দিবাস্বপ্ন
· Prothom Alo

হাসান আজিজুল হকের ‘দিবাস্বপ্ন’ গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ৬ নভেম্বর প্রথম আলোর প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যার ‘শুক্রবারের সাময়িকী’তে। তখনো প্রথম আলোর অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়নি, তাই গল্পটি এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়েই ছিল। গল্পটি আজ প্রথমবারের মতো ‘অন্য আলো’র অনলাইন পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
রহিম বখশের জীবন খুব লম্বা। এই লম্বা জীবনের শেষভাগে যখন তাকে জন্মভূমি ছাড়তে হয়, তখন সে ভীষণ বিপাকে পড়ে যায়। সবকিছুই লাগতে থাকে অদ্ভুত। কিছুই ঠিক চিনে উঠতে পারে না। পরিচিত জিনিসকেও বিচিত্র ঠেকতে থাকে। ভয় পেয়ে বুড়ো তার ছেলেকে কথাটা জানায়, আমি কিছুই ঠিক বুঝে বা চিনে উঠতে পারি না। ছেলে সামান্য কেরানি—বেশি কিছু বোঝানোর চেষ্টা কোনো দিনই তার পক্ষে করা সম্ভব হয়নি। কাজেই সরলতম পন্থা হিসেবে একজন ডাক্তারের কাছে গিয়ে রহিম বখশের জন্য একটা চশমার ব্যবস্থা করে ফেলল, যদি তাতে বাপের চোখের ঝাপসা ভাবটা কাটে এবং সে আবার পৃথিবীটাকে ঠিকঠাক দেখতে পায়। চিকিৎসাটি ব্যর্থ হলো। রহিম বখশ দেখার চেষ্টায় বারবার চশমা মোছে, চোখ কচলে পরিষ্কার করতে চায়। তাতে আরও ঝাপসা, আরও আবছা হয়ে আসে সবকিছু। মানুষ, প্রাণী, গাছপালা—সবই মঞ্চের পেছনে চলে যায়।
নতুন দেশে আসার সময় একটি কামনা ছিল তার। সে যেন পরিষ্কার ঝকঝকে কোনো সকালে সেখানে পৌঁছায়, রাতে একেবারেই পুরো নতুন দেশটা দেখে ফেলতে পারে এবং ছবিটা মৃত্যু পর্যন্ত মনে গেঁথে নিতে পারে। কিন্তু ব্যাপার দাঁড়াল উল্টা। যে সময় তারা বোঁচকাবুঁচকি, হাঁড়িকুঁড়ি, লেপকাঁথা নিয়ে স্টেশনে নামল, তখন রাত দশটা বেজে গেছে, দারুণ অন্ধকার। তীক্ষ্ণ বাঁশি বাজিয়ে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে গেলে রহিম বখশ ঠান্ডা আকাশের নিচে চুপচাপ বসে থাকে। তার পুত্রবধূ দশ বছরের মন্টুকে নিয়ে একটি কাঁঠালগাছের তলায় উবু হয়ে বসে অপেক্ষা করে। ছেলে একটা গরুর গাড়ি বা রিকশাটিকশা খুঁজতে যায়।
সেই যে চোখে অন্ধকার বাসা নিল, আর সেটা সরল না। গা গুলিয়ে মানুষজন দেখা যায় না। পথগুলো হাতড়ে হাতড়ে পাতালের দিকে চলে যাচ্ছে। কোথাও থই পাওয়া যায় না। ছেলে সকালে উঠেই কাজে চলে যায়। দেশ থেকে আনা কাঁসার বাটিতে দুটো মুড়ি আর ভাঙা কাপে একটু চা দিয়ে যায় ছেলের বউ। সেটুকু খেয়ে নিয়ে রহিম বখশ বুকে হাঁটু গুঁজে কী করে দিনটা কাটতে পারে ভাবে। রাত এলে সকালের নাগাল সুদূর সম্ভাবনা মনে হয়।
এভাবে চলতে চলতে শীত এসে গেল। রহিম বখশের পুরোনো তুলোর জামাটি প্যাঁটরা থেকে বের করা হলো। ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার হয়ে গেছে। পাটকিলে রঙের মাথা-কান-গলা ঢাকা পশমি টুপিটাও খুঁজে পাওয়া যায়। এসব গায়ে জড়িয়ে বসে রহিম বখশ অপেক্ষা করতে থাকে। এ রকম অবস্থাতেই একটি-দুটি করে স্বপ্নেরা আসতে শুরু করল। অনেকটা সিনেমা হলে বসে ছবি দেখার মতো। কারণ, চশমাতেও আজকাল রহিম বখশের বিশেষ সাহায্য হচ্ছিল না। যা সে দেখতে চাইত, মানুষ বা কোনো বস্তু, নাতির মুখ বা খাবার, খুব কাছে নিয়ে যেতে হতো চোখ। এত করেও সে দেখতে পাচ্ছিল না।
হাসান আজিজুল হকএই ফাঁকে রহিম বখশের বিষয়ে দু–একটা কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। কোনো অসাধারণ জীবন সে কাটায়নি, যাতে তার সমস্ত স্বপ্নই চমৎকার হবে। তবে সে বাল্যকালটা কাটিয়েছিল সুন্দর। প্রচুর ধানের জমি ছিল তার বাপের। বলতে গেলে তার বাবাকে একজন গ্রাম্য জমিদারই বলা চলত। বিশাল ভুঁড়িঅলা চেহারা—গভীর কণ্ঠ।
নতুন ঘটনাটা শুরু হলো এই শীতে। যে স্বপ্ন সে দেখছিল তা সে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করতে পারে। রহিম বখশ ছেলেকে ব্যাপারটা বলবে ভেবেছিল, কিন্তু তাতে হয়তো উজবুক ছেলেটা মনে করবে এসবই চশমার ফল। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে যে রহিম বখশ চশমা ছাড়াই, চোখে কিছুই না দেখতে পেলেও, ছবি দেখছে একটার পর একটা, নতুন ধরনের রোগ মনে করে একটু ঘাবড়ে গেল রহিম বখশ।
প্রথমে দেখল সেই দীর্ঘ তালগাছগুলো। নীল আকাশের দিকে সোজা তাদের মাথা উঠে গিয়ে ছাতার মতো ছড়িয়ে গেছে। লাল কাঁকুরে মাটিতে তাদের শিকড় জেগে আছে। এভাবে স্বপ্নেরা আসতে শুরু করল—বিরামহীন মাঠ ও কৃষিভূমি, বিশাল দিঘি বা নিচু জলাভূমি, হেমন্তের শস্যক্ষেত্র বা শীতরাত্রির আকাশ।
রহিম বখশ তার দীর্ঘ জীবনের এক প্রান্তে আপনার বাল্যকাল দেখ উত্তেজনায় ঘেমে ওঠে। তার বাল্যের মতোই তার দেশ আজ সমান সুদূর। কখনো সে দুপুরেই দেখতে পাচ্ছে এক সন্ধ্যা। বাড়ির সামনে খোলা খামারে ধান স্তূপ করা আছে—ভর্তি হয়ে আছে সমস্ত খামারটা। শীতের ভারী সন্ধ্যার কুয়াশা আর অন্ধকার আস্তে আস্তে নামছে গাঁয়ের ওপর। সেই অন্ধকারের মধ্যে ছোট ছোট পাহাড়ের মতো জেগে আছে ধানের স্তূপগুলো। রুখু গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে ধানের। দূর থেকে কুকুরের চিৎকার কানে আসছে। এই কনকনে ঠান্ডাতেও খামারে একরকম উষ্ণতা ভেসে বেড়াচ্ছে। দূরে মাঠের মধ্যে গোল হয়ে কৃষকেরা বসেছে। আগুন জ্বালিয়ে গাছসুদ্ধ মসুরি কড়াই পোড়ানো চলছে। তেমনই আগুন জ্বালিয়ে বৃত্তাকারে বসেছে সাঁওতাল মেয়েপুরুষ। তাদের বৃদ্ধেরা মাথা ঝুঁকিয়ে বসে, মেয়েরা কলকল করে কথা বলে, যুবকটি একটু দূরে বসে বাঁশি বাজায়।
এই ফাঁকে রহিম বখশের বিষয়ে দু–একটা কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। কোনো অসাধারণ জীবন সে কাটায়নি, যাতে তার সমস্ত স্বপ্নই চমৎকার হবে। তবে সে বাল্যকালটা কাটিয়েছিল সুন্দর। প্রচুর ধানের জমি ছিল তার বাপের। বলতে গেলে তার বাবাকে একজন গ্রাম্য জমিদারই বলা চলত। বিশাল ভুঁড়িঅলা চেহারা—গভীর কণ্ঠ। আর তার ছিল নরঘাতী নিষ্ঠুরতা। তবু রহিম বখশের বাবা জমিদার ছিল না, ছিল মাঝারি একজন জোতদার। প্রতিবেশীদের ফাঁকি দিয়েই জমিজমা সংগ্রহ করতে হয়েছিল তাকে। এ জন্য লোকটা জীবনে অজস্র মামলা–মোকদ্দমায় জড়িয়ে গিয়েছিল। গাঁয়ের প্রতি দশম ব্যক্তিটির সঙ্গে তার একটি মামলা চলতই। কিন্তু তার ওপর গাঁয়ের লোকের যে কোনো আক্রোশ আছে, তা স্পষ্ট কর বোঝার উপায় ছিল না। অন্তত রহিম বখশ তার ছেলেবেলায় এটা কোনো দিন টের পেয়েছিল, এমন মনে করতে পারে না। অথচ তার বাপের গোলায় ধান তুলতে তুলতে যে কৃষকটি হেসে হেসে কথা বলে, মনিবের যেকোনো জিনিস সম্পর্কে এমন উক্তি করে যেন ওসব জিনিস তার নিজেরই অধিকারভুক্ত, সেই লোকটিরই জমি কয়েক দিন আগে ফাঁকি দিয়ে নিয়েছে রহিম বখশের বাপ। কী করে বোঝা যাবে, যে প্রৌঢ়টি ব্যাপার জড়িয়ে আরাম করে বসে কিছু বালক বা যুবক জুটিয়ে পুঁথি পড়ছে বা গল্পকেচ্ছা বুনে যাচ্ছে, সেই লোকটিই বাড়ি ফিরে একমুঠো মুড়ি চিবিয়ে দারুণ খিদে নিয়ে শুয়ে পড়বে? কী সহজেই না মানুষ আনন্দ আর আপাতত সুখের নিচে বয়ে বেড়াতে পারে অসহ কষ্ট। আসলে জীবনের উপরতলে কিছু বোঝা যায় না। ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য গোপনে বাড়ে, ধীরগতি বিষের মতো খাদ্যে, পোশাকে, চরিত্রে, মনোভাবে আক্রমণ চালায়। অসন্তোষ ঘুসঘুসে জ্বরের মতো ঘোরাফেরা করে, ক্রোধ জমে একটু একটু করে।
অনেক দিন ধরে জীবন কাটিয়ে গেছে এভাবে রহিম বখশ। কেমন ছিল এই জীবন, বড়ই কঠিন কি? তা জানে না সে। খুব কি কাজের জীবন? তাতেও আপত্তি রয়েছে তার। যে তরুণ বলদটিকে শিঙে তেল মাখিয়ে চকচকে করে তোলা হলো, লাঙলে তোলা হলো, গোজন্মের শেষে এসে যখন সে ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত হয়, ছুরি শাণাতে শাণাতে চলে আসে মুচি—সেই বলদটির জীবন কি খুবই কর্মবহুল?
যাই হোক, বাল্যকালের মধুর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে রহিম বখশ একদিন হঠাৎ একটা দুঃস্বপ্নের শিকার হয়ে গেল। সেই বছর দেশে ফলন হয়েছিল প্রচুর। রহিম বখশের বাবা অত্যন্ত খুশি ছিল। আনন্দে তার গম্ভীর মুখ আরও থমথমে হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এক সকালবেলায় দেখা গেল, নেকড়ে বাঘের মতো বড় কুকুরটা খড়ের গাদায় মরে পড়ে আছে। এই কুকুরটি বাতাসের আগে দৌড়াত, একবার একটা গোখরো সাপ হত্যা করে বালক রহিম বখশের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। কুকুরটা তাদের পরিবারেরই একজন ছিল। কয়েক দিন আগে কুকুরটা ভোররাতের দিকে আকাশে মুখ তুলে করুণ চিৎকার করে কিসের যে সূচনা করে দেয়! সেদিন সকালে তাকে মৃত অবস্থায় দেখা গেল। রহিম বখশই প্রথম দেখে, কাঠের মতো শক্ত হয়ে পড়ে আছে, কষ বেয়ে রক্ত এসে মিশেছে গলার কাছে। শুকিয়ে রক্তরেখা কালো হয়ে গেছে।
এই ঘটনার মাত্র দুদিন পর রহিম বখশ সকালে উঠে বাইরে গেছে। সে দেখতে পেল নতুন খড়ের গাদার ওপর কেউ একজন শুয়ে আছে। এত ঠান্ডায় ওখানে কে শুয়ে থাকতে পারে, কিছুতেই আন্দাজ করতে পারেনি বালক রহিম বখশ। কাছে গিয়ে দেখল তার বাপই পড়ে রয়েছে। মুখের ভাব নিশ্চিত। তার আদরের কুকুরটির মতো কষে লেগে রয়েছে রক্ত। খড়ের মধ্যে এক জায়গায় রক্তের কালচে একটা চাঙর জমে আছে। লোকটা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর বৈঠকখানায় এক শুত। তার সেই গম্ভীর হেঁড়ে গলার গর্জন আর ওই জাঁকালো শরীরের কথা ভাবলে এই নিঃশব্দ মৃত্যু ভারী বেমানান, সন্দেহ নেই।
স্বপ্ন দেখতে শুরু করার পর এই হচ্ছে রহিম বখশের প্রথম নির্ভেজাল দুঃস্বপ্ন। তারপর সে চোখের সামনে স্বপ্নের দৃশ্যটা আবার টুকরো টুকরো দেখতে পেল। শূন্যে তার বাপের মাথা ভাসছিল। শরীর থেকে টেনে ছিঁড়ে নেওয়া মাথা। ধড়টি বহু আগে খণ্ড খণ্ড হয়ে যেন ছড়িয়ে গেল মাঠে। রহিম বখশের এখন মনে পড়ছে, এই ঘটনার ধকলে সে কিছুদিনের জন্য রোগগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। অতিপরিচিত কৃষকদের দিকে সে চেয়ে দেখতে পর্যন্ত সাহস করত না। সেই সব বেঢপ নিরীহ মানুষগুলোই আতঙ্কে অস্থির করে তুলত তাকে।
এরপর বছর তিন-চারেকের মধ্যেই ব্যাপারটার সুরাহা হয়ে গেল। তার বাপের জমিজমাগুলো আবার ফিরে গেল। আসল মালিকদের কাছে নয় অবশ্যই—তার বাবা মুনশী নবীজানের মতোই কারও কাছে। এবং চাষিরা সেসব জায়গায় আগের মতোই মুখ বুজে কাজ করে যেতে লাগল।
অনেক দিন ধরে জীবন কাটিয়ে গেছে এভাবে রহিম বখশ। কেমন ছিল এই জীবন, বড়ই কঠিন কি? তা জানে না সে। খুব কি কাজের জীবন? তাতেও আপত্তি রয়েছে তার। যে তরুণ বলদটিকে শিঙে তেল মাখিয়ে চকচকে করে তোলা হলো, লাঙলে তোলা হলো, গোজন্মের শেষে এসে যখন সে ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত হয়, ছুরি শাণাতে শাণাতে চলে আসে মুচি—সেই বলদটির জীবন কি খুবই কর্মবহুল? বুড়ো তার বাঁকাচোরা গাঁট-ওঠা আঙুলগুলোর দিকে তাকায়। কী সাংঘাতিক খাটুনি গেছে সারা জীবন। অথচ বছরের পর বছরের সারিবদ্ধ মিছিল কী নোংরাভাবেই না একঘেয়ে! এই একই জীবন ঈশ্বর অনুগ্রহ করে আবার তাকে গোড়া থেকে ফিরিয়ে দিলে সে ঈশ্বরকে নিজেই উক্ত অনুগ্রহ উপভোগ করার অনুরোধ জানাবে।
এই সময় রহিম বখশ মুখ খুলতে গিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে যায়। সে কোনো আওয়াজ বের করতে পারছে না গলা দিয়ে। বহু চেষ্টা করল সে। শব্দ বেরোল কষ্ট-পাওয়া অবোধ জন্তুর মতো। তার দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল, ঝুলে-পড়া গলার চামড়া থরথর করে কাঁপতে থাকল। কিন্তু কোনো শব্দই সে বের করতে পারল না। সন্ধ্যার দিকে তার ছেলে এল। তাকে দেখে আবার তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু সে নিজেই শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।
কিন্তু শীত শেষ হয়ে বসন্ত এসে গেলে আকারে চেহারা পাল্টাতে আর নতুন পাতা দেখা দিতে শুরু করলেই রহিম বখশের ছবিগুলো উজ্জ্বল হতে থাকে। একটি অতিদীর্ঘ কষ্টের আর সংগ্রামের একঘেয়ে জীবন কাটিয়ে আসার পরেও স্মৃতিতে সবই সুখের। এসব সুখের স্বপ্নে সে মধ্যবসন্তের কাছাকাছি আসতেই বিভোর হয়ে ওঠে। বুড়ো আর যেন ভার বহন করতে পারে না। বহুদিন নীরব থাকার পর সে ঠিক করে, এসব স্বপ্ন আর ছবি যা সে দেখছে তা কারও কাছে বর্ণনা করবে। সে ভেবেছিল, এসব স্বপ্নের বিবরণ যদি সে দিতে পারে তাহলে হলুদ, বিবর্ণ, পুরোনো গন্ধঅলা এক বিলুপ্ত পৃথিবীকে সে শ্রোতার চোখের সামনে হাজির করে দিতে পারে। এ কথা ভাবতেই তার মন ভীষণ হালকা হয়ে আসে। ভেতরের উত্তজনায় তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায়। কাকে বলা যাবে এসব স্বপ্নের কথা? কে ঢুকবে এই হলুদ অরণ্যে? রহিম বখশ চশমা খুলে কাচ মুছে সেটি আবার চোখে লাগিয়ে পরিচিত কাউকে খুঁজতে চেষ্টা করে। কেরানি ছেলে একবার দেখা দিয়েই জীবিকায় বেরিয়ে যায়। পুত্রবধূ হাড়-বেরোনো হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রাত্রিদিন কী রান্না করছে সেই জানে। শেষে দশ বছরের পৌত্র মন্টুকে সে বেছে নেয়। একমাত্র তাকেই খানিকটা চেনা চেনা লাগে। রহিম বখশ সবকিছু গুছিয়েগাছিয়ে প্রস্তুত হলো।
তারপরের দিন—কী উৎকণ্ঠা আর আনন্দের প্রতীক্ষা রহিম বখশের! বিকেল চারটের দিকে স্কুল থেকে ফিরে হাত–মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে সে দাদুর ঘরে এল। দাদু যে এত সব উপহার নিয়ে তারই জন্য অপেক্ষা করছে, কিছুই জানত না সে। ধমক খাওয়ার ভয়ে কোনো কথা না বলে স্যান্ডেল ছেড়ে খালি পায়ে সে বাইরে যাচ্ছিল।
এই সময় রহিম বখশ মুখ খুলতে গিয়ে ভীষণ অবাক হয়ে যায়। সে কোনো আওয়াজ বের করতে পারছে না গলা দিয়ে। বহু চেষ্টা করল সে। শব্দ বেরোল কষ্ট-পাওয়া অবোধ জন্তুর মতো। তার দুচোখ ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল, ঝুলে-পড়া গলার চামড়া থরথর করে কাঁপতে থাকল। কিন্তু কোনো শব্দই সে বের করতে পারল না।
সন্ধ্যার দিকে তার ছেলে এল। তাকে দেখে আবার তার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু সে নিজেই শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।