অন্য দেশে যেতে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছেন, যেখানে প্রাণহানির শঙ্কাও থাকে। ২০২৫ সাল ছিল এ ধরনের যাত্রার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মুখপাত্র বলেছেন, এই প্রেক্ষাপটে সহায়তার আবেদনটি সবচেয়ে জরুরি মানবিক প্রয়োজনগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা ও ভবিষ্যতের আশা ধরে রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে ত্রাণসহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে তাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শরণার্থী সংস্থার মুখপাত্র বলেন, মিয়ানমারে সংঘাত ও সহিংসতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে হবে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।