বড় লোকের বিশ্বকাপ, যেন বিলাসপণ্যের বাজার
· Prothom Alo

ব্লক নম্বর ১২৪, সারি নম্বর ৪৫, আসন নম্বর ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৬।
১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে চোখ থাকার কথা বিশ্বকাপ ট্রফির দিকে। কে পার্থক্য গড়ে দিচ্ছেন, কারা হচ্ছে চ্যাম্পিয়ন—ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে সে উত্তর খুঁজতেই তো হাজির হবেন হাজারো মানুষ।
Visit grenadier.co.za for more information.
তবে ৮২ হাজার ৫০০ দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটিতে সেদিন কেউ কেউ হয়তো কৌতূহল নিয়ে তাকাবেন গোলপোস্টের পেছনের চারটি চেয়ারের দিকে। না, কোনো প্রাইভেট বক্স নেই সেখানে। আসনগুলোর সঙ্গে ক্যাটারিং সেবা বা কোনো ফাইনালিস্টের সঙ্গে ‘মিট অ্যান্ড গ্রিটের’ সুবিধাও নেই। তবু ৩৩ থেকে ৩৬ নম্বরের ওই চারটা আসন নিয়ে আপনার কৌতূহল না থেকেই পারে না। ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮.৮৫ ডলার দামের টিকিট বলে কথা। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতিটির দাম ২৮ কোটি টাকার বেশি। ঢাকায় এই টাকায় গুলশানে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কেনা যায়।
এ নিয়ে হইচই হলে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো অবশ্য বলেছেন, কেউ যদি ২০ লাখ ডলারে ফাইনালের টিকিট কেনেন, তাহলে তিনি নিজে হাতে সেই দর্শকের জন্য হট ডগ আর কোক নিয়ে যাবেন, যাতে তাঁর খেলা দেখার অভিজ্ঞতা আরও ভালো হয়। কথাটা বলে তিনি ঠোঁটের কোণে এমন একটা হাসি ঝুলিয়েছেন, যেন ২০ লাখ ডলারের টিকিটের সঙ্গে হট ডগ ফ্রি দিলেই খরচটা একটু সহনীয় শোনাবে!
ইনফান্তিনোর রসিকতায় হাসি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু হিসাবের খাতা খুব একটা মজার নয়। সংখ্যাগুলোই বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের নয়, খরচেরও বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। টিকিট থেকে হোটেল, ট্রেনের ভাড়া থেকে পার্কিং—যেদিকেই তাকান, ডলারের অঙ্ক যেন ছুটছে ওপরের দিকেই।
যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে একটি দেয়ালে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুটবলচিত্রশোষণ আর বিশ্বাসঘাতকতার দাম
বিশ্বকাপ শুরুর এক মাস আগে ফাইনালের টিকিটের দাম তিন গুণ বাড়িয়েছে ফিফা। সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির টিকিট প্রথমে ১০ হাজার ৯৯০ ডলার ধরা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার (প্রায় ৪০ লাখ ৪৭ হাজার টাকা) করা হয়েছে। এই খরচ কতটা বেশি, সেটি বুঝতে সর্বশেষ আসরের সঙ্গে তুলনা দেখা যেতে পারে।
কাতারে ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল ১ হাজার ৬০৪ ডলার আর ২০২৬-এ তা ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার—২০ গুণের বেশি। বলতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির যে বিশালত্ব, ফাইনাল নিয়ে উত্তেজনা, সব মিলিয়েই ফাইনালের টিকিটের দাম বেশি। কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির একই চিত্র কিন্তু গ্রুপ পর্বের টিকিটের বেলায়ও।
যে বিশ্বকাপের পদে পদে ট্রাম্পের আমেরিকার ছাপটিকিটের দামের এই বৃদ্ধির কারণ ডায়নামিক প্রাইসিং। বিষয়টা জটিল আবার মজারও। ফিফা প্রথমে বিশ্বকাপ টিকিটের আবেদন নিয়েছিল, টাকা নয়। সেই আবেদনগুলো নিয়ে করা হয় লটারি। সাধারণত লটারি জেতা মানে কিছু পেয়ে যাওয়া। এ ক্ষেত্রে ঘটনা ভিন্ন। লটারিতে নাম ওঠা মানে আপনি টিকিট কেনার বাজারে ঢুকতে পেরেছেন। এবার টিকিট কিনতে পারবেন কি না, সেটা দরদামের ব্যাপার।
যে টিকিটের জন্য আপনি ১০ ডলার দেবেন, সেটি অন্য কেউ ১০ সেন্ট বেশি দিলেই নিয়ে যেতে পারবে। আবার কেউ আগ্রহী না থাকলে আপনি সর্বনিম্ন দামেও কিনতে পারবেন। বাজার চাহিদার সঙ্গে দামের ওঠানামার এ ব্যাপারটিই ডায়নামিক প্রাইসিং। আবার এই প্রাইসিংয়ের যুদ্ধে জিতে টিকিট কেনার পর সেটি নিয়ে ‘ব্যবসা’ করারও সুযোগ আছে। ফিফাই রিসেল মার্কেট নামে একটি বাজার চালু করেছে, সেখানে আপনি বেশি দাম হেঁকে টিকিট বিক্রি করতে পারবেন। এ কাজটা ফিফা কেন করেছে?
শুধু বিশ্বকাপের বছরেই ফিফার আয় হবে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা)। তুলনায় ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক থেকে আয় হয়েছিল ৫.২৪ বিলিয়ন ডলার।স্টক মার্কেটের ব্রোকারেজ হাউস যেমন ক্রেতা আর বিক্রেতা দুই পক্ষ থেকে কমিশন পায়, ফিফাও রিসেল মার্কেটের টিকিট থেকে ১৫, ১৫ করে ৩০ শতাংশ কমিশন পাবে। ফাইনালের ওই চারটি টিকিট যদি ২৩ লাখ ডলার দামে বিক্রি হয়, ফিফা প্রতিটি থেকে কমিশন বাবদই পাবে ৬ লাখ ৯০ হাজার ডলারের মতো।
টিকিটের এই বাড়াবাড়ি দাম নিয়ে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই বলেছেন, এত দাম দিয়ে তিনি নিজেই টিকিট কিনতেন না।
ফুটবল সমর্থক গোষ্ঠী ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ তো বিশ্বকাপের টিকিটমূল্যকে ‘চরম শোষণ’ ও ‘মহা বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে ইউরোপীয় কমিশনে মামলাও ঠুকেছে।
বিশ্বকাপের সঙ্গে অর্থনীতি মিশলে যা হয়যেন বিলাসপণ্যের বাজার
তবে এবারের বিশ্বকাপে টিকিটের দামই শুধু মাথাব্যথার কারণ নয়। বহু টাকা খরচ করে টিকিট কেটে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেছেন; কিন্তু মাঠে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া—প্রতিটি ধাপেই আপনাকে দেদার ডলার ছাড়তে হবে।
নিউইয়র্কের পেন স্টেশন থেকে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের দূরত্ব ৫৬ কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে এই পথের আসা-যাওয়ার ভাড়া প্রায় ১৩ ডলার। বিশ্বকাপের সময় নিউ জার্সি ট্রানজিট সেই ভাড়া ৯৮ ডলার করেছে। বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামের চিত্রও একই—স্বাভাবিক ভাড়ার চেয়ে চার গুণ বেশি, ৮০ ডলার রাউন্ড ট্রিপ ট্রেনের ভাড়া আর এক্সপ্রেস বাসে ৯৫ ডলার।
টেক্সাসের স্থাপন করা বিশ্বকাপ ট্রফি রেপ্লিকার সঙ্গে উৎসাহী দর্শকআর আপনি যদি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট না নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করেন, সেখানেও রেহাই নেই। মেটলাইফে পার্কিং ফি ২২৫ ডলার, বোস্টনের জিলেটে ১৭৫ ডলার এবং সেটা স্টেডিয়ামের পার্কিংয়েও নয়, পাশের শপিং মলে।
এবার আসুন আবাসনে। ম্যাচের দিনের হোটেলের কক্ষভাড়া প্রতিদিনই আগের চেয়ে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প অবস্থানের জন্য এয়ারবিএনবি বেশ জনপ্রিয়। কেউ নিজের বাসার একটি অংশ এক বা একাধিক রাতের জন্য ভাড়া দিয়ে থাকে। সেই এয়ারবিএনবিতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের কাছের একটি বাসার এক রাতের ভাড়া ছয় হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছে।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি চার সদস্যের স্কটিশ পরিবার যদি তাদের দলের গ্রুপ পর্বের খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যায়, তাদের থাকার খরচই পড়বে ৩৪ হাজার ডলারের বেশি। অথচ ব্রাজিল, মরক্কোর গ্রুপে স্কটল্যান্ড আদতে কতটা কী করতে পারবে, সেই অনিশ্চয়তা তো আছেই।
মেক্সিকান টাকোস আর আমেরিকান বার্গারের বিশ্বকাপফিফার ঘরে ১৩ বিলিয়ন ডলার, দলগুলোর কত
এই বিশাল ব্যয়ের ঢেউ শুধু দর্শকদের নয়, অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকেও স্পর্শ করছে। ২০২৩-২০২৬ চক্রে ফিফার মোট রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ১৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার ৬২০ কোটি টাকা)। দ্য গার্ডিয়ান–এর তথ্য অনুযায়ী, শুধু বিশ্বকাপের বছরেই ফিফার আয় হবে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা)। তুলনায় ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক থেকে আয় হয়েছিল ৫.২৪ বিলিয়ন ডলার।
অবশ্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য বরাদ্দও বাড়িয়েছে ফিফা। এবার দলগুলোর প্রাইজমানি রাখা হয়েছে মোট ৮৭ কোটি ১০ লাখ ডলার (প্রায় ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা), যা কাতারের (৪৪ কোটি ডলার) প্রায় দ্বিগুণ। প্রতিটি দল কমপক্ষে পাবে ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার (১৫৩ কোটি টাকা)। এরপরও কোনো কোনো দেশের শঙ্কা, ভ্রমণ, আবাসন ও অন্যান্য খরচ এতটাই বেশি যে গ্রুপ পর্বে বাদ পড়লে মোটের ওপর লোকসানই হবে।
তবে ফিফা মোটের ওপর লাভই দেখছে সবার। টিকিট নিয়ে, আবাসন ও যাতায়াত নিয়ে যতবারই কথা উঠেছে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ঘুরেফিরে বলেছেন, ফিফা একটি অলাভজনক সংস্থা এবং এই আয় ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় হবে।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ফিফা অর্থের পাহাড় গড়তে গিয়ে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসবটিকে সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে।
ব্লক নম্বর ১২৪, সারি নম্বর ৪৫, আসন নম্বর ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৬—টিকিটগুলো শেষ পর্যন্ত কেউ কিনেছেন কি না, কিংবা কারা কিনেছেন সেটি জানা যাবে ১৯ জুলাই। কিন্তু সেই দামের সংখ্যাটা সাধারণ মানুষের মাথায় থেকে যাবে অনেক দিন—ফুটবল কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তার একটা চিহ্ন হিসেবে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, প্রথম আলো
বিশ্বকাপে প্রথমবার, চার দেশের এক গল্প